.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

লালসালু উপন্যাসের বানোয়াট বাস্তবতা: বাংলা সাহিত্যে তার উত্তরাধিকার

লালসালু উপন্যাস্যের বানোয়াট বাস্তবতা: বাংলা সাহিত্যে তার উত্তরাধিকার

এক

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ভিন্ন ভিন্ন সাহিত্যকর্ম বিচারের  বেলা  যে চুল ছেঁড়া দিক উন্মোচন হওনের কথা একাডেমিক পরীক্ষার নম্বর পাওন আর দেওনের রীতির কারণে বাস্তবে তা হয় না। আমরা কিন্তু একাডেমিকভাবে পরীক্ষার নম্বর পাইবার লাইগা ওয়ালীউল্লাহর 'লালসালু' উপন্যাসের বানানো জগতরে লয়া কোনো প্রশ্ন করি না । কিন্তু এই বানানো সমকালিক জগতরেও ভাঙবার আছে, বিচক্ষণ পাঠক ও সমালোচকরা কেন বানোয়াট সমকালিক গর্ভের ছাঁচ ভাঙতে পারবে না? এই প্রশ্নখান ওয়ালীউল্লাহর সমালোচকদের  বেলায় জারি থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একমাত্র লালসালুর বিচারে দেখা হয় এই লেখকরে। এইকথা কইলে খুব অমূলক হইব না যে, লালসালুর একটা জনপ্রিয় উপনিবেশ গইড়া ওঠছে পরবর্তী বাংলা সাহিত্য তথা সিনেমা, নাটকেও।

রচনা জনপ্রিয় হইবার প্রথম শর্ত হইল পাঠকের মনোজগৎরে  চোখের সামনে তুইলা আনতে পারার ক্ষমতা। এই অনুপাতে লালসালুর চিত্রপট কি বাংলাদেশী মনোজগতের বহুদিনের অপ্রকাশিতব্য  কোনো অপাঠ্য ধন ছিল? নিশ্চয়ই তা না। পীর-ফকির বা ধর্মের নামে ব্যবসা করার  যে গল্পভিত্তিক চিত্রপটের পরবর্তী জনপ্রিয়তা  দেখা গেল, তা থাইকা এইটাই মনে হইতে পারে যে, বহুযুগের আকাঙ্ক্ষা  শেষে সামাজিক-রাজনৈতিক অধঃপতনের  গোপন চাবি বাইর হয়া  গেছিল ১৯৪৮ সালে।  দেখুন, ওয়ালীউল্লাহের অন্যান্য রচনাতেও  যে লালসালুর  গোপন চাবিই কার্যকরী আছিল তা বলতে চাইতেছি না আমরা। তাঁর 'চাঁদের অমাবস্যা' ও ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ কিন্তু বাংলা সাহিত্যে পুরস্কার পাওয়া ও রাতারাতি জনপ্রিয় হয়া উঠা, এমনকি আজোবধি সেই উপন্যাসের জের ধইরা উত্তরউপনিবেশকালেও যার খ্যাতি আকাশচুম্বি, তাঁর রহস্য উদঘাটনের  বেলা আমরা  তো আকর লালসালু নিয়া কিছুটা মাতামাতি করতেই পারি।

তাই ওয়ালীউল্লাহরে নিয়া আরও আরও জনপ্রিয় আলোচনা বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে মজিদ চরিত্রের বাস্তবভিত্তিক অসামঞ্জস্য নিয়া গুরুত্বপূর্ণ সমালোচকদের মত আমাদের সমালোচনাটাও লালসালু ভিত্তিক, উপন্যাসিক ওয়ালীউল্লাহ সর্বাঙ্গীন বিচার না। 

আবারও বলি- উপন্যাসিক ওয়ালীউল্লাহ না, লালসালুর রচয়িতা ওয়ালীউল্লাহর দৃৃষ্টি বনাম আমাদের দৃষ্টিগোচরতার মধ্যকার ফাঁকগুলান উইঠা আসবে এই রচনায়। এই কথা অনস্বীকার্য  যে, লালসালুর মজিদ চরিত্রের ভিতরে যে দুর্নীতির সাগর রচনা করছেন উপন্যাসিক, তা এযাবৎকালের পাঠক জনপ্রিয়তায় অগ্রগণ্য হিসাবে ভূমিকা পালন কইরা আসতেছে। যার ফলে রচিত হইছে আরও উপন্যাস, গল্প, নাটক। কিন্তু কথা হইল মজিদ চরিত্রের ভিতরে  যে দুর্নীতি,  সেই দুর্নীতি করার লাইগা মজিদের সামাজিক-রাজনৈতিক স্ট্যাটাসখানাই কি একমাত্র উপযুক্ত? তা না হইলে অতি আক্রুশে পাঠক বা মানুষ এই দুর্নীতির রূপটায় এতো সাচ্ছন্দবোধ করবে  কেন? তাই আমাদের প্রশ্ন হইল পীরবাদই কি একমাত্র  নৈতিক সাগর চুরি বা দুর্নীতির এতো বিশাল আশ্রয়স্থল?

আর এই প্রশ্নটাই তুলা হয় নাই আমাদের জনপ্রিয় সাহিত্য সমালোচনাগুলাতে। এই মর্মে প্রশ্ন তুলা-না তুলার ব্যাপারে আগেভাগে কিছু  কৈফিয়ত রাইখা যাওয়া ভাল মনে করতাছি। অতএব গড়পড়তা জনপ্রিয়তা নিয়া লালসালুরে নির্বিচার সালাম জানানোর ভিতরেও মাঝেমধ্যে যা কিছু ব্যতিক্রমী বিশ্লেষণ হইছে, তার মধ্য থাইকা চমৎকার একটা নমুনা তুইলা ধরার পর আমরা আমাদের উত্থাপিত প্রশ্নের আলোচনায় যাইতে চাই।

দুই

'ঔপন্যাসিক ওয়ালীউল্লাহ ও তাঁর উচ্চাকাঙ্খা' শিরোনামে কবি ও প্রাবন্ধিক মোস্তাক আহমাদ দীন 'লালসালু'-এর গল্পের অসামঞ্জস্যের দিকটা নিপুণভাবে তুইলা আনছেন।

‘এছাড়াও ওয়ালীউল্লাহ আরও  যে-সকল কার্যকারণ মিলিয়ে লালসালুর ঘটনাপরম্পরা তৈরি করেছে, সাধারণ  চোখে  দেখলে তা একধরনের বাস্তবই মনে হয়, যাকে বলে বানানো বাস্তব, যার মূল ভিত্তি নিরেট/বাস্তব জীবনে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অন্তত এমন বাস্তবতায়  তৈরি মজিদের মতো পির আমাদের সমাজে খুঁজে  পেতে লবেজান হতে হবে  যে-কিনা কৃষকদের ভয়  দেখিয়ে  দোয়া-কলমা মুখস্থ করায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য তাদেরকে  তৈরি করে, মসজিদ বানায় আবার মাজারকে  কেন্দ্রকরে ক্ষমতার সাম্রাজ্যও প্রতিষ্ঠা করে।  দোয়া-কলমা, নামাজ- রোজা পালনে কৃষকদেরকে বাধ্য করতে  দেখে মজিদকে শরিয়তের একজন পাক্কা পাবন্দ মাওলানার মতোই মনে হয়, অথচ শরিয়তপন্থী মাওলানা মাজারকে সাধারণত 'কবর' বলেই অভ্যস্ত, তার প্রতি তাদের  কোনো ভয়-খওফও প্রবল নয়, তারা কবর জিয়ারত করেন, আর কবর-পূজাকে শিরক জ্ঞান করেন, কিন্তু মজিদ সেরকম নয়। তাহলে কি মজিদ ফকিরি পন্থায় বিশ্বাসী? তাও মনে হয় না- কারণ, এ-পন্থার অনুসারীরা মাজারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, গানও তাদের প্রিয়, কারও কারও একান্ত অবলম্বনও বটে। মজিদ চরিত্রটি এর  কোনোটিই নয়, তাই একথা না বলে উপায় নেই যে, তাকে কেন্দ্র করে  যে-কৃত্রিম বাস্তবতাই  তৈরি   হোক না  কেন  সেটি পুরো ভিত্তিশূন্য না হলেও সামঞ্জস্যশূন্য।’
(নান্দীপাঠ, সংখ্যা: ছয়, ২০১৪। পৃষ্টা ১১৪)

এই আলোচনা থাইকা পরিষ্কার হয়া আসে গল্পের ভিত্তিগত দুর্বলতাটুকুন। মোস্তাক আহমাদ দীন বলছেন যে, ভিত্তিশূন্য না হইলেও সামঞ্জস্যহীন এবং এর ইসলামি তরিকা মোতাবেক ফ্যাক্টগুলাও ধরায়ে দিছেন প্রবন্ধের মূল বক্তব্যে। আমরা সেখানে কেবলই অসামঞ্জস্যতা দেখমু নাকি ভিত্তিগত দুর্বলতাটাও দেখমু? মনে করি গল্পের ঐতিহাসিক-সামাজিক সত্য বা ধারাগত ভুলের কারণে এইটার ভিত্তিও সবল না। উক্ত সমালোচনাটা ওয়ালীউল্লাহরে নিয়া পপুলার সকল সমালোচনার থেকে অনেকটা আলাদা বইলা আমাদের সমালোচনার আগে এইডারে তুইলা আনলাম। কারণ লালসালু মনস্তাত্ত্বিকভাবে যে উপনিবেশী বাছবিচারের মাধ্যমে দুর্নীতিরে উজ্জ্বল করছিল, একমাত্র  সেইটার রেষ কাটাইতে গিয়া লালসালুর প্লটের ভিন্নধর্মী সমালোচনা আমাদের একান্ত দরকার হয়া ছিল।

মোস্তাক আহমাদ দীন বলছেন গল্পের অসামঞ্জস্যের কথা আর এইবার আমরা সরাসরি বলতেছি যে, লালসালুর মজিদ চরিত্রের পীর ব্যবসা-ই কেন পরবর্তী সময়ে একমাত্র দুর্নীতির  পেশা হয়া ওঠলো?  কেন পরবর্তী সাহিত্যে ও সিনেমা-নাটক পর্যন্ত একমাত্র  নেক্কারজনক দুর্নীতিগ্রস্ত  পেশা হিসাবে পীর-দরবেশদেরকেই আয়রনি করে  দেখানো হইতে লাগলো? এমনকি  লোকমুখে আমেজ কইরা কইতে শুনা  গেল ধর্মব্যবসায়ী পীরবাদ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ওমরসানি-শাবনুর আর রাজিব অভিনীত নব্বয়ের জনপ্রিয় সিনামার প্রধান আকর্ষণ বানানো হয় মজিদের মত ভন্ডপীর রাজিবকে। তানভীর  মোকাম্মেল  কেবল জনপ্রিয়তার মোহে পইড়া লালসালুর চিত্রনাট্য করলেন, সিনেমার ভিতর দিয়া এই পীরবাদ বিরোধী বা বিশেষ কইরা ধর্মব্যবসা নামখানের বিরোধীতারে আরও আগায়া দিলেন। এমনকি ওয়ালীউল্লাহর পরবর্তী পাঠকপ্রিয় গল্প 'বহিপীর'-ও খ্যাতি লাভ করে লালসালুর মত একমাত্র পীরবাদরেই ভন্ডামীতে দেখাইতে পারছিলেন বলে।

কথা হইতেছে পীরবাদ নিয়া  যে কয়টা নাটক-সিনামা, সাহিত্য হইছে  সেগুলাই একমাত্র জনপ্রিয় হইল, অথচ হাজারে হাজার নাটক-সিনেমা, উপন্যাস, গল্পে গ্রামের  মোড়ল,  চেয়ারম্যান, নগরের মন্ত্রী, সন্ত্রাসীদের গডফাদার এমপি-মন্ত্রীদের  দেখাইলেও  সেগুলা গড়পড়তা জনপ্রিয় হয় নাই বা মানুষের মুখোরোচক হয় নাই। সাহিত্য সভা, আড্ডা, বাহাস   কোনোকিছুতেই উদাহরণযোগ্য হয় না  সেইসকল সমাজখেকু চরিত্ররা, কিন্তু সবজায়গায় এক মজিদ চরিত্রের  রেষ ধইরা মসজিদের  মোয়াজ্জেনের কথার  হেরফেরকেও মাইনষে পীরবাদের ব্যাবসায়ী কয়া তুলোধুনা করতে ছাড়ে না! এইসকল পষ্ট প্রশ্নের নিমিত্তেই আছে লালসালুর সময়ের উপনিবেশি জনপ্রিয়তার কাছে ধ্যান-ধারণারে বিকিয়ে দেওয়া।

১৯৪৮ সালে  লেখা হইছিল ‘লালসালু’। তার আগে  যে পীরবাদরে খারাপ বানায়ে একেবারেই গল্প  লেখা হয় নাই তা কিন্তু না। আমরা  দেখবার পাই ১৯২৬ থাইকা আবুল মনসুর আহমদ সওগাত পত্রিকায় কিছু গল্প ছাপাইতেছিলেন।  সেগুলা ১৯৩৫-এ ‘আয়না’ নামে সংকলিত হইয়া প্রকাশ হয়।  সেইখানে ‘আয়না’ শিরোনামের গল্পটাও একমাত্র পীরবাদরে ব্যঙ্গ কইরা দুর্নীতির খোলাশা কইরা শান্তি হাছিল করছিল।  সেই  যে  দেখানো দুর্নীতি তাতেও অতিবচন আছিল।  যেন একমাত্র পীর বা ধর্মের  খোলসে থাকা ভন্ডামিটাই দুর্নীতির বীজ, যারে ব্যঙ্গ না করতে পারলে দুর্নীতি মুক্তির প্রাণশক্তি ছড়াইবো না প্রজন্মের সাহিত্যে। এইভাবে ভাবতে পারলে  দেখা যাইব  যে এর ফল ধরছে ৪৮-এ আইসা। সিলসিলার দায়িত্বটুকু পালন করছেন  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।

সেই খবর লইবার আগে আবুল মনসুর সাহেবের টার্গেট মাফিক অতিব্যঙ্গ-বুলিগুলান একটু জাইনা আসা দরকার মনে করতাছি। পীরের ভন্ডামি আবিষ্কার করতে গিয়া পীরের ব্যবহৃত মুখের বুলিটারেও টার্গেটের বাইরে  নেন নাই  লেখক।  যেন যা খারাপ তার সবকিছুতেই নফরাৎ আনা লাগবো আর কি। ‘আয়না’ গল্প সংকলনের 'নায়েবে নবী' গল্পে পীরের মুখের আরবি ভাষার পরিষ্কার বা ফনেটিক্যাল অর্ডারে উচ্চারিত বাক্য আর শব্দগুলানরে লেখক মশকরা কইরা কইতেছেন; ‘মোখরেজ ও তালাফ্ফুযের ইযয্ত রক্ষা করিয়া, আইন-গাইন কাফের কারী উচ্চারণ করিয়া এবং হায় হত্তির উচ্চারণ ঠিক হলকম্ হইতে বাহির করিয়া তিনি মিসরি এলহানে যথাক্রমে আউযু, বিসমিল্লাহ ও সূরা ফাতেহা পড়িলেন।’

এই মর্মে আমাদের প্রশ্ন হইল মাখরাজ বা হরফ উচ্চারণের স্থান ব্যবহার করাটা কি কোনও স্তরের অপরাধ বলিয়া গণ্য হয় কোথাও? দুনিয়ার তামাম ভাষা-পরিবারের মত আরবিও তো এক ভাষা যার উচ্চারণ রীতি আছে। যেমন আছে বাংলার তালব্য-শ বা দন্ত-স এর মত অক্ষর উচ্চারণেরও। কই,  সেই উচ্চারণে  তো জনাব আবুল মনসুরের মত সাহিত্যিকরে  কেউ  কোনো কারণে ব্যঙ্গ করতে শুনি নাই। বাংলা ভাষার শব্দাদি উচ্চারণে সংস্কৃতের নিয়ম অনুসরণ করতে হয়, নাইলে অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হইতে হয়। এই নিয়া উচ্চারণের ছুৎমার্গ এতই কঠিন এইখানে যে উচ্চারণের জন্য নানা সংগঠন বা মেল পর্যন্ত গইড়া উঠছে আর ব্যাপক সম্মানের সাথে তারা সংস্কৃত ভাষার নিয়মে বাংলার উচ্চারণ শিখাইতাছি। এই নিয়া তো কাউরে ঠাট্টা করতে শোনা যায় না।

এইরকম উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনামূলক বাহাস ছিল ধর্ম ব্যবসারে আরও ব্যবসারূপী কইরা তুলতে। অস্বীকার করার উপায় নাই যে, ধর্ম নিয়া ফায়দা হাছিলের কুচক্রীমহল দেখা হয় নাই মানব সভ্যতার ইতিহাসে। এমনকি অধুনা দুনিয়াতেও  ভেলকিবাজি আছে ধর্মের শামিয়ানার তলায় বসে। কিন্তু প্রশ্ন হইল তাই কি একমাত্র এবং প্রধান দুর্নীতির জায়গা? আর  কেনই বা এই জায়গাটারে ধরতে গিয়া অসামঞ্জস্যের হাওলা নিতে হইল  সেই আবুল মনসুর সাহেব থাইকা আরম্ভ কইরা জনাব ওয়ালীউল্লাহ পর্যন্ত বা এখন অবধি। আবুল মনসুর আহমদ পীরের মুখে 'ইসলাম' শব্দটার ই-উপসর্গের বদলে এ-উপসর্গ রুপে 'এসলাম' উচ্চারণ পর্যন্ত করাইতে থাকেন। দুঃখের বিষয় এই বাংলা মুল্লুকে  কোনো  মৌলবির উচ্চারণে 'এসলাম' আসে না। এই সব-ই যখন অসংলগ্ন হিসাবে উইঠা আসে, তখন মনে হইতে পারে একমাত্র সমস্যা কী ধর্ম ব্যবসা আর তাও যদি হয় তবে তা কি  কেবলই পীর,  মৌলভিদের কারবার? 

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এমনকি কথিত গণতন্ত্রের বড়  দেশ ইন্ডিয়াতে আমরা  দেখি রাজনৈতিক মিথ্যা প্রচারণা  আরম্ভ হয় মাজার জিয়ারত কইরা আর গঙ্গাস্নান দিয়া। বাংলাদেশের প্রত্যেকদলের  দেয়া কথা যদিও নির্বাচনের পরে ফলে না তবু তারা নির্বাচনের যাত্রা আরম্ভ করেন হযরত শাহজালাল মুজাররতে রাঃ এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে। কই এতে কইরা  তো দুর্নীতির  কোনো জনপ্রিয় গল্প সাহিত্যে লেখা হয় না। হয় না নরেন্দ্র  মোদী যখন গঙ্গাস্নান কইরা মিথ্যা ওয়াদা করেন। তাহলে ধর্ম ব্যবসার লাগি এইসব রাজনৈতিক, কর্পোরেট যোদ্ধাদের দুর্নীতিরে রাইখা আবুল মনসুরের আয়না  যে পথ  দেখাইছিল   সেই পথের সাফল্য অর্জিত হইছিল ওয়ালীউল্লাহর 'লালসালুতে'। যার জনপ্রিয়তাই পরবর্তী  বাংলা সাহিত্যে দুর্নীতির আইকন হিসাবে পীর আর ধর্মতত্ত্বরে  দেখাইতে লাগছিল।

কিছু ভন্ড পীরের ভন্ডামিরে গোটা সমাজের উপর চাপাইয়া দিয়া এইডারেই একমাত্র এবং সামগ্রিক দুর্নীতি হিসাবে হাজির করার  প্রতিবাদ স্বরূপ আমাদের উচিত দুর্নীতির এই ন্যারেটিভ বিষয়ে আরেকটু সচেতন হওয়া।

‘ভাষা ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে’ গ্রন্থে ‘দুর্নীতি নিয়া কয়েকটা কথা’ প্রবন্ধে ফয়েজ আলম কইতেছেন;

‘আসলে আমাদের  গোটা সমাজ ব্যবস্থাটাই গড়ে উঠেছে এই ধারণা নিয়ে যে, সাধারণ মানুষ বা নিচের দিকের কর্মচারীরা দুর্নীতিগ্রস্ত। তাই তাদের দুর্নীতি  রোধ করার কৌশলও গ্রহণ করা আছে। এই  কৌশল অর্জিত হয়েছে শত শত বছরের পর্যবেক্ষণ আর অভিজ্ঞতা থেকে। এই ব্যবস্থায় উপরের দিকের মানুষদেরকে  নৈতিকতার রক্ষক বলে ধরে  নেয়া হত। তারাই  নৈতিকতার সংজ্ঞা দিয়েছেন, ব্যাখ্যা  যোজনা করেছেন, শাস্তির বিধান দিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই, এ ব্যবস্থায় ধরে  নেয়া হয়েছে  যে, নীতির রক্ষকেরা দুর্নীতি করবেন না।’
(দুর্নীতি নিয়া কয়েকটা কথা, পৃষ্টা-৭০, ভাষা ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে)

লালসালুর মজিদ চরিত্রটাও ঠিক ঠিক পইড়া  গেছে সমাজের বা রাষ্ট্রের সাধারণ  শ্রেণীতে। দুর্নীতি মজিদই করবে, কারণ দুর্নীতি দমন করার সম্ভাবনাও ফলানোর জায়গা এই মজিদদের স্তরে। ফয়েজ আলমের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে  দেখবেন  যে, শত শত বছরের পর্যবেক্ষণ আর অভিজ্ঞতার দ্বারা ধর্ম ব্যবসায়ী ভন্ডপীর মজিদরেই দাঁড় করানো হইছে দুর্নীতি দমনের চর্চার মাঠ হিসাবে।

তিন

মজিদ চরিত্রের বুনন নিয়া প্রশ্ন উত্থাপনের  কৈফিয়ত রাইখাই আরেকটু ভিতরের আলোচনায় যাইতে চাই। মজিদ পীরের মত ভন্ডামি  যে নাই তা অস্বীকার করি না, এই-কথা আগেও আমরা স্বীকার কইরা নিছি।

কিন্তু এর সৃষ্টিরে আইকন পর্যায়ে নিয়া যাওনের ফলে ভন্ডামি বা দুর্নীতি বলতেই ধর্ম ব্যবসারে সাধারণভাবে ধইরা  নেয়া হইছে। লালসালুর পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে এর  বেশ অনুকরণ হইছে। যার ফলে অঘোষিতভাবে হইলেও মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়ে একমাত্র ধর্ম ব্যবসারেই দুর্নীতি হিসাবে ধইরা  নেয়া হইছে বলে অতিরঞ্জিত বা অসংলগ্নের  ছোঁয়ায় এমন গল্পে  প্লট নিয়া আমাদের বাটখারা হাজির হইতে বাধ্য হইছে। এইবার  দেখা লাগবে লালসালুর সমকালিক সমাজ ব্যবস্থার চিত্র। সেই সমাজে সবচেয়ে দাপুটে দুর্নীতিবাজ ছিলো রাজনীতিবিদ, জমিদার তালুকদার, সুদখোর মহাজন, মোড়ল, এরা। কিছু লোক ধর্মরে নিয়াও ব্যবসা করতো। তারা ছিল নিরীহ ধরনের বাটপার। এখনো এই ধরণের চরিত্র আছে। এরা কিন্তু ধার্মিক না, পীরও না, ধর্ম বা পীরের ভন্ডামি করে। সে হয়তো ডাক্তার বা পুলিশের রূপেও ভন্ডামি করতে পারত। মাঝেমধ্যে পত্রিকায় দেখি কোনো এক বাটপার লোক ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ অফিসার বা সেনা অফিসার সাইজ্জা মানুষের ঠকায়া টাকা নিয়া ভাগছে। এরা ধরা পড়ে এবং এদের বাটপারি উন্মোচিত হয় এবং জড়িত লোকটি মানুষের লানত পায়। ভাইবা দেখেন, সে যে চরিত্র ধরছে (ম্যাজিস্ট্রেট/পুলিশ অফিসার/সেনা অফিসার) সেই চরিত্রর উপরে কিন্তু মানুষ  খেইপা উঠে না। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় লালসালুর মজিদ পীরের চরিত্রে ভন্ডামি করলে মানুষ মজিদের উপরে ক্ষ্যাপে না, ক্ষ্যাপে উঠে পীরবাদের উপরে। কেন?

আরেকটা কথা হইল,  সেই সমাজে দুর্নীতির সামনের কাতারের লোকদের (রাজনীতিবিদ/প্রশাসক/মহাজর/মোড়ল) বাদ দিয়া মজিদরে নিয়ে পীরবাদের পুরা কব্জায় এমন এক সমাজ দেখানো হইল যেন বাংলাদেশে সমাজের হর্তাকর্তা হইল পীরেরা, রাজনীতিবিদ-প্রশাসকদের কোনো পাত্তাই নাই। বড়ই আজব ওয়ারীউল্লাহর লালসালুর সেই সমাজ। আজব কারণ বাংলাদেশের মাটিতে সেই সমাজ ছিল না, এখনো নাই। সেইটা ছিল আবুল মনসুর ওয়ালীউল্লাহদের মগজে। ওয়ালীউল্লাহ-ই বা   কেন এমন শক্ত অনুধ্যান দিছিলেন  তেমন চারিত্রিক প্লট  তৈয়ার করার  পেছনে, এই খুঁজাখুঁজির জন্য আমরা শামসুদ্দিন  চৌধুরীর 'সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যে প্র্রতীচ্য প্রভাব' গ্রন্থের বিশ্লেষণ লক্ষ করলে  দেখি- 'অনুধ্যানযোগ্য  যে তাঁর সময়ে ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক অনুপ্র্রবশে পূর্বেকার আর্থসামাজিক সাম্যের ভরকেন্দ্র বিচ্যুত হয়ে গিয়েছিল এবং উদ্ভীত উপপ্লব এক-এক স্তরে এক-এক পরিস্থিতিতে-পরিবেশে স্বতন্ত্রচেহারায় প্রকাশিত হয়েছিল- আদিবাসী বা কৃষকের তেভাগার দাবিতে আন্দোলন, বর্ণনির্ভর বিদ্রোহ বা হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়গত বিবাদ-দাঙ্গা প্রভৃতি; মানুষের যার যার গ্রামীণ, প্রাদেশিক, ভাষা কৃষ্টিগত, শ্রণীগত ও ধর্মীয় পরিচয়সৃষ্ট সম্পর্কের ও দায়িত্বের বিপন্নবোধ জন্মে। এ প্রেক্ষাপটে অস্তিত্বের জন্যই মানুষ একাধিক পরিচয়ে সংগঠিত হয় ও অপরাপর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুযুধান হয়ে ওঠে। এভাবে ঘটেছে অন্তঃধর্মীয় দ্বন্দ্ব যেমন তেমন আন্তঃধর্মীয় দ্বন্দ্ব।
(সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহের সাহিত্যে প্রতীচ্য প্রভাব, শামসুদ্দিন চৌধুরী, পৃষ্টা-১০২)

তৎকালীন সমাজের উপর ফলে যাওয়া উপনিবেশি শাসনের প্রভাব সম্পর্কে শামসুদ্দিন চৌধুরীর অভিমত অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, যা ওয়ালীউল্লাহর সৃষ্টিগত  বেদনার বা তাড়নার জায়গাটারে চিনবার লাগি আরও নির্দিষ্ট কইরা তুলে।

উপনিবেশিকতার  মোটামুটি ক্ষতিকর দিকগুলার ভিতরে আর্থসামাজিকতার উপর বয়ে যাওয়া  যেসব চিহ্ন আছিল বা  তেভাগা সংগ্রাম, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ভাষিক সমস্যা, কৃষ্টিগত সমস্যা- এতোসব দিকগুলার ভিতর ওয়ালীউল্লাহর আগ্রহের জায়গা হয়া ওঠলো মাজার ও তারে  কেন্দ্র কইরা পীরের ভন্ডামি। আর আমরা মনে করতাছি, এই একটা বিষয়রে সর্বাঙ্গীন জনপ্রিয় করতে যাইয়া  লেখক অন্তঃধর্মীয় দ্বন্দ্বের ভিতরে না ঢুইকা উল্টা এইটারে দুর্নীতির মূল বিষয় বানায়া  ফেলছিলেন।

এইবার আমরা দেখতে পারি মাজার ব্যবসা বা মজিদ চরিত্রের উপর  লেখকের নিজের   কৈফিয়ত কতোটুকু। এমনকি  সেইসব কারণ কতোখানি যুক্তিযুক্ত এই সাগর সমান দুর্নীতির ভার বইবার লাগি।  সৈয়দ আলী আহসান কইতাছেন; 'আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'আপনি উপন্যাস লিখেন না  কেন?' উত্তরে বলেছিলেন, 'একটি উপন্যাসের বিষয় নিয়ে অনেকদিন ধরে ভাবছি। একজন    গ্রামের সাধারণ গৃহস্থ-যার সংসার আছে,  ছেলেমেয়ে আছে,  সে ব্যবসা হিসেবে  বেছে নিল কবর-পূজা। এ  লোকটি কীরকম আচরণ করে তা আমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। চট্রগ্রামে আমাদের গ্রামের বাড়ির কাছে এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল। একজন  লোক হঠাৎ উঁচু একটি মাটির ঢিবির উপর চুনকাম করে তার উপর লালসালু বিছিয়ে পথচারীদের কাছ থেকে পয়সা নিতে লাগলো। সরল বিশ্বাসী পথচারীরা চিরন্তন বিশ্বাসের ভারে এতই অভিভূত  যে তাঁরা নানাবিধ কামনায় সেখানে টাকা পয়সা দিতে লাগল। আমাদের  দেশে এরকম দরগা কিন্তু অনেক গড়ে উঠেছে। ইসলাম এটাকে সমর্থন করে না জানি তবু এ ব্যবসা ক্রমান্বয়ে প্রসারের পথে। এ রকম একজন ব্যবসায়ীর চাতুর্যকে আমি আবিষ্কার করতে চাই, মিথ্যাচারকে আবিষ্কার করতে চাই, আবার মতামতের মধ্যেও তাকে পেতে চাই।'
(সতত স্বাগত, পৃষ্টা-১৫৭,  সৈয়দ আলী আহসান)

আর এরকম একজন ব্যবসায়ীরে আবিষ্কার করতে যাইয়া ওয়ালীউল্লাহ্ বাস্তব আর কল্পনার মিশ্রণ ঘটাইতে বাধ্য হইলেন  যেন। সমাজের কারো কারো মিথ্যাচাররে তুইলা ধরতে গিয়া মাজার-পূজারিরে দিয়া শরিয়তের বিধি-নিষেধও আরোপ করাইলেন। লালসালুর মজিদ ওয়াক্তের নামাজ ওয়াক্তে পড়া নিয়া সচেতন থাকে, যা মাজারপন্থীদের আচরণে বিরল। আওয়ালপুরে আগত আরেক ভন্ডপীরের নামাজের সময়জ্ঞান নাই  দেইখা মজিদ কয়; 'থকোন নামাজ হইল এইটা? থকাহে?  জ্বোহরকা নামাজ হুয়া। উত্তর শুনে আবার চিৎকার করে গালাগাল শুরু করল মজিদ। বললে, এ কেমন  বেশরিয়তি কারবার, আছরের সময়  জ্বোহরের নামাজ পড়া?'

এইসব ডায়লগ অসামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ মাজারপন্থী মজিদের লগে শরিয়তের সংযোগ বাংলার ধর্মচর্চার ধারায় বিরল। এইটা ঘটছে এই ক্ষেত্রে কারণ ওয়ালীউল্লাহ্র জীবনে  দেখা কেবল একটা মাত্র ঘটনা বা কবর-পূজারী বাটপারের চরিত্ররে একদিকে বাঙালির সাধারণ সামগ্রিক চরিত্রে রূপ দিতে গিয়া। আবার বাটপাররে ধিক্কার দেয়ার বদরে পীরবাদরে ধিক্কার দেওনের লাইগা। এইসব করতে গিয়ে দেখা গেলো নিজেই রচনা করলেন মিথ্যার এক সমাজ। সেই সমাজে বিরাট এক টাওয়ারের মত কেবল মজিদরেই দেখা যায়। সেইখানে শোষক রাজনীতিবিদ নাই, তালুকদার জমিদারের অত্যাচার নাই, সুদখোর মহাজনের অত্যাচারে কারো জীবন অতীষ্ট না, ওয়ালীউল্লাহ সেই কাল্পনিক সমাজের একমাত্র সমস্য হইলো পীরবাদ।

তাছাড়া গ্রামের জীবন সম্পর্কে জানাশোনা আছে কি না  সেই বিষয়ে স্ত্রী আন মারি ওয়ালীউল্লাহরে জিগাইছিলেন, যার উত্তর শুনলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়া উঠে আরও কতক। ওয়ালীউল্লাহ আন মারির চিঠির জবাব দিতাছেন এইভাবে; 'আমার বইপত্র আর  লেখালেখির ব্যাপারে তুমি খুব অপ্রাসঙ্গিক একটা প্রশ্ন তুলেছো, তা হলো, আমি যে   গ্রাম আর তার মানুষজন নিয়ে লিখি,  গোর্কি ওদের যতটা কাছ থেকে জানতেন, অতটা জানাশোনা কি তাদের নিয়ে আমার আছে? জানি না তুমি এটা মনে করো কি না  যে ওদের নিয়ে লেখতে  গেলে ওদের মধ্যে আমাদের বসবাস করতে হবে। আমার পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। গ্রামের  লোকদের নিয়ে  লেখতে  গেলে আমাকে  কেনই গ্রামের মানুষ হতেই হবে? এটা অত্যাবশ্যকীয় নয়।...'
('আমার স্বামী ওয়ালী', আন মারি ওয়ালিউল্লাহ, পৃষ্টা-৫৫)।

বউয়ের চিঠির এই উত্তরে বুঝা যায় যে, ওয়ালীউল্লাহ্র গল্প বাস্তবের প্লট থাইকা হইলেও  সেইটা একটা বানোয়াট বাস্তব, ওয়ালীউল্লাহ্ তার রচিয়তা এই বানানো বাস্তবের কৈফিয়ত  যেন মনে করায়ে  দেয় ওরহান পামুকের  সেই বিশ্লেষণরে; 'উপন্যাসই আমাদের দ্বিতীয় জীবন। ফরাসি কবি  জেরার্দ দ্য  নের্ভাল কথিত স্বপ্নের মতো উপন্যাস আমাদের জীবনের বিচিত্র বর্ণ ও জটিলতা প্রকাশ করে; ঠিক স্বপ্নের মতোই উপন্যাস পড়ার সময় আমরা কখনো কখনো বস্তুর অসাধারণ প্রকৃতির দ্বারা এত প্রবলভাবে ধাক্কা খাই  যে আমাদের অবস্থানের কথা ভুলে গিয়ে নিজেদের প্রত্যক্ষ করা কাল্পনিক ঘটনাবলি ও মানুষজনের মাঝখানে দেখতে পাই। সে সময়ে আমরা উপলব্ধি করি আমাদের সম্মুখীন হওয়া, আমাদের উপভোগ করা গল্পজগৎ বস্তুজগতের  চেয়ে আরও বাস্তব।'
('ওরহান পামুক', অকপট ও ভাবপ্রধান ঔটন্যাসিক, অনুবাদ- সঞ্জীবন সরকার)

লালসালুর এই উপন্যাসিক জগৎ-ও বস্তুর অসাধারণ প্রকৃতির দ্বারা ধাক্কা দিতাছে। দিতে দিতে কল্পজগতরেই অধিক বাস্তব কইরা  দেখাইতেছে। এইটা থ্রিলার গল্পের লাগি   বেটার।  প্রেমের উপমিত প্লটে উপভোগ্য, কিন্তু সমাজে বিদ্যমান  কোনও চিরায়ত একটা চর্চার ভিতর যখন কল্পজাগতিক হয়া এইটা আরও ধাক্কা মারে তখন তা রাজনৈতিক বোধে ঝামেলা  তৈয়ার করে।  তেমনটা ঘটছে মাজারপন্থী বা ধর্মের নামে ব্যবসার জগতের কল্পবাস্তবিক উপস্থাপনে।

দুর্নীতির একরোখা উপস্থাপনের দ্বারা পীরবাদ, মাজার বা ধর্ম ব্যবসারে একমাত্র দায়ী করা ছাড়া ভাবলে লালসালুর আরও কিছু সার্থক দিক আছে, যা বিভিন্ন বিশ্লেষকের মাধ্যমে উপস্থাপিত হইছে।  দেবীপদ চট্রোপাধ্যায় লালসালু সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়া অচেতন জমিলার প্রতি সপতœী রহিমার মাতৃস্নেহের উদ্বোধনে মজিদের স্পৃষ্ট হইবার ঘটনারে দেখাইতেছেন; 'মুহূর্তের মধ্যে মজিদের ভিতর কি যেন ওলট-পালট হয়ে যাবার উপক্রম করে, একটা বিচিত্র জীবন আদিগন্ত উন্মুক্ত হয়ে ক্ষণকালের জন্য প্রকাশ পায় তার  চোখের সামনে আর একটা সত্যের সীমানায়  পৌঁছে তীব্র  বেদনা অনুভব করে মনে মনে। কিন্তু  শেষ পর্যন্ত টাল খেয়ে সামলে নেয় নিজেকে।'

এইটা হল টালমাটাল পরিস্থিতির গোপন স্বাধীনতা আবার সামলে  নেয়াটাই জীবনের তরে আস্থাশীল হওয়া। এই নারী-পুরুষের অন্তর্লীন বাসনা অত্যন্ত সুন্দরভাবে লালসালুরে ডাইভার্সিটিক্যালি সমৃদ্ধি দিছে।
(দেবীপ্রসাদ ভট্রাচার্য, "সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস: দ্বিতীয় চিন্তা, ভাষা সাহিত্য পত্র, ১৯৭৮, পৃ- ১৮৩)

সৈয়দ আবুল মকসুদ লালসালুরে অস্তিত্ববাদী দর্শনের শক্ত তক্তার উপর স্থাপন করেন। তিনি  দেখান; 'শিলাবৃষ্টিতে শস্য ও সম্পদের ক্ষতির অব্যবহিত পরেই অপ্রতিরোধ্য বন্যার করাল আক্রমণ, ঘরে জমিলার অসুস্থতা, সর্বোপরি তার অবস্থান টলমলে ইত্যাদি নিয়ে বিপর্যস্ত মজিদ ভয়ে অনুশোচনায় ইয়েসপার্সিয়- 'নড়ৎফবৎষরহব ংরঃঁধঃরড়হ' বা প্রান্তস্থিত চূড়ান্ত সংকটে নিপতিত হয়। সংকট থেকে পালাবার বা আত্মরক্ষার সকল পথও তার রুদ্ধ। কোথায় যাবে সে? যদিও অপরাধবোধে বিহ্বল মজিদ... তবুও থাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রহিমা এবং জমিলাকে গ্রামে রেখে তাই সে এই বিপর্যের মধ্যেই বাড়িতে প্রত্যাবর্তনের স্বিদ্ধান্ত নেয়।'
(উদ্ধৃত,  সৈয়দ আবুল মকসুদ, ২য় খন্ড, প্রাগুক্ত, পৃষ্টা- ১৫২)

মজিদের এই অস্তিত্বশীল তড়িঘড়ি একটা দ্বান্দি¦ক চরিত্রের ভিতরের সরল অস্তিত্বরে প্রকাশ কইরা তুলছিল।  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ একটা গল্পের ভিতরে আরও আরও ডাইভার্সিটি ঘটাইতে পাইরা  বেশ সফল বুননের পরিচয় দিছেন একথা ঠিক। জীবনযুদ্ধে চাতুরীর  রেস সামলায়েও  যৌবনের অবোধ মন যখন উঁকি দিত মজিদের, তখনই মনে হয় উপন্যাসটার স্বার্থকতা আসলে  নারী আর পুরুষের  যৌন সম্পর্কের ভিতরকার পর্দা কাঁপানোর সফলতায় নিহিত রইছে।

আর আছে ভাষা। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ভাষিক দিক উন্মোচন ছিল চমৎকার। বাংলা সাহিত্যের আগের ভাষার সঙ্গে লালসালুর ভাষাগত পরিবর্তন পূববাংলার সন্ধান করছিল তখনকার মতো প্রথম।

মজিদ যখন জমিলারে কয়- ‘অমনি করি হাঁটতে নাই বিবি, মাটি-এ গোস্বা করে'। তখন এইটারে আঞ্চলিক রূপেও  ফেলা যায় না। কথ্য বাংলার ব্যবহারে এই এক সার্থক প্রচেষ্টার বীজ বুনা মনে হইতে থাকে। ওয়ালীউল্লাহ্ কইতেছেন; 'অনেকদিন মজিদ বিয়েও করে। অনেকদিন  থেকে আলি-ঝালি একটি চওড়া  বেওয়া  মেয়েকে  দেখছিল।' শব্দে শব্দে পূববাংলার জগতের ভিতরে ঢুইকা যাইবার প্রবল  চেষ্টা মিলে আবহমান কথাবার্তার ভিতর। এইখানেও ওয়ালীউল্লাহ স্বার্থকতার পরিচয় বহন করেন নিশ্চই। ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসের ভাষাগত স্বার্থকতা  খেয়াল করলে  কেবল লালসালুই না, ঐরকম পীরবাদ নিয়া মশকরা করা গল্প 'বহিপীর'-এও ভাষাগত পরিবর্তন আর এই বাংলার ভাষিক পরিচয়ের  চেষ্টা পাওয়া যায়। এই মর্মে কাজী  মোস্তাকীন বিল্লাহ কইতেছেন; 'অতিশয় গদ্যগন্ধী ও বুদ্ধিনির্ভর ভাষা কখনও কখনও সংকেতময় হয়ে উঠেছে, ইঙ্গিতবহ হয়েছে। এই ভাষা তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি। তাঁর ভাষাভাবনার স্মারক 'বহিপীর' নাটকটি, লিখেছেন পঞ্চাশের দশকে, ভাষা-আন্দোলন প্রশ্নে গৃহীত স্বিদ্ধান্ত তখনও বাস্তবায়িত হয়নি 'কোন ভাষা বাস্তব, আপন উত্তরাধিকারের না আত্মবিক্রীত ধনার্জনের।'  নাটকের পাত্রপাত্রী ছয়জন, নামচরিত্র বহিপীর। নিজমুখেই বলে সে 'বইয়ের ভাষায় কথা বলে। কারণ  দেশের সর্বত্র তার মুরিদান রয়েছে। এক জায়গার ভাষা অন্যত্র বোধগম্য নয়, কখনও হাস্যকর।’ (প্রাগুক্ত, পৃ-৯)

অথচ পীরের অর্জিত ভাষার বিদ্রোহ বিফল হয়া যায় তাহেরার বিদ্রোহর কাছে। ভাষা বনাম ভাব, আর সমকালিক ভাষাগত অসিদ্ধান্তের উপর দাঁড়ায়ে ওয়ালীউল্লাহ্ যে নিরিক্ষা চালাইছিলেন, তা তাঁর পীরবাদ বিরোধী একক আক্রমণের থাইকা বেশি অংশে সফল হইছিল। উপন্যাস আর নাটকটির ভাষাগত বিচক্ষণতা বেশি স্বার্থক হইছিল।

সফলভাবে কিছু কি সুক্ষ্ণ কারুকার্যের পরও 'লালসালু' উপন্যাস হয়া উঠলো সমাজ বাস্তবতায় খবরদারী করার মত একটা অস্ত্র।  যে অস্ত্রের মনস্তাত্ত্বিক আঘাতে পরবর্তী সাহিত্যের জমিনে রোপিত হয় ধর্মরে নিয়া পীরবাদরে নিয়া ব্যঙ্গ করার একপক্ষীয় আগাছা। আর কে না জানে বাঙালি সৃজনশীলতার নয়াপথ কষ্ট করে খোঁজার চেয়ে নকল করার কাজেই উৎসাহ পায়--সেই সাহিত্য থেকে শুরু করে চিত্রকলা, নাটক- সবক্ষেত্রেই; আর সিনেমা সেখানে যেন অনুকরণই একমাত্র শিল্প। তাই লালসালু উপন্যাসে পীরবাদরে সমাজের একমাত্র সমস্যা দেখানোর জন্য যে মিথ্যার সমাজ বানায়া দিয়া গেলেন ওয়ালীউল্লাহ্, বহু বছর ধইরা তার নকল বানানোর কাজ চলতাছে, আর তৈরি হইতেছে হালি হালি মজিদ চরিত্র।

লালসালু উপন্যাসের বানোয়াট বাস্তবতা: বাংলা সাহিত্যে তার উত্তরাধিকার
ওয়াহিদ রুকন

মন্তব্য

নাম

অনুবাদ,31,আত্মজীবনী,26,আর্ট-গ্যালারী,1,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,উৎপলকুমার বসু,23,কবিতা,299,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,17,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,54,ছড়া,1,ছোটগল্প,11,জার্নাল,4,জীবনী,6,দশকথা,24,পাণ্ডুলিপি,10,পুনঃপ্রকাশ,14,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,151,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,2,বিবৃতি,1,বিশেষ,23,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,36,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,8,সম্পাদকীয়,16,সাক্ষাৎকার,21,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,14,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: লালসালু উপন্যাসের বানোয়াট বাস্তবতা: বাংলা সাহিত্যে তার উত্তরাধিকার
লালসালু উপন্যাসের বানোয়াট বাস্তবতা: বাংলা সাহিত্যে তার উত্তরাধিকার
জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। বিশেষ সংখ্যা। লালসালু উপন্যাস্যের বানোয়াট বাস্তবতা: বাংলা সাহিত্যে তার উত্তরাধিকার
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgCXVAoLCZJ9Mn-jeee6-OFAGHcb1S2smH6gyMtye_dV2Ma88evadXLqnT_N19fdT12bn6zRxQlNQY-RataIKzsrQJVuGh4Hny1QR2W_uC5X5_tdvtUgAzet8i6grT17qrOmzsmAiK3Ch-O4dS0NZr-UJgVJ58dUC2FJ4r4T4r1MphKGPc94LfLcVdy/w320-h160/syed-waliullah(bindu).png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEgCXVAoLCZJ9Mn-jeee6-OFAGHcb1S2smH6gyMtye_dV2Ma88evadXLqnT_N19fdT12bn6zRxQlNQY-RataIKzsrQJVuGh4Hny1QR2W_uC5X5_tdvtUgAzet8i6grT17qrOmzsmAiK3Ch-O4dS0NZr-UJgVJ58dUC2FJ4r4T4r1MphKGPc94LfLcVdy/s72-w320-c-h160/syed-waliullah(bindu).png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2023/01/criticism-of-Lalsalu-novel.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2023/01/criticism-of-Lalsalu-novel.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy