.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

বাংলা সাহিত্যের ‘ছুপা রুস্তম’ মাসুমুল আলম | শাহনাজ নাসরীন

বাংলা সাহিত্যের ‘ছুপা রুস্তম’ মাসুমুল আলম | শাহনাজ নাসরীন

গল্পে তার চর্চা আছে, আছে নিজেকে আড়ালের ভিতরও দাপট বহাল রাখার বিষয়। তার ভাষা, বুনন কৌশল, গল্পভঙ্গি তাকে আলাদা করে। তার গল্পে কাহিনির ঝাঁপাঝাপি নেই, নিজেকে দেখার রূপ ছড়ান তিনি।
'আনন্দ কোথা থেকে আসে', 'নামপুরুষ', 'জ্বর', 'স্বৈরিণীর জন্য প্রতীক্ষা', 'সমবেত হত্যাকাণ্ড' সহ আরো বেশ কিছু গল্প তার আছে।
(নয়ের দশকের গল্পকার: একটি প্রাথমিক সমীক্ষা,  কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, ২০১৩।)

প্রয়াত কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করতে হলো কারণ ২০১২তে  ‘নামপুরুষ ও অন্যান্য’গল্পগ্রন্থটি পাঠ করার পর আমারও ঠিক এমনি একটি অনুভূতি হয়েছিল। যেন এই কথাগুলো আমারই যদিও এই গ্রন্থের নামগল্প সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বহুরৈখিক আখ্যান ‘নামপুরুষ’পাঠের পর আমি ভাবছিলাম এটি উপন্যাস কেন নয়! 

মাসুমুল আলমের কথা নব্বইয়ের আলোচনায় শুনতে পাইনি। অথচ প্রকাশিত বই পড়ে জানা গেল ততদিনে লিটলম্যাগ এ তার প্রচুর লেখা ছাপা হয়ে গিয়েছিল (বই সত্যি গুরুত্বপূর্ণ!)। কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর ২০১১ তে প্রকাশিত মাসুমুল আলমের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নামপুরুষ ও অন্যান্য’ নিয়ে যখন এই আলোচনা লিখছেন একই সময়ে অর্থ্যাৎ ২০১৩ এর ফেব্রুয়ারির বইমেলায় মাসুমুল আলমের প্রথম উপন্যাস ‘র‌্যাম্প, বার-বি-কিউ আর কানাগলির হুলো’ প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। মাসুমুল আলমের তিনটি উপন্যাসের মধ্যে এটিই দীর্ঘ। পরিচ্ছেদ বিভাজনহীন টানা গদ্যে লেখা ১১২ পৃষ্ঠার এই উপন্যাস পাঠককেই ভয় পাইয়ে দিতে পারে। ছোট ফন্টে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ঠাঁস বুননে অক্ষর সাজানোর জন্য যথেষ্ট দক্ষতার সাথে সাহসও দরকার। আর প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস  সেই সাহসের যোগানদার। ধারণা করি লেখকের তা একটু বেশিই আছে। তিনি চেনেন তার পাঠকদের। হ্যাঁ, তিনি আম পাঠক তথা তার ভাষায়, ‘শ্রমবিমুখ, উইট আর হিউমারের সন্ধানে মজামারা ম্যাংগো পিপলের জন্য শিল্প করেন না’তাই জনপ্রিয়তার মোহে স্বাদু গদ্যের প্রচল পথে হাঁটেন না। দুর্বিনীত অহংকারে জানান দেন তিনি ‘আত্মাশূন্য পারফেকশনিস্ট’না । তবু তার যাদুবিস্তারি টেক্সট এর কল্যাণে নীরব এক ভক্তশ্রেণী তৈরি হয়েছে যারা তার বই হাতে নেন পাঠ শেষও করেন।

র‌্যাম্প, বার-বি-কিউ আর কানাগলির হুলো
র‌্যাম্প, বার-বি-কিউ আর কানাগলির হুলো
প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নামপুরুষ ও অন্যান্য’পাঠ শেষে যেসব পাঠকেরা অপেক্ষায় ছিলেন পরবর্তী পাঠের, তার প্রথম উপন্যাস ‘র‌্যাম্প, বার-বি-কিউ আর কানাগলির হুলো’ নিশ্চিতভাবেই তাদেরকে আরও পরিণত একটি উপন্যাস পাঠের তৃপ্তি দিয়েছে। উপন্যাসের  নামটিই যেন অনেক কাহিনির ইঙ্গিত দেয়। একটি আবদ্ধ সমাজের কৃত্রিম পুঁজির বিকাশের সাথে অনিবার্যভাবে র্যা ম্প ও বার-বি-কিউ সংস্কৃতির উত্থান আবার পুঁজির দৌরাত্ম্যে নিপীড়িত জনতার বার-বি-কিউ হওয়া সবই ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকে। তেমনি রূপক, ইঙ্গিতময়তা আর কূটাভাসে বাস্তব ও পরাবাস্তব একাকার হয়ে পাঠককে বিমূঢ় করে রাখে।

‘র‌্যাম্প, বার-বি-কিউ আর কানাগলির হুলো’ উপন্যাসের শুরুই চমক দিয়ে। প্রথম পৃষ্ঠাতেই মাত্র আড়াইশ’শব্দে তিনি পুরো উপন্যাসটির  সিনোপসিস পাঠককে জানিয়ে দেন। যেমন ভৌগলিক অবস্থান: 
শহরের পূর্ব-পশ্চিমে একদা প্রবাহিত ভৈরব নদ এইখানে মৃত।

সামাজিক অবস্থা:
এই একটুকরো ভূ-খণ্ডের স্ফীতোদর উত্তরাংশ− যেটা আসলে মরা ভৈরবের তীরে গড়ে ওঠা কলোনি− অনেক আগে থেকেই সেখানে অভিবাসিত বহু ছিন্নমূল মানুষের বাস; আর বাদবাকি এলাকা জুড়ে যারা তাদের অনেকেই নিজেরা নিজেদেরকে আদিবাসিন্দা বলে শ্লাঘা বোধ করলেও অন্যরা আদৌ তা মনে করে না। বরং, জনমিতিতে মানুষের জীবনপর্বে অভিপ্রয়াণ বা স্থানান্তরের ধারণাটি তো বেশ পুরোনো: মূলত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক কারণগুলো সামনে চলে আসে। সুতরাং বিরাজমান বাস্তবতায় বেশ একটা মিশ্র ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়া এখানে লক্ষ করা যায়।

এরকম একটি জনপদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও এর পরিণতি সম্পর্কেও লেখক আগাম জানিয়ে দিচ্ছেন:
যদিও আগামীতে, এতদঞ্চলে সার্বিক অর্থে একটা মুখ থুবড়ে পড়া মন্দা মুমূর্ষু টিকটিকির খসে পড়া লেজের মতো গোটা এলাকাটিকে বিশিষ্ট করে তুলবে। এবং এর কেন্দ্রস্থলে একক মোশিউর রহমান; তাকে সামনে রেখে অর্থনীতির দুষ্টচক্রে আবর্তিত একটা খেলা জমে উঠলেও শেষ পর্যন্ত নিছক অর্থহীনতায় পর্যবসিত হয়। ফলে, সবকিছুই পূর্বাপর যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে যায়।

এবং উপসংহারে লেখক জানিয়ে দিচ্ছেন,
এতদসত্ত্বেও, পরবর্তীতে মোশিউর রহমান তার জীবনের সর্বশেষ অন্যায়টা করে যখন কলোনির জামে মসজিদে বিদেশি মুসল্লিদের সাথে বেয়াদবির কারণে এলাকায় একটা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফলে, থানাগারদ থেকে ফেরার পর সে নিজেকে গৃহবন্দি এবং মহল্লার ভেতর তার দীর্ঘ অনুপস্থিতির জন্য একরকম বিস্মরণ হয়ে যায়।

এই হলো গল্পের সারসংক্ষেপ। এরপর লেখক উপন্যাসের বিস্তার ঘটান কাল্পনিক এক কথপোকথনে। যেখানে তিনি হয়তো এই এলাকার পুরোনো কোন বাসিন্দা যে লেখক ও মোশিউরের সমসাময়িক কিন্তু অনেকদিন এই মহল্লায় গতায়ত নেই এমন কাউকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘এই ঘটনাটি অবশ্য তোমার জানা থাকে না। যদিও মোশিউরকে তুমি আগে থেকেই বিলক্ষণ চিনতে।’সাথে জানাচ্ছেন মোশিউর রহমান খর্বত্বের জন্য বেড়ে মোশিউর নামে বিশেষ পরিচিত। উচ্চমাধ্যমিকের পর পড়াশুনার পাট চুকিয়ে দেয়া বেড়ে মোশিউরের বিশেষ যোগ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করছেন− অবিরাম কথা বলতে পারা, নানাবিধ বিষয়ে আগ্রহ, গোঁয়ারের মতো সাহস এবং আগ-বাড়ানো আলাপী স্বভাব। এই সাহস তাকে বয়স নির্বিশেষে রাজনীতিক-সাংস্কৃতিক চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সামনে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেয় আগ-বাড়ানো আলাপী স্বভাবের উৎসও এই গোঁয়ার, অন্ধ সাহস যা দিয়ে সে বিশেষজনদের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলে। অথচ ‘সমবয়স্ক  সমযোগ্যতাসম্পন্নদের  সাথে সে মেশে না, নিজের পাড়ায় চা সিগ্রেট খায় না আড্ডা দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না।’

পাঠক লক্ষ করুন, পুঁজি বাজারের ফড়িয়ার এই নিখুঁত পোর্ট্রে। কানা গলির এই সেই হুলো যে চেতনাসম্পন্নদের কাজে লাগিয়ে একটি কৃত্রিম স্বপ্নভূমি নির্মাণ করে সবাইকে বোকা বানায়। প্রতিটি জেলা শহরেই অপশাসনের সুযোগে খর্ব মোশিউরদের হাত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় অতঃপর সর্বনাশের চূড়ান্ত ঘটিয়ে তারা গা ঢাকা দিতে পারে সিস্টেমের ফাঁক-ফোকড়ে−
তারপর একদিন নতুন একটা আলোড়ন ওঠে: কী হয়, সেদিন দুপুরের আগে মানবাধিকার সংস্থার একটা ঝাঁ চকচকে গাড়ি, একটা অ্যাম্বুলেন্স আর একটা পুলিশ ভ্যান এসে মোড়ের মাথায় সহসা এসে থামে। বিচক্ষণ মোনায়েম রশীদকে অন্যদের সাথে মানবাধিকারের গাড়ি থেকে নামতে দেখা যায়। যথা সময়ে যথাস্থানে মোনায়েম রশীদের আবির্ভাব এবং মোড়ের দোকানে সর্বদা খুঁটি গেড়ে বসে থাকা মুখের দোষঅলা ট্যারা কালামের অবস্থান, পরন্তু, এই নিঃসাড় খরদুপুরে যখন রাস্তাঘাটে মুষ্টিমেয় পথচারী, তখন সমস্ত এলাকা স্তম্ভিত ক’রে দিয়ে মেয়রের নির্বাচনী প্রতীক ‘গা-ভী-রে’ডাকটা হঠাৎ শোনা যায়।

খর্বত্ব এ উপন্যাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। মরা ভৈরব একইসাথে মানুষ আর ভূমির সার্বিক বন্ধ্যাত্বেরও প্রতীক। নদীর উর্বরতা নয় বন্ধ্যা নদ পরিবেষ্টিত একটি মহল্লার মানুষের শারীরীক ও মানসিক খর্বতার এ রূপক গোটা দেশ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার  বামনত্ব  প্রকট করে তোলে। 

২০১৩ পরবর্তী সাত বছরে ধারাবাহিকভাবে মাসুমুল আলমের বই প্রকাশিত হচ্ছে এবং অনেকের ক্ষেত্রে যেমন প্রথম বইটিই মাস্টারপিস হয়ে যায় মুসুমুল আলমের ক্ষেত্রে তেমন ঘটেনি। ভাষার কারুকাজে গল্প বলার কায়দায় তিনি উত্তরোত্তর নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। অনুবাদেও নিজস্বতার স্বাক্ষর অক্ষুন্ন রেখেছেন। বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি কথাসাহিত্যিক ঘাসান কানাফানির উপন্যাস ‘মেন ইন দ্য সান’মরুভূমির পথে কয়েকজন ভাগ্যান্বেষী ফিলিস্তিনি তরুণের করুণ মৃত্যুর মর্মন্তুদ কাহিনি। মাসুমুল আলমের  অনুবাদে তা প্রকাশিত হয়েছে ২০১৫ তে। তৃতীয় বিশ্বের ভাগ্যান্বেষী প্রান্তিক তরুণদের এই গল্প অনুবাদকের মুন্সীয়ানায় বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণের দালালের খপ্পড়ে পড়ে স্বপ্নভূমিতে গিয়ে বা সেখানে পৌঁছানোর আগেই পথেঘাটে নির্মমভাবে  মৃত্যুবরণ করার বাস্তবচিত্র হয়ে ওঠে। 

