আমরা তখন কেবলই তরুণ তুর্কির মেজাজে বাংলাদেশের সাহিত্যজগতের সড়ক-মহাসড়ক, অলিগলি ঘুরে বেড়াচ্ছি। দিন-রাত আড্ডা মারছি আজিজে, শাহবাগে, উদ্যানে। সে সময়ই জানতে পারি এক হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার কথা। অনেক অনেক দিন আগে এই শহরে বাঁশি বাজিয়ে ফিরতেন তিনি। তার বাঁশির সুরে, পরবর্তী সময়ে যারা আশি-নব্বই দশকের ডাকসাইটে লেখক-কবি হয়ে ওঠেন, সেই তাবড় তাবড় সব সাহিত্যিক মোহাবিষ্ট হয়ে ফিরতো। তাদের সৃষ্টিশীলতার সর্বনাশের দিকে উস্কে দেয়া, সাহিত্যিক প্রণোদনা দেয়া, বইপত্র প্রকাশ করা, চাকরি জুটিয়ে দেয়া, অন্ন সংস্থান করা, স্নেহ, প্রেম, ভালোবাসা বিলিয়ে সবার জন্য এক অভয়ারণ্য হয়ে ওঠার সবটাই করতেন তিনি, একা। একজন মানুষ, অথচ এতোজন তার কাছে ঋণী, এতোজনের ওপর তার প্রভাব, এতোজনের চিন্তাকে অঙ্কুরিত করেছেন তিনি, যে রীতিমত এক মিথে পরিণত হয়ে উঠেছিলেন। সেই মিথই তাকে করে তুলেছিল হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তিনিই ইচক দুয়েন্দে (Ichok Duende)। কচি ভাই।
মূলত শিল্প আর জীবন, সবটাকেই এক অন্যতর বাস্তবতার নিরিখে দেখতে চেয়েছেন এই শিল্পী। তা বড্ড বাস্তব, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণের কাছে রূপকথার মতো। আমাদের কাছে কচিকে উল্টালে তবে হয় ইচক। কিন্তু তার কাছে কচি আর ইচক আলাদা কিছু নয়।
লালঘর, টিয়াদুর সব বাস্তব। লালঘর কি নয়া আউটসাইডার বা মেটামরফোসিস নয়? টিয়া আর বাদুরের সম্মিলনে যে ‘টিয়াদুর’, লাল ঠোঁট-সবুজ ডানার সেই টিয়া কি কোনো দেশ বা দেশের পতাকা? বাদুরেরা তবে কী?
সবাইকে নিয়ে, যুথবদ্ধত হয়ে আপাত রূপকথার মতো ওই বাস্তবের দুনিয়ায় বিরাজ করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সবাই তো তা দেখতে পারবে না। ফলে সেই গল্পের মতোই এক পর্যায়ে পাহাড়ের ওধারে অন্তর্হিত হয়েছেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তবে শিশুগুলোকে নিয়ে যাননি। একা একাই রাজধানী ছেড়ে চলে গেছেন সবার আড়ালে, রাজশাহীর বরেন্দ্রভূমিতে। সেখানেই নিজের জগতে বেঁচে ছিলেন, একা।
বহুকাল পরে কোন কপালগুণে তার স্নেহ পাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। দুয়েকবার দেখা। হায়, কচি ভাই!
কালই জানলাম, উনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। তেমন কোনো উদ্বেগই কাজ করেনি। খুব ক্যাজুয়ালিই নিলাম। হায়, রাত হতে না হতেই জানলাম, সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালাটি বাঁশিতে শেষ সুর তুলে মেঘের দেশে চলে গেছেন। দিনে-দিনেই তার এই চলে যাওয়াটাও কেমন রূপকথার মতো!
কচি ভাই কি চলে গেলেন?
উনি বলছেন- না।
ওনার বলাটাই সত্যি। কারণ, উনি তো অন্য বাস্তবতার নিরিখে দুনিয়া দেখেন। আমাদের মতো সাধারণের চোখে তো তা ধরা পড়বে না...
লাভিউ কচি ভাই...
ইচক দুয়েন্দে, এক হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার কথা
হিজল জোবায়ের
হিজল জোবায়ের




মন্তব্য