রক্তের মধ্যে এই যে গল্প লেখার চোরা টান— এর উৎস কোথায়? অনেক ভেবে আজ সকালে গল্প-সম্ভাবনা বলে একটা শব্দ আমি তৈরি করেছি। শব্দটা কি এর আগে ব্যবহার করেছেন কেউ? ইংরেজিতে বলা যেতে পারে Possibility of fiction। প্রাত্যহিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই গল্পের বিবিধ সম্ভাবনা— গল্পচিহ্ন— যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে তা কে না জানে এখন! ধরা যাক একটি লোক, খুঁড়িয়ে হাঁটছে, রাস্তায় লোকজন বিশেষ নেই— খানিক এগোতেই সে দেখল রাস্তার ঠিক মাঝখানটায় একটা খয়াটে পাথর পড়ে আছে। এখন সেই খুঁড়িয়ে চলা লোকটা স্থাণু ও নিঃস্ব পাথরটিকে দেখে যদি থমকে দাঁড়ায়— এটুকুই আমাদের বিবেচ্য। এই হল গল্পের premise। এর পরে গল্পটাকে ঠিক করে নিতে হবে তার নিজের ভবিষ্যৎ— নাড়াচাড়া করে দেখে নিতে হবে নানান গল্প-সম্ভাবনা, কোনদিকে সে অগ্রসর হবে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাকেই, লেখকের এখানে বিশেষ করার কিছু নেই। লেখকের কাজ ওই premise-টুকু নির্মাণ করা। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, গল্প কি একটা conscious entity— যদি না হয়, তাহলে নিজের ভবিষ্যৎ সে কীভাবে নির্ণয় করবে? অচেতন পদার্থকণা যেমন নিয়তিনির্দিষ্ট কক্ষপথ মেনে আবর্তিত হয়— গল্পের ক্ষেত্রেও ঘটবে তেমনটাই, এবং পদার্থকণার আবর্তনের আড়ালের মতোই ঠিক এখানেও, অর্থাৎ গল্পের ক্ষেত্রেও, সম্ভাবনা-তত্ত্বের একটা জরুরি ভূমিকা থেকে যাবে। সম্ভাবনা ও সংশয়ের মধ্যে দিয়েই চিহ্নিত হবে গল্পের গতি ও পরিণাম। যেমন খুঁড়িয়ে চলা লোকটা এবারে কী করবে? পাশ কাটিয়ে চলে যাবে পাথরটিকে? কোন দিক দিয়ে— ডান না বাঁ? নাকি টপকে যাবে পাথরটিকে? টপকে যেতে তার সমস্যা হবে না— যদি খোঁড়া পায়ে ভর বেশি দিতে হয়? নাকি সে দু-এক মুহূর্ত অপেক্ষা করবে? ভাববে— সংশয়গ্রস্ত দেখাবে তার মুখ? দ্বিধা ও সংশয়ের তরল কালো ছায়া তার মুখে তিরতির করে কাঁপবে! এইখানে আরও একটি logical constraint আরোপ করা যাক। ধরা যাক লোকটি বাঁ পায়ে খোঁড়াচ্ছিল— এবং বাঁ পা-টি তার আহত নয়, ব্যাধিগ্রস্ত, ওটি কাজই করে না, টেনে-ঘষটে নিয়ে যেতে হয়। তখন ওই পাথরটিকে দেখে কি সে শিউরে উঠতে পারে? কারণ লোকটি চলনশীল ও পাথরটি নিশ্চল হলেও স্থাণুত্বের আতঙ্ক লোকটির মনে মুহূর্তে খেলে যেতে পারে— সে ভাবতেই পারে অন্য পা-টিতে আকস্মিক কোনো চোট লাগলে এখন থেকে সে-ও ওই পাথরটির মতোই বাড়িতে পঙ্গু অনড় ও খয়াটে হয়ে বেঁচে-থাকবে। কিন্তু এই গল্প আমি কেন লিখছি? লোকটিকে তো আমি চিনি না। তাছাড়া, বিশেষত যখন কল্পনা আমার নেই। আমি সর্বাংশে একজন ইম্যাজিনেশনলেস মানুষ— ইম্যাজিনেশনকে আমি ঘৃণা করি। এবং কল্পনা যে আমার নেই তা আমি প্রথম থেকেই জানি— একটা মৃত মাথা নিয়ে জন্মেছিলাম আমি, আস্তাবলে। ওঃ না, আস্তাবলে তো যীশু জন্মেছিলেন— আমি তাহলে কোথায় জন্মেছিলাম? হাসপাতালে? তাই হবে। আলুথালু কালবৈশাখীর ডাকাতে হাওয়ায় ম্যাটার্নিটি ওয়ার্ডের পর্দাগুলো উড়ছে— পর্দাগুলির রং কী ছিল? কালো? ম্যাটার্নিটি ওয়ার্ডের পর্দার রং কালো হয়? ধরে নেওয়া যাক কালো— এবং ঘরের বাল্বগুলি হলুদ। সাদা ইয়ুনিফর্মে ঘুরছে যতেক নার্স। কালো হলুদ ও সাদার অত্যাশ্চর্য বিন্যাসের মধ্যে আমি জন্মাচ্ছি— সারা দেহ রুধিরাক্ত, লাল। যেন সেজানের ছবি। জন্মমুহূর্তের কথা ভাবি— ভাবতে ভালো লাগে; বস্তুত আমি কখনও ম্যাটার্নিটি ওয়ার্ড দেখিনি। এ কিন্তু কল্পনা নয়, নিছকই চিন্তা— কল্পনা আমার নেই। গল্প লিখতে যদি কল্পনার দরকার হয়, তাহলে আমি গল্পকার নই। কিন্তু তা-ও আমি একটা গল্প লিখবো— কল্পনা দিয়ে নয়, কেবলই আমার যৌন-অতৃপ্তি দিয়ে। যৌন-অতৃপ্তি দিয়ে একটা গোটা গল্প লেখা যায় (একটি সংশয়— বাঁক: গল্প-সম্ভাবনা)? অন্তত আমি বিশ্বাস করি যায়। যেমন এভাবে একটি গল্প শুরু হতেই পারে। একটু পরে আমি সুমিতার কাছে ফিরে যাবো— সুমিতাকে ব্যবহার করার জন্যেই। তারপর? সুমিতা আর বড়ো জোর কয়েক মাস আমার সঙ্গে থাকবে; তারপর আমায় দু-একটি খিস্তি করে— সম্ভবত ইংরেজিতে— আমার মুখের ওপর দিয়েই তন্বী শরীর নিয়ে ফণা-তোলা সাপের ভঙ্গিমায় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে ও। এবারে ঢুকে যাবো গল্পের মধ্যে পুরোদস্তুর। কেন ছেড়ে যাবে সুমিতা আমায় (এখানে আরও একটি গল্প-সম্ভাবনা)? তার কারণ, এখন না হলেও, কয়েক মাসের মধ্যে ও ঠিকই বুঝতে পারবে আমার কাছে ও শেষপর্যন্ত পাবে না কিছুই। এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে, কী চেয়েছিল সুমিতা আমার কাছ থেকে (এই প্রশ্নগুলিই তো গল্পের অক্ষ ও দ্রাঘিমা)? সম্মান সম্ভবত— যা সব মেয়েই চেয়ে থাকে। মন শরীর ও ব্যক্তিত্বের প্রতি সংশয়াতীত সম্মান— যা আমি দিতে পারিনি। সুমিতাকে আমি ব্যবহার করতে পারি খালি— তার বেশি কিছু করাই আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কামার্ত হয়ে সুমিতার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াও অসম্ভব আমার পক্ষে— সুমিতা কেন, কারুর ওপরেই সম্ভব নয়। অথচ আমার সুমিতাকে দরকার— যৌন-ভাবেই দরকার। শরীরের স্তরে-স্তরে, রক্তের বীজে-বীজে, যে যৌন-অস্বস্তি, অসহায়তার যে আর্ত ঘোষণা, যে অসতর্ক কান্না— সুমিতা না-থাকলে তা ক্ষয় করবে কে? আ-শরীর যদি চোরা ঘূর্ণি ছোট ছোট সাপের মতো পাকিয়ে ওঠে, সেই মুহূর্তে আমায় সামলাবে কে? সুমিতাই তো। সে-ই তো তার শরীর দিয়ে, যৌনস্থান দিয়ে, ত্বকের ঘর্ষণ দিয়ে, ঠান্ডা করবে আমায়। তাই আমার সুমিতাকে দরকার। তাহলে কেন আমি সুমিতাকে মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছি না? কয়েকটি সম্মানের মিথ্যে চিহ্নক তো আমি তার দিকে ছুঁড়ে দিতেই পারি, তাতে তো আমারই লাভ। ভণ্ড শ্রদ্ধায় আমি তার শরীর ও ব্যক্তিত্বের সামনে মাথা হেঁট করি যদি— যদি আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিই তাকে সে কী জরুরি ও মহার্ঘ আমার কাছে— তাহলে তো এই নিয়মমাফিক যৌনতার সুরক্ষা-ব্যবস্থা, এই ফিক্স-ডিপোসিট, ভেঙে আমায় চলে আসতে হয় না। সুমিতা চলে গেলে আমার শরীর আবার অলক্ষ্যে হয়ে উঠবে শঙ্খচূড়ের বাসা— সময়ে-অসময়ে ছোবলে ছোবলে নীল করে দেবে আমায়: ফলত যে যৌন-প্রিমিয়াম সুমিতা আমায় দিয়ে চলেছে নিয়মিত, ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেই ব্যবস্থা তো আমার বানচাল না করাই উচিত। কিন্তু আমি পারি না। জানি না কেন কিছুতেই পারি না আমি। রক্তের মধ্যে ব্যাধির কোন সূক্ষ্ম বীজ আমায় সুমিতাকে মিথ্যা বলতে দেয় না, ভান করতে দেয় না, সৎ থাকতে বাধ্য করে ওর কাছে। সকালে ভাবি আজ রাতে নানান সামাজিক কেতাবি কথায় সুমিতাকে বুঝিয়ে দেবো কী ভীষণ সম্মান করি ওকে আমি; কিন্তু কাছে গেলেই আমার চোখ বলে দেয় ওকে একটি যন্ত্র-শরীর ছাড়া কিছুই ভাবছি না আমি: কেবলই একটি যন্ত্র— যা নিয়মিত রতি সরবরাহ করে। এমনই সৎ হয়ে উঠি আমি সুমিতার কাছে, যে সম্মান দূরস্থান, আমি ওকে অসম্মানও করতে পারি না। অসম্মানের মধ্যে আদর, লুন্ঠন ও দস্যুতার কিছু অবিমিশ্র চিহ্ন থাকে, যা কখনো-কখনো নারী প্রত্যাশা করে তার ঘনিষ্ঠ পুরুষের কাছ থেকে। সারা পৃথিবী জুড়ে যৌনতার আধুনিক পরিভাষা অত্যাচারের ভাষাকে ক্রমে আইনসম্মতভাবে গ্রাস করে ফেলছে— সারা পৃথিবীই হয়তো একদিন মার্কুই দি সাদের শিষ্য হয়ে উঠবে, এই তৃতীয় বিশ্বও। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই আমি, অত্যাচার ও আদরের তেমন প্রগাঢ় দাগ আমি ওর শরীরে কিছুতেই মুদ্রণ করতে পারি না। পারলে হয়তো তাও ওর মেধাকে না-হোক, মন-কে না-হোক, ব্যক্তিত্ব-কে না হোক, অন্তত শরীর-কে কিছু সম্মান দেখানো যেতো— কিন্তু আমি অপারগ। আমি সুমিতার সম্মতিক্রমেও সুমিতাকে ধর্ষণ করতে পারবো না। সঙ্গমের পরে সুমিতা জবুথবু হয়ে বসে থাকবে একটি জায়গায়— আমি ওকে ঘৃণায় সরেও যেতে বলবো না। ততটুকু বলার মধ্যেও যে ক্লান্তি রয়েছে, তা আমায় অসুস্থ করে ফেলবে। তার চেয়ে বরং এই ভালো— ব্যবহৃত হতে-হতে সুমিতা একদিন ঘৃণায় মুখে থুতু ছিটিয়ে চলে যাবে আমার— আমি অন্ধকারে পঙ্গু শিশুর মতো বসে থাকবো। শঙ্খচূড়ের বাসায় ঢিল পড়বে— ওদের কাছে তৎক্ষণাৎ খবর চলে যাবে যে সুমিতা চলে গেছে, প্রতিরোধের দেওয়াল চূর্ণবিচূর্ণ, এখন ওরা নিঃসংশয়ে আক্রমণ করতে পারে আমায়, এখন আমি বর্মহীন, আমার দুর্গ ধ্বসে গেছে, শিরস্ত্রাণ দ্বিখণ্ডিত, সেনাপতির বুক তীরে ঝাঁঝরা। লতাগুল্মময় ওই অন্ধকারে বসে সাপগুলির সঙ্গে কথা বলবো আমি, ছোবল খাবো ওদের— শিখে নেবো সাপেদের ভাষা। কারণ তখন তা-ছাড়া আর কিছুই করার নেই আমার, সময় তো কাটাতে হবে কোনোভাবে। সাপেদের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে খুঁজবো নতুন গল্প-সম্ভাবনা। অন্ধকারের মধ্যে কোথাও ঝলকে উঠবে সূত্র, সংশয়, গল্পের নতুন রক্তাক্ত বীজ।
সুমিতাকে আমি ধর্ষণ করতে পারবো না
সৌমাল্য মুখোপাধ্যায়
সৌমাল্য মুখোপাধ্যায়




মন্তব্য