.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

হাজার বছর ধরে: দহনের এপিঠ-ওপিঠ

হাজার বছর ধরে: দহনের এপিঠ ওপিঠ  আদিবা নুসরাত
বুকের ভেতর হাহাকার জাগানিয়া সুর বাজছে। মনে মনে চলে গেছি পরীর দিঘীর সন্নিকটে, জ্যোৎস্না রাতে যেইখানে পরীরা নেমে এসে, গান গায় নাচে। আমার আশৈশব যে কাহিনীতে আমি বুঁদ হয়ে থেকেছি সেটা ‘হাজার বছর ধরে’। প্রতিবার শেষ হবার পর আবার প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শুরু এইভাবে কতবার, কতবার,  বুকের ভেতর বয়ে যাওয়া তুমুল বিষাদ নদী নিয়ে আমি চুপচাপ টুনির হাত ধরে বসে থেকেছি বহুরাত অথচ আমি বরাবর আম্বিয়াই হতে চেয়েছিলাম বোধহয়। আমি যাকে ভালোবাসি তাকেই পেতে হবে আমার, পৃথিবীর সমস্ত নিয়ম উলটে। তারপর একদিন পরিণত হবার প্রয়োজনে ভুল ভাঙ্গে আমাদের৷ নিকট হয়ে যায় সুদূর। “সুচেতনা, তুমি এক দূরতম দ্বীপ।”

‘হাজার বছর ধরে’ র সবচে প্রতিক্রিয়াশীল নারী চরিত্র বলা যায় টুনিকেই৷ পুরো উপন্যাসে, এই নারীর জীবনের নানান ফেইজ, তার দ্বিধা দ্বন্দ্ব, প্রেম, ব্যাকুলতা, বিরহ, প্রত্যাখান দিয়ে পরিপূর্ণ। বয়সের সাথে, অভিজ্ঞতার সাথে বদলে যাওয়া মুখায়ব। আমি বহুবার টুনিকে কল্পনা করেছি টিয়া রঙের শাড়িতে কিংবা হালকা বেগুনি, লালচে চুল। বাতাসে চোখেমুখে লেপ্টে যায়, দু হাত দিয়ে প্রাণপণ আগলে রাখা বালিকা। 

টুনি কেন্দ্রীয় চরিত্র মুকবলের ছোট বউ৷ এইখানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আধিপত্য, নারীর অবদমন, প্রবাহমান কুসংস্কারচ্ছন্নতা সব পাশ কাটিয়ে আলাপ করব কেবল টুনিকে নিয়েই৷ টুনির মনস্তাপ, দহন, হৃদয়ের ব্যবচ্ছেদ। নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে যে বুকে নিয়ে অজস্র অজ্ঞাতনামা স্মৃতি।  যেইখানে নাই কোন প্রধান কিংবা অপ্রধান চরিত্র, দহনই প্রধান কেবল৷ সেতারের মতো বাজে। 

দৃশ্যের বর্ণনা দিই, স্বচ্ছ জল সেইখানে ফুটে আছে অগণিত শাপলা৷ শাপলা ফুলের ঘ্রাণ টা কেমন যেন ভোঁতা ধরনের, খুব হালকা অনেকক্ষণ পর এসে নাকে লাগে৷ মন্তু, টুনি ফুল চুরি করে সবার আগে কিন্তু বিক্রির জন্য না। দুইজন উড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায়, খুনসুটি করে, রাত বিরাতে মাছ ধরে৷ এইখানে টের পাই টুনির হৃদয়ের একাকীত্ববোধ। তার অসম বয়সী স্বামী মকবুল, কখনোই পায়না তার মনের খোঁজ, চেষ্টাও করেনা। ঘরে আরো দুজন বউ৷ নুন লংকার হিসেব,  ফসল ঘরে তোলার চিন্তা, সময় কোথায়?  

টুনি এক নিঃসঙ্গ, অনাত্মীয় বধূ৷ ঘর বোঝে না, সংসার তাকে টানে না মোটে। সে উড়ে বেড়ানো, ঘুরে বেড়ানো এক ফড়িং। মন্তুর সাথে তার যে নিবিড় বন্ধন গড়ে উঠে সময়ের সাথে সাথে, সেটা আমার মনে হয় একপাক্ষিকই৷ মন্তু ধরা দিয়ে দিয়ে কোথায় কোথায় হারিয়ে যায়, প্রবল প্রেমের সম্মুখে দাড়িয়েও নির্বিকার মুখ৷ মন্তুর মনে থাকে সামাজিক কলংকের ভয়, থাকে অন্যের বউকে ভালবেসে শেষে ড্যামেজড হবার আশংকা, এইসব দ্বন্দ্ব টুনির দহনকে প্রসারিতই করে কেবল৷ এইসব দহনের মধ্যবর্তী সময়ে, সুরুত আলী পুঁথি পড়ে সুর করে। আমার কান্না পাই।

“শোন শোন বন্ধু গণ শোন দিয়া মন
কমলা সুন্দরীর কথা করি যে বর্ণন 

হিরন নগরের মেয়ে কমলা সুন্দরি
গুনের কথা কি কহিব রূপ ছিল তার ভারি...”

কমলা সুন্দরী চলে যায় পাতালের রাজকুমারের কাছে৷ ডাঙ্গায় পড়ে থাকে তার ঘর, সংসার, সন্তান, স্বামী।

এই চলে যাবার ভেতর বিরহ আছে, আছে প্রেমও৷ কমলার চলে যাওয়া আর টুনির চলে যাবার মধ্য কোথায় যেন রয়েছে এক সাদৃশ্য। যে অধিকার চিরদিন ধরে সে চেয়েছে, সেটা পাবার পর অসীম মনোবল নিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করার সাহসও রাখছে। কখনো কখনো আমরা এইরূপে গ্রহনের প্রস্তুতি নিয়ে তারপর প্রত্যাখ্যান করে আসি। সেইখানে প্রেমটা আর বড় হয়ে উঠে ছেড়ে যাওয়ায়, থেকে গেলেই যেন সেই প্রেমের মহিমা ম্লান হয়ে যেত৷ 

মন্তুকে আর কোনদিনও পায়না টুনি৷ তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বে থাকে দীর্ঘ এক নদী, থাকে মন্তুর সংসার, সন্তান, ফসলের হিসেব। এই যে কিছু কিছু দূরত্ব যে আর অতিক্রম করা যায়ই না, সম্ভবই না, এতো টুনি জানতো। তবুও সময়ে আমরা এমন কিছু মেনে নিই, যা কখনো মেনে নিব বলে ভাবিইনাই, তারপরও নির্বিকার থাকি, ভাত, মাছ খাই, প্রিয় বইয়ের তাকে ধূলো জমাই৷ 

এইভাবে মন্ত আর টুনির ভেতরেও যোগাযোগহীনতা বাড়তে থাকে ধূলোর পাহাড়। না পাওয়ার দহনে দুজনেই পুড়ে, তবে টুনি সম্ভবত বেশি পুড়ে, ভুল ত্রুটি যারই হোক, প্রত্যাখ্যান যে করে তার দহনই বড়৷ ছেড়ে আসতে পারা সহজ কাজ তো নয়! 

তারপর দেখি গল্প শেষ হয়, রাত বাড়তে থাকে। তীব্র নস্টালজিয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাই আমরা গল্প শেষে৷ যেন, এই উঠানের এক কোণে গড়ে উঠেছিল আমাদের ছোট্ট ছোট্ট ঘর৷ মকবুল, সুরত আলী, টুনির মত, সেই স্থান থেকে আমরাও বিলীন হয়ে যাচ্ছি! প্রতিবার গল্প শেষ হবার পর, আমি টুনির কথা ভেবে নিজেকে স্বান্তনা দিই, কে জানে টুনিও বোধহয় নিজেকে স্বান্তনা দেয় আমার কথা ভেবেই!

হাজার বছর ধরে: দহনের এপিঠ-ওপিঠ 
আদিবা নুসরাত


মন্তব্য

নাম

অনুবাদ,38,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,2,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,ইচক দুয়েন্দে,23,উৎপলকুমার বসু,26,ঋত্বিক-ঘটক,4,কবিতা,346,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,16,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,81,ছড়া,1,জার্নাল,4,জীবনী,6,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,22,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,173,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,2,বিবৃতি,1,বিশেষ,25,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,42,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,19,সাক্ষাৎকার,23,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,15,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: হাজার বছর ধরে: দহনের এপিঠ-ওপিঠ
হাজার বছর ধরে: দহনের এপিঠ-ওপিঠ
জহির রায়হানের উপন্যাস হাজার বছর ধরে প্রসঙ্গে আদিবা নুসরাতের আলোচনা৷
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEj_7g1HOpRyt2nRUS7h7sI2Ff8yKHHHzzZIHURig8ruH-P6PtYcVSRyqtX9GK1TUvXlMO8_HiIdoH-wYV4Yh3nTlBf0F-xOpJY0foFsezxBS6wGNwmjH94U1jPvKHSwgVrBDtWc95XxoQUpocalfh2Pui9PaM4QBO4Nm3jFROKl0v6w7KpM5wxFCNq6bOc/s16000/Hajar%20Bachhor%20Dhore%20Zahir%20Raihan%20bindu%20littlemag.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEj_7g1HOpRyt2nRUS7h7sI2Ff8yKHHHzzZIHURig8ruH-P6PtYcVSRyqtX9GK1TUvXlMO8_HiIdoH-wYV4Yh3nTlBf0F-xOpJY0foFsezxBS6wGNwmjH94U1jPvKHSwgVrBDtWc95XxoQUpocalfh2Pui9PaM4QBO4Nm3jFROKl0v6w7KpM5wxFCNq6bOc/s72-c/Hajar%20Bachhor%20Dhore%20Zahir%20Raihan%20bindu%20littlemag.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/04/hajar-bachhor-dhore-zahir-raihan.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/04/hajar-bachhor-dhore-zahir-raihan.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy