কী করি আর আমরা! চুপ থাকি আর অগত্যা তাদের হাতে তুলে দিই অভাগা শিশুদের। যেহেতু আর কেউ নাই নেওয়ার মতো। আর টুকে রাখি ক্যালেন্ডারে আমাদের দুর্গতি। আর নরকে বাস করা মানুষদের এক অপার্থিব স্বান্তনা, তারাই দিয়েছেন আমাদের, বেহেশত পাবো, এ প্রতিশ্রুতি। এ ছাড়া আর কিছুই পাওয়ার নেই যে আমাদের, এই দুনিয়ায়। কী করা, সপ্তাহে সাতদিন আমরা আমাদের দুর্গতির কথা না লিখে পারি না, আর তা লুকিয়ে রাখতে কত শতভাবে ব্যর্থ হই। আর নিরুপায় সারাটা বছর কাঁদি, আর আমাদের চোখের পানিতে শিশু, বেহেশত, শিক্ষা সবই ভেসে যায়। আমরা কী পারি আর!
শনিবার: আম্বিয়ার হাত হুজুরের রাগে ভেঙে গেছে, আর আমরা কাঁদি। পিঠে তার বসে গেছে অগুনতি লাঠির দাগ, কী লাল। হুজুর বলেছে, তার ইচ্ছেকে অমান্য করেছে সে। অন্য ছাত্ররাও তাই শিখবে নাকি?
রবিবার: নাসিরের লাশ বাথরুমে পাওয়া গেছে। আমরা কাঁদি। পুলিশ বলেছে, তার পায়ুতে ক্ষত। আর হুজুরও পালিয়েছে।
সোমবার: আয়েশা বলেছে হুজুর তাকে অনেক জোর করে। মাদ্রাসায় সে যাবে না আর। আমরা কাঁদি আর নিরুপায় তাকে আবারও হুজুরের হাতেই দিয়ে আসি।
মঙ্গলবার: কালামকে তিনবার বলাৎকার করেছে হুজুর। এর জন্য শয়তান নাকি দায়ী, তিনি নাকি তার ধোঁকায় পড়ে গেছেন। তো আমরা কাঁদি আর শয়তান যেনো বা হুজুরকে আর ধোঁকা দিতে না পারে সেজন্য দোয়া করি।
বুধবার: মুসা ভয়ে পালিয়েছে। কিন্তু আমরা বাবা-মা তাকে ফের ধরে এনেছি। সে বলেছে, হুজুর খালি মারে, আর যাবো না। আমরা কাঁদি আর তাকে বোঝাই, আমরা তো কাজে বাইরে যাই, কে দেখবে তোকে, পড়াশোনা কি বন্ধ হয়ে যাবে, বাবা? তাকে ফের হুজুরের হাতে দিয়ে আসি। আর হাহাকার করি। দিনরাত আমরা খেটে মরি। আর ভাত জোটাতেই প্রাণ যায় যায়। কখন কোথায় যে যাই ঠিক নাই, তদোপরি থালায় টান। মোমিনকেই বা আমরা কী দেবো থালায়! অগত্যা হুজুরই আশ্রয়।
বৃহস্পতিবার: হুজুরই মা-বাপ। হুজুরই ভরসা। আর কেউ নাই আমাদের। সরকারের বিনা বেতনের স্কুল তো আমার ওসমানরে খাবার দিবো না, রাতে ঘুমানোর সুযোগও দিবো না। তার ওপর রাবেয়ার পেটে বাচ্ছা এসে গেছে। তাকে নাকি হুজুর জোর করে আদর করেছে। আমরা তাকে লুকাতে পারি না আর, তার পেট, হায়, সবাই দেখে, কিন্তু হুজুর তো লুকিয়ে গেছে ঠিকই। তো আমরা শুধু কাঁদি।
শুক্রবার: ইব্রাহিম কী ভালো, হুজুরদের কথা শুনে, হুজুরের আগুন তাকে চরম দহন করলেও, সে নিরুপায় সহ্য করে চলে, আর চুপচাপ থাকে। রহমান খালি মার খায় আর কাঁদে। আমিনাও তাই। আমরা তা দূর থেকে শুনি না। আমাদের সৌভাগ্যই বলা যায়! সন্তানের কান্নার শব্দ কাকেই বা শান্তি দেয়! তাকে তো দেখে রাখে হুজুরেরা। পিটালেও কিছু যায় আসে না! সুশীলেরা শিশুদের জন্য চিল্লায়, প্রতিবাদের রাজনীতি মারায়, সরকারকে দায়িত্ব নিতে ভুলেও বলে না। তাহলে কী করবো আমরা! ফলে হজুরেরা গলা টিপে ধরলেও যে কিছু হয় না, কখনও জান বের হয় না, আর বের হলে তো, কথা নেই, বেহেশতে যাবেই সে! আর তার হাত ধরে কি আমরাও নয়!
অতএব, শেষ কথা, আমরা গরীব। আমাদের কেউ নাই, সরকারও নাই। অতএব সুশীলও নাই, হুজুরও নাই। বরং হুজুর এ নরক সমুদ্রে আমাদের শিশুদের কলাগাছ বানিয়ে নিজেদের শ্বাস ফেলার প্রক্রিয়া চালু রেখেছে কোনরকম। সুশীলেরা তা দেখেও দেখে না, আর রাজনীতিবিদরা তো নয়ই। ভোটের সময় সবাই কতকিছু বলে। অথচ এসব শিশুদের নিয়ে কিছু ভুলেও বলে না তারা। যেনো ওরা এ রাষ্ট্রের কেউ নয়! আর আমরা তো কোন বেহেশত নয়, শিশুর মুখে নগদে অন্ন, শিক্ষা ও মাথার উপর শুধু আশ্রয় খুজি। আর হুজুরেরাই কেবল তা দেয়। তাই আমরা সাগরেই ভাসি। শিশুরাও ভাসে। হুজুরের কলার ভেলা হয়ে রুদ্ধশ্বাস ভাসতেই থাকে ওরা। আমাদের শিশুরা এতো দুর্ভাগা যে যেখানেই যাই লাভ নেই, অভিজাত বংশের নয় বলেই কি ওদের কারো পায়ের তলা থেকেই কখনও জন্ম নেয় না কোন আবে জমজম, আর সকলেই দেখে, বায়ান্ন সপ্তাহের চক্করে আমাদের চোখের পানিতে বছর ভুলেও ফুরায় না।
বারোমাস্যা
▮ রথো রাফি
▮ রথো রাফি




মন্তব্য