কাব্যহন্তারক
এই মুহূর্তে কিছু কাব্যহন্তারক দিন-রাত উপশব্দে সম্মোহিত হয়ে ঘুরছে জলগদ্যের শরীরে। আর তাদের উপলব্ধি থেকে ঝরছে একাধিক নির্বিকার তরল জিরাফের আত্মশ্লাঘা। যেখানে রয়েছে আমাদের ফেরার দরজা, অনুল্লসিত হেমন্তক্লান্ত পাখিরা দাঁড়িয়েছে সেখানেই। পিয়ানোবাদক রাত এক, তার ভিতরে অজস্র ভুষিমাল সঞ্চয় করেছে এক-একটি প্রাজ্ঞগোলাপ। বাগানকেন্দ্রে তাই এতো রঞ্জনশিলার কুণ্ডলিত ধোঁয়ার নাচ। একমাত্র হাত বাড়িয়ে যেই ধরতে চাই, এইসব চরিত্রশক্তি, তামাশাভরা সেই অক্ষম বন্ধুর চাতুর্য মনে পড়ে যায়; হয়তো এই ছিল মুহূর্তের নিশীথরক্তে, স্বর্ণকাগজের ত্রিপলে গাঁথা সময়ের প্রকৃত ঠাট্টালিপি!
অসমাপ্ত পংক্তিগুলো
কোনো সূর্যমুখী বনে বিকেলের আমিষাশী আলো যখন অভিজ্ঞ সেই কুষ্ঠরোগীর মত এই নগরীতেও নেমে আসে; সম্পাদিত জল তখন ক্যাম্পের পাশে কালো রেখার ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। তখন তোমার মাছিগুলো সংশয়বাক্যে জ্যোৎস্নায় আমার কথা বলে। আমি মৃত্যুর নিজস্ব এক বিমূর্ত পংক্তি— ক্রমাগত নিষ্পেষিত নীলাকাশে শ্বেত আনন্দের নক্ষত্র খুঁজেছি। এনেছি মৃদু-মন্থর ঘণ্টা, বাজাও এইবার— পয়ারের মতো কিছু মানুষ দেখো ঐ দু-পয়সার ঘরে। মুখোমুখি যত অশ্বক্ষত দেখেছি, তর্কপ্রধান রাতে তারাও একটি করে নকল ইগলপাখি হয়ে উড়ছে সেই সূর্যমুখী বনে। আজ ঝলসানো শ্বাস সন্ধ্যাব্রিজে বসে থাকা বালিকার মনেও চিরুনি দাঁত বসিয়ে দেয়। কুয়াশাপদ্মের সেই পর্বতের বুকে তাকে খুঁজে পাই, স্তব্ধ তুষারের মতো দুজনে অসমাপ্ত ঘুমে হারিয়ে যাই।
প্রাক্-পুরাণ ও বর্তমান
কী আছে ওখানে, স্মৃতিকূট শান্ত প্রস্তর লিখন ছাড়া!
নষ্ট বাইসনের মতো অগ্নিবেদ, দেখ, আমাদের টেনে
নিয়ে যায় আদি জীবনের কাছে, খুলে দেখায় শস্ত্র...
সেইসব শূন্য গুহা, নয়নাভিরাম তার প্রত্নচিত্রেরা;
খুলে পড়ছে টোটেম মাংস, সবখানে, প্রাক-ইতিহাসে।
ও আমার অন্তঃপুরুষ, এই সময় কী সরীসৃপের নয়?
বরফে ঢাকা উদ্যান আজ অভিধানহীন— ভাসমান
মাছের কাছে আমরা কেন খেচরের মতো বসে থাকি!
ভাবনাবিন্দু
ভাবনাবিন্দুর দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখি সহজ-সরল
ঘাসে মোড়ানো চিঠিটি এখনো পড়ে রয়েছে পথে।
বহুজন এসেছিল, আর কতজন যে ফিরে গেছে
সেই পথে? ডোরাকাটা বাঘ হল শিকারসম্ভবনাময়ী!
চিঠি শিকার করেনি সে কোনোদিন। শক্তি-সামর্থ
যাই থাকুক, ক্ষমতা কিংবা ক্ষয়, মায়ানৌকা নিয়ে
ছোট ছোট শিশু নদীতে আয়োজন করে ভোজন।
সেখানে মিলিত হয় আকাশের শ্রেষ্ঠতম নক্ষত্রছবি।
গাছেরা যেমন ঝড়ে ভীত, ঘোড়ার পশমে উষ্ণ সেই
চিঠিও, রক্তিম ঝড়ে উড়ে যেতে চায় না নতুন ঠিকানায়।
হাতের এক-একটি করতালি এখনো এগিয়ে আসে—
জাহাজবাক্য ক্রমশ ডুবে যায়, এমন-কি আরও
ইঁদুর শূদ্রের কালো দিন, প্রলাপগুল্মের ঝ’রে পড়া—
যত আহত হয়েছি প্রেমে, তত প্রবল নয় এই আঁধার
রমণরাক্ষসী কৌতুক
প্রতীকী সেই ঘুম যখন ভেঙে যাবে, রাত্রির ক্ষতবাক্যগুলি ক্রমে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে রম্যগোধূলির মতো হৃদয়পল্লবে; আত্মিক বায়ু-কলরবহীন সেই শব্দপ্রতিমা তখন উষ্ণ বাগানে; গোলাপ তস্করের চোখের ভেতর আমাদের অশ্বকেশী আগুনসঙ্গম। কিন্তু এই লৌহলঘু মহূর্ত, যাকে বৈষ্ণবীয় ছাঁয়াতলে এসেও বাঘিনীর বাষ্পীয় ধূলিসোনা ভাবি; কেনই-বা ভাবি, এই তুচ্ছ চিহ্নপরম বাকবিভূতি; আমি তো নীরবতার সেই পাথরগাছ, খ'সে পড়া পালকের জমজ শব। এখন দু-একটা রমণরাক্ষুসী কৌতুক লিখি; আরাধ্য শুধু ওই দৈবলেখকের মতো, যার সম্পর্কে আমি আজও দ্বিমত! দ্বিমত ওই মৃতপাতাদের বক্তৃতারও। ভুতুড়ে মাঠে তাই গাধাখেলাচ্ছলে সেদিন দেখেছি অনেক সমাধিকন্যার কটাক্ষ। তাই যারা গণক, কাল মার্ক্সের অরণ্যে ঝিমায়, উৎকৃষ্ট রসিকতা জানে না, ওদের পিছনে বিমূর্ত সেগুনপাতার মতো জ্যোতির্ময় খঞ্জন খুঁজতে থাকি। শিবলিঙ্গের পাশে আজো কাকে অনুকরণ করে দাঁড়িয়ে আছি? কাকে আর আপেলহত্যার হেমন্তশোচনা শোনাই? হে পিত্তসবুজ তরুণ, হে জেব্রালিখনকার, তোমার হাসি-হাসি মুখে কেন আজ চন্দ্রবিভীষিকা! বৌমাছের সেই সরোবর শয্যার কথা উপদ্রুত ভুলে গেলে কি করে? এখন শুভ্রকেশ মাথায় এক চিরতরুণ— হরিণ তবু কলহমুগ্ধ; রক্তপ্রশ্ন নিয়ে তাই চলেছি এবার মহানিসর্গের কোনো এক মার্গসংগীত সভাঘরে।
রমণরাক্ষসী কৌতুক ও অন্যান্য কবিতা
শামসুদ্দিন শিপন
শামসুদ্দিন শিপন




মন্তব্য