আমাদের বাড়ির পোষা বিড়ালটা ৩ দিন যাবত কেঁদে চলেছে। পোষা বলাটা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, বলতে পারবো না। কেননা ওকে আমরা কেউ পোষ্য নেইনি কোনোদিন। আমার মা কুকুর-বিড়াল দু-চোখে দেখতে পারেন না। আমার বাবার ব্যাপারটা বোঝা মুশকিল। কারণ বাবা দুবেলা নিয়ম করে উচ্ছিষ্ট কিছুটা ভাত আর মাছের কাঁটা বিড়ালের জন্য নিজের থালার একপাশে জমিয়ে রেখে দেন ঠিকই, কিন্তু বিড়ালকে কখনোই ঘরের ভিতর প্রত্যাশা করেন না। বিড়ালটা ঘরে ঢুকলেই মা-বাবা দুজন মিলে হুসহুস করে তাড়িয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠেন। পোষ্য বলাটা হয়তো বাড়াবাড়িই হবে। অবশ্য বিড়ালটা কিন্তু নিজ উদ্যোগে হয়তো বেঁচে থাকার খায়েশে নিয়ম করে দুপুর এবং রাতে, ঠিক আমরা যখন খেতে বসি তখন দরজার সামনে এসে বসে থাকে। এবং বিড়ালটা ঠিক কবে থেকে আমাদের বাড়িতে আসে তা আমরা জানি না। আমরা কেবল খাওয়ার পর কিছুটা উচ্ছিষ্ট ভাত আর কাঁটাকুটা কলপাড়ের এক কোণে শুকনো কাঁঠালপাতার উপর রেখে দেই। আর বিড়ালটা নিজের সুযোগ বুঝে কেবল কাঁটাগুলো সাবাড় করে ভাতগুলো ফেলে রেখে চলে যায়।
কিন্তু ৩ দিন যাবৎ আমদের বাড়ির বিড়ালটা কেঁদেই চলেছে। মিয়াঁও মিয়াঁও করতে করতে ওর গলা ভেঙে গেছে। কণ্ঠস্বরের সুরেলা ধাঁচটা এখন অবলুপ্ত হয়েছে। ইদানিং খাবারের ব্যাপারেও তার উৎসাহ নেই। এক রকমের বৈরাগ্যে তার অন্তঃকরণ যেন দীর্ঘশ্বাসের মতন বিষন্ন হয়ে গেছে। পোষ্য বলাটা হয়তো যুক্তিসঙ্গত হলো না, কেননা ভরণপোষণের দায়িত্ব কিংবা চিকিৎসার দায়িত্ব কিংবা ওর বসবাস উপযোগী কোনো স্থানের দায়িত্বের মতন কোনো রকম সাতে-পাঁচেই আমরা নেই।
এবার কী হয়েছে, বিড়ালটা মাসখানেক আগে প্রকৃতির নিজস্ব বাস্তবতায় বাচ্চা প্রসব করেছে। এর আগেও একবার আমাদের বাড়িতেই সে ৩টা বাচ্চা প্রসব করেছিল। সেই ৩টার মধ্যে কেবল ১টাকেই সে প্রকৃতির কঠিন শৃঙ্খলায় টিকিয়ে তুলতে পেরেছিল। সেই বাচ্চাটা অবশ্য বড় হবার পর, মা’কে একা ফেলে সে নিজের চারণভূমি নিজেই পছন্দ করে, সেখানে চলে গেছে। তাকে আর ইদানিং দেখা যায় না।
আমাদের বাড়ির বিড়ালটা ৩দিন যাবত কেঁদেই চলেছে। মাসখানেক আগে সে মা হয়েছিল। কতগুলো বাচ্চার মা সে হয়েছিল তা আমরা জানি না। তবে এবার তার সাথে কেবল ১টা ছানাই আমাদের বাড়িতে আস্তানা গেড়েছিল। বিড়ালছানাটা ফুটফুটে সুন্দর ছিল। সারাদিন সে মনের আনন্দে তিড়িংবিড়িং করে বেড়াতো। মায়ের পিছে পিছে তিড়িংবিড়িং করতো। মাঝেমধ্যে আমাদের ঘরের ভিতরও ঢুকে যেত। ঘরের ভিতর ঢুকেই সে খাটের নিচে আশ্রয় নিত। আর তখনই আমার মা-বাবা দুজনই সম্মিলিত স্বরে হুসহুস করে সেই ছানাটাকে তাড়িয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠতেন।
