আমার ঘর: যে ঘরে এখন লিখছি সে' ঘরের বর্ণনা শোনো, অতিপ্রাকৃতিক। প্রাচীন জীবিত ও অর্ধমৃত যৌন-প্রজাপতির বাস। অমৃতলোভী অসংখ্য মাছি ওড়ে। এ'ছাড়াও প্রাণীসংকুল, বাঘ ভালুক ও বরাহ। আমার অনার্য প্রপিতামহ, সিন্ধু-সভ্যতার ভগ্নশেষ, কাঠের শরীর, আমার লেখার টেবিলের দিকে তাকিয়ে। এ' ঘরে বৃষ্টি ঢোকে না, গত তিন হাজার বছর এ' ঘরে বৃষ্টি ঢোকেনি। চন্দনমাখা এক নগ্ন রমণীর লাশ সিন্দুকের ভিতর, গোপন। আমার সমস্ত লেখার পাতা ওড়ে, আমাকে পাথর ক'রে ওড়ে, লাইমস্টোন। একটা অর্ধেক চাঁদ ঝুলে আছে সিলিং থেকে। ট্রাপিজ চাঁদের আলোয় আমি ধবধবে লাইমস্টোন হয়ে লিখি। দেখি যে-পাতা উড়ছে, পাতার অ্যানার্কি, তাতে আমার করোটির ছাপ। আমার বইয়ের তাক, সার করা টমাস মান-বাতাই-বেকেট-বারোজ-মার্কেজ-কাফকা-দস্তয়েভস্কি, স্থাণু উপত্যকা যেন, অন্ধকার, ঈশ্বরের উপত্যকা, মৃত লাইটহাউসের স্মৃতি নিয়ে অন্ধকারের সুতো বুনছে, বৃদ্ধ ক্লান্ত ঈশ্বর দাবা খেলছেন বালক শয়তানের সংগে, এ' দৃশ্য বার্গম্যান দেখাননি। সময়ে অচ্ছিন্ন নয় এখানে, টাইম ইস নট কন্টিনিউয়াস হিয়ার, বাঘের মতো আমার দৃষ্টি সময়কে বিমূর্ত করেছে, আক্রমণ করেছে।
অতঃপর আসুন আমরা মূল লেখায় প্রবেশ করি...
করোটিতন্ত্র
[সাহিত্যতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি দস্তাবেজ, বা নিউক্লিয়ার দেবতার সংগে ব্যক্তিগত কথোপকথন, দেবতা- যাঁর শরীর অবিমিশ্রিত, কোয়ার্ক ও ইলেকট্রনের নির্মাণ। করোটির ভিতর যে অনলস উত্থান-পতন, সন্ত্রাস, নরকের আলোয় যে যৌন-জংঘা দেখা যায়, বা গোলগাথা পাহাড়ে যীশু উঠে যাচ্ছে পিঠে ক্রুশ নিয়ে]
প্রার্থনার বিরুদ্ধে ভিন্নতর এক প্রার্থনা...
হে নিউক্লিয়ার দেবতা, হরিদ্রাভ জাতক আলো জ্বলছে, যে আলোর পিতৃদেব তুমি, মাতৃদেবী-ও তুমি, আলো-কে বিনষ্ট করবেও তুমি। অশ্রাব্য ধ্বনিময় আলো, মৃত্যুর থেকেও পাণ্ডু, প্রার্থনার যান হতে পারে! তবু এই প্রার্থনা, আত্মার কপাট খুলে দ্যায়। মাংস এবং হাড়ের কঙ্কাল ভেদ ক'রে দেবতার পা-এ, যেখানে চোখ, এবং চোখের সংসার, করুণা কুড়িয়ে ন্যায়, বিদ্যুৎ কুড়িয়ে ন্যায়। কঙ্কালের ভিতর আণবিক মাংস দলা পাকিয়ে উঠেছিল, পেট-কে ঠেলে দিচ্ছিলো নাভির অপ্রাচীন গর্তে এবং নাভি স্বয়ং উঠে আসছিলো গলায়। এখন হরিদ্রাভ আলোর প্রভায় নোংরা প্রজাপতির মতো ডানা উড়িয়ে ঝটপট করছে আত্মাপিণ্ড, যেন দেবতার পা-এ চাঁদতাপ দগ্ধ রাক্ষসজন্ম চরিতার্থ করবে। ভবিষ্যতে সাদা আত্মা কালো চন্দন মাখবে না যোনিগর্ভে। না-জন্মে পিণ্ড সার্থক হবে।
উপগ্রহের ঈশ্বর, আলোর কোষ ফেটে যে সাদা অন্ধকার জমছে, অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত যে মাছি, নিউক্লিয়ার মাছি উড়ছে অন্তরীক্ষে। শ্বেতকণায় মৃত্যুর ধবধবে বোধি। মহাজাগতিক বামন পা-এ চেপে ধরেছে আমার মস্তকমুণ্ড। মহাকালীর গলায় ঝুলছে নক্ষত্রসময়। হা ঈশ্বর, হা নিউক্লিয়ার দেবতা, আমার পেটের ভিতর নরকজন্ম, নরকমৃত্যু। তনুর ভিতর নক্ষত্র আলোর কাক খায়, মহাদানব প্রসব করে সুপার্নোভা। ছায়ার কঙ্কালের সংগে সংগম করে কাঠের ঘোড়া। মহাব্যোমে কোয়ার্কের জঞ্জাল ভরিয়ে তোলে চূর্ণপ্রায় করোটি। ছায়াব্যোমে দোলে মুণ্ডমালা। সূর্য চাঁদ নভোঘড়ি দোলে।
[আমার ঘরে তখনো দাবা খেলা চলছে, বৃদ্ধ ঈশ্বর এবং বালক শয়তানের মধ্যে]
অতিকায় গহ্বরশূন্যে বিজ্ঞানী সংগম করে উন্মাদ উলঙ্গিনীর সংগে। তার জানু চেপে ধরে। মাই-এ রেখা আঁকে, সংখ্যা, সূত্র, চিহ্ন; x, y, z, r, θ, ϕ। উলঙ্গিনীর ত্রিকোণ যোনি থেকে জন্ম হয় তত্ত্বের। তত্ত্ব যা ব্যাখ্যা করবে মহাবিশ্বকে। মহাবিশ্বের কুঞ্চনে-কোণে-সুতোয় যে খুনেজগৎ, যে নোংরা প্রস্রাবখানা, নীলম্যাক্সি বেশ্যাপল্লী, তা থেকে উঠে আসছে অসংখ্য সুক্ষদেহী সূত্র, গুঢ় জ্যোতির্জ্ঞান সূত্রসমূহের লিঙ্গ নির্মাণ করছে। গতি এবং অ-গতি, জ্ঞান এবং অ-জ্ঞান, যুক্তি এবং অ-যুক্তি, ক্রম এবং বিশৃঙ্খলা চূর্ণ ক'রে, সেই কালো আত্মাপিণ্ড-কে ব্যাখ্যা ক'রে ফেলে, যা ঈশ্বরের-ও নয়, শয়তানের-ও নয়। যা স্বM© এবং নরক-কে প্রত্যাখ্যান করেছে। যা স্বয়ংক্রিয় ও অমোঘ।
হে নিউক্লিয়ার দেবতা, হরিদ্রাভ জাতক আলো জ্বলছে। ধূমায়মান করোটি থেকে উঠে আসছে সূর্যতাপ, ধূম। করোটি কি মহাকালের মিনার, ঘড়ি? ভিতরে প্রকাণ্ড ঘন্টা দুলছে। মহাঘন্টাধ্বনি-তে বাজছে করোটিতন্ত্র। অন্দরে বিগ্রহ, নটরাজ। কজমিক নাচ স্তব্ধ অঙ্গে। এই মৃত্যুতাল, এই পরাভব-ছন্দ তরল আগ্নেয় শিরার ভিতর অনন্ত অনাহত ধ্বনিশূন্যে বাজে। THE PRISTINE RESONANCE। জাতক আলো জ্বলে, গর্ভের ভিতর প্রবল মৃত্যুগর্জনে আমার পরাজন্ম, আমার না-জন্ম
[ এ' গদ্য আমি লিখেছি করোটির ভিতর যে মাংস, সে' মাংসের ভাষায়]




মন্তব্য