.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

পাঠকের মুখোমুখি মাসুমুল আলম


ডিসেম্বরে আমরা আমাদের ওয়েবসাইটে প্রশ্ন আহ্বান করেছিলাম। তাদের কাছে, যার মাসুমুল আলমের পাঠক; তার লেখা পড়েছেন, জানেন। আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকে প্রশ্ন পাঠিয়ে আমাদের আনন্দিত/অভিভূত করেছেন। আপনাদের পাঠানো প্রশ্ন থেকে নির্বাচিত ২৯টি প্রকাশিত হলো। কিছু প্রশ্ন রিপিট হয়েছিলো, সেক্ষেত্রে পূর্ব ঘোষণামতে আগে যিনি পাঠিয়েছেন, তার প্রশ্নটি গ্রহণ করা হলো। ধন্যবাদ সবাইকে।

:: প্রশ্নকর্তা ::
হিম ঋতব্রত। মরিয়ম মেরিনা। বর্ণ চক্রবর্তী। মোখলেছুর রহমান। বর্ণালী বড়ুয়া
স্বপন সেন। রুহুল আমিন। সাগর মল্লিক। রমজান আলী। মৌসুমী আহম্মেদ
সৈকত জাহিদ। জাহিদুর রহিম। অনিক মাহমুদ। নজরুল ইসলাম
কাজী রায়হান। হাসান হৃদয়। মাহমুদুল হোসেন তমাল। রবিউল করিম। রুবিনা আক্তার

বর্ণ চক্রবর্তী: কেন লেখেন? না লিখলে কী হতো? 

উত্তর:  লিখে আমি আনন্দ পাই। পড়েও। তাই  লেখা-পড়াটা নিয়মিত করার চেষ্টা থাকে। আর সবার মতোই যে ডার্ক,  ক্রুড, অবিশ্বাস্য রিয়ালিটিতে আমি থাকি, তাতে আমার একটা যাপনের উপলব্ধি হয়, যা নাকি আমার দেখা থেকে আসে। সেই দেখাটা বা পর্যবেক্ষণটা আমি দেখাতে চাই বা শেয়ার করতে চাই বলেই আমি লিখি। সব লেখকই অসুখী এবং অসুখী বলেই তারা লেখে। আর যেহেতু, আমি মনে করি, লেখা একটা শুশ্রুষা। আমার কাছে পড়াশোনা করাটাও একরকম তাই। কাজেই না লিখলে কি হতো সহজেই অনুমেয়। 

বর্ণ চক্রবর্তী: আপনি কখনো সম্পাদনা করেছেন? 

মাসুমুল আলম: না। 

মরিয়ম মেরিনা: মাসুমুল আলমের হাতেখড়ির গল্পটা কেমন ছিলো? 

মাসুমুল আলম: মানে লেখালেখির হাতেখড়ি তো? আচ্ছা,  ছোটোবেলা থেকেই বাড়িতে দেখতাম পড়াশোনার এক পরিবেশ। আমার বাবা ওনার বই আছে, আর আমার ভাইয়েরা কেউ কবিতা লেখে, ছবি আঁকে কেউ। 
ছোটোবেলায় আর সবার মতোই আমি খেলাধুলা করতাম। শুধু যখন খুব জ্বর-টর হতো তখন ঐ বই পড়াটা হতো। আগেই বলেছি বাড়ির সবাই লিখতো এবং হাতের লেখা সবার ভালো। তো, একদিন হঠাৎ-ই খেলাধুলা ছেড়ে দিয়ে বাড়ির বইগুলোতে ঢুকে গেলাম। পাবলিক লাইব্রেরিতে যেতে শুরু করলাম। এটা খুবই প্রাচীন, প্রচুর বই আছে এবং সম্ভবত: বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লাইব্রেরি। বইয়ের জগৎ। ১৯৯০ তে দস্তয়েভস্কির ক্রাইম এ্যাণ্ড পানিশমেন্ট  পড়লাম। আমার মাকে আমি বিকেলবেলা ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ডমরু-চরিত, পরশুরামের বই পড়তে দেখেছি: কজ্জলী, হনুমানের স্বপ্ন... এসব। দুপুরে খাওয়ার পর সন্ধের আগ পর্যন্ত বই পড়তেন মা। ছোটোবেলায় যা-যা পড়ার, সবাই যা পড়ে এবং পড়তেই থাকে কৈশোরযুবকাল অব্দি  এবং সেই হ্যাংওভার অনেকের আর কাটে না। আমার তেমনটা হয়নি। আমি সিঁড়ি থেকে নেমে অথবা উঠে গিয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্-র চাঁদের অমাবস্যা, কাঁদো নদী কাঁদো-তে ঢুকে পড়েছি; আর পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বাবা বই তুলে নিয়ে আসতেন। দেখছি তিনি দুপুরে ড. জিভাগো  পড়ছেন। এক লিমেরিক ছাড়া কবি হিসেবে বাবা সম্বন্ধে আমার উচ্চ ধারণা ছিলো না।  
শুরু থেকেই যে লেখালেখির ইচ্ছে ছিলো, এটা স্পষ্ট কখনো বুঝি নি। কেবল পড়াতেই আনন্দ। সমবয়সীদের সাথে অনিবার্য বিচ্ছিন্নতা, এবং বড়োদের সাহিত্য, বড়োদের জটলা, সমাবেশ, কথোপকথনে কান পেতে রাখার বিশ্রী অভ্যাস ও আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগও ছিলো একটু। পড়া হতো প্রকাশ্যে এবং গোপনেও। এ অভিজ্ঞতা অবশ্য কমবেশি সবারই আছে। 
১৯৯১ তে স্থানীয় আলোচিত এক পত্রিকায় পরপর ২ সপ্তাহে দীর্ঘ একটা গল্প ছাপা হলো। ঐ একবারই। আবার, এতো যে জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাতা নিয়ে তখন আলোচনা, সরগরম, তো ভাবলাম দেখি তো পাঠিয়ে। ১৯৯২-৯৩ সালে, বাংলাবাজার সাহিত্যপাতায়, পরে জেনেছি নাসরীন জাহান তখন ঐ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন, সে গল্প ছাপা হয়ে গেলো। এরকমভাবে চলছিলো। 
তো, যশোরের চলতি সাহিত্যপত্রিকায় ধারাবাহিকতার বাইরে গিয়ে ঐ শনিবাসর-রবিবাসরের অংশগ্রহণকারী মূলত: কবিদের একটা গ্রুপ নিজেদের মতো করে ‘প্রতিশিল্প’ করার সিদ্ধান্ত নিলো।‘কালপত্র’ কেন্দ্রিক আড্ডা থেকে সর্বজনাব সৈকত হাবিব, মারুফুল আলম, মহিউদ্দীন মোহাম্মদ, অসিত বিশ্বাস, কবির মনি, এঁদের উদ্যোগে ‘প্রতিশিল্প’ বের হলো। আর ‘প্রতিশিল্প’ প্রথম সংখ্যায় ছোট কাগজের ‘চারিত্র্য’ বজায় রাখতে রাখতে দ্বিতীয় সংখ্যায় এসে একইসাথে ‘ছোটকাগজ’ এবং ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধী’ প্রবণতার দিকে যেতে থাকলো। প্রতিশিল্পের ১ম সংখ্যা থেকেই আমার লেখা ছিলো।

মরিয়ম মেরিনা: আপনি আপনার কোন লেখাটার উপর বেশি সন্তুষ্ট? সেই লেখাটা পাঠক কতোটা আপন করে নিয়েছে?

মাসুমুল আলম: উপন্যাসে মৌন ধারাপাত, আরব্যরজনীর ঘোড়া। আর গল্পে বলা যাচ্ছে না। অনেকগুলো গল্প তো। বইও ৩ টা। একেক বইয়ের একেক লক্ষ্য। ভরকেন্দ্র আলাদা। 
দ্যাখেন পাঠকের ব্যাপারটা আমার কাছে পরিস্কার না। না, কোনো প্রতিক্রিয়া পাই নি। তবে, সচেতন পাঠকগোষ্ঠী যাঁরা একইসঙ্গে লেখকও তাঁরা আরব্যরজনীর ঘোড়া’র কথা বলেছেন। অনেকের খুবই প্রিয় মৌন ধারাপাত উপন্যাস। আমার একটা দীর্ঘ লেখা আছে- নামপুরুষ, ঐটাও আমার প্রিয়। কিন্তু কেউ পড়েছেন কি-না, আজ অবধি নিশ্চিত না। 

মরিয়ম মেরিনা: লেখা নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ ভাবনা কি? 

মাসুমুল আলম: আমি একটা নতুন ধরনের উপন্যাসের কাজ করছি। সংলাপ প্রধান। আপাতত এটাই। আর যশোরের চৌগাছায় নীল বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছিল, দিগম্বর বিশ্বাস-পীতাম্বর বিশ্বাস-দুইভাইয়ের নেতৃত্বে-সেটা নিয়ে কিছু একটা করবো হয়তো। 

বর্ণালী বড়ুয়া: আপনি হয়তো বলবেন, পাঠকই বিচার করবে। তবু জানার ইচ্ছে, “আরব্যরজনীর ঘোড়া” বাংলা সাহিত্যে কতোটুকু প্রভাব বিস্তার করবে বলে মনে হয়? 

মাসুমুল আলম: এটা সমসাময়িক কালে একটা আলোচিত বই। অনেকে গ্রহণ করেছেন, অনেকে একটু অসহিষ্ণুতাও প্রকাশ করেছেন। এতোটা খোলামেলা নিতে পারেন নি আর কি।  ইন্টাররিলেটেড তিনজন নারীর স্বগতকথন, পুরো টেক্সটের ফর্মটা এমন, পাঠকের সিদ্ধান্তগ্রহণের বা পাঠকের ভাবনার অবকাশ রয়েছে বইটিতে। হয়তো সে কারণে এটা ভবিষ্যতে আলোচিত হতে পারে। তবু, এটাও আমি নিশ্চিত না। 

বর্ণালী বড়ুয়া: বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের গতিপথ কোনদিকে বলে মনে হয়? গত দশ বছরে কোন কোন বিষয়গুলো আপনার চোখে পড়েছে? 

মাসুমুল আলম: আমাদের এখানে কথাসাহিত্য এখনো নিটোল কাহিনির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর যেসব সাহিত্যিকের হাতে স্মার্ট গদ্যভাষা রয়েছে, রয়েছে পর্যবেক্ষণ শক্তি, তারাও প্রচল ফর্মের বাইরে যাচ্ছেন না। মধ্যবিত্ত সমাজের রুচি পছন্দ অনুযায়ী কমিউনিকেটিভ গদ্যে, উপন্যাস বা গল্পের কাব্যময় একটা ক্যাচি নেম দেয়ার ট্রেন্ড এখানে রয়েছে। অথচ, সারা বিশ্বে লেখা এখন লেখাই, তা কোনো ঘেরাটোপে বন্দী না। লেখা, সে উপন্যাস/গল্প, যাই হোক, সব রাইট-আপ গ্রাস করে নিচ্ছে। রিপোর্টাজ, বহু বিচিত্র ধরণের টেক্সট। এমন কি কবিতা, সব, সবকিছু, ফিকশন–নন ফিকশনের দেয়াল ঘুচে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে এই প্রবণতা সাম্প্রতিককালে ক্ষীণধারায় দেখা যাচ্ছে একালের হাতে গোণা কিছু লেখকের হাতে। ঐতিহাসিক উপন্যাসের নামে ঢাউস প্রজেক্ট নভেলের কনসেপ্ট চেঞ্জ করে দিয়েছেন মাসউদুল হক, তাঁর পূবের পূর্ব পুরুষেরা উপন্যাসে। ‘অপৌরুষেয়’ বইটিতে, অদিতি ফাল্গুনীরও এরকম ধরনের গল্প আছে। এরকম খুঁজে খুঁজে উদাহরণ দেয়া যাবে। উপন্যাস ৫ প্রকার− এগুলোকে কেউ কেউ মনে মনে লালন করলেও সমকালীন লেখকরা ফর্মুলা ভাঙতে শুরু করেছেন। গত দশ বছরে বিন্দু বিন্দু করে সাহসী কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে সাহিত্যের একটা বিকল্প পথরেখা তৈরি হচ্ছে। কষ্ট করে খোঁজ খবর, অনুসন্ধিৎসা থাকলে প্রচুর ভিড়ের মধ্য এই শ্যাডোলাইটটা দেখা যায়। 

স্বপন সেন: সোশ্যাল সাইটগুলো সাহিত্যজগতের পরিবর্তন আনছে বলে মনে হয় না? 

মাসুমুল আলম: হ্যাঁ তা তো দেখা যাচ্ছে। ফেসবুক, ওয়েবজিন, ব্লগজিন, এগুলো একেকটা প্লাটফর্ম হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত, বা দলবদ্ধ সবাই এটাকে ব্যবহার করছে। ছোটোকাগজের লেখকেরা, সম্পাদকেরা তাদের ভাবনার প্রতিফলন সমৃদ্ধ ওয়েবজিন করছে। এটা ভালো। তবে, পাঠকের মনোজগৎ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সিরিয়াস লিটলম্যাগ যখন অনলাইনে যায় তখন সেই সিরিয়াসনেসটা তো থাকছে না। অনলাইনে পাঠকের মনোজগৎ দ্রুত স্যুইং করে, পাঠক ধরে রাখতে সবকিছুতে একটা হালকা চাল চলে এসেছে ইদানীং। ফলে, লিটল ম্যাগের চারিত্র্য অন্যান্য বড়ো কাগজের সহোদর চলকের মতো না হয়ে যায়, গড়ে হরিবোল না হয়ে যায়, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। 

স্বপন সেন: পূর্বসুরী হিসেবে কাউকে কি ফলো করেন? 

মাসুমুল আলম: এখন আর কাউকে ফলো করি না, শুরুতে যেমেন করতাম। বরং এখন অনেকের লেখা পড়ি, কৌশলটা দেখি, ট্রাম্প কার্ড-হাতের তাসটা কোথায় লুকানো রয়েছে বোঝার চেষ্টা করি। 

রুহুল আমিন: আপনার সাহিত্যে বামপন্থীদের পক্ষে বক্তব্য আমার নজরে পড়ে। আপনার রাজনৈতিক দর্শন জানতে চাই। 

মাসুমুল আলম: আমার সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দর্শন নেই। একটা সচেতনতাবোধ আছে মাত্র, যা সমাজ বা ব্যক্তিচরিত্র ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে আমি কাজে লাগাই। এই সচেতনতা কখনো কখনো বামপন্থার সঙ্গে যেতে পারে। 

সাগর মল্লিক: বর্তমান সময়ে আপনার প্রিয় কথাসাহিত্যিক ও কবির নাম জানতে চাই। 

মাসুমুল আলম: বর্তমান সময়ে মানে দ্বিতীয় বা সদ্য শেষ হওয়া তৃতীয় দশক অব্দি। কিন্তু দশকের বিভাজনটা বেশ ঝামেলাপূর্ণও। যাই হোক, বর্তমান সময়ে অনেকেই আমার প্রিয় কথাসাহিত্যিক এবং কবি আছেন। হয়তো এমন কেউ যার বই আমি পড়িনি, কোথাও গুচ্ছ কবিতা পড়েছি, ভালো লেগেছে। বা একটা গল্পের বই। কিংবা একটা উপন্যাসের জন্য তিনি আমার প্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। তালিকাটা দীর্ঘ। আবার ঝটিতি বলতে গেলে অনেক নামই বাদ পড়ে যাবে। শুধু এটুকু বলি, আমি অনেক নাম না জানা তরুণ বা স্বল্প পরিচিতদের বই খুঁজে খুঁজে পড়ার চেষ্টা করি। 

রমজান আলী: আপনারা যারা আপনার প্রজন্মের লিটল ম্যাগ কর্মী তারা ফেসবুকে শুধু নিজেদের বই/সাহিত্য নিয়ে বক্তব্য দেন, রিভিউ লিখেন, যদিও আপনি ব্যতিক্রম। এর কারণ কি বলে মনে হয় আপনার? তারা কি নিজেদের বই ছাড়া আর কিছু পড়েন না? 

মাসুমুল আলম: ফেসবুক তো একটা পাব্লিক প্লাটফর্ম। প্রচারের জন্য এটা যে কেউ করতেই পারেন। তবে, যে কেউ নিজেদের বই নিয়ে নিজেরা রিভিউ লেখেন বলে মনে হয় না। নিজের ওপর অন্যদের লেখা রিভিউ আপলোড করলে ঠিক ছিলো, কি বলেন? 
হয়তো লিটল ম্যাগের কর্মীরা অন্যদের বই পড়েন। কিন্তু আমরা এখন একটা নীরবতার সংস্কৃতির মধ্যে আছি। সব অর্থেই। 

রমজান আলি: লিটল ম্যাগাজিনের প্রয়োজনীয়তা কি ফুরিয়ে গেছে? 

মাসুমুল আলম: না। 
নিজেদের মতো, ইচ্ছেখুশি স্বাধীনতা নিয়ে লিখতে গেলে, মু্ক্ত মনন নিয়ে লিখতে গেলে ছোটকাগজ একমাত্র জায়গা। ছোটোকাগজের লেখকদের প্রকাশনা থাকাটাও খুব জরুরি। প্রয়োজনীয়তা তো ফুরায় নি। বরং লিটল ম্যাগ তার কনসেপ্ট বজায় রেখে ব্লগজিন, ওয়েবজিনে রূপান্তরিত হয়েছে রূপভেদে।  

মৌসুমী আহম্মেদ: পুনর্জম্মে বিশ্বাস করেন?

মাসুমুল আলম: না। 

মৌসুমী আহম্মেদ: আপনার প্রিয়বন্ধুর নাম কি?

মাসুমুল আলম: একজন না। তিনজন। তারা সবাই সাহিত্যিক। একজন গদ্য লেখক, বাকি দুইজন মশহুর কবি। সাগর নীল খান দীপ, নাভিল মানদার এবং সুহৃদ শহীদুল্লাহ। 

সৈকত জাহিদ: জন্মের আগে যদি আপনার মতামত নেয়া হতো, পৃথিবীতে আসতে চাইতেন? 

মাসুমুল আলম: জানি না।সন্দেহ আছে। 

জাহিদুল রহিম: ব্যক্তিজীবনে প্রেম আপনাকে বিষাদগ্রস্ত করেছে কখনো? 

মাসুমুল আলম: সবাইকে তো করে। প্রেম কেবল অব্যাহত উজ্জীবন ইউফোরিয়া-ই শুধু না এতে বিষন্নতাও থাকবে। আবার আনন্দ, আবার বিষাদ, চক্রাকারে। সুখখানি চ দুখখানি চ।  

অনিক মাহমুদ: সুবিমল মিশ্র সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? 

মাসুমুল আলম: অতি বড় মাপের লেখক। আমাদের বাতিঘর। তাঁর লেখাপত্র তরুণদের স্বাধীনভাবে লিখতে সাহসী এবং উদ্বুদ্ধ করে। 

নজরুল ইসলাম: আপনার শৈশব এবং ছেলেবেলা কিভাবে কেটেছে? 

মাসুমুল আলম: আমার শৈশব কেটেছে যশোর শহরে। আবার বাবা ছিলেন কবি এবং সরকারি স্কুলের একজন প্রধান শিক্ষক। আগেই বলেছি, আমার মা ছিলেন ভালো পাঠক। ক্লাস সেভেনের পর আমি আর খেলাধুলা করিনি পাড়ার সমবয়স্কদের সাথে। কেননা, তখন আমি বাড়িতে বইয়ের সমাহারে ঢুকে পড়েছি। 
আমি আমার এক স্কুলের সহপাঠীর সাথে, যার বাবা আমাদের এলাকায় ভাড়া থাকতো, তার সাথে বাইসাইকেলে ঘুরে বেড়াতাম। ভৈরবের পাড়ে, বাবুর বাগানে। ও মোটেই বই পড়তো না। আমরা একসাথে ঘুরতাম। এস.এস.সি.-র পরে ওর সঙ্গেও আর সম্পর্ক থাকে না। ততদিনে আমি সর্বগ্রাসী পাঠক হয়ে উঠেছিলাম। ছোটোবেলায় রোজার এক মাস স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে বাবার সঙ্গে লাইব্রেরি যেতাম, উনি লাইব্রেরিতে বসিয়ে দিয়ে বাজার-ফেরত থলি হাতে আমাদের ২ ভাইকে নিয়ে তবে বাসায় ফিরতেন। তখন রোজার দিনগুলি দীর্ঘ হতো। ইফতার হতো সন্ধে ৭টায়, দূর দড়াটানার ডিসি-র অফিস থেকে সাইরেনের শব্দে শহরবাসীরা তখন রোজা ভাঙতো। 
যা হোক, আমার শৈশবের বিস্ময়বোধ কেটে গেছিলো নানা ধরনের বইয়ের সংস্পর্শে। তখন অন্য বিষ্ময়। সমবয়স্কদের সাথে দুরত্ব তৈরি হয়েছিলো। আমি একা নিজের আনন্দে বেড়ে উঠেছিলাম। হ্যাঁ, আমার লম্বা চুল ও গোঁফ ছিলো। রোগা, দেখতে খারাপ, কামচোর, বেশিরভাগ মানুষ সম্বন্ধে ভেতর ভেতর একটা নেতিবাচক মূল্যায়নের প্রচেষ্টা ছিলো। আমাদের পাড়ার বাৎসরিক ফাংশন হতো। ছেলেমেয়েরা সেজেগুজে এটা সেটা করতো। আমি কেবল দর্শক ছিলাম। বরাবর আমি দর্শক।  

নজরুল ইসলাম: আপনার কথাসাহিত্যিক হওয়ার পেছনে মানে কথাসাহিত্যের প্রতি আগ্রহ কিভাবে? 

মাসুমুল আলম: ছোটবেলায় বই পড়তে পড়তে আমি একদিন অন্য কিছু না, গল্প লিখে ফেলি।  সেই শুরু। 

কাজী রায়হান: আপনাকে যদি তিনটি করে, গল্প, কবিতা আর বইয়ের নাম বলতে বলা হয়, তাহলে সেগুলো কি কি? 

মাসুমুল আলম: খুব টাফ। সময়কাল ও পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী, এগুলোর গুরুত্ব, সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও পছন্দ নির্ভর করে। 

হাসান হৃদয়: আপনার সাহিত্যে শব্দ ব্যবহার, বাক্য গঠনে একটা ব্যতিক্রমধর্মীতা লক্ষ্য করা যায়, এ বিষয়ে কিছু বলবেন? 

মাসুমুল আলম: লেখার সময় শব্দ ব্যবহার, বাক্য গঠনে আমি খুব একটা সতর্ক থাকি না। এমনকি, একটানে লেখার পর খুব একটা পরিবর্তনও হয় না। আমি মোটামুটি মুখের ভাষায় লেখার চেষ্টা করি। পথ চলতি ব্যবহারিক শব্দ, এমন কি মানুষের মুখের কথা বলার ধরনে পদবিচ্যুতিসহ বাক্য লিখি। লিখি বললাম, আসলে এটা আলগোছেই চলে আসে। ব্যতিক্রম লেখা লিখবো, গল্পটাকে ব্যতিক্রম করবো। এমনতর পূর্ব ধারণা বা প্রচেষ্টা আমার থাকে না। 
যদি ব্যতিক্রমধর্মিতা পাঠক হিসেবে আপনি পান, ঐটা আমার এটিটিউড, অন্তর্জগতের ভাবনা বিস্তার, যা ঐরকমভাবেই লেখাতে আসে, এসেছে। 

মাহমুদুল হোসেন তমাল: প্রিয় লেখক, প্রিয় কবি, প্রিয় শিক্ষক, প্রিয় সম্পাদক, প্রিয় গায়ক, প্রিয় লিটল ম্যাগের নাম জানতে চাই। 

মাসুমুল আলম: অনেকেই প্রিয় লেখক বা প্রিয় কবি। প্রিয় শিক্ষক- হাই স্কুলে পড়াকালে শ্রী দুলাল হরিদাস। গণিত, ভূগোল, বাংলা, বিজ্ঞান সব পড়াতে পারতেন। অন্যসব হিন্দু শিক্ষকরা ধূতি পরে স্কুলে আসতেন, উনি আসতেন প্যান্ট-শার্ট ইন করে। স্কুলে বার্ষিক নাটকের মহড়া করাতেন। প্রিয় সম্পাদক-আমি যে ম্যাগাজিনগুলোতে লিখেছি, তাঁরা সবাই। হাতে গোণা তিন/চার জন। 

প্রিয় গায়কও বলা কঠিন। ফোক সং –এর ক্ষেত্রে অমর পাল, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, আংশুমান রায়। গানের ধরণ অনুযায়ী প্রিয় গায়ক নির্ভর করে। আমার ক্ষেত্রে প্রিয় গায়ক একাধিক। 

রবিউল করিম: “র‌্যাম্প, বার-বি-কিউ ...” উপন্যাসটি কিভাবে লেখা হলো? 

