আত্মার একটা অংশ চলে গেলো, ঠিক এমনটাই ভাবি কচি ভাইকে নিয়ে। বিশেষ ক’রে প্রকাশনা নিয়ে ওনার সাথে কতো রকমের যে কথা চলতো, দিনের পর দিন। ‘চাঁদের ক্যামেরা’ পাঠানোর পর কবিতাগুলো পড়ে তাঁর আন্তরিক পাঠপ্রতিক্রিয়া জানালেন। বইটিতে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা উল্লেখ আছে। আমাদের সময়ের এক নক্ষত্রের পতন। পতন নয়, উনি জ্বলজ্বলে তারা হয়েই জ্বলছেন, আমাদের হৃদয়ের আকাশে।
একবার এভাবেই বলেছিলাম, দেখেন কচি ভাই, আমাদের এখানে দু’ধরনের সাহিত্যিক আছে, এক স্বল্প জানা, আরেক জ্ঞানী। কচি ভাই জ্ঞানী। নিরলস জ্ঞানী। ওনার সাথে কথা বলতে আনন্দ পেতাম। মনটা ভরে উঠতো। একটা উজ্জীবনী শক্তি কাজ করতো। অনেক বড়ো ক্ষতি হয়ে গেলো। কচি ভাই, আপনার জন্য ভালোবাসা। প্রেম না হ’তে হ’তেই আপনি চলে গেলেন!
শামসুল কবীর থেকে হয়ে গেলেন ইচক দুয়েন্দে। ডাক নাম কচি। তাকে উল্টিয়ে করলেন ইচক। আর দুয়েন্দে’র ভাবার্থ তো আমরা কমবেশি জানি।
কচি ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় আজ থেকে প্রায় ৩৮ বছর আগে। বন্ধুরা মিলে পেঁচা পত্রিকা বের করতেন। পেঁচা নামে প্রকাশনাটি তাঁরই হাতে গড়া।
উনি এবং ওনার কাছের বন্ধুরা যে আড্ডাটা পিজি’র পেছনে দিতেন, ওখানে কচি ভাইয়ের সাথে আমার বসা হয় নি কখনো। ক্ষীণভাবে মনে পড়ে সেই যে উদাত্ত গলায় গান ধরতেন, তা কি শুনেছিলাম? তাও আবছাভাবে মনে পড়ছে। তবে অনেক বছর পরে যখন বন্ধুরা কয়েকজন মিলে মালিবাগের একটা ভাড়া বাসায় থাকতেন সেখানে এক সকালে আমাদের গ্রীনরোড-এর বাসা থেকে শাহেদ শাফায়েত-এর সাথে রিক্সাযোগে হাজির হই। সেই সময়টায় উনি ব্রাকের প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করতেন। কিংবা ব্রাকের কাজ চুকিয়ে ততদিনে নিজেকে ঘরবন্দী করে ফেলেছেন?
তবে ‘সখাবাবা’ গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার পরই শামসুল কবীর ওরফে ইচক দুয়েন্দের বাংলা কথাসাহিত্যে একটা স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি হয়। আমার মনে আছে আমাদের প্রিয় কথা সাহিত্যিক সেলিম মোরশেদ, সেলিম ভাই একদিন নাইজি ভাবির হাতে আমার কাছে বুকলেট আকৃতির একটা বই পাঠালেন নাম ‘সখাবাবা’, লেখক শামসুল কবীর। বইটি একটি মাত্র গল্প দিয়ে প্রকাশিত হওয়ার কারণে ক্ষীণকায় ছিলো। যতদূর মনে পড়ছে, প্রচ্ছদটি এক কালারের ছিলো, কালো। বড় করে ‘সখাবাবা’ শিরোনামটি লেখা। আর ইনারে যে কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে প্রচ্ছদের কাগজও এক-ই ছিলো।
৯৪ কি ৯৫ সালের পর ওনার সাথে আর দেখা হয় নি। শুনলাম তার নিজ শহর রাজশাহীতে স্থায়ী ভাবে চলে গেছেন। হঠাৎ দু’একবার, প্রায় বিশ বছর পর যখন ঢাকায় বই মেলায় এলেন তখন দেখা হয়েছিলো। সেই সুস্বাস্থের অধিকারী কচি তখন ডাইবেটিসের প্রকোপে একদম ক্ষীণ স্বাস্থের মানুষ হয়ে গেলেন। বয়স হয়ে যাওয়ার পরও কিছু কিছু মানুষের চেহারায় যেরকম শিশুর মুখের আদল ও ছাপ থেকে যায় কচি ভাইয়ের মুখমন্ডল জুড়ে সেরকম একটা ছাপ সবসময়ই লেগে থাকতো। আর কথা বলার ধরনটা তাঁর গল্পের সিনট্যাক্স-এর মতোই ছোট ছোট!
তবে ছোট গল্প আর উপন্যাস লেখার পাশাপাশি কচি ভাই যে কবিতা লিখেন সেটা অনেক পরে জানলাম, যখন শিরদাঁড়া’র জন্য লেখা চাইতে গিয়ে উনি কবিতা ছাপাতে দিলেন।
কবিতার যে ধারাকে আমরা ননসেন্স বলে থাকি, আবার ফেয়ারি টেইলস ঘরাণার, অনেকটা সেই ধারার-ই কবিতা এটি। শিরদাঁড়ার ফেব্রুয়ারি ২০১১, সংখ্যা ৯, বর্ষ ১১ সংখ্যাটিতে শামসুল কবীর ওরফে ইচক দুয়েন্দের নিভিয়া অরিন্দুয়েলাকে কবিতাটি ছাপা হয়েছিলো। আমরা যারা ইচক দুয়েন্দেকে কথাসাহিত্যিক হিসেবে জানি তার কবি সত্তাটি অনেকটা অগোচরেই থেকে গেছে।
ইচক দুয়েন্দে (১৯৬০ - ২০২৬)নিভিয়া অরিন্দুয়েলাকে নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ১অর্থাৎতুমি সত্যিই সুন্দরতুমি সত্যিই মধুরতুমি চিকতমতুমি কিচি মিচচিংচা চাহরা ডকা।২স্বপ্নে তার দুটি পিনোকিও পুতুলহয়ে যায় আস্ত জ্যান্ত শিশুহাবুডুবু চৌবাচ্চায়কেঁচামেঁচি চেচাঁমেচিযেতে চায় ইস্কুলে হাম্বুগম্বু পড়াজেগে উঠে স্বপ্নতন্বি মাতাকী এক আনন্দে দিশেহারা।৩একট ছেলে গাছপালা পুষতঅন্ধকারে ঘুরতদুষ্টুমি করত, ইন্দামিন্দাতারপর সে চলে যায়অন্যরাওআর নিভিয়াও একটুএকটু দুঃখছেলেটা তো বন্ধু হতে পারততার আগেইআহা চলে গেল।৪ছেলেটি ছিল লম্বাচোখে মুখে তার মাদকতাএকটা ছোট্ট মেয়ে পড়ে গেল তার প্রেমেআর উঠতেই পারে নাতখন একটা পন্টু* যাচ্ছিল সেই পথ দিয়েসেই ছোট মেয়েটিকে দিল জলের ছিটেমেয়েটি চোখ পিট পিট করে তাকালসেই দেখে পন্টু বলে, ‘ওমা আমি তোএর প্রেমে পড়ে গেলাম, এখন কী হবে।’ছোট্ট মেয়েটি বলল, ‘তাতে কী।’সেই না দেখে লম্বা ছেলেটি ভাবল,‘ওমা এদের তো প্রেম হয়ে গেল।’*গোবেচারা সুন্দর৫তার চোখে অকরুণ দৃষ্টিকেউ নেই তারনা, মা না, বাবানা, ভাই না, বোনওরা চুরি করে এনেছিলো তাকেনা, স্বামী নেই ছিলও নানা, ছেলে না, মেয়েচোররা তাকে বিক্রি করতে পারেনিবাড়ি ছিল রংপুরেবয়স বছর পঞ্চাশথাকে গোরস্থানেহাতে একটা উদ্ভিদ তার, কেন?সে মাথায় দেবে ঠাণ্ডাকরার জন্য।
এক বুজুর্গ, ইচক দুয়েন্দে
আহমেদ নকীব
আহমেদ নকীব




মন্তব্য