মা বলতেন, ‘বিলাই ঢুকছে ঘরে। হাইগা-মুইতা ঘর নষ্ট কইরা ফালাবো। তাত্তাড়ি খেদা বিলাইডা।’
মায়ের আশঙ্কা একেবারে অমূলকও ছিল না। কেননা ওরা তো আমাদের পোষ্য নয়। ওদের তো কোনোরকম ট্রেনিং নেই। যেমন মায়ের আশঙ্কা অনুযায়ী, ওরা একদিন আমাদের মাঝের ঘরের ১টা বিছানা ভিজিয়ে রেখে পালিয়ে ছিল। মা সেদিন খুব চিল্লাপাল্লা করেছিলেন। বিড়ালের যন্ত্রণায় তাঁকে বিছানাপত্র ধুতে হয়েছিল এবং তোশক রোদে দিতে হয়েছিল। এরকমের বাড়তি কাজ তাঁর একদমই ভালো লাগে না। আদতে কারোরই তো বাড়তি কাজ ভালো লাগে না।
আমাদের বাড়ির বিড়ালটা ৩দিন যাবৎ কেঁদে কেঁদে গলা ভেঙে ফেলেছে। ওর ছোট্ট ছানাটাকে গত ৩দিন দেখতে পাই না। বিড়ালটা বারবার আসে। কাঁদে। এ ঘর থেকে সে ঘরে ঘুরে ঘুরে মিয়াঁও মিয়াঁও করে। সারাদিন তন্নতন্ন করে খোঁজে। সে তার উত্তরাধিকারীকে খুঁজে ফেরে। পায় না। মিসিং হবার আগে যেখানে যেখানে বিড়ালছানাটা তিড়িংবিড়িং করে বেড়াতো, আমাদের বিভিন্ন ঘরের কোণে, ঠাকুরঘরে, খাটের নিচে, রান্নাঘরে; সেই সকল জায়গায় সে তার ছানাটাকে মিয়াঁও মিয়াঁও করে ডাকে। সে হয়তো স্বপ্ন দেখে, তার মিয়াঁও শুনে ছানাটা দৌড়ে চলে আসবে। আবার আগের মতন তিড়িংতিড়িং করে খেলে বেড়াবে। বিড়ালটা হয়তো ভাবে ছানাটা তার সাথে লুকোচুরি খেলছে।
৩ দিন আগে, যে রাত থেকে বিড়ালটা কাঁদতে শুরু করেছিল, সেদিন বিকেলেও আমি ওদের বাৎসল্য দেখে ছিলাম। ওরা দুজনই খেলতে খেলতে আমার ঘরে খাটের নিচে ঢুকে পড়েছিল। তারপর আমি বিশেষ পদ্ধতি প্রয়োগ করে ওদেরকে আমার ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ছিলাম। সন্ধ্যায় যখন বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলাম, ছানাটা আমার পায়ের কাছে এসে বেশ কিছুক্ষণ ভয়ে ভয়ে তিড়িংবিড়িং করেছিল। ওর তিড়িংতিড়িং দেখে আমার মন গলে গিয়েছিল। আমি ওকে হাত দিয়ে আদর করতে এগিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে আদরের তোয়াক্কা না করে তিড়িংবিড়িং করে পালিয়েছিল। হয়তো ভয়ই পেয়েছিল।
সেই সন্ধ্যার পর থেকে আমি আর ছানাটাকে দেখিনি। সেদিন সারারাত বিড়ালটা কেঁদেছে। কখনো ছাদের উপর, কখনো দরজার পাশে, কখনো জানালার ধারে, কখনো বারান্দায়, কখনো উঠানে। আমি বিড়ালটাকে বহুবার বলেছি, ধীরে ধীরে বলেছি, যাতে অন্য কেউ বিড়ালের সাথে কথা বলতে আমায় না দেখে, সেই খেয়াল রেখেই বলেছি, কেননা লোকে যদি আমায় বিড়ালের সাথে কথা বলতে দেখে তাহলে তারা আমায় নিশ্চিত পাগল ভাবতে পারে (মানুষ সাধারণত নিজের পাগলামি গোপন রাখাতেই স্বস্তি বোধ করে) তাই সবদিকে খেয়াল রেখে ধীরে ধীরে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছি।
‘তর ছানাটা চইলা আসবো। একটু ঘুরতে গেছে। কান্দিস না।’
বিড়ালটা আমার কথা শোনেনি। হয়তো আমার ভাষা সে বোঝেনি। যেমন আমি তার ভাষা বুঝি না। সেও আমার ভাষা বোঝেনি। আমরা কেবল একে অন্যের ইশারা-ইঙ্গিত কিছু কিছু বুঝি। যেমন আমি যখন ওকে তাড়িয়ে দেই তখন সে আমার কথা বোঝে, আবার ওর যখন খিদে পায় তখন মিয়াঁও মিয়াঁও শুনে আমি কিছুটা আন্দাজ করতে পারি। যদি ওদের ভাষাটা আমি জানতাম, যদি সেই ভাষা রপ্ত করার কোনো পদ্ধতি থাকতো, আমি অবশ্যই রপ্ত করে ওর মনের সব কথা শুনতাম। বোঝার চেষ্টা করতাম। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য, আমরা কেউ কারো ভাষা বুঝি না। অবশ্য মানুষই তো মানুষের বলা কথা লেখা ভাষার মর্ম ঠিকঠাক উদ্ধার করতে পারে না। যাক সেই সমস্যা ভিন্ন ব্যাপার।
যেদিন রাতে বিড়ালছানাটা মিসিং হলো, তার পরদিন সকালে মায়ের চিৎকারে আমার ঘুম ভাঙে। সাতসকালে তিনি চেঁচামেচি শুরু করলেন। এবং কিছুটা দুঃখও প্রকাশ করলেন। আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সব শুনলাম। সাড়া দিলাম না। মা ছানাটাকে রান্নাঘরে আবিষ্কার করলেন। মৃত। ঠান্ডা। মৃত্যুর কথা শুনে আমি আর বিছানা থেকে উঠিনি। মনটাও বেজায় বিষন্ন হয়ে গেল। আমি নিজের মাঝে সেই মৃত ছানাটাকে দেখার সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি। দিনের অন্য কোনো সময়ে হলে হয়তো সাহস হতো, কিন্তু সাতসকালে ১টা মৃত বিড়ালছানার বায়বীয় দুঃখ সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না। পরে শুনেছিলাম মা নাকি মৃত ছানাটাকে নদীর জলে ফেলে দিয়ে এসেছেন। জানতে চেয়েছিলাম, কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল কিনা। মা জানিয়ে ছিলেন, বাড়ির সামনের রাস্তায় হয়তো কোনো মোটরসাইকেল এই ঘটনাটা ঘটিয়ে থাকতে পারে। যদিও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তবে নিশ্চিত মানুষেরই কর্ম ঐটি। হয়তো রাতেই মৃত ছানাটিকে বিড়ালটা খুঁজে পেয়েছিল। এবং মুখে ধরে টেনে এনে আমাদের রান্নাঘরে লুকিয়ে রেখেছিল। হয়তো আশা করেছিল, রান্নাঘরে রাখলে মাছের গন্ধে নিশ্চয়ই তার সন্তান আবার জেগে উঠবে।
কিন্তু পৃথিবীর বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে যারা একবার বর্ণ গন্ধ অনুভূতির অতীত কোনো এক নিরুদ্দেশের পথে হারিয়ে যায়, তারা আর কোনোদিন এই জাদুবাস্তবতার মাঝে নিজেদের সচেতন সত্তাকে ফিরে পায় না।
এসব কথা জেনে এবং বিড়ালের কান্না শুনে বাবা বলেছিলেন, ‘৬৫ বছরের জীবনে এরম তো কুনোদিন দেখি নাই। বিড়াল তো দেহি মানুষের থিকাও বেশি কান্দে। মানুষের বাচ্চা মরলেও তো কুনোদিন কুনো মায়েরে এরম কানতে দেহি নাই।’
বিড়ালের কান্না
অসীম নন্দন
অসীম নন্দন




মন্তব্য