ফুল, তুমি চিরকাল ভাবরূপী। স্বর্গ কেহ কখন বুঝিল না; স্বর্গ চিরকালই ভাবময়-ভাবের ভাণ্ডার। ফুল, তোমাকেও কেহ কখন জ্ঞানের দ্বারা বুঝিল না। তুমি চিরকালই ভাবময়- ভাবের ভাণ্ডার। ফুল, এমন ভাব নাই যাহ। তোমাতে দেখিতে পাই না। গাম্ভীর্য্য বল, প্রফুল্লতা বল, নম্রতা বল, লজ্জাশীলতা বল, সরলতা বল, উল্লাস বল, শোক বল, বিসাদ বল, বিমর্ষ বল, চপলতা বল, সঙ্কোচ বল, সকলই তোমাতে দেখিতে পাই। দেখিতে পাই বটে, কিন্তু কেমন করিয়া বুঝাইতে হয় তাহা জানি না। কেমন করিয়াই বা বুঝাইব? তোমাতে যখন যে ভাব দেখি, তখনই সেই ভাবে ভোর হইয়া যাই, তখন সমস্ত জগৎ সেই ভাবে ভোর বলিয়া অনুভূত হয়। তবে কেমন করিয়া বুঝাই? আর বুঝাইলেই বা বুঝিবে কে? সকলেই ত আমার মতন তোমার ভাবে ভোর। তুমি ক্ষুদ্র ফুল, তোমার শক্তি অসীম। যেখানে তুমি, সেখানে আর কিছুই থাকিতে পারে না, সেখানে সবই তুমি। ক্ষুদ্র ফুল, তুমি অমোঘ মন্ত্র। তোমার ভাবরূপ নিশ্বাসে সকলই গলিয়া ভাবময় হইয়া যায়। পাথরের পাহাড়ে তুমি হাসিলে পাথরের পাহাড়ও হাসির পাহাড় বলিয়া বোধ হয়। ফুল, তুমিই পৃথিবীর ভাবের ছাঁচ। তুমিই পৃথিবীতে ভাবরূপী মন্ত্র।
আর সেই জন্যই, স্কুল, তুমি সুন্দর ও সৌন্দর্য্য। জগতে সৌন্দর্য্যের ছড়াছড়ি। যে দিকে ফিরি সেই দিকেই সৌন্দর্য্য দেখিতে পাই। উর্দ্ধে চাহিয়া দেখি আকাশ সৌন্দর্য্যময়। আবার আকাশ অপেক্ষা উর্দ্ধতর প্রদেশ, যাহা চক্ষে দেখিতে পাই না, তাহাও ভাবিয়া দেখিলে সৌন্দর্য্যময়, সৌন্দর্য্যের উৎস বলিয়া মনে হয়। এ সৌন্দর্য্যের অর্থ কি? এ সৌন্দর্য্য কিসে হয়? অনেকে ভ্রান্ত হইয়া এই কথার কত ভ্রান্তিমূলক উত্তর দিয়াছেন। কেহ কেহ বলিয়াছেন, যে, বর্ণবিশেষের নাম সৌন্দর্য্য-বর্ণ বিশেষ সৌন্দর্য্যের কারণ বা উপাদান। যাহাতে সে বর্ণ আছে তাহা সুন্দর, যাহাতে সে বর্ণ নাই তাহা সুন্দর নয়। ফুল তোমাকে দেখিলে ত এ কথা সত্য বলিয়া মনে হয় না। তোমাতে কোন্ বর্ণ নাই?-নীল, পীত, হরিৎ, শ্বেত, যত বর্ণ আছে এবং যত রকমের বর্ণের সংযোগ এবং মিশ্রণ হইতে পারে সকলই ত তোমাতে আছে। তবে কেমন করিয়া বলিব যে বর্ণ বিশেষের গুণে সৌন্দর্য্য। আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন যে আকার বিশেষের নাম সৌন্দর্য্য-আকার বিশেষ সৌন্দর্য্যের উপাদান। কিন্তু, ফুল, তোমাকে দেখিলে এ কথাও ত সত্য বলিয়া মনে হয় না। তোমার কোন নির্দিষ্ট আকার নাই, তোমাতে অনেক আকার দেখিয়া থাকি। কিন্তু তোমাকে যে আকারে দেখি তুমি সেই আকারেই সুন্দর। তবে কি, ফুল, তুমি সৌরভের গুণে সুন্দর। তাই বা কেমন করিয়া বলি? কত ফুল ফোটে যাহার সৌরভ নাই, কিন্তু সে ফুলও ত সুন্দর। তাই বলি, ফুল, তুমি কেবল তোমার ভাবের গুণে সুন্দর এবং সৌন্দর্য্য। এবং তুমি, ক্ষুদ্র ফুল, তুমিই জগৎকে এই মহাতত্ত্ব বুঝাইয়া দেও যে স্বর্গে এবং মর্ত্যে যাহা কিছু সুন্দর আছে তাহা কেবল ভাবের গুণেই সুন্দর। একজন ইংরাজ কবি জগদ্বিখ্যাত তাজমহল দেখিয়া বলিয়াছেন—
It is a sigh made stone!
যিনি এ কথা বলিয়াছেন তিনি প্রকৃত সৌন্দর্য্যতত্ত্ব বুঝিয়াছেন। তিনি বুঝিয়াছেন যে সৌন্দর্য্য চোখে দেখা যায় না, কেবল ভাবের ঘোরে দেখিতে পাওয়া যায়। তাই বলি, ভাই সকল, যদি সুন্দর হইতে চাও, যদি জগতের প্রকৃত সৌন্দর্য্য উপভোগ করিতে ইচ্ছুক হও তবে ফুলের কাছে যাইও, ফুল তোমাকে শিখাইয়া দিবে যে সৌন্দর্য্য রূপে নাই, সৌন্দর্য্য গুণে, সৌন্দর্য্য আকারে নাই, গঠনে নাই, রঙে নাই, সৌন্দর্য্য ভাবে। ফুলের কাছে এই শিক্ষা লইয়া ফুলের ভাবে ভরিয়া থাকিও, দেখিবে তোমাদের সুখের সীমা নাই, তোমাদের অদৃষ্টচক্র অনন্ত উন্নতির পথে ঘুরিয়া যাইতেছে।
কিন্তু ফুল, তোমাকে হৃদয়রূপেই দেখি, ভাবরূপেই দেখি, আর সৌন্দর্য্যরূপেই দেখি, তুমি যে কি রহস্থ্য তাহা ত বুঝিয়া উঠিতে পারি না। দেখ যখন সন্ধ্যার মৃছ-মধুর শোভায় আকৃষ্ট হইয়া ঐ দেবালয়সম্মুখস্ত শেফালিকা-মূলে উপবেশন করি, তখন আমার ক্ষুদ্র দেহের সামান্ত সংঘর্ষে রাশি রাশি শেফালিকা বৃস্তুচ্যুত হইয়া চারিদিক্ ছাইয়া ফেলে। অথবা যখন প্রাতঃকালে সঞ্জীবনী সমীরণে উৎফুল্ল হইয়া গৃহ হইতে বহির্গত হই, তখন কেবল মাত্র আমার গমনজনিত বায়ুসঞ্চালনে ঐ প্রাঙ্গণপার্শ্বস্ব কামিনীবৃক্ষ হইতে কত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কামিনী ফুল ঝর ঝর করিয়া খসিয়া পড়ে। এ দিকে ত দেখি, তুমি এমনি কোমল, এমনি অসহিষ্ণু, এমনি ভঙ্গুর যে শুধু যেন একটু নিশ্বাস গায় লাগিলে, ভাঙ্গিয়া চুরিয়া কি এক রকম হইয়া যাও। কিন্তু আবার ঐ দেখ দেখি ওখানে তোমাকে কি ভিন্ন প্রকৃতির দেখিতেছি। ঐ দেখ আজ মহাসমুদ্রে নিদাঘ-ফটিকা উঠিয়াছে। অপরাহ্ন-রবি অদৃশ্য হইয়াছে। আকাশ মেধ-যুদ্ধে সংক্ষুব্ধ। অসংখ্য মেঘখণ্ড ভীমরবে গর্জন করিতে করিতে অনন্ত আকাশে পরস্পরকে তাড়না করিয়া বেড়াইতেছে। এক এক খানা মেঘ ক্রুদ্ধ হইয়া অপর মেঘের প্রতি তীব্র কটাক্ষ নিক্ষেপ করিতেছে, আর অমনি দিগ দিগন্ত ঝলসিয়া উঠিতেছে এবং বিকট শব্দে চমকিয়া পড়িতেছে। সমুদ্রের নীল জল কাল হইয়া উঠিয়াছে। সেই কাল জলে প্রচণ্ড ঝটিকোথিত ভীষণ তরঙ্গ সকল নভোমণ্ডলগ্ন মেঘখণ্ডের জায় পরস্পরকে তাড়না করিতেছে এবং রাগে ফেনা ভাঙ্গিতে ভাঙ্গিতে গর্জন করিয়া চারিদিকে ধাবিত হইতেছে। আকাশে মেঘ-গান, সমুদ্রে তরঙ্গ গর্জন, আকাশ-সমুদ্রে ঝটিকা-গর্জন, আর সেই সমস্ত গর্জনরাশি ভেদ করিয়া ঝটিকা- পক্ষীর উৎকট চীৎকার-যেন এই মহাপ্রলয়ের অন্তরাল হইতে প্রলয়শক্তি প্রলয় তুর্য্য ধ্বনিত করিতেছে। এই মহাপ্রলয়ে পড়িয়া একখানা প্রকাণ্ড অর্ণবযান খণ্ড খণ্ড হইয়া যাইতেছে। বড় বড় মোটা মোটা পাল তরঙ্গাঘাতে ছিঁড়িয়া কুটী কুটী হইয়া যাইতেছে, বড় বড় মাস্তল ভাঙ্গিয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফলকাকারে ভাসিয়া চলিয়াছে। কিন্তু ঐ দেখ একটী ক্ষুদ্র ফুল কোথা হইতে আসিয়া ঐ ঝটিকা-তাড়িত ভীষণ তরঙ্গোপরি অসীম সাহসে ভাসিয়া বেড়াইতেছে, প্রলয়-যন্ত্রণা দেখিয়া ভিজিয়া উঠিয়াছে সত্য, কিন্তু একটাও পাপড়ি খসে নাই, একটা পাপড়িও সরে নাই। ফুল, কে বলে তুমি কোমল? তুমি দৃঢ়তম অপেক্ষা দৃঢ়। কে বলে তুমি অসহিষ্ণু। তুমি সহিষ্ণুতার উচ্চতম আদর্শ। কে বলে তুমি ভয়বুষ্ঠিত। তুমি সাহসের, তুমি বীরত্বের জীবক্ত প্রতিমা! তোমার অপেক্ষা রহস্য এ. জগতে আর কি আছে। তুমি বৈপরীত্যের আধার। এই জন্য মানুষ সমাজের প্রারম্ভ হইতে কোমলহৃদয় কবি এবং সাহস সহিষ্ণুতা এবং শক্তির আদর্শরূপী ধর্মবীর এবং কর্মবীর, উভয়েরই শিরোপরি ফুলের মালা চাপাইয়া কোমলতার এবং বীরত্বের পুরস্কার করিয়া আসিতেছ।
যে মহাপুরুষ এ জগতে পুরস্কৃত হইবার যোগ্য, কেবল তিনিই মাথায় ফুল পরিতে পারেন। অতএব, ভারত সন্তানগণ, যদি তোমরাও মাথায় ফুল পরিতে চাও, তবে দেহ, মন, প্রাণ সংকল্প করিয়া যাহাতে হৃদয়ের কোমলতা- গুণে এবং জগতের কর্মক্ষেত্রে বীরত্বগুণে মনুষ্য সমাজে পুরস্কৃত হইবার যোগ্য হও, সে চেষ্টা কর। প্রার্থনা করিতেছি, তোমাদের চেষ্টা যেন সফল হয়, বীরভূষণ ফুল যেন তোমাদের শিরে শোভা পায়।
▮ফুল ও ফল। ১৮৮৫
ফুলের ভাষা
চন্দ্রনাথ বসু (১৮৪৪-১৯১০)
চন্দ্রনাথ বসু (১৮৪৪-১৯১০)




মন্তব্য