একটি লিটল ম্যাগাজিন আসলে কী—তার সংজ্ঞা যতটা কাগজে লেখা যায়, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি তার অস্তিত্ব বিরাজ করে প্রতিবাদী নৈতিক অবস্থানের মধ্যে। ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা, মূলধারার আরামদায়ক নিশ্চয়তাকে অস্বীকার করা, সাহিত্যকে ‘প্রোডাক্ট’ নয়—‘প্রয়াস’ হিসেবে ভাবা। বাঙলা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের এই নৈতিক অবস্থানকে যাঁরা জীবনভর বহন করেছেন, সন্দীপ দত্ত তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ‘বিন্দু’র এই বিশেষ সংখ্যাটি কোনো স্মরণসভা নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধার্ঘ্যও নয়—এটি এক প্রয়োজনীয় ফিরে তাকানো, এক দায় স্বীকার।
চার দশকের বেশি সময় ধরে ‘কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি এবং গবেষণা কেন্দ্র’ যে কাজটি করে এসেছে, তা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। অথচ সন্দীপ দত্ত সেই অসম্ভবকেই নিজের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নিয়েছিলেন। যে সাহিত্যকে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ‘জঞ্জাল’ বলে দূরে ঠেলে দেয়, সন্দীপ দত্ত তাকেই তুলে নিয়েছিলেন বুকের মধ্যে। তাঁর কাছে লিটল ম্যাগাজিন ছিল ভবিষ্যতের আর্কাইভ—যেখানে আজকের অবহেলা আগামী দিনের ইতিহাস।
ন্যাশনাল লাইব্রেরির অবহেলায় স্তূপীকৃত লিটল ম্যাগাজিন দেখে যে প্রতিবাদ একুশ বছরের তরুণকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছিল, সেই প্রতিবাদ ঠুনকো আবেগী প্রতিক্রিয়া ছিল না—ছিল সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সূচনা। সন্দীপ দত্ত বুঝেছিলেন, সাহিত্য রচনাই শুধু নয়—সংরক্ষণ করাও রাজনীতি। আর সেই রাজনীতিতে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন একা, প্রায় নিঃস্ব হাতে, কিন্তু দৃঢ় সংকল্পে। ১৮ এম টেমার লেনের বাড়ির একতলায় কয়েকটি চেয়ার, একটি টেবিল, দড়িতে ঝোলানো পত্রিকা—এই সামান্য আয়োজন থেকেই যে মহীরূহের জন্ম, তা বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
সন্দীপ দত্ত নিজে ছিলেন চলমান প্রচারপত্র—মাথায় সেই বিখ্যাত টুপি, বইমেলার মাঠে ঘুরে বেড়ানো, স্লোগানকে শরীরে ধারণ করা। ‘লিটল ম্যাগাজিন কিনুন, পড়ুন, ভাবুন’—এই আহ্বান আজও আমাদের কানে বাজে, অথচ প্রশ্ন জাগে: আমরা কি তা পালন করেছি?
লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে সন্দীপ দত্তের অবদান শুধু সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। ‘লেখক ব্যাঙ্ক’-এর মতো অভিনব উদ্যোগ তাঁর দূরদৃষ্টির প্রমাণ। নির্জনে লিখে যাওয়া, অপ্রতিষ্ঠিত লেখকদের জন্য একটি আশ্রয়। যদিও সেই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবু তা দেখিয়ে দিয়েছিল, সাহিত্যিক ন্যায্যতা কীভাবে কল্পনা করা যায়। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত বইগুলি—‘লিটল ম্যাগাজিন ভাবনা’ থেকে ‘বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিবৃত্ত’—সবই আসলে একই সংগ্রামের বিভিন্ন রূপ।
২০২৩ সালের ১৫ মার্চ সন্দীপ দত্তের প্রস্থান প্রকৃতপ্রস্তাবে এক অভিভাবকত্বের অবসান। তাঁর সংগ্রহ, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর দায়—সবই আজ আমাদের সামনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লিটল ম্যাগাজিন কি আবার অনাথ হবে? সংরক্ষণের দায় কি আবার অবহেলায় ঢেকে যাবে? এই বিশেষ সংখ্যার মাধ্যমে ‘বিন্দু’ সেই প্রশ্নগুলিকেই সামনে আনতে চায়।
সন্দীপ দত্তকে স্মরণ করা মানে তাঁকে আবেগে বন্দি করা নয়; বরং তাঁর অসম্পূর্ণ কাজের দায় ভাগ করে নেওয়া। লিটল ম্যাগাজিন মানে শুধু ছোট কাগজ নয়—এটি সাহিত্যের বিবেক। সেই বিবেককে জাগ্রত রাখাই আজ আমাদের একমাত্র শ্রদ্ধা।
উল্লেখ্য, বর্তমান সংখ্যাটি আমরা প্রিন্ট সংখ্যায় (বর্ষ ১৮, সংখ্যা ২৭, জানুয়ারি ২০২৪) ক্রোড়পত্ররূপে প্রিন্ট করেছিলাম৷
সাম্য রাইয়ান
সম্পাদক, বিন্দু




মন্তব্য