জীবদ্দশায় বড় কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে আমন্ত্রণ পাননি, পুরস্কার জোটেনি; প্রায় সব সিনেমাই বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ। তবুও তিনি নির্মাতাদের প্রেরণা; দেশে-বিদেশে তাঁকে, তাঁর সিনেমাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন নির্মাতা, বিশ্লেষকেরা। বলছিলাম ঋত্বিক ঘটকের কথা।
মেঘে ঢাকা তারা, তিতাস একটি নদীর নামসহ ৫০ বছরের জীবনে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা করেছেন আটটি। সেইসব সিনেমার প্রভাব উপমহাদেশ তো বটেই, ছড়িয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী। মৃত্যুর পরই যেন ঋত্বিককে নতুন করে আবিষ্কার করেছে বিশ্ব। কারণ ঋত্বিকের সিনেমায় ছিল নিজস্বতা আর বাঙালি সংস্কৃতির ছাপ। যেখানে অন্যান্যরা বিদেশি সিনেমা থেকে প্রভাবিত হয়ে সিনেমা নির্মাণ করতেন, সেখানে ঋত্বিক ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি ফ্রেমে যেন ধ্বনিত হয়েছে মানুষের বেদনা, বিভাজনের ক্ষত এবং স্বপ্নভঙ্গের ক্রন্দন। সিনেমার শট, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, লাইটিং, এডিটিং দেখলেই বোঝা যায়, ঋত্বিক ছিলেন নিজস্ব স্টাইলে বিশ্বাসী। যেমন শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল, তেমনই অতুলনীয় সাউন্ডট্র্যাক নির্বাচন।
বর্তমানে ঋত্বিকের কদর আকাশছোঁয়া হলেও দুর্ভাগ্যবশত এই নির্মাতার জীবদ্দশায় বাংলা চলচ্চিত্র দর্শকদের দ্বারা ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন। তাঁর অধিকাংশ সিনেমাই প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি। কেবল ‘মেঘে ঢাকা তারা’ কিছুটা সফল হয়েছিল। অথচ তিনি ছিলেন এক বিরল প্রতিভা, যার আবেগের গভীরতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা ভারতীয় সিনেমায় বিরল।
অনবদ্য লেন্স ব্যবহার করে ঋত্বিক সিনেমার যে ভাষা তিনি তৈরি করেছিলেন, তা মাথা ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য। ‘অযান্ত্রিক’ তো একটা গাড়ি নিয়ে। একটা জড়বস্তুমাত্র। ঋত্বিক তাতেও প্রাণ সঞ্চার করে অবাক করে দিলেন। গাড়ির দুঃখ-কষ্ট-বেদনার কথা উঠে এল পর্দায়।
‘সুবর্ণরেখা’ বা ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় তিনি বারবার অতিনাটকীয়তা ব্যবহার করেছেন। আর সেসব মুহূর্তে ভরে দিয়েছেন উথালপাতাল আবেগ। এভাবে পুরো দৃশ্য অন্য স্তরে পৌঁছে গেছে।
ঋত্বিক সিনেমার প্রতিটি দিক জানতেন—ক্যামেরা পরিচালনা, লেন্সের ব্যবহার ও অভিনয়; মঞ্চ ও পর্দায়—উভয় ক্ষেত্রেই ছিলেন দক্ষ। প্রচলিত নিয়ম ভাঙার সাহসিকতা সেই সময় ঋত্বিকই দেখিয়েছিলেন। শুধু সিনেমা নির্মাণে নয়, তাঁর লেখা প্রবন্ধের মধ্যেও নতুন প্রজন্মের পরিচালকদের সাহসী হওয়ার প্রেরণা দিয়েছেন। ঋত্বিকের মৌলিকতা অনুকরণ করা কঠিন হলেও এটি নতুন পরিচালকদের জন্য পথপ্রদর্শক। তিনি শুটিংয়ে মুহূর্তে যেভাবে ইম্প্রোভাইজ করতেন, সেটা ছিল অবিশ্বাস্য।
ঋত্বিক ঘটকের জন্ম ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর। ছেলেবেলায় কিছুদিন কলকাতায় ছিলেন তিনি। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাজশাহী শহরে ফিরে যান তিনি। রাজশাহী শহরের পৈতৃক বাড়িতে শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের একটি অংশ কাটিয়েছেন। ১৯৪৭-এর ভারত বিভাগের পরে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে যায়।
এই বঙ্গ ছেড়ে গেলেও ঋত্বিকের মনের ভেতর সারা জীবনই ছিল বাংলাদেশ। তবে এ দেশে একটি সিনেমাই করেছিলেন তিনি; ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি তৈরি হয়েছিল অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলেন প্রবীর মিত্র, রোজী সামাদ, কবরী, গোলাম মুস্তাফা, আবুল হায়াত।
ঋত্বিকের অন্য সিনেমার মতো এটিও আলোচনায় এসেছে পরে। ২০০৭ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দর্শক, চলচ্চিত্র সমালোচকদের ভোটে ১০টি বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের তালিকা করে; ‘তিতাস’ ছিল সেই তালিকার শীর্ষে।
১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় মৃত্যু হয় ঋত্বিক ঘটকের। জীবদ্দশায় অবহেলা, মৃত্যুর পর স্বীকৃতি—ঋত্বিক ঘটক যেন প্রমাণ করে গেছেন, প্রকৃত শিল্পীকে চিনতে কখনো কখনো সময়েরও অনেকটা সময় লেগে যায়।
লেখক: চলচ্চিত্র সাংবাদিক।
ঋত্বিক ঘটক: জীবদ্দশায় অবহেলা, মৃত্যুর পর অমরত্ম!
▮ মেহেরা রহমান সিমরান
▮ মেহেরা রহমান সিমরান




মন্তব্য