এই প্রশ্ন করতে চাই ‘বিলোল’ ভিড়ের মতো এত কবিদের। যারা তিরিশ বছর আগে বা তার আশেপাশে সময় অবধি লিখতে এসেছিলেন তাদেরকে এই আলোচনায় টানছি না, কারণ তখন সমাজ ও তার সত্য ভিন্ন ছিল অনেকটাই। কিন্তু তারপর মানে ওয়াইটুকে নামক ঝড়— যা মূলত উদার অর্থনীতি, গ্লোবালাইজেশন ও ব্যাপক প্রযুক্তি বিপ্লবের এক দুর্দান্ত মিশেল হয়ে আছড়ে পড়ল আমাদের অতিসাধারণ রান্নাঘর অবধি; তারপর তো সবকিছু ঘেঁটে গেছে; এর আগের সময়ের কোনো স্বতঃসিদ্ধই আর এখন টিকছে না। আর এই মহাসময়ের মধ্যে দলবাজি, ছকবাজি, আন্দোলন, বামপন্থা, অতিবামপন্থা, অতিতীব্রবামপন্থা, একা একা চলার স্টান্টবাজি, চালাকি, অতিচালাকি এইসব যাবতীয় প্রকল্পের শেষে আমাদের মুখে লেগে আছে সারাবিশ্বের একগাদা তথ্যের থুথু আর ওপেন সোর্সে ফ্রিতে হাজারো মহাপুরুষদের রচনা সংগ্রহ, যেখানে কপিরাইট আইনের মারপ্যাঁচ প্রায় নেই কারণ তাঁদের মৃত্যুর ষাট বছর হয়ে গেছে!
প্রশ্নটা হল— আপনি লিখছেন কেন? অমরত্ব বা খ্যাতির ব্যাপারটাকে একটু দূরে রেখে এই প্রশ্ন কারণ যখন আপনি লিখেছেন আর সেটা মুদ্রিত হয়েছে আপনার নামে, অর্থাৎ একটা মালিকানার ব্যাপার ও বাজারের সম্পর্ক এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, যেখান থেকে আপনি নয়া পয়সাও পাবেন না বা পেলেও তাই দিয়ে উনুন গরম হবে না, সেখানে খ্যাতির প্রত্যাশাকে অস্বীকার করা অশ্লীল। তাই এই স্বতঃসিদ্ধটুকু এই আলোচনায় থাক। প্রশ্নটা আরো নির্দিষ্ট করে বললে, এই দাঁড়ায় যে একজন কবি সে যাই লিখুক না কেন তার ইন্টিগ্রিটির জায়গাটা কি, যেখান থেকে সে লেখাটাকে একটা কাজ হিসেবে গ্রহণ করছে, যখন এরকম কোনো ইতিহাস নেই আজ অবধি যে শুধুমাত্র কবিতা লিখে কেউ ধনী হয়েছেন বা অন্যকোনো বস্তুসুখ পেয়েছেন?
এই প্রশ্ন অতিপ্রাকৃত, অতিপ্রাচীন এবং অতিব্যবহারে হয়তো প্যাতপ্যাতে ন্যাকাগোছের, কিন্তু সাপের কাছেই তো বিষ থাকে, তাই মেরুদণ্ড নেই বলে কাউকে হেয় করা আর এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া একই ব্যাপার। তারচেয়ে আসুন ব্যাপারটা নিয়ে আরেকটু রসিয়ে কথা বলা যাক।
একজন 'কবি' অন্য এক 'কবি'কে কোনো এক জায়গায় কবিতা পড়তে ডাকছে কারণ এই নিমন্ত্রিত 'কবি'র সঙ্গে অনেক তরুণ কবির যোগাযোগ এবং আরো কিছু চ্যানেল ট্যানেলের ব্যাপার আছে— এইসব মহাজাগতিক ব্যাপার পৃথিবীতে হয়তো অগুণতি বার হয়েছে বা হবে কিন্তু তার সঙ্গেই যারা এইসব ঘটনার সাক্ষী থাকবে তারা যদি শিল্পী হন তাহলে তাদের এই ঘটনাকে নিজের নিজের মতো করে এনকাউন্টার করতে হবে এমন একটা আইডিয়ালিস্ট জায়গায় আমার অবস্থান। অতি ব্যক্তিগত ব্যাপার। ইদানিং এরকম একটা ঘটনার সাক্ষী হলাম আর সেখান থেকেই এই প্রশ্ন বা লেখা। আমি বরাবর পরিকল্পনানির্ভর মানুষ, মুহূর্তের খারাপ লাগাকে মুহূর্তে প্রকাশ করার মধ্যে কোনো লাভ আছে বলে মনে করি না, বরং বিষয়টাকে সুচিন্তিত উপায়ে কাটাছেঁড়া করে তার সঙ্গে জুঝতে চেষ্টা করি। একদম নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া। কারণ এই কাজ তো একবার কেউ করল না, এতো বারবার হচ্ছে, তাহলে এর একটা সুদূরপ্রসারী কারণ আছে তাহলে এর বিরোধিতাও সুদূরপ্রসারী উপায়েই হতে হবে। দ্বান্দিকতার থেকে বিরোধিতার সুদূরপ্রসারী উপায় জানা নেই বলেই সেই রাস্তায় এলাম। নিরুপায় অবস্থান।
এখন কথা হচ্ছে কবিতা লিখে হবেটা কি? কারণ লিখে কবির ঘর চলে না আর পড়ে পাঠকের কিছু বোঝার নেই কারণ কবিতায় অনেকদিন ধরে এক কথাই যেন ফিরে ফিরে আসছে অথবা এক আবছা উপস্থাপনার কায়দা চলছে। যেখানে কবিতা আবার বোঝার কী আছে মার্কা বায়বীয় উত্তর চালু আছে।
উত্তর হতে পারে, কবিতা অনুভবের বিষয় বা আমি একদম নতুন কথা লিখছি যা এর আগে কেউই লেখেনি। এরমধ্যে দ্বিতীয় দাবি তখন করা সম্ভব যখন কবি প্রায় পৃথিবীর সব কিছু পড়ে ফেলেছেন, যা এককথায় অসম্ভব আর প্রথম দাবির ক্ষেত্রে বলতেই হয় লেখালিখি একদমই একটি ভাববাদী বিষয় যার আবার শিকড় জড়িয়ে থাকতে হবে বস্তুজগতের পেটে। আপনি চারপাশের ক্যাপিটালিস্ট পৃথিবী দেখেই তো বামপন্থার কল্পনা করবেন আর সেটা করতে পারলেই তো সেটা লিখতে পারবেন, তারপর তার গলদ থেকে আবার কল্পনা আবার লেখা আবার প্রয়োগ। অর্থাৎ সব অনুভবের পেছনেই তো বাস্তব পৃথিবীর পোকা লেগে থাকতে হবে। অর্থাৎ রাজনীতিবিদদের মতো কবির কোনো সুললিত অ্যাজেন্ডা থাকে না ঠিকই কিন্তু কবিকেও অ্যাজেন্ডার মধ্যেই নিমজ্জিত থাকতে হয়, যেখানে সে তার সমসময়কে একটা তেরছা প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে কাটতে থাকে, যে গাছে বসে আছে সেই গাছটাই তাকে কাটতে হয়, তাই কালিদাসকে নিয়ে যাদের হাসার তারা হাসুক কিন্তু কবি জানেন কালিদাস নিরুপায়, সে এক অনিবার্যতার শিকার। এই কনফ্লিক্ট, এই কন্ট্রাডিকশন, এই টানাপোড়েন, এই থিসিস অ্যান্টিথিসিসের চব্য ছাড়া তার কিছু করনীয় নেই।
অর্থাৎ, এই যে ব্যক্তিকবি তার সময়কে দেখে তার অনুভবের কথা লিখছে, তার মধ্যেই আবার কবি যে সামাজিক প্রাণী তার যোগাযোগ রয়েছে কারণ দেখা— এই কাজটাই তাকে জড়িয়ে ফেলছে সবকিছুর সঙ্গে, যা পড়ে যে কবি নয় সেই পাঠক রসগ্রহণ করবে। কিন্তু বাংলায় এইসব নতুন কবিতার পাঠক তো শুধু কবিরাই বা তাদের পরিবার পরিজন বা বন্ধুদের বৃত্ত। অর্থাৎ বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে অমরত্বের আশা করা বৃথা। নিজের স্বতঃসিদ্ধ নিজেই কেটে ফেললাম না কিন্তু, বললাম যে কবি সেই আশা করছেন কিন্তু তার সম্ভাবনা কম বা নেই। কিন্তু তাও লিখতে হচ্ছে কেন? না লিখলে কী হত? খ্যাতিমান হতে পারার তো এখন সহজ অনেক উপায় আছে। তাহলে এমন কম সম্ভাবনার কিছুর প্রতি তার ঝোঁক কেন?
এর একটা উত্তর হতে পারে অনিবার্যতা। অর্থাৎ, বিগত কয়েকশো বছরের মধ্যে লেখা ও পড়া এখন অনেক সহজ একটি কাজ। একটি সামান্য নাচ বা গান বা অভিনয়ের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, লেখালিখি বা কবিতা লেখার ক্ষেত্রে সেইসব কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। যোগ্যতা মাপার কোনো পদ্ধতি নেই। সর্বহারার প্রকৃত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করল যে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা সোশ্যাল মিডিয়া নামক এক অভূতপূর্ব প্রযুক্তিবিপ্লবের মধ্যে যেখানে ক্রেতা বিক্রেতা উপভোক্তা পুরো চক্রটাই ধূসর— গভীর নয়; মোটা দাগের ধূসর, সেই একনায়কতন্ত্রেই প্রকাশের অপার স্বাধীনতায় সবকিছুর যোগানের সঙ্গেই বাড়ল কবির যোগান, কিন্তু প্রয়োজন বাড়ল কি? বাড়ল না। ফলত কবির দাম কমল। তাও যোগান বাড়ল কারণ কবি হয় অমর হতে পারার বাকি বিদ্যাগুলি জানে না কিন্তু সাধ আছে অথবা এই কাজটা কবি তার মূল পেশার সঙ্গে খুব সহজেই করতে পারে, খুব বেশি কন্ট্রাডিকশন নেই। কবিতা লিখে যে কবির ঘর চলে না সেকথা বারবার মনে করাচ্ছি না।
কিন্তু বোধহয় একটা মারাত্মক ভুল সে করে ফেলল, যেহেতু কবিতা তথাকথিত পারফরমিং আর্ট নয় ফলত লেখা হয়ে যাওয়ার পর পাড়ার বিষ্টুর কবিতা আর বিনয় মজুমদারের কবিতা দু্ই-ই পাশাপাশি রয়ে গেল এবং বিচারের নিক্তিতে আপনাকে অন্য যে কোনো আর্ট ফর্মের থেকে অনেক বেশি পূর্বপুরুষ শিল্পীদের সঙ্গে লড়াই করতে হয় কারণ এখানে গ্রাহকদের মনে তাদের পারফরম্যান্সের স্মৃতির স্বাভাবিক ক্ষয়ে যাওয়া আপনার পক্ষে নেই। যখন আপনার কবিতা ও জীবনানন্দের কবিতা পরপর কেউ পড়ল, তখন দুটোই তার কাছে জীবন্ত। এক্ষুনি ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনা ছাড়া কিছুই নয়।
সুতরাং আদতে যেটা করে ফেলা প্রযুক্তিগত কারণে সহজ মনে হচ্ছিল সেটা ঠিকঠাক করা কতটা কঠিন সেটা বোঝা যাচ্ছে আশাকরি আর ঠিক একইভাবে আবার এই কারণে অমরত্বের প্রত্যাশা কী আজগুবি বোঝা যাচ্ছে আশাকরি।
কিন্তু খ্যাতির সুযোগ বা সমাজের কেষ্টবিষ্টু হতে পারার চান্স বা টিভি রেডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে এলিট হতে পারার সম্ভাবনা সেটা তো অস্বীকার করার কিছু নেই। কতলোকেই তো হচ্ছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত নিজেকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে শ্লাঘা অনুভব করছেন, প্রধানমন্ত্রী বা আরো অনেকেই এই 'সহজ' কাজের মধ্যেই নিজেকে 'সাংস্কৃতিকমনস্ক' হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছেন। অর্থাৎ, এখনও ‘কবিতা’ এই প্রায় অবসোলিট শিল্পমাধ্যমটার দাম আছে, যেমন সোনার বা প্ল্যাটিনামের দাম থাকে আর কী! তো সেই খ্যাতির কাছে যেতে গেলে আপনাকে হয়তো যার সোর্স বেশি তার পিঠ চুলকাতে হবে এইভাবে আপনার সোর্স বেশি হলে সে আপনার পিঠ চুলকাবে এও একপর্যায়ে থিসিস অ্যান্টিথিসিসের চব্য। কিন্তু আপনি খেয়াল করবেন না কালসর্প প্রশ্ন— আপনি লিখছেন কেন? আপনার জন্য সবসময় অপেক্ষা করবে। তার বিষ ভয়ঙ্কর। মেরুদণ্ডহীন। অব্যর্থ। তার অভিমুখ লেখার দিকে, শুধুমাত্র লেখার দিকে।
এখন এইদিকে যেতে যেতে যখন কবির পক্ষে কারণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল তখন তাকে বলতেই হয় এটা একদম একটা সিনিক ব্যাপার। এবার হয়তো আমাদের বিষয়টা অনেকটাই আধ্যাত্মিক কিছু মনে হবে। কারণ মনের কথা বলে হালকা যদি হতেই হয় সে তো কোনো কাছের বন্ধুকেই বলা যায় বা একা একাই বলা যায় যদি কবি 'নির্জন' হন। তার জন্য খামোকা এতো বাড়াবাড়ি করে লিখে ছাপিয়ে মহাপুরুষের বাণীর মতো কিছু করার যৌক্তিকতা কী? এর হয়তো উত্তর হবে কবি বা শিল্পীর এই উত্তর আধুনিক সময়ে সে অর্থে ভালো বন্ধু হয় না। সে কার্যত একা। তাই সে সব লিখে রেখে যেতে চায়। লেখা যে একটা প্রযুক্তির বিষয় যা করে কবি এক অনির্বচনীয় আনন্দ পাচ্ছেন তিনি সেই আনন্দকে আরো এক্সটেন্ড করতে চাইছেন ছাপিয়ে।
লিখে মনের ভাব প্রকাশের আনন্দ অবধি বোঝা গেল। কিন্তু ছাপিয়ে মনের ভাব প্রকাশের আনন্দের জায়গাটা একটু ফ্যাকাশে নয় কি? মূলত এখন, যখন আপনি কিছু লিখে আপনার বন্ধুবৃত্তে সেটা খুব সহজেই ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারেন। অর্থাৎ, ভাব প্রকাশ করে ‘কাছের মানুষ’দের পাঠাতে পারেন সহজেই। তখন এই ‘ছাপিয়ে মনের ভাব প্রকাশের আনন্দ’ আসলে শাক দিয়ে যেন মাছ ঢাকা, তাই না? বাঙালি বেড়ালের জাত বাবা, অত সহজে মাছ লোকাতে দেব না। আসুন না, এই ‘ভাব প্রকাশের আনন্দ’কে অন্যদিক দিয়ে অ্যাটাক করি।
মনে করুন, মানে মনে করার কিছু নেই, বরং কল্পনা করুন, যখন গুটেনবার্গ ছাপাখানা আবিষ্কার করেন নি, তখন তো কারি কারি ক্লাসিক লেখা হয়ে গেছে। আমাদের মতো সাধুসন্তের দেশে যেখানে একরকম বিশ্বাস আছে যে ঋষিরা আত্মপ্রচার করতেন না (এরকম কিছু আদৌ আছে কি? আসলে লোকে এটাকে বাজে কাজ বলে তো, তাই ধরে নেওয়া যাক), সেই যুগে কোথায় জঙ্গলে বসে বাল্মিকী ‘রামায়ণ’ লিখছেন সেটা ছড়িয়ে পড়ল কি করে? না-ছাপিয়েই তো ছড়িয়ে পড়ছে। আচ্ছা বাদ দিন সেই মহাকাব্যের অতিপ্রাচীন কালের কথা। স্কুল-কলেজে আপনি যদি একটু দুষ্টু প্রকৃতির ছেলে হন, তাহলে নিশ্চয়ই ‘মহায়ণ’ পড়েছেন বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে। সে বই কি ছাপা হয়েছে কোথাও? হয়নি তো? তাও সে এত বিখ্যাত হল কি করে? মেনে নিচ্ছি ‘মহায়ণ’ সাংসদীয় ভাষার ব্যবহার করেনি একেবারেই। তাকে এই আলোচনায় টেনে আনলে আপনি বলতেই পারেন ‘আব্বুলিশ, এইভাবে খেলব না’। সে যতই পৃথিবীর মহান মহান শিল্প এইসব কিছুর ধার না ধরেই চলেছে, কিন্তু সেটা অন্য আলোচনার বিষয়, তাকে এখানে টেনে এনে, খামোকা জ্ঞান দেব না। বরং নাকে খত দিচ্ছি। ভুল হয়ে গেছে। আসুন না, আমরা উদাহরণটা বদলে দেই, মঙ্গলকাব্যকে উদাহরণ হিসেবে ধরি। সে ছড়িয়ে পড়ল কি করে? অথবা ধরুন আজকের ছাপা বইয়ের জগতেই মমতা ব্যানার্জীর ‘হাম্বা হাম্বা’ বা জয় গোস্বামীর ‘বেনীমাধব’। শেষদুটো উদাহরণ দেখে আপনার অস্বস্তি হচ্ছে বা নানারকম তথ্য ও তত্ত্ব দিয়ে এর মোকাবিলা করার সুযোগ পেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে তো? সেটা হতেই পারে।
দেখুন আমাদের কাছে এখন কতগুলো আলাদা আলাদা রকমের উদাহরণ তো এল, প্রথম বাল্মিকী যার সময়ে ছাপার প্রযুক্তি ছিল না, থাকলে তিনি কি করতেন জানিনা, কিন্তু ধরে নিচ্ছি ছিল না বলে তিনি ছাপান নি, লিখেওছিলেন কিনা মানে তখন লেখালেখির প্রযুক্তিও ছিল কিনা তা নিয়েও নানারকম কানাঘুষো আছে, সেই লোকের লেখা বিখ্যাত হল। গোটাজীবনে কি বাল্মিকী আর কিছু লেখেন নি? কে জানে? দ্বিতীয় হল, ‘মহায়ণ’ যার কাছে ছাপানোর প্রযুক্তি থাকলেও শ্লীলতার প্রশ্নে সে হয়তো ছাপায় নি, তৃতীয় ‘মঙ্গলকাব্য’, ‘হাম্বা হাম্বা’ বা ‘বেনীমাধব’ যারা প্রত্যেকেই ক্ষমতার কল্যাণে একটা প্রচার বা প্রসার পেয়ে খ্যাতি অর্জন করল। শেষ ব্র্যাকেটটা আবার হয়তো আপনার মনে নানারকম অস্বস্তির জন্ম দিচ্ছে। সেটা নিয়েই মনে করে দেখুন যে আসলে প্রথম উদাহরণটা তো আপনি নিজেই ছিলেন, মানে আমাদের সময়ের এত কবিরা যাদের কবিতার পরিচিতি সাধারণের কাছে শূন্য, আপনাকে তো ধরতেই ভুলে গেছিলাম। তাহলে আপনি হলেন চতুর্থ উদাহরণ। আর পঞ্চম উদাহরণ হল, সেই কিছু মানুষ যারা লিখলেও ছাপায় না। বড়োজোড় নিজের কাছের লোকেদের পড়ান। এই পঞ্চপাণ্ডবই কিন্তু মনের ভাব প্রকাশ করে আনন্দ পাচ্ছে। কারণ আমরা একরকম ধরেই নিয়েছি কবিতা লেখার সেটাই কারণ। তাহলে ছাপানোর ব্যাপারটার সঙ্গে ভাব প্রকাশের ব্যাপারটার যে সম্পর্ক সেটা ঠিক নয়। তাই না?
তাহলে ছাপানোর কাজটা কি অনুচিত বা বেল্লেলাপনা? না, সেকথা বলিনি। ছাপানোর আলবৎ দরকার আছে। আজ থেকে অনেক বছর পরে যখন আজকের ইতিহাস লেখা হবে তখন ‘হাম্বা হাম্বা’ বা ‘বেনীমাধব’ পড়ে যেমন আজকের সময়ের ভাষা, ইতিহাস ও অনেককিছু জানা যাবে, তেমন আপনার লেখা পড়েও যাবে। এখন আজকের খ্যাতনামা কবি বা কবিতাগুলো ইতিহাসে তো স্থান করে নিচ্ছে, নিজের নিজের মতো করে, কিন্তু আপনারটা? ইতিহাসের তো মজাটাই এখানে, কোথা দিয়ে যে কি বের করে আনবে আর কি করতে পারবে না কেউ জানে না। আর আপনি যখন লিখছেন বা লেখার চেষ্টা করছেন বা পড়ছেন, আপনি এই যে শিল্পমাধ্যমটা তাকে বাঁচিয়ে রাখছেন আর বিবর্তনকে লালন করছেন। সুতরাং আপনি হ্যালা ফ্যালা নয়। শুধু মঞ্চে উঠে কবিতা পড়ে, হাসিমুখে ফেসবুকে ছবি দিয়ে বা কটা বই ছাপানোটাই আপনার পরিচয় নয়। তার চেয়ে ঢেড় বেশি। তাই আপনার জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জরুরি, কারণ তাই আপনার মননকে গড়ে নিচ্ছে অজান্তে, আর সেটা সৎ ভাবে প্রকাশ করাই সাহিত্য। আপনি অটো ভাড়া কম দিয়ে, নিজের মাইনেটা বুঝে নিয়ে, যতই সাম্যবাদের কবিতা লিখুন, হবে না। কারোর হয়নি। শিল্পের বিশেষত্বটাই ওইখানে। তার থেকে শিল্পী কোনোদিন বড়ো হতে পারে নি।
তাই শুধু লেখার আগে নয়, জীবনে প্রতিটা সিদ্ধান্তের আগে সেই বোকা বোকা প্রশ্নটা করুন নিজেকে, “আপনি লিখছেন কেন?”, কারণ এটা শুধু প্রশ্ন নয়, আপনার পথ প্রদর্শক। অন্ধের যষ্ঠি। এরপরেও যদি আপনি অমর বা বিখ্যাত না-হন দেখবেন খুব ক্ষতি হচ্ছে না কিছু। যদি তাও মনে হয় যে ক্ষতি হচ্ছে, তাহলে জিজ্ঞেস করুন আবার নিজেকে, “আপনি লিখছেন কেন?”, মনে রাখবেন এর থেকে আপনার নিস্তার নেই, যদি সত্যিই লেখালেখিটাকে আপনি ‘কাজ’ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন।
ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন
সুরজিৎ পোদ্দার
সুরজিৎ পোদ্দার




মন্তব্য