ইচক দুয়েন্দে (শামসুল কবির কচি) অন্তিম ঘুমে ঘুমিয়ে পড়লেন। একজন ‘সৃষ্টিছাড়া’ সাহিত্যিক, ভিন্নতার খোঁজে প্রত্যাখ্যানের অস্ত্রে শান দিয়ে নিজেকেই অসীম শূন্যতায় সমর্পণ করলেন বলা যায়।
সংবাদপত্রে যদি লিখা হয়— মহামতি Ichok Duende (ইচক দুয়েন্দে) গত হলেন। তবে মিথ্যাচার হবে। তিনি গত হন নি, তিনি গত হওয়াটাকেই শাসিয়ে চিরকাল থাকবেন, কিন্তু ভিষণ একা, একাকিত্বকে নিয়ে অনন্তকাল থেকে যাওয়ার বাসনায়
ইচক দুয়েন্দেরা আসলে মারা যান না—তাঁরা ধীরে ধীরে সাহিত্যের ক্রমনির্মিয়মান ভাষা থেকে মুছে যেতে থাকেন। তারপর একদিন হঠাৎ টের পাই, বহুদিন আর তাঁর কোনো খোঁজ রাখিনি আমরা।
আজ ভোরে এই সংবাদ শোনার পর মনে পড়ছিল বছর পনের আগের স্মৃতি, সেই বাড়িটার কথা। এরো অনেক বছর আগে কাশিপুরে নরাইলের জমিদার পুত্রের বাড়ির সঙ্গে আশ্চর্য মিল পেয়েছিলাম। একা, নিসঙ্গ, দারিদ্র, অন্ধকার ঘিরে থাকা সাহিত্যের স্বত্তন্ত্র সত্ত্বার সন্ধানী শুয়ে আছেন। তুষার রায় অথবা ইচক কচি— দুয়েন্দের সন্তান সন্ততিরা।
রাজশাহীতে সেবার আমার প্রথম যাত্রা। চিহ্নমেলা। অনুজ শিক্ষক হাওয়াদারই সম্ভবত, আমরা দুজনে একদিন খুজে খুজে তাঁর খন্ডহরের মতো প্রাচীন বিশাল বাড়িতে হাজির হয়েছিলাম। এর আগে পড়াছিল ‘লালঘর’ ও ‘We are not Lovers’ আর ‘কলকাতা ভ্রমন্তিকা’ এবং ‘টিয়াদুর’। কিন্তু একদম ভিন্ন আঙ্গিক, ভিন্ন স্বর আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সেদিন।
কাশিপুরের রায় বাড়ির মত্যই শামসুল কবীরের (কচির আসল নাম) রাজশাহীর সেই বিশাল, প্রায়-পরিত্যক্ত বাড়ি। অন্ধকার করিডর। বন্ধ দরজা। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। মনে হবে সেখানে কোনো মানুষ থাকেন না—“থাকে শুধু সময়, নিঃসঙ্গতা আর ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়া এক জীবন।”
সেই বাড়িতে একা থাকতেন ইচক দুয়েন্দে। চারদিকে আগাছা, পোকামাকড়ের ভয় নেই? জিজ্ঞাসায় হেসেছিলেন। কাফকার কথা বলেছিলেন, পোকা হয়ে থাকার কথা বলেছিলেন। আর কবিতা শোনাতে বলেছিলেন। কবিতার অতৃপ্তি চোখেমুখে দেখেছিলাম। তারপর তিনি কবিতা শোনালেন। গভীর এক নৈশব্দকে শব্দে ধরে রাখা। এক অসীম আলোর ভেতর গভীর অন্ধকার।
কবিতা পাঠের পর প্রায় আধঘন্টা, আমরা চুপ করে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে, কিছু কি খুঁজছিলাম, নিজেদের স্পন্দন?
ইচক দুয়েন্দে, নিজের নামে লোরকার ‘দুয়েন্দে’ যুক্ত করে ছদ্মনাম নিয়েছিলেন। যাকে বোঝা যায় না, ব্যখ্যা করা যায় না—অনুভব করতে হয়।
ইচক দুয়েন্দের কাছে— “ভাষা কেবল বাক্য নয়; ভাষা যেন কোনো আহত প্রাণী, যাকে তিনি নতুন করে জন্ম দিতে চাইছেন। তিনি সাহিত্য লিখতে চাননি শুধু, তিনি সাহিত্যের শরীরটাই বদলে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, লেখা মানে পাঠককে শান্তি দেওয়া নয়; লেখা মানে তাকে তার নিরাপদ জায়গা থেকে টেনে বের করে আনা।” (সংগৃহীত)
ইচক দুয়েন্দের মতো বিরল প্রজন্মের সাহিত্যিকেরা আপস করেন না। তাঁরা জীবনকে হারিয়েদেন, মানুষের ভিড় থেকে দূরে সরে গিয়ে ধীরে ধীরে বিস্মৃত হয়েযান। তাঁদের লেখা তখন একদম ব্যক্তিগত, নিজস্ব। এরা আর প্রকাশের, পাঠকের তোয়াক্কা করেন না। ক্যামু না জীবনানন্দের মতো যাবতীয় লেখালেখি নিজের ব্যক্তিগত তোরঙ্গে তুলে রাখেন।
এক বন্ধু কচির মৃত্যুর পর লিখেছেন আজ— “এখন মনে হয়, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে করুণ মানুষ হয়তো সেই, যে সত্যিই শিল্পকে ভালোবেসে ফেলে। কারণ সত্যিকারের শিল্প মানুষকে পুরস্কার দেয় না, তাকে নিঃসঙ্গ করে দেয়। ধীরে ধীরে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ইচক দুয়েন্দে সেই নিঃসঙ্গতার শেষ সীমা পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলেন।” আমিও সহমত তাঁর সঙ্গে।
আজ ইচক দুয়েন্দের মৃত্যুর খবর শুনে মনে হচ্ছে আমরা, বাংলার পাঠকেরা শুধু দ্বিখণ্ডিত হই নি, স্বার্থপর হয়ে গেছি, বৈপ্লবিক সাহিত্যকে, সাহিত্যকর্মের প্রতি প্রেম জাগাতে পারিনি।
“আমরা তাঁকে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় হয়তো কিংবদন্তি বলেছি, দুর্বোধ্য বলেছি, অদ্ভুত বলেছি, কিন্তু তাঁর নিঃসঙ্গতার কাছে গিয়ে বসিনি। তাঁর অন্ধকার ঘরগুলোর ভেতরে জমে থাকা নীরবতা শুনিনি। বুঝিনি, একজন মানুষ কত গভীরভাবে লেখার মধ্যে ডুবে গেলে বাস্তব পৃথিবী থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে পারে।”
আজ তিনি নেই হয়ে গেলেন, যেভাবে তুষার রায়, জীবনানন্দ দাশ, সুবিমল মিশ্র, শৈলেশ্বর ঘোষ, অরুণেশ ঘোষ, শহিদুল জহির, অনন্য রায়, ফাল্গুনী রায়…
যারা প্রমাণ করেছেন সাহিত্যও বিপজ্জনক হতে পারে, আততায়ী হতে পারে, আপনাকে নিজের মতই নিঃসঙ্গ করে দিতে পারে, গভীর আঘাতের উল্লাসের মতো গোপন!
ইচক দুয়েন্দে: নিঃসঙ্গতার অন্তিম উত্তরাধিকার
গৌতম গুহ রায়
গৌতম গুহ রায়




মন্তব্য