আরব্য রজনীর ঘোড়া
আরব্য রজনীর ঘোড়া
আরও দুটি উপন্যাস ‘আরব্য রজনীর ঘোড়া (২০১৬)’ ও ‘মৌন ধারাপাত (২০১৭)’। ‘র‌্যাম্প, বার-বি-কিউ আর কানাগলির হুলো’র  তিন বছর পরে দ্বিতীয় উপন্যাস আরব্য রজনীর ঘোড়ায় আবার ফর্ম ভাঙার নিরীক্ষা, খোলনলচে পাল্টে বেরিয়ে আসা! এদেশের শিল্প সাহিত্যে যৌনতা বিশেষত নারীর যৌনতা নিয়ে কথা বলবার ক্ষেত্রে একরকমের অটো সেন্সরশীপ কাজ করে। এ যেন উচ্চারণ অযোগ্য বিষয় যেন অন্ধকারে সমাহিত থাকাই এর নিয়তি। কিন্তু মাসুমুল আলম প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নামপুরুষ ও অন্যান্য’থেকেই প্রথাগত স্ট্রাকচারের বাইরে তুলনামূলক স্পষ্টতায় যৌনতা ডিল করেন। বিশেষত প্রকাশে দ্বিতীয় হলেও (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও তৎপরবর্তী মৌলবাদের উত্থান নিয়ে লিখিত প্রথম উপন্যাস ‘মৌন ধারাপাত’ তবে প্রকাশে এটি তৃতীয়) লেখার ধারাবাহিকতায় তৃতীয় ‘আরব্য রজনীর ঘোড়া’উপন্যাস ও তৎপরবর্তী গল্পে যৌনতা নিয়ে ডিল করার প্রবণতা সুস্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। সেসব লেখায় যৌনতা শুধু পারস্পরিক সম্পর্ক থাকে না বরং যৌনতার সামাজিক প্রেক্ষাপট ও দৃষ্টিভঙ্গি, শ্রেণিগত যৌন আচরণ, যৌনতার রাজনীতি, ক্ষমতার সাথে যৌনতার সম্পর্ক, ডাবল ষ্ট্যান্ডার্ড সব কিছু নিয়েই টান দেন তিনি। আরব্যরজনীতে রাজকুমারী শেহেরজাদী গল্পের বুনন কৌশলে রাজাকে ভুলিয়ে রাখে আর মাসুমুল আলম একই গল্প বিভিন্নভাবে বলে প্রতিবারই আগের সত্যটি ভেঙে দিয়ে একই আখ্যানের আরও বিশ্বস্ত আরেকটি বাস্তবতা তুলে ধরে সত্যমিথ্যার  গোলকধাঁধাঁয় পাঠককে বিভ্রান্ত করে ফেলেন। 

তিন বয়সের ও অর্থনৈতিক অবস্থানের তিন নারীর মনোলোগে তাদের সামাজিক অবস্থানের প্রেক্ষিত পাঠকের সামনে রেখে সমান্তরালে সমসাময়িক সমাজ ও রাজনৈতিক  ঘটনাসমূহের বিবরণ দিতে দিতে নারীত্রয়ের প্রেমিক ও যৌনাচার, যৌন অবদমন, যৌনতার পণ্যায়নও এক্সপ্লয়টেশান এর বিশ্বাসযোগ্য আখ্যানটির ভেতর পাঠক পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার পর তৃতীয় এক ব্যাক্তির পারসপেকটিভে গল্পের পুণঃনির্মাণ করেন তিনি। কারণ তিনি গল্পদাদু নন। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার ভাষায়− ‘ফুরোয় না ফুরোয় না নটে গাছটা বুড়িয়ে ওঠে কিন্তু মুড়োয় না’। জীবনকে তিনি পাঠ করেন ও করান বহুকৌণিক বাস্তবতায় এবং সম্ভাবনায়। দুটি গল্পগ্রন্থ ‘দর্শনীর বিনিময়ে’(২০১৯) ও ‘বরফের ছুরি’র (২০২০) ইঙ্গিতময় গল্পগুলো এক্ষেত্রে স্মর্তব্য। কখনো বিদ্রুপাত্মক কখনো কাব্যময় মায়াবী ভাষায় মানুষের জীবন প্রণালীতে যৌনতার ঘোর ও ক্লেদের বয়ান করেন। এরকম বোধের কালে জীবনানন্দ দাশের কথা মনে পড়ে কিন্তু মাসুমুল আলম একেবারে নিজস্ব একটি ভাষা ভিন্ন একটি ষ্টাইল নির্মাণ করেছেন যেখানে তিনি প্রতিটি শব্দ এমনকি যতিচিহ্নগুলিও নিজস্ব মাপে সবিশেষ যত্নে ব্যবহার করেন!

দর্শনীর বিনিময়ে
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
‘দর্শনীর বিনিময়ে’র ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’‘লালবিবি সমাচার’‘ষষ্ঠীর খেলা’ইত্যাদি গল্পের সাথে সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায় ‘প্রদর্শনী দশ সেকেন্ড’ও ‘পানির সহজ সংকেত’ গল্পের এবং এই ধারার বারোটি গল্প নিয়ে ২০২০ এ ‘বরফের ছুরি’। ‘বরফের ছুরি’তে আবার বাঁকবদল! ‘নামপুরুষ ও অন্যান্য’বা ‘দর্শনীর বিনিময়ে’র প্রথম দশটি ঘন বুনটের গল্পে ভাষার কারুকাজ যতটা মনোযোগ কাড়ে সেই তুলনায় ‘বরফের ছুরি’র গল্পগুলোতে শব্দপ্রয়োগ অনেকটাই সহজ, ঘটনাগুলো দৈনন্দিন। তুলনামূলক অনাড়ম্বর ভাষায় লেখা স্বল্পপরিসরের এই গল্পগুলো যেন সুগারকোটেড বোমা একেকটা! চেনাজানা সমাজের এর ‘আম ও খাস’মানুষদের তীব্র ঈর্ষা, নীচতা, নীতিহীনতা, প্রতারণামূলক সম্পর্ক, যৌনতার ভালোবাসাহীন ক্লেদাক্ত ব্যবহার সব মিলিয়ে ভীষণ ধাক্কা দেয়, বিষন্ন আর তিক্ত করে। কিন্তু অস্বীকার করার কোন উপায় থাকে না। কারণ এইরকম একটি আত্মঘাতী জীবনপ্রণালীর ভেতর আমাদের বাস। 

এই অসহনশীল সময়ে সমালোচনা সাহিত্য যেখানে লুপ্ত প্রায় মাসুমুল আলম সেখানে একেবারে খড়গহস্তে চ্যালেঞ্জ করেন। ‘কথাপরিধি: ২২ পয়েন্ট বোল্ড ও অন্যান্য’(২০২০) শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির হালহকিকত ও সেই জগতের কুশীলবদের জীবন-যাপন-রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে তীব্র শ্লেষাত্মক আলোচনা বা স্বগত সংলাপ (?), দুটি পূনর্মুদ্রিত গল্প, বই আলোচনা, সাক্ষাৎকার, আরববিশ্বের দু’জন লেখকের গল্পের অনুবাদ সব মিলিয়ে একেবারে ভিন্ন স্বাদের এক গদ্যসম্ভার। এইসব গদ্যের ধ্বক পাঠককে জানান দেয় লেখককে কতোটা নির্লোভ হতে হয়, নির্লোভ হলে হয়তো এতটা স্পষ্টভাষী হতে পারা যায়। গ্রন্থের ৯-৫৭ পৃষ্ঠার কথাপরিধি অংশে ধারালো লেখনীতে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত করা শুধু নয় নির্মম হাতে ব্যবচ্ছেদ করেছেন অশিক্ষা, ভণ্ডামি, গোষ্ঠীবদ্ধতার সংস্কৃতিকে। পাশাপাশি আন্ডাররেটেড ভালো লেখা ও লেখকের তথ্যও দিয়েছেন যথেষ্ট। কেন? যেন মতি ফেরে? আবালপনার উজ্জ্বল উদ্ধার যেন হয়?

উপরে উল্লেখিত উদ্ধৃতির সামান্যতম বিচ্যুতি না ঘটিয়ে বরং প্রতিনিয়ত মাসুমুলের ভাষা আরও শানিত হয়েছে। শব্দের সুচিন্তিত প্রয়োগ, যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার, ভাষার কাব্যময়তা তাকে বিশিষ্ট করেছে নিঃসন্দেহে। কাহিনির ঝাঁপাঝাপি নেই আছে বড় বড় কাহিনির ইঙ্গিত দিয়ে ছোট বাক্যে বক্তব্য শেষ করার পারঙ্গমতা, আছে গল্পের  ভেতর অসংখ্য তির্যক ও তীব্র গল্প, আছে অসম্ভব নিরীক্ষাপ্রবণতা! কী গল্পে কী উপন্যাসে বার বার নতুন ফর্ম নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছেন আবার নিজের ফর্ম নিজেই  ভেঙে দিচ্ছেন! 

একটি শব্দবন্ধ আছে ‘ছুপা রুস্তম’। ছুপা কি বাংলা শব্দ? আঞ্চলিক ব্যবহার আছে জানি। আমার দাদী বলতেন। স্পেশাল কোন জিনিষ/খাবার আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলতেন ছুপায় রাখো/খাও অর্থ্যাৎ তার আরও অনেক নাতি নাতনিরা যেন এই পক্ষপাত টের না পায় তাই লুকিয়ে রাখতে/খেতে হবে। রুস্তম অবশ্য বাংলা সাহিত্যের নায়ক নয়। তবু কারো বিশেষ গুণের খোঁজ পেলে আমরা এই শব্দবন্ধটি অহরহই ব্যবহার করি। হিন্দি সিনেমার নায়কের ক্ষেত্রে রাগ, ঘৃণা, জিঘাংসা, ভালোবাসা ইত্যকার সবরকম আবেগ প্রকাশেই ‘... ছুপা রুস্তম নিকলা’বাক্যটির ব্যবহার দেখা যায়। অন্তর্গত ভাবটি হচ্ছে সে বিশেষ কিছু। আনপ্যারালাল। মাসুমুল আলমকে অনেকটা সেভাবেই আবিস্কার করা গেলো!

শ্রদ্ধেয় কথাসাহিত্যিক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর অকালে প্রয়াত না হলে ২০২০ এ মাসুমুল আলম সম্পর্কে লিখতেন নিশ্চয়ই। সেই লেখাটি পড়তে না পারার বেদনায় এই মুহূর্তে ভারাক্রান্ত বোধ করছি।

মন্তব্য

BLOGGER
নাম

অনুবাদ,14,আত্মজীবনী,16,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,উৎপলকুমার বসু,23,কবিতা,175,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,10,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,32,ছড়া,1,জার্নাল,1,জীবনী,3,দশকথা,22,পুনঃপ্রকাশ,8,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,1,প্রবন্ধ,56,বর্ষা সংখ্যা,1,বিক্রয়বিভাগ,23,বিবৃতি,1,বিশেষ,12,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,21,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,সম্পাদকীয়,8,সাক্ষাৎকার,12,স্মৃতিকথা,2,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: বাংলা সাহিত্যের ‘ছুপা রুস্তম’ মাসুমুল আলম | শাহনাজ নাসরীন
বাংলা সাহিত্যের ‘ছুপা রুস্তম’ মাসুমুল আলম | শাহনাজ নাসরীন
https://1.bp.blogspot.com/-yxfFUVMmrQk/X_A2DaBMCKI/AAAAAAAABMU/XSMzIhN_ZjY61fCeSYttN42AJg7G3XatACNcBGAsYHQ/w320-h160/%25E0%25A6%25B6%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B9%25E0%25A6%25A8%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%259C-%25E0%25A6%25A8%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%25B0%25E0%25A7%2580%25E0%25A6%25A8-%25E0%25A6%25AE%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B8%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25AE%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25B2-%25E0%25A6%2586%25E0%25A6%25B2%25E0%25A6%25AE.png
https://1.bp.blogspot.com/-yxfFUVMmrQk/X_A2DaBMCKI/AAAAAAAABMU/XSMzIhN_ZjY61fCeSYttN42AJg7G3XatACNcBGAsYHQ/s72-w320-c-h160/%25E0%25A6%25B6%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B9%25E0%25A6%25A8%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%259C-%25E0%25A6%25A8%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%25B0%25E0%25A7%2580%25E0%25A6%25A8-%25E0%25A6%25AE%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B8%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25AE%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25B2-%25E0%25A6%2586%25E0%25A6%25B2%25E0%25A6%25AE.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2021/01/Shahnaz-Nasreen.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2021/01/Shahnaz-Nasreen.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy