.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

সুন্দর মানুষ সুন্দর কবি বিষ্ণু বিশ্বাস

সুন্দর মানুষ সুন্দর কবি বিষ্ণু বিশ্বাস ইচক দুয়েন্দে
তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার 
কত রঙে রঙ করা।

মোর সাথে ছিল দুঃখের ফলের ভার 
অশ্রুর রসে ভরা।
–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিষ্ণুর সঙ্গে ষোল বছর দেখা নেই। শেষ দেখা সংসদ ভবনের কোনায় বিশাল রাস্তায়। আমরা একটা বেবিট্যাক্সিতে ছিলাম। যাত্রা করেছিলাম মালিবাগ চৌধুরী পাড়া থেকে। আমি নেমে গেলাম। বিষ্ণুকে নিয়ে বেবিট্যাক্সিটা চলে গেল গাবতলির দিকে। তাঁর রাজশাহী যাবার কথা।

সেই-ই তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা।

রাজশাহীতে সে মাসখানেক ছিল। তারপর যাত্রা করেছিল ঝিনাইদহ। অবশিষ্ট সবকিছু শোনা কথা। ঝিনাইদহে তাঁর পৈত্রিক গ্রাম। তাঁর বাবা অনেক দিন আগে পরলোকে। শুনেছিলাম তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন । তাঁর মা থাকতেন গ্রামে। ভাইবোন ছিল না। গ্রামে গিয়ে বিষ্ণু দেখেন তাঁর মা পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন। বিষ্ণুও যাত্রা করেছিল সেখানে। 

বছর কয়েক পরে শুনেছিলাম, বিষ্ণু সেখানে বিয়ে করেছিল। একটি বাচ্চা হয়েছিল। তারপর সে আত্মহত্যা করেছিল। শুনেছিলাম আবার, সে আত্মহত্যা করে নাই, পথে পথে সে কাগজ কুড়োচ্ছে।

ঘন ঝাঁকড়া চুল, মাঝে সিঁথি কাটা, দীর্ঘদেহী স্বপ্নালু চোখ বিষ্ণুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৮৪/৮৫ সালে। কবি অসীম কুমার দাস পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। বিষ্ণুর কন্ঠস্বর ভরাট গভীর স্পষ্ট। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত আবৃত্তি সংগঠন ‘স্বনন’ এর তারকা আবৃত্তিকার সে তখন।

আমি তখন গল্প লেখা শিখছি। বিষ্ণু কবিতা লেখা।

বিষ্ণু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে পড়ত। আমি পড়তাম না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর আমাকে টানত। বিষ্ণু টানত। অসীম টানতেন। আড্ডা দিতে যেতাম। কবিতা নিয়ে কথা হত। উপন্যাস নিয়ে। কে বড় কে মহান। কে হারিয়ে যাবে আগামীকাল, কে থাকবে জুড়ে মহাকাল। এবং আলাপ হত প্রেম নিয়ে।

বিষ্ণু সদালাপি। তাঁর পথে পথে চেনা তরুণ-তরুণী। সহজেই সে মিশে যেতে পারে সবার সঙ্গে। কলকাতা বেড়িয়ে এসেছে সে অনেকবার। সমসাময়িক বাংলা কবিতার সঙ্গে তাঁর সাবালীল পরিচয়। জীবনানন্দ তাঁর প্রিয়। রবীন্দ্রনাথ হৃদয়ে। মন ভাল থাকলে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে মন তাঁর ভালই থাকত, গুনগুন করত রবীন্দ্র সঙ্গীত। ‘ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভাল।’

জামা ইন করত। জিনস ছিল তার প্রিয়। কেডস পড়ত। চুল লম্বা।

একটু সময় নিয়ে স্নান করত। নাস্তা করত কিছুটা দেরিতে। প্রথম পরিচয়ের সময়ে ১০/১১টার দিকে। শেষ দিনগুলোয় ১২/১টার দিকে দুপুরে। নিজেকে ঠিকঠাক করে বেরুতে সে একটু সময় নিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় তাঁর মন ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক সব নিয়ম মেনে চলায় সে ছিল বিরক্ত। যদ্দুর মনে পড়ে সাবসিডিয়ারি সময়মত তাঁর করা হয়ে উঠেছিল না। পরে করে নেয়। অনার্স শেষ করেছিল । কিন্তু সনদ সম্ভবত তুলেছিল না।

তার পথে পথে প্রেম ছড়ানো ছিল। যেখানেই সে যেত আশেপাশের মেয়েরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আসত। চোখাচোখি করত। গান করত। যখন সে চলে যেত তাদের মনে দুঃখ হত। সে খেয়ালি মানুষ, ভুলে যেত,  নতুন কেউ তাঁকে টানত।

এক পাতলা শ্যামলা তরুণী যিনি হাসলে তার নাসারন্ধ্রও হেঁসে উঠত, বিষ্ণু তাঁর প্রেমে মগ্ন হল। মগ্ন আচ্ছন্ন একটু পাগল করা। তরুণী স্বল্পভাষী, মিতবাক। তাঁর টিনএজ থেকে দুর্দান্ত কিংবদন্তি এক প্রেম ছিল। সেই প্রেম এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। তবুও তিনি বিষ্ণুকে সময় দিতেন।

তাঁরা দু’জন রিক্সায় ঘুরতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শহরে। বিষ্ণু গান গাইত, যেন ঢলে পড়তে চাইত তাঁর গায়ে। তরুণী ছিলেন নিরব, বড্ড নিরব, দূর থেকে তাই আমাদের মনে হত।

বিষ্ণু কি তাঁর ভালবাসার কথা আমাদের আটখানা করে বলত? না প্রায় একদম নয়। তাঁর ভালবাসা ছিল অন্যরকম। কামনা বাসনা সেখানে ছিল অপ্রধান, বিয়ে করে ঘর বাঁধবার বাসনা বোধ হয় সে স্বপ্নেও ভাবত না। মর্ত্য মানুষের মতো নয়। সে ভালবাসা চাইত। অন্যরকম ভালবাসা। তাঁর এই প্রেম ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। কেন আমি জানি না। এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মতিহার সবুজ চত্বর ফেলে রেখে সে রাজশাহী শহরে আমাদের সঙ্গে অনেক বেশি সময় কাটাতে শুরু করল।

তখন আমরা ভাবলাম ‘পেঁচা’ বের করব। প্রচুর বিপুল চা সিগারেট খেয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রেসে ছাপা ও কাগজের দাম বাকি রেখে আমরা ‘পেঁচা’ প্রথম খণ্ড বের করলাম।

বিষ্ণু-র লেখা সম্ভবত পেঁচাতেই প্রথম প্রকাশিত হল।

পেঁচা প্রকাশের সময়, যাকে বলে মুক্তোর মত হাতের লেখা নিয়ে এক তরুণী অমাদের জগতে উঁকি দিলেন। যাঁর হৃদয়ে তিনি অনুরণন তুলতে চাইলেন, তিনি তাঁর হৃদয়ে কোনো স্পন্দন বোধ করতে পারলেন না । তাঁর হস্তলিপি বিধৃত কথাগুলি বিষ্ণুর হৃদয়ে স্পন্দন জাগাল। বিষ্ণু প্রেমে পড়ল, ভালবাসল তাঁকে নিজের চেয়ে বেশি।

তিনি ছিলেন মেধাবী, একটু খর্বকায়, কালো পৌরানিক দেবী, যেন। বিষ্ণু তাঁকে গোটা গোটা সৃষ্টিশীল হাতের লেখায় হৃদয়ের সব আবেগ ঢেলে চিঠি লিখল। তিনি থাকতেন দূরে। উত্তর দিতেন বিষ্ণুর চিঠির। প্রেমের নয়।

১৯৮৮ সাল। আমি ঢাকায় চলে গেলাম। পরে পরে বিষ্ণুও ঢাকায় এল। পেঁচার আরেকটি খণ্ড বের করবার জন্য বিষ্ণুর ভীষণ জেদ। আমার ইচ্ছে করছিল না। শেষে রাজি হলাম কিন্তু লেখা দিতে চাইলাম না। 

এক রাতে আমরা মালিবাগ চৌধুরী পাড়ার রাস্তায় হাঁটছিলাম। যেখানে একটা ছোট্ট বাসায় আমরা থাকতাম তার কাছে। বিষ্ণু আমার পেঁচায় না-লিখবার ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করে অশ্রুভেজা অবেগ প্রকাশ করল। আমি রাজি হলাম লিখতে। সাত দিন কাজ থেকে ছুটি নিয়ে ‘ধূলিযুদ্ধ’ পুনর্লিখন করলাম।

পেঁচা ২য় খণ্ড বের হল।

তারপর আমরা আরও ৬ বছর ছিলাম ঢাকায় । কিছুদিন এক সঙ্গে। তারপর বিচ্ছিন্ন। বিষ্ণু তাঁর নূতন ডেরায়।

সেই দিনগুলোয় বিষ্ণু’র অনেক নূতন বন্ধু। আমারও।

বিষ্ণু তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে, আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতাম।

পুরানো বন্ধুরা ভাইবোনের মতো হয়ে ওঠে, যদি বিশ্বাস ও ভালবাসা থাকে।

ঢাকা ছেড়ে যাবার আগে শেষ তিন মাস বিষ্ণু আবার আমার সঙ্গে ছিল। বিষ্ণু ঢাকা ছেড়ে চলে যাবার চার/পাঁচ মাস পরে আমিও ঢাকা ছেড়ে চলে আসি।

আচরণে কর্মে কথায় বিষ্ণু নিঁখুত সুন্দর। ‘নিঁখুত’ এর বদলে অন্য একটি শব্দ লিখতে পারলে ভাল লাগত, এখন মনে এল না।

সুন্দর মানুষ। সুন্দর কবি। লোকপ্রচলিত ধারনা কবি বা শিল্পীরা বিষয়-জ্ঞান রহিত। তাঁদের টাকা ফুরিয়ে যায়, প্রেম ব্যর্থ হয়, সংসার তাঁদের তাড়িয়ে দেয়। যাঁরা কবি শিল্পীরূপে খ্যাতি প্রতিপত্তি পান প্রায়শই তাঁরা এর বিপরীত। তবুও লোকপ্রচলিত ধারনাটার একটা সত্যতা থেকে যায়, কারণ অধিকাংশ কবি শিল্পীর কাছে খ্যাতি প্রতিপত্তি ধরা দেয় না। তারা হতদরিদ্র অপরিচিত থেকে যান। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বার্ধক্যে পৌঁছে আর অতি নগন্য কেউ কেউ পান মৃত্যুর পরে সম্মান। সুন্দর মানুষ সুন্দর কবি এই শেষোক্তদের দলে। যাঁর নাম বিষ্ণু বিশ্বাস।

আমার বিশ্বাস বিষ্ণু বেঁচে আছে। মনে হয় হিমালয়ের কোলে কোথাও। একদিন সে ফিরে আসবে আমাদের মাঝে। যখন হয়ত আমি থাকব না।

বিষ্ণু আমাকে বলেছিল, ‘তুমি আমার জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধু।’

আমি বলি, ‘বন্ধু দেখা হবে জন্মান্তরে।’

মে ২০১০

সুন্দর মানুষ সুন্দর কবি বিষ্ণু বিশ্বাস 
ইচক দুয়েন্দে


মন্তব্য

নাম

অনুবাদ,38,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,উৎপলকুমার বসু,26,ঋত্বিক-ঘটক,4,কবিতা,346,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,16,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,81,ছড়া,1,জার্নাল,4,জীবনী,6,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,22,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,173,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,2,বিবৃতি,1,বিশেষ,25,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,42,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,19,সাক্ষাৎকার,23,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: সুন্দর মানুষ সুন্দর কবি বিষ্ণু বিশ্বাস
সুন্দর মানুষ সুন্দর কবি বিষ্ণু বিশ্বাস
কবি বিষ্ণু বিশ্বাস প্রসঙ্গে ইচক দুয়েন্দে বা শামসুল কবীর কচির লেখা প্রবন্ধ৷
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEggZFjQ3dFk10o_jxbIZ0DBb8_2D-kCIyUzfxBeEzajVfEDdsooy7tcfSNrIeynpT2QsRK7UHY4DwsMrQ4kmAcEdU7fk6d6H6J3i9Y73k95cyHFTSFGDbEq9JWLKpF7641i-_qO42Pha2ucQHkDa3Er7mOTHNhj1lxZbjk5kp_f8w-rVGTUp9JaQgX04SA/s16000/%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%A3%E0%A7%81%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.jpg
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEggZFjQ3dFk10o_jxbIZ0DBb8_2D-kCIyUzfxBeEzajVfEDdsooy7tcfSNrIeynpT2QsRK7UHY4DwsMrQ4kmAcEdU7fk6d6H6J3i9Y73k95cyHFTSFGDbEq9JWLKpF7641i-_qO42Pha2ucQHkDa3Er7mOTHNhj1lxZbjk5kp_f8w-rVGTUp9JaQgX04SA/s72-c/%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A6%BF%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%A3%E0%A7%81%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.jpg
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/06/bishnu-bishwas.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/06/bishnu-bishwas.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy