বুঝলে অনিবেন্দ্র, নিজে নিজেই প্রেমে পড়লাম, আর দেউলিয়াও হলাম নিজে নিজেই। প্রেমিক বুঝলো অথচ বুঝতে দিলো না কিছুতেই। এ প্রেমে সাথী হয়েছে ধূ ধূ মাঠ, একলা দুপুর -খাঁ খাঁ রোদে জড়সড়, চোখে নীল সমুদ্রের পিপাসা।
আমার প্রেমে কেন যে জীবনানন্দ আসলেন না! তার ধানসিঁড়ি নদী, ছায়াঘন বট, হিজল, অশ্বত্থ, টুকটুকে শিমূল, পলাশেরও জায়গা হলো না। শঙ্খচিল, শালিখ আমার আকাশে উড়ে বেড়াইনি। আমার প্রেম নিয়ে জসীমউদ্দীন নকশিকাঁথা আর বোনেননি। চোখের কোনে নিষ্কলুষ ভোরের মতো এত প্রেম, অথচ তোমার প্রেমিকা হতে পারলাম কই? তাই বুঝি রবির বলাকার পথ চিনে নিতে পারিনি। তোমার সেই প্রিয়তমা, কি যেন নাম - পার্বতী, সে বুঝি তোমায় খুব ভালোবাসে? খুব .. খুব তাই না! সারাক্ষণ চোখে হারায়! তুমিও বুঝি... না না শুধু তুমি নও, আমিও তো তার বটের ঝুড়ির মতো লম্বা বেণী, পটল চেরা হরিণীর চোখ, কমলালেবুর কোয়ার মতো ঠোঁট আর গোধূলি বরণ গায়ের রঙে মুগ্ধ। সে বুঝি তোমায় প্রতি প্রভাতে কচি কলাপাতা রঙের ভোর পাঠায়? নির্জন একাকী মধ্যাহ্নে ব্যস্তমুখর হাওয়া পাঠায় - যে তোমায় দোলা দিয়ে একাকীত্ব ভেঙে চুরমার করে দেয়। সূর্য যখন তাল গাছের পাতার আড়ালে নিজেকে গুম করতে চায়, তখন সে বুঝি গোলাপী খামে নরম হাতে কিছু সূর্যাস্ত পাঠায়? আমি যে বড্ড বোকাসোকা, ভালবাসতে হলে এত কিছু যে রপ্ত করা আবশ্যক, সেটা আজ পর্যন্ত বুঝে ওঠা হলো না।
সেজো মামী ডুমুর গাছের তলে বসে থাকতে দেখে, আমাকে কতবার যে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে পড়তে বলেছেন - যিনি বারবার অবিশ্বাসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তাকে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে চেয়েছেন। তবু তাকে আমি পড়ি না, পড়ি না জীবনানন্দ, শক্তি, সুনীলকেও। তবে ক্লান্ত ঘড়ির কাঁটায় যখন বুকের এখানে সেখানে কাঁটা ফোটে তখন জয় গোস্বামীকে পড়ি, তার বেণীমাধবকে পড়ি। অনিবেন্দ্র তোমার বুঝি জয়কে এক্কেবারে পছন্দ নয়? নইলে অন্তত জয়ের হাত ধরেই আমার ধূ ধূ মাঠে বৃষ্টি হতো, পথ পিছল হতো, ওই মরা নদীটিও ধানসিঁড়ি হয়ে উঠতো। ঘুঙুর পায়ে কিশোরী, গায়ের বধূ কলসী কাঁখে জল নিতে এসে শান বাঁধানো ঘাটে শতশত কথার মেলা বসাতো। নির্জন দুপুরে কোনো এক যুগল এসে জলে পা ডুবিয়ে প্রেম প্রণয়ের... ইসস...
অন্তত জয়ের হাত ধরেই হয়তো তোমার প্রিয়তমা হয়ে উঠতাম, মরুভূমিতে মরীচিকার সৃষ্টি হতো…
এখন দিন যায় শুধুই তোমার ঘ্রাণে ও কাঁটায়...
দেউলিয়া
প্রতিমা পাল
প্রতিমা পাল




মন্তব্য