মাসুমুল আলম: সব পাড়ায় একটা-দু’টো খর্বকার মানুষ থাকে। লোকে তাদের নিয়ে ঠাট্টা করে। এবং তারা তাদের শৈশবেই প্রকৃত নাম হারায়, বা নামের সাথে একটু, ‘বেড়ে’‘নাটা’ইত্যাদি যুক্ত হয়। শচীন তেন্ডুলকারও বেটে। কিন্তু ব্যাটিং-এ নেমে দিনকে রাত বা রাতকে দিন করে পুরো পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে পারেন। 
আমাদের শহরে এরকম একজন বেটে মানুষ ছিলো। তুমুলভাবে রসিক, মিমিক্রিতে ওস্তাদ এবং গাঁজাখোর। ফরহাদ মাযহারের নাম জানতো, এই লোকই আমার চিন্তায় চলে এসে মননকে অধিকার করলো। যশোরে উদীচী হ্ত্যাকাণ্ড ঘটলো। সেও রক্ত দিতে গেলো। কিন্তু আর্মি ডাক্তার গাঁজাখোর সন্দেহে রক্ত নিলো না। এই ঘটনা শোনার পর ভেতর ভেতর অনেক কিছু দানা বাঁধলো। অগোছালো, তারপর যা হয়, লিখতে বসলাম। তারপর প্রতিদিন লিখে আমি উপন্যাসটি শেষ করি।  

রুবিনা আক্তার: আপনার গল্প ইউনিক, কিন্তু স্টাইল মনোটোনাস। ভার্মেটাইলিটি নাই কেন? 

মাসুমুল আলম: আমার প্রথম বইয়ে গল্প ছিলো ২০ টা। স্পষ্টত প্রতিটি গল্প থেকে প্রতিটি গল্প আলাদা। এবং সময়কালের নিরিখে স্টাইল পরিবর্তিত হয়েছে পরের ১০ টি গল্পে। উপরিতলের ভাঙচুর নেই, যতোটা অন্তর্গতভাবে, আর যদি প্রতিটি বইয়েরই একেকটা চরিত্র থাকে, তা নিরুপিত হয় ভরকেন্দ্র অনুযায়ী। সে বিবেচনায়, সর্বার্থে, বিষয় এবং স্টাইলে, তিনটিই তিনটির থেকে আলাদা। অবশ্য পাঠকের তা নাও মনে হতে পারে। কিন্তু আমি স্ট্রংলি ভিন্নমত পোষণ করি। 

হিম ঋতব্রত: কেন লিটল ম্যাগ চর্চা করেন এবং কেন দৈনিকে লিখেন নি? 

মাসুমুল আলম: দৈনিকে লিখিনি, তা না। লিখেছি। লিখতে লিখতে ইউটার্ন করে ছোটোকাগজে এসেছি। 

হিম ঋতব্রত: প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি? 

মাসুমুল আলম: এ প্রশ্নের উত্তরও আমি আগে দিয়েছি। এটা আমার বলা সাজে না। 

হিম ঋতব্রত: লেখকরা কেউ কেউ লিটল ম্যাগ চর্চা করে অথবা কেউ কেউ দৈনিক বা হরেদরে নিজেকে বিক্রি করে। তবে, লেখকের মান বিবেচনায় তারা কোথায় লিখেছেন এটা বেশি জরুরি নাকি তাদের লেখার মান কেমন সেটা বিবেচনা করা বেশি জরুরি? 

মাসুমুল আলম: কোথায় লিখেছেন, কোথায় লেখেন সেটা যেমন জরুরি, পাশাপাশি লেখার মানও। ধরেন অমুক নামের ছোটোকাগজে অমুক একটা গল্প বা কবিতা লিখলো। যেটা কেরদানি-সর্বস্ব এবং মানহীন, তাহলে কি হলো। আবার, দৈনিকে একটা ‘ভালো’গল্প বা কবিতা আপনি পাবেন না এমন না। তবে, বিশেষ সংখ্যার ৩০ টি কবিতার মধ্যে ২টি, ১০টি গল্পের মধ্যে একটি বা একটি উপন্যাস, ঐ হরেদরে। ‘ভালো’ বললাম বটে, হ্যাঁ, ভালো। তবে, ধক্ পাওয়া যাবে না। নিরীক্ষা পাবেন না। কেবল ‘ভালো’− ঐ পর্যন্তই। 

আর যারা ‘ভালো’ লেখেন, এদেরকে আমরা চিনি, তাঁরা নিঃসন্দেহে মেধাবী, বলনশৈলী দক্ষ, কিন্তু এক্সপেরিমেন্টের ধারে কাছে নেই বিশেষ বিবেচনার কারণে। তার লক্ষাধিক পাঠকের কাছে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু ট্রাজেডি হলো তারা যেতে পারেন না, যেহেতু তারা ভালো লেখেন সেজন্যই। পাঠক তাদের না নিয়ে ঐ একই দৈনিকের একগাদা কুচো চিংড়ির মতো মুদ্রিত গুচ্ছের লেখক/কবির মধ্যে অন্য মাঝারি বা বাজারি কাউকে নিয়ে নাচে। আর ‘ভালো’যিনি কবিতা/গল্প লেখেন, লিখেছেন, নিজেই জানেন, এবং তিনি একসময় ঐ ইদুঁর-দৌঁড় দেখে ‘আহাজারি’লেখকে পরিণত হন। 
ছোটকাগজেও ‘বাজারি-বাজারি’করতে করতে এরকম ‘আহাজারি’কিছু কবি-সাহিত্যিক আছেন। 

হিম ঋতব্রত: আপনার প্রকাশিত বইগুলোর ভেতর কোন বইটি আপনার বেশি প্রিয় এবং কেন? 

মাসুমুল আলম: জবাব দেয়া কঠিন। এমন না যে আমি প্রবলভাবে আমার সব লেখা পছন্দ করছি। আমি আমার নিজের মুদ্রিত লেখা বই হয়ে যাওয়ার পর পড়তেও চাই না। পড়ি না।  অস্বস্তি হয়। আবার খারাপ লিখেছি এমনও মনে হয় না। একটা অস্বস্তিকর মিশ্র অনুভূতি আমার আছে নিজের লেখাপত্র নিয়ে। সেটা মানের প্রশ্ন নিয়ে নয়। কোনটা প্রিয়, এই বলাটাও কম অস্বস্তিকর নয়। নিজের লেখার মুগ্ধতা প্রকাশ করাটা লজ্জার মনে হয়। তার চেয়ে অন্যরা পড়ুক তারাই বলুক। 

সবাইকে ধন্যবাদ। ভালো থাকুন।  

মন্তব্য

BLOGGER
নাম

অনুবাদ,14,আত্মজীবনী,16,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,উৎপলকুমার বসু,23,কবিতা,175,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,10,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,32,ছড়া,1,জার্নাল,1,জীবনী,3,দশকথা,22,পুনঃপ্রকাশ,8,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,1,প্রবন্ধ,56,বর্ষা সংখ্যা,1,বিক্রয়বিভাগ,23,বিবৃতি,1,বিশেষ,12,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,21,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,সম্পাদকীয়,8,সাক্ষাৎকার,12,স্মৃতিকথা,2,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: পাঠকের মুখোমুখি মাসুমুল আলম
পাঠকের মুখোমুখি মাসুমুল আলম
https://1.bp.blogspot.com/-p_CaMmQbNZo/X_FtiTOXaWI/AAAAAAAABOY/TrHea7AoyJo67vUCdrec9xi6QDQ16sdigCNcBGAsYHQ/s320/%25E0%25A6%2596%25E0%25A7%258B%25E0%25A6%25B2%25E0%25A6%25BE-%25E0%25A6%25AA%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%25B6%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A8-%25E0%25A6%25AE%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B8%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25AE%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25B2-%25E0%25A6%2586%25E0%25A6%25B2%25E0%25A6%25AE-%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%2582%25E0%25A6%2596%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25AF%25E0%25A6%25BE.png
https://1.bp.blogspot.com/-p_CaMmQbNZo/X_FtiTOXaWI/AAAAAAAABOY/TrHea7AoyJo67vUCdrec9xi6QDQ16sdigCNcBGAsYHQ/s72-c/%25E0%25A6%2596%25E0%25A7%258B%25E0%25A6%25B2%25E0%25A6%25BE-%25E0%25A6%25AA%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%25B6%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A8-%25E0%25A6%25AE%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B8%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25AE%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%25B2-%25E0%25A6%2586%25E0%25A6%25B2%25E0%25A6%25AE-%25E0%25A6%25B8%25E0%25A6%2582%25E0%25A6%2596%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25AF%25E0%25A6%25BE.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2021/01/Masumul-Alam-Intrv.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2021/01/Masumul-Alam-Intrv.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy