.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

বাংলা নাটক: জন্ম ও বেড়ে ওঠার ইতিবৃত্ত | কানিজ ফাতেমা


বাংলা নাটকের জন্ম ইতিহাসের পিছনে দুটি বিপরীতধর্মী ভাষা ও সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটেছিল। এক জন তাকে জন্ম দিয়েছিল অন্যজন দুগ্ধ দান করে পরিপুষ্ঠ ও সজিব করতে সহায়তা করেছিল। নাটক রাষ্ট্রের সামজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দুরদর্শতার পরিচয় বহন করে সাহিত্যের অন্য যেকোন শাখার চেয়ে বেশি। বাংলা সাহিত্যের এ ধারাটির সমৃদ্ধ ও বিকাশের ইতিহাস জানতে হলে যেতে হবে বেশ কিছুটা পিছনে। অবশ্য প্রথমে জেনে নেওয়া আবশ্যক নাটক সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু বিষয়।

নাটক হলো জীবনের অনুকরণ। সূক্ষাতিসূক্ষ ভাবে মানুষের প্রতিটি আচরনকে পর্বেক্ষণ করে এক ধরণের ইলিউশন তৈরী করা। চারপাশে কী ঘটছে আর কী ঘটা উচিতের মাঝে দারুণ এক সামঞ্জস্যতা বিধান করে নাটক। নাটক একটি জাতীর অখণ্ড জীবন-ইতিহাসের সাথে ওতোপ্রতোভাবে মিশে থাকে। এ কারণে নাটকের চতুরঙ্গ কাঠামোর মাঝে জাতির প্রবাহমান জীবনধারা, তার দ্রষ্টা নাট্যকার, অনুকারক অভিনয়কারীগণ এবং আস্বাদক দর্কমণ্ডলী বিশেষ স্থান নিয়ে অবস্থান করে।

নাটক সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা। নাটক, নাট্য, নট, নটী- এই শব্দগুলোর মূল শব্দ হল নট্। নট্ মানে হচ্ছে নড়াচড়া করা,অঙ্গচালনা করা। নাটকের ইংরেজী প্রতিশব্দ হলো Drama। Drama শব্দটি এসেছে গ্রিক Dracin শব্দ থেকে। যার অর্থ হলো to do বা কোন কিছু করা। নাটকের মধ্যেও আমরা মূলত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নড়াচড়া,কথাবার্তা ইত্যাদির মাধ্যমে জীবনের বিশেষ কোন দিক বা ঘটনার উপস্থাপন দেখতে পাই।

সাহিত্যের প্রাচীন রূপটিকে কাব্য বলা হতো। কাব্য ছিল দুই প্রকার -শ্রব্য কাব্য ও দৃশ্য কাব্য। দৃশ্য কাব্যই মুলত বর্তমান সময়ের নাটক বা অভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা। সংস্কৃতে নাটককে বলা হয়েছে দৃশ্যকাব্য। নাটককে শুধু দেখার বিষয় বললে পুরোটা বলা হয় না, এতে শোনারও বিষয় থাকে। নাটক মঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে দেখা এবং সংলাপ শোনার মাধ্যমে দর্শকের সামনে তুলে ধরা হয়। এটি একটি মিশ্র শিল্পমাধ্যম। সংস্কৃতিতে একে বলা হয়েছে কাব্যের মধ্যে শ্রেষ্ঠ- কাব্যেষু নাটকং রম্যম্। নাটক একই সাথে পড়ার, শোনার ও দেখার। আজকের যুগে অবশ্য নাটক তার দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। মঞ্চের সাথে সাথে টেলিভিশন, রেডিও ও স্যাটেলাইট আজ তার দখলে। সেখানে সে নিজেকে সহস্ররূপে মেলে ধরে সভ্যতার পরিবর্তনকে নিজের মাঝে সম্পৃক্ত করেছে। নাটকের আঙ্গিক ও গঠনকৌশল নিয়ে রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকলে সকল ক্ষেত্রে তা মনে চলা হয় না। তবে প্রথাকে পাশ কাটানোর আগে প্রথা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা আবশ্যক।

পূর্বেই বলা হয়েছে, সাহিত্যের অন্যান্য শাখা মূলত পাঠের জন্য হলেও নাটকপ্রধানত অভিনয়ের জন্য। তাই এর বিশেষ কিছু গঠনবৈশিষ্ট্য রয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে পার্থক্য থাকলেও নাটকে সাধারণত চারটি উপাদান থাকে। সেগুলো হলো-কাহিনী,চরিত্র,সংলাপ,পরিবেশ। নাটকের পাত্রপাত্রী বা চরিত্রগুলোর সংলাপ অথবা পারস্পারিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে একটি কাহিনী গড়ে ওঠে। কাহিনীটি হয়তো মানবজীবনের কোন খন্ডাংশকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। প্রতিটি নাটকে এক বা একাধিক চরিত্র থাকে। নাটকের কাহিনী বা ঘটনা মূলত নাটকের এই পাত্রপাত্রী বা চরিত্রকে নির্ভর করেই গড়ে ওঠে। চরিত্রগুলোর পারস্পারিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ভেতর দিয়নাটকের কাহিনী প্রকাশিত হয়। আবার চরিত্রগুলো মুখর হয় সংলাপের ভেতর দিয়ে। বলা যায়,সংলাপ নাটকের প্রাণ। সংলাপের কাহিনী ও চরিত্রগুলোকে ব্যক্ত করে পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। সংলাপের মাধ্যমেই তৈরি হয় নাট্যপরিস্থিতি। উপন্যাস বা গল্পের লেখকের বর্ণনার মাধ্যমে বিভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি ও ব্যাখা করতে পারেন।নাটকে সে সুযোগ থাকে না। এ ক্ষেত্রে প্রধান অবলম্বন সংলাপ। তাই নাটকের সার্থকতা অনেকাংশে নির্ভর করে সংলাপের ওপর।নাটকের কাহিনী, চরিত্র বা সংলাপ সংযোজনার জন্য নাট্যকারকে তৈরি করতে হয় উপযুক্ত পরিবেশের। অর্থাৎ কোন পরিবেশ বা পরিস্থিতিতে এ ঘটনাটি ঘটছে বা কোন পরিবেশ পরিস্থিতিতে চরিত্র এ আচরণ করছে বা সংলাপ বলছে তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হয়। মঞ্চনাটকে মঞ্চসজ্জ,আলোকসম্পাত,শব্দযোজনা ইত্যাদির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে এ পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এ কাজটি মূলত করেন নাট্য নির্দেশক। নাট্যকার তাঁর নাটকেই এর নির্দেশনা রাখেন। তবে উত্তম নাটকের বৈশিষ্ট্য হলো সংলাপের বা অভিনয়ের ভেতর দিয়েই নাটকের পরিবেশ সৃষ্টি করা। নাটকের এই উপাদানগুলোকে একত্র করলেই সফল নাটক সৃষ্টি হয় না, নাটকে বিভিন্ন প্রকার ঐক্য রক্ষা করতে হয়। সনাতনপন্থী নাট্যকারগণ নাটকে তিনটি ঐক্যনীতি মেনে চলতেন। সেগুলো হলো:

১. সময়ের ঐক্য: নাটকীয় আখ্যানভাগ রঙ্গমঞ্চে দেখাতে যতক্ষণ সময় লাগে, বাস্তব জীবনে সংঘটিত হতে যেন ঠিক ততক্ষণ লাগে, এদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এরিস্টটল এই কাল-নির্দেশ করতে গিয়ে একে 'সিঙ্গেল রিভোলিউশন অব দ্য সান' অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন।

২. স্থানের ঐক্য: নাটকে এমন কোন স্থানের উল্লেখ থাকতে পারবে না, যেখানে নাট্য-নির্দেশিত সময়ের মধ্যে নাটকের কুশীলবগণ যাতায়াত করতে পারে না।

৩. ঘটনার ঐক্য: নাটকে এমন কোন দৃশ্য বা চরিত্র সমাবেশ থাকবে না, যাতে নাটকের মূল সুর ব্যাহত হতে পারে। সমস্ত চরিত্র ও দৃশ্যই নাটকের মূল বিষয় ও সুরের পরিপোষকরূপে প্রদর্শিত হওয়া চাই এবং নাটকটি যেন আদি, মধ্য ও অন্ত-সমন্বিত একটি অখণ্ডরূপে পরিস্ফুট হয়।

ইংরেজি সাহিত্যে বেন জনসন ঐক্যনীতি মেনে চলেছেন এবং শেক্সপিয়ার মাত্র দ্য টেম্পেস্ট এবং দ্য কমেডি অব এরর'স-এ এই নিয়ম মেনে চলেছেন। এইখানে উল্লেখযোগ্য যে, প্রাচীন সংস্কৃত নাটকে কাল, স্থান ও ঘটনার ঐক্য অনুঃসৃত হয়নি। ভবভূতির 'মহাবীর চরিত্রে' দ্বাদশবর্ষের ঘটনা নাট্যাকারে পরিবেশিত হয়েছে। চরিত্রে দ্বাদশবর্ষের ঘটনা নাট্যাকারে পরিবেশিত হয়েছে।নাটকে একটি কাহিনী যেভাবে অগ্রসর হয় তাকে পাঁচটি পর্বে বিভক্ত করা হয়।পর্ব গুলো হল:

১. কাহিনীর আরম্ভ বা মুখ
২. কাহিনীর ক্রমব্যাপ্তি বা প্রতিমুখ
৩. কাহিনীর উৎকর্ষ বা চূড়ান্ত দ্বন্দ্ব বা গর্ভ
৪. গ্রন্থিমোচন বা বিমর্ষ
৫. যবনিকাপাত বা উপসংহতি

অর্থাৎ একটি নাটক শুরু হওয়ার পর তার কাহিনীর বিকাশ ঘটবে, বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে কাহিনীটি চূড়ান্ত দ্বন্দ্বমুহূর্ত সৃষ্টি হবে। তারপর কোন সত্য বা তথ্য প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে নাটকটির চূড়ান্ত দ্বন্দ্বপরিণতির দিকে যাবে এবং সবশেষে একটি পরিসমাপ্তি ঘটবে।1এর পরে আসে শ্রেণিবিভাগ। নাটকের শ্রেণীবিভাগ কোনো বিশেষ বিষয়কে ভিত্তি করে করা হয়নি। নানারকম বিষয়বস্তু অনুসারে নাটককে নানাভাবে শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে। নাটকের শ্রেণীবিভাগগুলো এরকম:

ক) ভাব সংবেদনা রীতি অনুসারে-

     ১. ট্রাজেডি 
     ২. কমেডি 
     ৩..ট্রাজেডি-কমেডি
     ৪. মেলোড্রামা 
     ৫. ফার্স

খ) বিষয়বস্তুর উৎসরীতি অনুসারে-

     ১. পৌরাণিক 
     ২. ঐতিহাসিক 
     ৩. ঐতিহাসিককল্প চরিত্রমূলক 
     ৪. সামাজিক 
     ৫.পারিবারিক 
     ৬. উপকথাশ্রয়ী 
     ৭.কাল্পনিক

গ) বিষয়বস্তুর প্রকৃতি অনুসারে-

     ১. ধর্মমূলক 
     ২. নীতিমূলক 
     ৩. আধ্যাত্মিক 
     ৪. রাজনৈতিক
     ৫. অর্থনৈতিক 
     ৬. প্রেমমূলক 
     ৭. দেশপ্রেমমূলক 
     ৮. সমাজরীতিমূলক 
     ৯. ষড়যন্ত্রমূলক 
     ১০.রোমাঞ্চকর দুঃস্বাহসমূলক 
     ১১. অপরাধ আবিষ্কারমূলক

ঘ) উপাদানযোজনা বৈশিষ্ট্য অনুসারে-

     ১. গীতিনাট্য বা অপেরা 
     ২. যাত্রা 
     ৩. নৃত্যনাট্য 
     ৪. নাটক বা ড্রামা

ঙ) আয়তন বা অঙ্কসংখ্যা অনুসারে-

     ১. মহানাটক 
     ২. নাটক 
     ৩. নাটিকা 
     ৪. একাঙ্কিকা

চ) গঠন রীতি অনুসারে-

     ১. ক্লাসিক্যাল 
     ২. রোমান্টিক 
     ৩. দৃশ্যাবলী

ছ) রচনারীতি অনুসারে-

     ১. পদ্যনাটক 
     ২. গদ্যনাটক 
     ৩. গদ্য-পদ্যময় নাটক 

জ) উপস্থাপনারীতি অনুসারে-

     ১. বাস্তবিক নাটক 
     ২.ভাবতান্ত্রিক নাটক 
     ৩. রূপক নাটক 
     ৪. সাংকেতিক নাটক 
     ৫.এক্সপ্রেশানিস্টিক নাটক

ঝ) উদ্দেশ্য অনুসারে-

     ১. ঘটনামূখ্য (মোলোড্রামা) 
     ২. চরিত্রমূখ্য (চরিত্রনাট্য) 
     ৩. রসমূখ্য (রসনাট্য) 
     ৪.তত্ত্বমূখ্য (তত্ত্বনাটক)

এবার চলে যাই বাংলা নাটকের জন্ম ইতিহাসের বেশ খানিকটা সময় পূর্বে। প্রচীনকাল হতেই আমাদের দেশে নাটকের দুটি ধারা প্রচলিত ছিল। একটি সংস্কৃত নাটকের ধারা, অন্যটি দেশীয় যাত্রার ধারা। খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দী হতে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সংস্কৃত নাটকের গৌরবময় বিকাশ চলেছিল। নাট্য সাহিত্যের উৎপত্তি সম্পর্কে ভারতে মুনির নাট্যশাস্ত্রে যে কাহিনীর উল্লেখ আছে, তা হলো সৃষ্টির পর ইন্দ্র ব্র্হ্মার নিকট আবেদন করলেন, চক্ষু কর্ণের আনন্দ বিধায়ক এমন একটি উপায় উদ্ভাবন করার জন্যে, যাতে সকলেরই অধিকার থাকবে। তাঁর আবেদন ব্যর্থ হল না। ব্রহ্মা ঋগবেদ হতে বাণী, সামবেদ হতে গীতি, ঋজুবেদ হতে অভিনয় এবং অথর্ব বেদ হতে অনুভূতি ও রস গ্রহণ করে অপর একটি বেদ সৃষ্টি করলেন। এ বেদই পঞ্চম বেদ বা নাট্য বেদ নামে পরিচিত। দেব শিল্পী বিশ্বকর্মা ব্রহ্মার আদেশে এক নাট্যশালা নির্মাণ করলেন। ভরত ও তার একমত শিষ্যের তত্ত্বাবধানে যে নাট্যশালায় প্রথম নাটক অভিনীত হয়, সে নাটকের বিষয়বস্তু ছিল দেবগণের পরাভব। নহুষ ইন্দ্রপদ লাভ করলে তিনি চাইলেন, এ নাট্যবেদ পৃথিবীতে প্রচারিত হোক। তাই ভরতের সন্তানগণই পৃথিবীতে প্রেরিত হলেন। তদবধি এ নাট্যবেদ পৃথিবীতে প্রচারিত হয়ে আসছে সকল জাতির সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ ঋগবেদ। এ ঋগবেদে এমন কতকগুলো যুক্ত আছে যাকে সম্পূর্ণ নাট্য সাহিত্যের প্রথম রূপ বলে ধরে নিতে কোন অসুবিধা নেই এবং এগুলোর সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। এগুলো সংবাদ যুক্ত নামে পরিচিত। ঋগবেদের সময়ই স্ত্রী পুরুষগণ উত্তম পোশাকে সজ্জিত হয়ে নৃত্যগীত করতেন। বেদের সম্পর্কে নাটকের বীজ পরিলক্ষিত হয়। রামায়ন মহাভারতে অনেকস্থলেই দেখা যায় পুরোপুরি নাটকীয় ঘটনার সূত্রপাত এবং তা অভিনয়ের জন্য খুবই উপাদেয়। সুতরাং সংস্কৃত নাটক সৃষ্টির মূলে ঋগবেদ, রামায়ন ও মহাভারতের দান অস্বীকার করা যায় না। অনেকে মনে করেন পুতল নাচ থেকে নাট্য সাহিত্যের উৎপত্তি হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন ছায়ানৃত্য থেকেই এর উৎপত্তি।3 সংস্কৃত নাটকের উদ্ভব ও সম্প্রসারণ বুদ্ধিজীবী বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের দ্বারা হয়েছিল।ফলে নাটকের বিকাশ ও আবেদন অতি সংকীর্ণ সীমার মধ্যে আবদ্ধ ছিল। কারণ সংস্কৃত নাটক অতি অলঙ্কারপূর্ণ ও কবিত্বসমৃদ্ধ ছিল যা কতিপয় নির্বাচিত জ্ঞানী এবং বয়স্ক ব্যক্তি ছাড়া দেশের অধিকাংশ সাধারণ লোকের কাছে বোধগম্য ছিল না। একাদশ শতাব্দীর পর মুসলমানদের দ্বারা ভারত বিজিত হলে, পৃষ্ঠপোষকতা না পেয়ে সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যের বিলোপ ঘটে। রাজদরবার হতে নির্বাসিত নাটক সাধারনের হৃদয়ে আসনলাভ করে। এবং তখন থেকেই মানুষের নাট্যরস উপভোগ করবার চিরন্তন ইচ্ছা পূরণ করবার মধ্যদিয়ে এদেশে ‘যাত্রা’ প্রসার লাভ করে। যাত্রাপালার মাঝে এদেশের সাধারণ মানুষ নিজেদের রুচি ও চাহিদার সামঞ্জস্য দেখতে পায়। অতি প্রাচনীনকাল থেকেই চলে আসা এই যাত্রার প্রথম দিকে দেবতার লীলা উপলক্ষে মানুষের এক জায়গা হতে অন্য এক জায়গায় গমন করে নাচ গানের মাধ্যমে দেবতার মাহাত্ম্য প্রকাশ করার সাথে সম্পর্কিত ছিল।4 বিশেষ করে অষ্টম ও নবম শতকে এদেশে পালাগান ও পালার অভিনয় প্রচলিত ছিল। শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পূর্বে রাঢ়, বঙ্গ, সমতট, গৌড়, পুণ্ড্র, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল, শ্রীহট্টসহ সমগ্র ভূখণ্ডে পালাগান ও কাহিনিকাব্যের অভিনয় প্রচলিত ছিল।  শিবের গাজন, রামযাত্রা,কেষ্টযাত্রা, সীতার বারোমাসী, রাধার বারোমাসীর সাথে সাথে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী অভিনয় করে দেখানো হতো।এই ধর্মীয় উৎসব হতেই একসময় যাত্রার উৎপত্তি ঘটে। অষ্টাদশ শতকে (১৭০০ সাল) যাত্রা বাংলা ভূখণ্ডের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাস প্রভৃতি ছিলেন যাত্রার জগতে প্রসিদ্ধ কারিগর।5 উনবিংশ শতকে পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক যাত্রা খুব জনপ্রিয়তা পায়। মতিলাল রায় ও নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের যাত্রাদল বেশ নামকরে।  কৃষ্ণলীলা এবং রামায়ণ-মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনির পাশাপাশি বিদ্যাসুন্দর, লাইলি মজনু, ইউসুফ জোলেখা, বেহুলা লখিন্দর, মা মনসা, লক্ষ্মীর মহিমা, কমলাবতী রানী, ইত্যাদি প্রেমকাহিনি ও লোকজ কাহিনির অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে। উনবিংশ শতকের শেষে এবং বিশশতকের শুরুর দিকে যাত্রায় দেশপ্রেমমূলক কাহিনির অভিনয় শুরু হয়। কালক্রমে মুসলমান রাজত্বের অবসান ও ইংরেজ শাসনের অরাজকতার ফলে যাত্রায় বিকৃতি ঘটে।6 পরবর্তীতে পাশ্চাত্য শিক্ষা-দীক্ষার সংস্পর্শ বাংলার মানুষের রুচি ও বিবেচনাবোধে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটায়। বাস্তব জীবনের সাথে মিলহীন আবেগময় অসম্ভব দীর্ঘ সংলাপের মাধ্যমে যাত্রার উপখ্যান দৃশ্য বর্ণিত হওয়ার বিষয়টি এ সময় মানুষকে আর আকর্ষন করতে সক্ষম হয় না। ঠিক সেই সময়টিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের এক ধরণের কাহিনী উপস্থাপন কৌশল বাঙালি প্রত্যক্ষ করে। রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে উনিশ শতকের আধুনিক, শিক্ষিত ও নব্য নাগরিক সমাজ পাশ্চাত্য হতে সরাসরি নাটককে নিয়ে আসেন বাংলার অভ্যান্তরে। তাই নাটকের প্রচলন শুরু হবার পূর্বে বাংলার প্রাণে যাত্রাপালার সুধাস্রোত ফল্গুধারার ন্যায় বহমান থাকলেও মনে রাখো জরুরী আধুনিক বাংলা নাটক যাত্রার সংশোধিত এবং মার্জিত নাগরিক রূপ নয়। তবে সংলাপ উপস্থান ও দর্শকরুচি অনুধাবনে যাত্রার নিকট নাটক কিছুটা হলেও ঋনী।

অষ্টাদশ শতকে নতুন ধনতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতাকে উপলক্ষ করে বাংলায় এক নতুন নাগরিক সমাজ গড়ে উঠেছিল। ইংরেজদের প্রয়োজনে। কোলকাতায় ১৭৫৩ সালে ইংরেজি নাটক অভিনয়ের উদ্দেশ্যে থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় থেকেই নাটক অভিনয়ের একটি স্পষ্ট প্রচেষ্টা এদেশে দেখা দিতে থাকে। ১৭৯৫ সালে রুশদেশীয় ‘হেরোসিম লেবেডফ’ কলকাতায় প্রথম ‘বেঙ্গলী থিয়েটার’ নামে একটি নাট্যশালা স্থাপন করেন। তিনি তাঁর ভাষা শিক্ষক গোলকানাথ দাসকে দিয়ে   Disguise I Love is the best Doctor নামক প্রহসন দুটির বাংলা অনুবাদ করান।7 তিনি দেশীয়দের রুচি অনুযায়ী এ নাটকে “বিদ্যাসুন্দর” যাত্রা থেকে অনেক গানও দেশীয় কিছু টাইপ চরিত্র প্রবর্তন করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এ দেশীয়রা ব্যঙ্গ-কৌতুক এবং পরিহাসের পক্ষপাতী। ইংরেজদের সাথে সাথে নাট্যপ্রিয় ধনশালী বাঙালিও এ বিষয়ে উদযোগী হন। ১৮৩১ সালে ‘প্রসন্নকুমার ঠাকুর’ “হিন্দু থিয়েটার” প্রতিষ্ঠা করেন। তখনকার দিনে বাংলা নাটককে শিক্ষিতরা অবজ্ঞা মিশ্রিত অনুকম্পার চোখে দেখত। ফলে এখানে ‘জুলিয়াস সিজার’ ও ‘উত্তরামচরিত’ ইংরেজিতে অভিনীত হত।

১৮৩৩ সালে নবীনবসু একটি নাট্যশালা প্রতিষ্ঠা করেন। এখানেই প্রথম বাংলা নাটক ‘বিদ্যাসুন্দর (১৮৩৫) অভিনীত হয়। অল্পকালের মধ্যে আরো কয়েকটি নাট্যশালার প্রতিষ্ঠা হয়। উল্লেখযোগ্য হল- বিদ্যোৎসাহিনী রঙ্গমঞ্চ, বেলগাছিয়া নাট্যশালা, পাথারিয়াঘাটা রঙ্গনাট্যালয়, জোড়াসাঁকো নাট্যশালা ইত্যাদি। এসব নাট্যশালায় অভিনয়ের জন্য বাংলা নাটকের চাহিদা বাড়তে থাকে ফলে বাংলা নাট্যসাহিত্যের আঙ্গিনায় নাট্যকারগণ প্রবেশ করতে থাকেন। তবে মধুসূদনের পূর্বে রচিত বাংলা নাটক কোনো অভিনব মৌলিকত্বের দাবী করতে পারে না। কারণ সংস্ক্রত সূতিকাগৃহের চিহ্ন এদের অঙ্গে সুপরিস্ফুট । প্রথম পর্যায়ের নাটক গুলো ছিল মূলত অনুবাদ। অনুবাদক নাট্যকারদের দ্বারাই বাংলা নাটকের অভ্যুদয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল। ইংরেজী ও সংস্কৃত উভয় প্রকার নাটকেরই অনুবাদ হলেও প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃত নাটকের রীতি ও আদর্শই এই সময় অনূদিত বাংলা নাট্যসাহিত্যকে নিয়ন্ত্রিত করে রেখেছিল। অনুবাদকের মধ্যে প্রথেমেই হরচন্দ্র ঘোষের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রায় সব নাটকেই কোনো না কোন গ্রন্থের অনুবাদ। কাহিনীর দিক থেকে মৌলিকতা তাঁর নেই। তাঁর নাটকের ভাষা সংস্কৃত শব্দে আড়ষ্ট এবং নান্দী, সূত্রাধার প্রভৃতি সংস্কৃত রীতিও এতে আছে। নাট্যমঞ্চের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক না থাকায় তাঁর কোন নাটক অভিনীত হয়নি। বাংলা নাটকের ইতিহাসে তাঁর মূল্য বেশি নয়। তাঁর নাটক সমূহ-

(১) ‘ভানুমতী চিত্তবিলাস’ (১৮৫২) শেক্সপীয়রের Marchat of venice নাটকের ভাবানুবাদ। ভাষা গদ্য ও পদ্য ধর্মী এবং চরিত্রগুলোকে কিছুটা নতুনভাবে দেখিয়েছেন।

(২)  ‘কৌরব বিয়োগ’ (১৮৫৮) নাটকটি পাশ্চাত্য রীতি অনুসারে পঞ্চঙ্ক বিশিষ্ট। সংলাপ নিস্প্রান আড়ষ্টতায় আবদ্ধ। চরিত্রাঙ্কনে লেখকের অক্ষমতার জন্য কোন চরিত্রই সজীব রসঙ্গতি লাভ করে নি। রচনাটি ছিল নাট্যিক না হয়ে ছিল বিবরণমূলক।

(৩)  চারুসুখ-চিত্তহার (১৮৬৪) ‘ÔRomeo and Juliet এর অনুবাদ। দেশীয় রুচি অনুযায়ী চিত্রায়ণ করেছেন। কথ্য ভাষা ব্যবহারের চেষ্টা আশানুরূপ সাফল্য দিতে সক্ষম হয় নি।

(৪) ‘রজতাগিরি নন্দিনী (১৮৭৪) নাটকটির মাঝে নাট্যিক ক্রিয়াকলাপের ব্যবহার খূব কম লক্ষ্য করা যায়। নাটক হিসেবে এটি সাফল্যের মুখ তেমন প্রত্যক্ষ করেনি।

যোগেন্দ্রচন্দ্র গুপ্তের ‘কীর্তিবিলাস নাটক’ (১৮৫২) সর্ব প্রথম বিয়োগান্ত নাটক। সপত্নী-পুত্র বিদ্বেষ এবং তার নিষ্ঠুর পরিনতি দেখান হয়েছে এ নাটকে। দেশীয় জীবনধারা সম্পর্কে আজন্মবদ্ধ ধারণা ও পাশ্চাত্য নাট্যকলার পুঁথিগত বিদ্যা নিয়ে যোগেন্দ্রগুপ্ত যে নাটক লিখেছেন ঐতিহাসিক মূল্য ছাড়া তার আর কোনো সার্থকতা এখানে নেই। তারাচরণ শিকদারের ‘ভদ্রার্জুন’ (১৮৫২) প্রথম সার্থক নাটক। নাটকটির উপজীব্য অর্জুন কর্তৃক সুভদ্রা হরণ। কাহিনীর সুসংহত গতি, নাটকীয় কৌতুহল এবং সংলাপগত স্বাচ্ছন্দ্য লক্ষ্য করা যায়। উনিবিংশ শতাব্দীতে যে সব কৃতবিদ্য প্রতিষ্ঠাসম্পন্ন লোক বাঙালি জাতির মুখোজ্জ্বল করেছিল কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁদের অন্যতম। বাংলা নাটক রচনা, রঙ্গালয় স্থাপন, নাটকে অভিনয় ও উৎসাহদানে তাঁর অবদান প্রশংসার দাবী রাখে। তাঁর সহায়তা এবং উৎসাহ বাংলা ভাষার কথ্য-বাচনভঙ্গীর রূপ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং নাটকের অভিনয় এবং নাটক রচনার পথ সুগম হয়েছিল। তিনি কালিদাসের ‘বিক্রমোর্বশী’ (১৮৫৯), ভবভূতির ‘মালতী মাধব’ (১৮৫৮) মহাভারতের উপাখ্যান অবলম্বনে ‘সাবিত্রী-সত্যবান’ (১৮৫৮) রচনা করেন। তাঁর প্রথম নাট্যরচনা ‘বাবু’ ছিল একটি প্রহসন। ‘মালতীমাধব’ নাটকটি নির্ভুল চলতি ভাষায় লেখা। মধুসূদনের পূর্বের নাট্যকারদের মধ্যে রামনারায়ণ তর্করত্ন ছিলেন (১৮২২-১৮৩৬) শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। তাঁর নাটক সংস্কৃতগন্ধী। তাঁর নাটকের প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তিরূপে ছিল সমাজ-সংস্কার, চেতনা কৌলিন্য প্রথা। বুহবিবাহ, বিধবা বিবাহ, বাল্যবিবাহ। উনবিংশ শতাব্দিতে পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রদীপ্ত আলোকে আমাদের সমাজের বহুকাল পোষিত অনেক কুৎসিত ব্যাধির নগ্নরূপ প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এ ব্যাধি দূর করতে রামহোহন, বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে সমাজ জীবনে ব্যাপক আন্দোলনের জোয়ার বইতে থাকে । সাহিত্যেও তাঁর প্রতিফলন অনিবার্য ভাবে দেখা দেয়।8 নাট্যক্ষেত্রে এই সংস্কারের গুরুভার নিয়ে অবর্তীর্ণ হন রামনারায়ণ তর্করত্ন। তাঁর সমাজিক নাটকগুলো হলো:

(১) ‘কুলীনকুল সর্বস্ব’ (১৮৫৪) তাঁর প্রথম নাটক। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সামাজিক নাটক। হিন্দু সমাজের কৌলিন্য প্রথাকে কেন্দ্র করে নাটকটি লিখিত। এ নাটকটির মধ্য দিয়ে তিনি সমকালে প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এ নাটকটি প্রথম সাধারণের মধ্যে এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্য ও সন্তোষের সঞ্চার করে। তিনি নাটকটির মধ্য দিয়ে সমাজের একটি কুৎসিত প্রথাকে ব্যঙ্গ করে ভাঙতে চেয়েছেন- কিন্তু নতুন কোন আদর্শের দিশরী হতে পারেননি।

(২) বহুবিবাহের কুফল নিয়ে ‘নবনাটক’ (১৮৬৬) রচিত হয়েছে। নাটক ‘ট্রাজেডি’ সৃষ্টির চেষ্টা রয়েছে। জটিল কাহিনী সাভাবিক গতিতে অনিবার্য পরিনতিতে যেতে পারেনি। ভাষা বিন্যাসও পরিনতি সৃষ্টিতে ‘নীলদর্পনের’ প্রভাব রয়েছে। প্রহসন রচনায় রামনারায়ণের পটুত্ব রয়েছে। স্বচ্ছ ও লঘু সংলাপ এবং বাগবৈদগ্ধ সষ্টিতে দক্ষ ছিলেন। পরস্ত্রীর প্রতি আসক্তি ও সপত্নী-সমস্যা নিয়ে লিখিত প্রহসন তিনটি হল- যেমন কর্ম তেমন ফল (১২৭৯),চক্ষুদান (১৮৬৯),উভয় সঙ্কট (১৮৬৯)।এছাড়া পৌরনিক নাটকের ক্ষেত্রেও তিনি দেখিয়েছেন কৃতিত্ব। যেমন:

(১) রুক্ষ্মিনীহরণ (১৮৭১) নাটকটি পুরাণের অনুবাদ বা অন্ধ অনুবর্তন না। চরিত্র সৃষ্টি এবং কুশলী ঘটনাবিন্যাস করে পৌরনিক বৃত্তান্তকে নাট্যরসোত্তীর্ণ করে তুলেছেন। প্রাচীন চরিত্রগুলি আলৌকিক ভাব ছিন্ন করে লৌকিক বাস্তবরসে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সংস্কৃত শব্দবর্জিত চলিত ভাষার ব্যবহার হয়েছে।

(২) কংসবধ (১৮৭৫): সংলাপের দীর্ঘতা ও আধ্যাত্ম্যিক উচ্ছাসের জন্য নাটকখানি ততটা সরস হতে পারেনি। ধর্ম বিজয় (১৮৭৫) তাঁর অপর পৌরাণিক নাটক। এর পাশাপাশি অনুবাদ মূলক নাটক রচনায়ও তিনি তাঁর সক্ষমতা প্রদর্শনে সক্ষম হন। বেনীসংহার (১৮৫৬), রত্নাবলী (১৮৫৮), অভিজ্ঞান শকুন্তল (১৮৬০), মালতী মাধব (১৮৬৭) । রামনারায়ণ তর্করত্ন নাটকের প্রাথমিককালে প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁকে বলা হতো নাটুকে ‘নাটুকে রামনারায়ণ’ । অবশ্য তাঁর এ সাফল্যেরে পিছনে রয়েছে উনিশ শতকের নবজাগরণশীল নাগরিক বাঙালি সমাজের সার্বিক আকৃতিকে আত্মসাৎ করার কারনে। এরপরে সামাজিক সমস্যাশ্রিত বিষয়ে অতি-উচ্ছসিত কাহিনী অবলম্বনে নাটক রচনার পর উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নাট্যসাহিত্য, রেনেসাঁর মর্মযন্ত্রণা বিদ্ধ হয়ে নিজেকে আমুল ভাবে পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়। পাশ্চত্য চেতনার জারকরসে জারিত হয়ে বাংলা নাটকে যিনি প্রথম অখণ্ড ও শিল্পিত জীবনবোধের উদ্ভোধনকে সম্ভব করে তোলেন তিনি রেনেসাঁস বিদ্ধ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বাংলা নাটকে মাইকেল মধুসূদনের আবির্ভাব আকস্মিক। ১৮৫২ সালে তারাচরণ শিকদার, জে. সি. গুপ্ত ও রামনারায়ণ তর্করত্নের হাত ধরে বাংলায় শৌখিন রঙ্গমঞ্চে নাট্য মঞ্চায়ন শুরু হয়। এই সময় লেখা নাটকগুলির গুণগত মান খুব ভালো ছিল না। ১৮৫৮ সালে পাইকপাড়ার জমিদার ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ ও প্রতাপচন্দ্র সিংহের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চে রামনারায়ণ তর্করত্নের রত্নাবলী নাটকটি অভিনীত হয়। শিল্পগুণবিবর্জিত এই সাধারণ নাটকটির জন্য জমিদারদের বিপুল অর্থব্যয় ও উৎসাহ দেখে মধুসূদনের শিক্ষিত মন ব্যথিত হয়ে ওঠে। এরপর তিনি নিজেই নাট্যরচনায় ব্রতী হন। রামনারায়ণ তর্করত্নের সংস্কৃত নাট্যশৈলীর প্রথা ভেঙে তিনি পাশ্চাত্য শৈলীর অনুসরণে প্রথম আধুনিক বাংলা নাটক রচনা করেন।

মাইকেল মধুসূদনের নাট্যচর্চার কাল ও রচিত নাটকের সংখ্যা দুইই সীমিত। ১৮৫৯ থেকে ১৮৬১ - এই তিন বছর তিনি নাট্যচর্চা করেন। এই সময়ে তার রচিত নাটকগুলি হল : শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯), একেই কি বলে সভ্যতা (১৮৬০), বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০), পদ্মাবতী (১৮৬০), কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১)। এছাড়া মৃত্যুর পূর্বে মায়াকানন (১৮৭৪) নামে একটি অসমাপ্ত নাটক।

শর্মিষ্ঠা একটি পৌরাণিক নাটক। রচনাকাল ১৮৫৯। এটিই আধুনিক পাশ্চাত্য শৈলীতে রচিত প্রথম বাংলা নাটক। নাটকের আখ্যানবস্তু মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত রাজা যযাতি, শর্মিষ্ঠা ও দেবযানীর ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনী থেকে গৃহীত। অবশ্য পাশ্চাত্য নাট্যশৈলীতে লিখলেও, মাইকেল এই নাটকে সংস্কৃত শৈলীকে সম্পূর্ণ বর্জন করেন নি। এই নাটকের কাব্য ও অলংকার-বহুল দীর্ঘ সংলাপ, ঘটনার বর্ণনাত্মক রীতি, প্রবেশক, নটী, বিদুষক প্রভৃতির ব্যবহার সংস্কৃত শৈলীর অনুরূপ। আবার ইংরেজি সাহিত্যের রোম্যান্টিক ধারার প্রভাবও এই নাটকে স্পষ্ট। প্রথম রচনা হিসেবে ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও, সেই যুগের ইংরেজি-শিক্ষিত পাঠকসমাজে এই নাটকটি খুবই সমাদৃত হয়। বেলগাছিয়া রঙ্গমঞ্চে সাফল্যের সঙ্গে নাটকটি অভিনীতও হয়।

শর্মিষ্ঠার পরে ১৮৬০ সালে মাইকেল রচনা করেন একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ নামে দুটি প্রহসন। এই প্রহসন দুটি তার দুটি শ্রেষ্ঠ নাট্যরচনা। প্রথম নাটকটির বিষয় ছিল ইংরেজি শিক্ষিত নব্য বাবু সম্প্রদায়ের উচ্ছৃঙ্খলতা ও দ্বিতীয়টির বিষয় ছিল সনাতনপন্থী সমাজপতিদের নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন। এই নাটকে মাইকেলের পর্যবেক্ষণ শক্তি, সমাজবাস্তবতাবোধ ও কাহিনী, চরিত্র ও সংলাপ রচনায় কুশলতা বিশেষ প্রশংসা লাভ করে। কিন্তু নাটকের বিষয়বস্তু নব্য ও সনাতনপন্থী উভয় সমাজকেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। তাই বেলগাছিয়া রঙ্গমঞ্চে নাটকটি অভিনীত হওয়ার কথা থাকলেও, শেষপর্যন্ত তা হয় নি। এতে মাইকেল খুবই হতাশ হয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে প্রহসন রচনা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন।

১৮৬০ সালেই মধুসূদন রচনা করেন পদ্মাবতী নাটকটি। এটিও পৌরাণিক নাটক। তবে এই নাটকের ভিত্তি পুরোপুরি ভারতীয় পুরাণ নয়। গ্রিক পুরাণের ‘অ্যাপেল অফ ডিসকর্ড’ গল্পটি ভারতীয় পুরাণের মোড়কে পরিবেশন করেছেন মধুসূদন। গ্রিক পুরাণের জুনো, প্যালাস ও ভেনাস এই নাটকে হয়েছেন শচী, মুরজা ও রতি। হেলেন ও প্যারিস হয়েছেন পদ্মাবতী ও ইন্দ্রনীল। তিন দেবীর মধ্যে রতিকে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নির্বাচিত করলে অন্য দুই দেবী ইন্দ্রনীলের প্রতি রুষ্টা হন এবং ইন্দ্রনীলের জীবনে বিপর্যয় নামিয়ে আনেন। শেষে রতি ও ভগবতীর চেষ্টায় ইন্দ্রনীল উদ্ধার পান এবং বিচ্ছিন্না স্ত্রী পদ্মাবতীর সঙ্গে তার মিলন ঘটে। মূল গ্রিক উপাখ্যানটি বিয়োগান্তক হলেও, মাইকেল এই নাটকটিকে ইংরেজি ট্র্যাজি-কমেডির ধাঁচে করেছেন মিলনান্তক। এই নাটকে সংস্কৃত নাট্যরীতির প্রভাব অল্পই। প্লট-নির্মাণ, নাটকীয় দ্বন্দ্ব উপস্থাপনা ও চরিত্র চিত্রণে মাইকেল এখানে আগের থেকে পরিণত হয়েছেন।

কৃষ্ণকুমারী নাটক রচনার পর মাইকেল কাব্যরচনায় পুরোদমে মনোনিবেশ করেন। শেষ জীবনে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বেঙ্গল থিয়েটারের কর্ণধার শরচ্চন্দ্র ঘোষের অনুরোধে তিনি মায়াকানন নাটকটি রচনায় হাত দেন। নাটকটি তিনি শেষ করতে পারেন নি। করেছিলেন ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। এই নাটকটির শিল্পমূল্য বিশেষ নেই। মাইকেলের সৃষ্টিপ্রতিভার কোনো সাক্ষর এতে পাওয়া যায় না। মধুসূদনের প্রতিভার স্পর্শে বঙ্গের ‘অলীক কুনাট্য’ যথার্থ নাটকের মর্যাদা পেল। মধুসূদন বাংলা নাটককে সংস্কৃত অলঙ্কার শাস্ত্রের আচ্ছাদন থেকে যথাসম্ভব মুক্ত করে পাশ্চাত্য নাটকের অনুকরণে সার্থক নাটক রচনা করেন। আঙ্গিকের নতুনত্বে, কাহিনীর দৃঢ়তায়, সংলাপের নির্মাণের দক্ষতায়, চরিত্র সৃষ্টির কৌশলে, নারী চরিত্রকে প্রাধান্য দানে, চরিত্রের উপর রেনেসাঁসীয় বৈশিষ্ট্য আরোপে মধুমূদন ছিলেন যথার্থ অর্থে বাংলা নাটকের মুক্তিদাতা। মধুসূদনের নাট্য প্রতিভার পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা। তাঁর নাটকের নাটকীয়তা কম। সংলাপ অতিদীর্ঘ ও একথেয়ে এবং কবিত্বের আড়ম্বরপূর্ণ। আর অনেকস্থলে দীর্ঘ স্বগতোক্তি তাঁর নাটকের নাট্যরসকে ব্যহত করেছে। 9

প্রত্যক্ষ স্বজাতি-প্রেম ও বিদেশী শাসকের প্রজাপীড়নের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অভিযোগ নিয়ে নাট্যক্ষেত্রে  অবতীর্ন হন দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-১৮৭৩)। তাঁর নাটক সামাজিকতাকে অতিক্রম সার্বজনীন মানববোধকে অবলম্বন করেছে। সমসাময়িক সমাজের গ্লানি ও বিচ্যুতির মধ্যে আনন্দ, দুঃখ, দৈন্য, দুর্দশা, সর্বনাশ, সমৃদ্ধি প্রভৃতিকে নিয়ে মানুষ যে জীবন অতিবাহিত করেছে তার পরিচয় দীনবন্ধুর নাটকে পাওয়া যায়।

(১) নীলদর্পন (১৮৬০): অত্যাচারী ও অত্যাচারীতের দ্বন্দ্ব বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠেছে নাটকটিতে। এ নাটকের নায়ক কোন ব্যক্তি নয় সময় ও চেতনা। সময় ও মানবচৈতন্যের ভাঙাগড়ার দারুণ এক তথ্যচিত্র এ নাটকটি। সামন্ত সমাজ কাঠামোর ভাঙ্গনের চিত্রের পাশাপাশি ঘুণে ধরা সমান্ত সমাজের নির্মম চরিত্রকে খুলে খুলে দেখান হয়েছে। নাটকটি সমাজ, কাল,দেশ ও জাতির ট্রাজিডিকে ধারণ করে বেড়ে উঠেছে। স্বাধীনতাবোধ ও স্বাধীকার চেতনায় উজ্জ্বল এ নাটকটিতে প্রবলভাবে স্পষ্ট হয়েছে দীবন্ধুর সমাজ-সচেতনতা ও সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধ। পরবর্তীতে এ নাটকটিই হয়ে ওঠে স্বদেশচেতনা ও স্বদেশপ্রেমমূলক রচনার বীজ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আর্দশের মিশ্র অনুকরণে নির্মিত এ নাটকটি সমকালে অবিস্মরণীয় সাফল্য অর্জন করে। সাধারণ মানুষের চরিত্র ও সংলাপ নির্মাণে দীনবন্ধু মিত্রের সার্থকতা প্রদর্শনে সক্ষম হলেও তাঁর নির্মিত ভদ্র চরিত্রসমূহ আড়ষ্ট ও প্রাণহীন।

(২) নবীন তপস্বিনী (১৮৬৩) প্রচুর হাস্যরসের রয়েছে এ নাটকটিতে। ঘটনার জটিলতা ও বৈচিত্র এর নাটকীয় গতি বৃদ্ধি করেছে। অভিজাত শ্রেণি অভিজাত্য প্রকাশ পায়নি। এখানে যে দুটি উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান হয়নি। মাঝে মাঝে তিনি মধুর অনুকরণে অসিতচ্ছন্দে আড়ষ্ট ও বৈচিত্রহীন কবিতা ব্যবহার করেছেন।

(৩) লীলাবতি (১৮৬৭) নাটকটি নাট্যকারের পরিনত লেখনীর রচনা। অসৎ একটি শিক্ষিত মেয়ের বিবাহ-বিভ্রাট চিত্রিত হয়েছে। সমকালে সমাজে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে।

(৪) কমলেকামিনী (১৮৭৩) রোমান্টিক জীবন-চেতনা দীনবন্ধুর স্বভাব-বিপরীত থাকার কারণে নাটকটি ব্যর্থ হয়। দীনবন্ধু মিত্রের প্রহসনগুলোর মাঝে আছে:

(১) সধবার একাদশী (১৮৬৬): তৎকালীন ইয়ংবেঙ্গলদের বিপদগামীতা, মদাসক্ত, পরনারীর প্রতি আসক্তি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে নাটকটির ঘটনা আবর্তিত। হাস্য ও করুণ রসের দারুণ মিশ্রণে ঘটেছ্ নিমচাঁদ চরিত্র সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সমকালী যুবকদের অসঙ্গতি চিন্তা বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

(২) বিয়ে পাগলা বুড়ো (১৮৬৬) নাট্যকার প্রাচীন। সংস্কার বিরোধী সমাজকে উপহাস করেছেন। অনর্গল হাসির ফোয়ার ফুটিয়েছেন। হাস্যরসাত্মক প্রহসন হিসাবে সার্থক ও চমৎকার।, ভারতীয় মূল্যবোধ, মানব প্রেম, বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ, সামাজিক অসঙ্গতিসমূহকে তুলে ধরেছেন।

(৩) জামাইবারিক (১৮৭২) সামাজিক প্রহসন। এখানে দীনবন্ধ স্বচ্ছ এবং সাবলীল। পারিবারিক জীবনবোধের প্রতি পরিণামী মমতাবোধও এখানে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন। একটি যথার্থ প্রহসন। জীবনের প্রসন্নতা, পরিহাস ও বেদনার বহুমখী প্রকাশে দীনবন্ধু মিত্রের পারঙ্গমতা ছিল শিখরস্পর্শী। জীবনের প্রতি অব্যহত বিদ্রুপের এমন সমাবেশ আর কোন বাংলা নাট্যকারের মধ্যে পাওয়া যায় না।

দীনবন্ধুর পর কয়েকজন প্রতিভাশালী মুসলমান নাটকের আবির্ভাব ঘটে । মীর মশাররফ হোসেন তাঁদের অন্যতম। ‘জমিদার দর্পন’ মীরের শক্তিশালী একটি নাটক। বহুল পঠিত এ নাটকটির মাঝে নিখুঁতভাবে ধর্মব্যবসায়ী, অত্যাচারী জমিদারশ্রেণির ক্রুর,কুটিল ও কুৎসিত রূপের প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। একইসঙ্গে তৎকালীন সমাজবাস্তবতায় নারীদের অবস্থা এবং তাদের প্রতি অত্যাচারী জমিদারদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং যৌননির্যাতনের কথাও তুলে ধরেছেন পরম মমতায়। সামগ্রিক বিচারে জমীদার দর্পণ নাটকটি জমিদার শ্রেণির মুখোশ উন্মোচনে ও স্বরূপ নির্ণয়ে কালের দলিল হিসেবে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর জমিদারী প্রথায় নারীদের অবস্থা উপস্থাপনের প্রমাণ হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে।10‘বসন্তকুমারী’ নাটকটিও সমাকালে বেশ সমাদৃত হয়। রূপতৃষ্ণা ও সপত্নীপুত্রের প্রতি ইর্ষার মধ্য দিয়ে ঘটা বিয়োগান্তক পরিণতি পাঠকের মন ছুঁয়ে দিয়েছে। এ নাটকটিতেও প্রবল ভাবে মীর মশাররফ হোসেনের সমাজ মনস্কতার পরিচয় আমাদের সামনে উঠে আসে। আব্দুল করিমের জগৎমোহিনী (১৮৭৫) নাটকটিও সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষনে সক্ষম হয়।

এর ঠিক পরপর বাংলা নাটকের কাহিনী নির্বাচনের আবার দিক পরিবর্তন ঘটে। কোমল ও ভাব প্রবণ বাঙালি এ সময় প্রবলরূপে তরল, উচ্ছ্বাসময় ও ভক্তিমূলক নাটক দেখতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেই সাথে দেশের সর্বত্র নাট্যমঞ্চ স্থাপন না হওয়ার কারণে সেসময় নাটকের পাশাপাশি অপেরা বা গীতাভিনয়ের প্রচলন ব্যাপকমাত্রায় শুরু হয়। আর এ পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ মনোমোহন বসু। প্রাচ্য আদর্শ অনুসরণ করে নতুন ধরণের পৌরানিক নাটক রচনা করে স্বাতন্ত্র্যতা প্রতিষ্ঠা করেন মনোমোহন বসু। তাঁর নাটকে ব্যক্তির আবেগ, দেশাত্মবোধের ভাবালুতা ও উচ্ছাস এবং সেকালের পরধীনতা লাঞ্চিত বাঙালির জীবন চিত্র চিত্রিত হয়েছে। মনোমোহন বসু প্রধানত একজন গীতিকার ছিলেন। তাঁর সকল নাটকেই গানের প্রাচুর্য রয়েছে। তিনি দীনবন্ধুর অন্ধ অনুকারক ছিলেন। প্রচুর প্রবাদ-প্রবচন ও কোন একটি চরিত্রের হঠাৎ নিরুদ্দেশ তাঁর রচনার প্রধান ত্রুটি। হিসেবে ধরা হয়। তাঁর সংলাপ খুর দীর্ঘ এবং সংস্কৃত অলঙ্কারচ্ছন্ন। ভাষা অত্যন্ত ভারগ্রস্থ। দর্শক রূচির প্রতি শদ্ধা রেখে তিনি তাঁর পৌরাণিক চরিত্রসমূহকে মানবীয় গুণাবলীতে ভূষিত করেছেন। এছাড়া তিনি রামণারায়ন, মধুসূদন ও দীনবন্ধুর সমন্বয়ে একটি বিমিশ্র ভাষা তৈরি করেন। তাঁর রচিত সামাজিক নাটকসমূহ হলো: প্রণয় পরীক্ষা (১৮৮৯),পার্থ পরাজয় (১৮৮১), আনন্দময় নাটক, রাসলীলা (১৮৮৯) ইত্যাদি। রাজাভিষেক নাটক (১৮৬৭),স্বর্গ (১৮৭৩), হরিশচন্দ্র (১৮৭৬) ইত্যাদি তাঁর পৌরণিক নাটক। আর নাগাশ্রমের অভিনয় (১৮৭৫) তার একটি প্রহসনধর্মী রচনা।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৪৯-১৯২৫) সাহিত্যিক জীবনের সূচনা হয় নাটক-প্রহসন রচনার মাধ্যমে। কিঞ্চিৎ জলযোগ (প্রহসন, ১৮৭২), পুরুবিক্রম নাটক (১৮৭৪), সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ নাটক (১৮৭৫), অশ্রুমতি নাটক (১৮৭৯), স্বপ্নময়ী নাটক (১৮৮২), হঠাৎ নবাব (প্রহসন, ১৮৮৪), অলীক বাবু (প্রহসন, ১৯০০) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। স্বপ্নময়ী (১৮৮০), বসন্তলীলা (১৯০০), ধ্যানভঙ্গ (ওই) নামে গীতিনাট্য রচনা করেন। তাঁর অধিকাংশ নাটক জোড়াসাঁকো ও কলকাতার নাট্যশালায় একাধিকবার অভিনীত হয়। ভারত-ইতিহাসের পটভূমিতে রচিত তাঁর নাটকগুলির প্রধান উপজীব্য ছিল স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ। প্রহসনে সমাজের নানা সমস্যার প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ছিল। তিনি মৌলিক নাটক রচনার পাশাপাশি সংস্কৃত, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষার বহু সংখ্যক নাটক বাংলা অনুবাদ করেন।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পথ ধরে আসেন কিরণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নাটকগুলো রূপকধর্মী এবং জাতীয় ভাবত্মক নাট্য-আন্দোলনের সূচনায় প্রভাব বিস্তারী। ভারতমাতা (১৮৭৩) নাটকের উপজীব্য ইংরেজ রাজত্বকালীন দীনদুঃখী ভারত সন্তানদের অবস্থা ও পরিশেষে মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা। ভারতে যবন (১৮৭৪) নাটকে মুসলমান শাসনাধী ঘটনা এবং সে শাসন থেকে মুক্তির বানী ফুটে উঠেছে। রোমান্টিক কাহিনীর সাথে জাতীয় ভাবোদ্দীপনা প্রধান্য পেয়েছে হরলাল রায়ের  হেমলতা (১৮৭৩),বঙ্গের সুখাবমান (১৮৬৪) ইত্যাদি। রোমাঞ্চকর ও অতিনাটকীয় উপদান বিষয়ের সমাবেশ ঘটিয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন উপেন্দ্রনাথ দাস । শরৎ- সরোজনী (১৮৭১), সুরেন্দ্র বিনোদনী (১৮৭৫), দাদা ও আমি (১৮৮৮) তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক। উমেশচন্দ্র গুপ্ত তিনটি রচনা পাওয়া যায়। তাঁর হেমনলিনী (১৮৭৪),বীরবালা (১৮৭৫),মহারাষ্ট্র কলঙ্ক (১৮৭৫) নাটক ত্রয়ে ইতিহাস,কল্পনা ও রোমন্টিক ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। তবে নাটকহুলো সাফল্যের মুখ দর্শনে সক্ষম হয় নি। এরপর বাংলা নাটকে রাজকৃষ্ণ রায়ের আবির্ভাব। তাঁর উত্তরসূরী মনোমোহন ও পূর্বসূরী গিরিশচন্দ্র। তাঁর লেখা পৌরণিক কাহিনী অবলম্বনে লিখিত নাটকসমূহ ছিল ভক্তিরসে সিক্ত। তাঁর রচিত নাটকসমূহের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো ‘প্রফুল্ল চরিত্র (১৮৮৪), নরমেধ যজ্ঞ (১৮৯৮),বামন ভিক্ষা (১৮৮৫),যদু বংশ ধ্বংস (১৮৯০) ইত্যাদি।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে আবার ধর্মচেতনা বাঙালির ভাব-সংস্কৃতিক্ষেত্রে এক অনন্য প্রভাবজাল বিস্তার করে। অবশ্য এই ধর্মচেতনার মূল উৎস ছিলেন ধর্মাবতার রামকৃষ্ণ পরমহংস ও তাঁর কর্মযোগী শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ। ভাবোন্মত্ত জাতির সাগ্রহ সম্বধর্নায় এ সময় নাট্যক্ষেত্র তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়। ভাবের গঙ্গায় প্লাবিত ভূবনে তখন গিরিশচন্দ্রের আভির্ভাব ঘটে। যে প্লাবন ধেয়ে এসেছিল সহজাত স্বাভাবিকতায় গিরিশচন্দ্রের আশ্চার্য প্রতিভার স্পর্শে তা দুকূল ভাসিয়ে মহাপ্লাবনের সৃষ্টি করে। এছাড়া এসময়ের অন্য একটি অসাধারণ ঘটনা হলো,সাধারণ রঙ্গমঞ্চের প্রতিষ্ঠা, যা আধুনিক নাটকের বিকাশে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।

গিরিশচন্দ্র ঘোষ একই সাথে নাট্যকার, নাট্যরচয়িতা, নাট্যগ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও নাট্যাভিনেতা ছিলেন। তিনি একটি যুগের প্রবর্তন করেন। তাঁর রচিত নাটকের মর্মমূলে অধ্যাত্মবোধ ও ভক্তিরস ছিল । ভক্তিরসের প্রাবল্যের কারণেই সমকালে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল সর্বাধিক। তিনি ‘গৈরিশ ছন্দ’ প্রচলন করেন। বাংলা নাটকে সংলাপের যে আড়ষ্ঠতা প্রকটরূপে ছিল তা তিনি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন। তিনি সমাজের পতিত শ্রেণির চরিত্রগুলোকে শেষ পর্যন্ত ধর্মকাজে নিয়োজিত করেন। ব্যক্তির সুখ-দুঃখ নয় তার নাটকের উপজীব্য একান্নবর্তী পরিবারের সমস্যা ও সমাধান। তিনি পৌরণিক নাটক রচনায় যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করলেও সমাজিক, ঐতিহাসিক, প্রহসন রচনায় ততটা সফলতা লাভ করেননি। তিনি অসংখ্য নাটক রচনা করেছেন। এগুলোকে মোটামুটি চার ভাগে ভাগ করা যায়। পৌরানিক বা ভক্তিমূলক নাটকের মাঝে রাবণ বধ (১৮৮১), শীতার বনবাস (১৮৮২),লক্ষ্মণ বর্জন (১৮৮২),সীতার বিবাহ, রামের বনবাস( ১৮৮২), সীতা হরণ (১৮৮২)জনা (১৮৯৪),পাণ্ডব গৌরব (১৮৮৬), বিশ্বমঙ্গল ঠাকুর (১৮৮০),চৈতন্য-লীলা (১৮৮৬),অভিমন্যু বধ (১৮৮১) ইত্যাদি। গিরিশচন্দ্রের প্রতিভার উন্মেষ ও পরিণতরূপ প্রত্যক্ষ করা যায় তাঁর পৌরণিক নাটকসমূহে। তবে বহুপ্রচলিত পৌরণিক ঘটনার নাট্যরূপ দানে তিনি তাঁর পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তবে এ ধরণের নাটকে তিনি চরিত্রগুলোর স্বাধীন-সত্তা ফুটাতে পারেননি ধর্মীয় কারণে। এছাড়া গিরীশচন্দ্র নাটক নির্মাণে সবসময় দর্শকরুচিকে প্রাধান্য দিতেন। দর্শকদের আকূতিভরা হৃদয়ের আর্তি ছিল তাঁর নাটকের পাথেয়। এ কারণে তাঁর নাটকে ছিল ভক্তিরসের প্রাবল্য এবং অলৌকিক বিষয়ের অবাধ সমাবেশ। পৌরনিক নাটকে গিরিশচন্দ্রের মৌলিকতা ফুটে ওঠে তাঁর ভাষা ও ছন্দে। গৈরিশী ছন্দে নাটকীয় গতি ও ব্যঞ্জনা আছে। বিদূষক চরিত্র অঙ্কনেও তিনি নতুনত্ব এনেছেন।

গিরিশচন্দ্রের সামাজিক ও পারিবারিক নাটকগুলো নাগরিক কোলকাতার বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারকে কেন্দ্র করে রচিত। একান্নবর্তী পরিবার জীবনের রসহীন শুষ্ক চরাচরে মাঝে নাটকীয় উপদানের সমাবেশ ঘটাতে গিয়ে তিনি কলহ-বিবাদ, বেশ্যাবৃত্তি, জুয়াচুরি, প্রতারণা, সম্পত্তি নিয়ে দলাদলি ইত্যাদি বিষয়গুলোকে অতিমাত্রায় প্রাধান্য দিয়েছেন। এসব নাটকের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো প্রফুল্ল (১৮৮৯),হারানিধি (১৮৯০),মায়াবসান (১৮৯৮),বলিদান (১৯০৫),শাস্তি কি শাস্তি (১৯০৮), গৃহস্থলী (১৯১২) ইত্যাদি।

ঐতিহাসিক নাটক রচনা করে গিরিশচন্দ্র ঘোষ তেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি কারণ সে যুগ ছিল নব ধর্মোত্থানের যুগ । তিনি যথাসম্ভব ইতিহাসের প্রতি আনুগত্য রক্ষা করে নাটক লিখেছিলেন। উন্নত মহিমাময় অসংখ্য চরিত্র তাঁর নাটকে আছে। ঘটনার তীব্র ঘাত-প্রতিঘাতে এবং শক্তিশালী ভাষা প্রয়োগে নাটকগুলি বীর-রসাত্মক হয়ে ওঠে। গদ্য-পদ্য উভয় ভাষারীতি ব্যবহার করেন। সিরাজদ্দৌলা (১৯০৬), অশোক (১৯১১) ,সৎনাম (১৯০৪),বাসর (১৯০৬) ইত্যাদি নাটকগুলো গিরিশচন্দ্র ঘোষের ঐতিহাসিক নাটকের অন্তভূর্ক্ত।

প্রহসন জাতীয় রচনার মাঝে গিরিশচন্দ্রের পঞ্চ রং বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এটি একপ্রকার হালকা, চটুল ও হাস্যরসাত্মক নাটক। অন্যান্য প্রহসনের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো বড়দিনের বখশিস, সভ্যতার পাণ্ডা , বেল্লিক বাজার ইত্যাদি। রোমান্টিক ধারার নাটকের মাঝে রয়েছে সপ্তমীতে বিসর্জন ,নসীরাম, বিষাদ, ফনীর মনি, মনের মতন, মুকুল-মঞ্জুসা, হিরার ফুল, বাসর, হঠাৎ বাদশা, মুকুলমুঞ্জরা , আবু হোসেন ইত্যাদি।

অমৃতলাল বসু সমকালে ‘রসরাজ’ নামে অধিক জনপ্রিয় ছিলেন। প্রগতিশীলতাকে পাশ কাটিয়ে তিনি পূর্বতন সংস্কারগুলোকে আবার আঁকতে ধরেন। যুগোচিত প্রেরণা হতে বঞ্চিত হবার ফলে তাঁর নাট্যরচনা এক সঙ্কীর্ণ সীমার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সর্ব প্রকার প্রগতি ও নবজাগরণকে তিনি বিদ্রুপের দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। চিন্তু ও কর্মের রাজ্যে তিনি ছিলেন সর্বতোভাবে রক্ষণশীল। তাঁর রচনাসমূহ যুগচিন্তার সাথে তালমেলাতে পারেনি। তবে গিরিশচন্দ্রের রচনায় যে হাস্যরসের অভাব ছিল অনেকের মতে অমৃতলালই তা পূরণ করেছিলেন। এ হিসাবে কেউ কেউ তাকে গিরিশের পরিপূরক মনে করেন। অবশ্য প্রকৃত হাস্যরস (যঁসড়ঁৎ) বলতে যা বোঝায় অমৃতলালে তা নেই। তার মাঝে আছে ব্যঙ্গ (ঝপবঃরৎব)। অবশ্য তিনি সাহিত্যসম্মত রস পরিবেশনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁর রচনায় বর্ণ বৈষম্য প্রকট ছিল। তাঁর বিদ্রুপাত্মক প্রহসনগুলোর মাঝে  হিরকচূর্ণ (১৮৭৫), বিবাহ বিভ্রাট (১৮৮৪), বাবু (১৮৯৪), বউমা (১৮৯৭), একাকার (১৮৯৫), গ্রাম্যবিভ্রাট (১৮৯৮),বাস (১৯২৮),তিলতর্পন (১৮৮১),রাজবাহাদুর (১৮৯১),অবতার (১৯০২) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বিশুদ্ধ প্রহসনসমূহের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো চোরের উপর বাটপাড়ি, চাটুজ্জ্যে-বাডুজ্জ্যে (১৮৯৬), তাজ্জব ব্যাপর (১৯০০), কৃপনের ধন (১৯০০) উত্যাদি। তাঁ রচিত নাটকসূহ হলো-খাস দখল (১৯১২), নবযৌবন (১৯১৪),তরুবালা (১৮৯১),বিমাতা বিজয় বসন্ত (১৮৯৩),মআদর্শ বন্ধু (১৯০০),যাজ্ঞসেনী (১৯১৮),হরিশচন্দ্র  ইত্যাদি।

বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে বাংলা নাটকের গতি আবার ভিন্ন পথে চালিত হল এবং তার ভিত্তিভূমি স্থানান্তরিত হল পৌরানিক জগৎ হতে ঐতিহাসিক জগতে। এর মূলে ছিল জাতীয় আন্দোলনের অনিবার্য প্রভাব। উনবিংশ শতকের ঐতিহাসক নাটকে ঐতিহাসিক পরিবেশ অথাব উদাত্ত জাতীয় উদ্দেশ্য অপেক্ষা ব্যক্তি, কাহিনী ও ধর্মভাবই অধিকতর প্রশ্রয় পেয়েছিল। এবং ঐতিহাসিক নাটকের পূর্ণতম রূপটি দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতিভা-স্পর্শের জন্য অপেক্ষা করছিল। ঐতিহাসিক নাটক ও দ্বিজেন্দ্রলাল একসাথে মিশে রয়েছে। ঐতিহাসিক নাটকের ক্ষেত্রে সর্বাধিক সফল ব্যক্তিত্ব। সমকালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে দেশের মধ্যে যে তুমুল বিক্ষোভ ও প্রবল আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তারই প্রভাবপুষ্ট তাঁর নাটকসমূহ। সমসাময়িক বিষয়, পাশ্চাত্য আর্দশের অনুপ্রেরণা ও ইতিহাসের বীরত্বপূর্ণ ঘটনার সমন্বয় ঘটে তাঁর নাটকে। মানুষকে মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠার দাবী ছিল তাঁর রচনায়। অধ্যাত্মবোধ নয় মানবীয় মূল্যবোধে ছিলেন জাগ্রত। শুধু দেশপ্রেম নয়, জাতি ধর্ম-নির্বিশেষে এক উদার সার্বজনীন প্রেমে তাঁর চিত্ত উদ্বেলিত ছিল, জাতি বৈরিতা অপেক্ষা মানবের সামগ্রিক কল্যাণ ও মৈত্রী স্থাপনে তাঁর আগ্রহ ছিল অধিক। দ্বিজেন্দ্রলালের নাটক সার্থক এবং জনপ্রিয় হবার প্রধান কারণ তাঁর ভাষা। তিনি তাঁর নাটকের সংলাপে শক্তিশালী, কবিত্বপূর্ণ এবং নাটকীয় ভাষা ব্যবহারে সক্ষম হন। আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের নাট্যকলার সাথে পরিচিত থাকায় তাঁর নাটকে আধুনিক টেকনিক বেশি। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র সমূহ আত্মদ্বন্দ্ব এবং বিরুদ্ধে-ভাব সংঘাতে অতিশয় প্রাণময় এবং আবেগময় ছিল। এবং নারী চরিত্রগুলো প্রবল ব্যক্তিত্বশালিনী। তাঁরা পুরুষের কর্মক্ষেত্রের সহযোগী বা প্রতিদ্বন্দী ছিলেন। তাঁ রচিত ঐতিহাসিক নাটকের মাঝে তারাবাই (১৯০৩),প্রতাপসিংহ (১৯০৫),দুর্গাদাস (১৯০৬),নুরজাহান (১৯০৮),মেবার পতন (১৯০৮)সাজাহান (১৯০৯),চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১),সিংহলবিজয় (১৯১৫) ইত্যাদি। তাঁর অন্যতম প্রহসনগুলো হলো- কল্কি-অবতার (১৮৯৫), বিরহ (১৮৯৭), ত্র্যহস্পর্শ (১৯০০), প্রায়শ্চিত্ত (১৯০২), পুনর্জন্ম(১৯১১)। এছাড়া তাঁর বেশ কিছু সামাজিক নাটকও রয়েছে। সেগুলো হলো-পরপারে (১৯১২),বঙ্গনারী (১৯১৬) বাল্য বিবাহ, পূর্ণপ্রথা  ইত্যাদি। পৌরাণিক নাটকের মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিল পাষানী (১৯০০), সীতা (১৯০৮), ভীষ্ম (১৯১৪) ইত্যাদি।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পর বাংলা নাটকের সমৃদ্ধ ভূবনে ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের আবির্ভাব ঘটে। ছাত্র থাকাকালীন সময় থেকেই তিনি সাহিত্য চর্চা করতেন। ১৮৮৫ সালে তার রাজনৈতিক সন্ন্যাসী (দুই খণ্ড) প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৯৪ সালে তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দে ফুলশয্যা নাটকটি রচনা করেন। এটি উচ্চকবিত্বপূর্ণ বাংলা নাটক হিসাবে প্রশংসা পেয়েছিল। ক্ষীরোদপ্রসাদের সবথেকে জনপ্রিয় নাটক আলিবাবা (১৮৯৭)। আরব্য উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে তিনি এই গীতিনাট্যটি লিখেছিলেন। অতি কঠিন আদর্শ ও নীতির বিপরীতে গিয়ে নাটকে তিনি নিয়ে আসেন রূপকথার ন্যায় কাহিনী। অধিকাংশে আরব-পারস্য-তুরস্কের প্রচলিত উপাখ্যান অবলম্বনে অধিকাংশ নাটক রচনা করেছেন যদিও তাঁর নাটকে নাটকীয় বাস্তবতা খুব একটা নেই। চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রেও তিনি আশানুরূপ সাফল্য পান নি। নাটকগুলির ঘটনা লাগামহীন ঘোঢ়ার ন্যায় কেবল কেশর দুলিয়ে ছুটে চলেছে, থেমে থেমে চলার শৈল্পিক স্থিতি খুব একটা দেখতে পাওয়া যায় না। অলৌকিকতা ঐতিহাসিক নাটকের জন্য প্রচণ্ডরকম ক্ষতিকারক জানা সত্ত্বেও নাট্যকার তাঁর নাটকে প্রচুর পরিমাণ অলৌকিক ঘটনার সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। যা নাট্যরস কিছুটা হলেও স্থিতিমিত করেছে। তাঁর ঐতিহাসিক নাটকগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য রঘুবীর, বঙ্গের প্রতাপাদিত্য, আলমগীর, ও নন্দকুমার। এই নাটকগুলি দেশাত্মবোধক চেতনা জাগাতে সাহায্য করেছিল। তাঁর রচিত ৬টি পৌরাণিক নাটকের মধ্যে ভীষ্ম ও নরনারায়ণ রঙ্গমঞ্চে বহুদিন অভিনীত হয়েছিল। তাঁর লেখা গীতিনাট্যসমূহের মধ্যে ফুলশয্যা (১৮৯৪), আলিবাবা (১৮৯৭), বেদৌরা (১৯০৩), বরুনা (১৯০৮), ভূতের বেগার (১৯০৮), বাসন্তী (১৯০৮), কিন্নবী (১৯১৮),মজুলিয়া (১৯১১), মিডিয়া (১৯১২) ইত্যাদি। পৌরাণিক নাটকসমূহের মাঝে আছে সাবিত্রী (১৩০৯),উলুপী )১৩১৩),ভীষ্ম (১৩২০), মন্দাকিনী (১৩২৮), নরনায়ণ (১৩৩৩) ইত্যাদি। ঐতিহাসিক নাটকসমূহের মাছে আছে অশোক (১৩১৪), চাঁদবিবি (১৩১৪), বাঙ্গলার মসনদ (১৩১৭) আলমগীর (১৩২৮), বিদূরথ (১৩২৯) প্রভৃতি। কল্পিত ইতিবৃত্তমূলক নাটক আছে তিনটি। সেগুলো হলো- খাঁজাহান (১৯১২) ও আহেরিয়া (১৯১৫) ও বঙ্গে রাঠোর (১৯১৭)।

বাংলা নাটক ছুটে চলছিল দুরন্ত গতিতে। আপামর জনসাধারণের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার বিন্দুমাত্র ঘাটতি সেখানে ছিল না। কেবল সে গতির মাঝে খানিকটা দমবন্ধ করা গুমোট হাওয়া ছিল। মাঝে মাঝে সে গতির আকাশে দেখা দিত মেঘের প্রাচুর্য এরপর হয়তো চারিদিক আঁধারে ঢেকে নামত অঝোরে বৃষ্টি। একদিন বহুপ্রতীক্ষার পর বাংলা নাটকের সে গতির বহমান ধারার মাঝে সকল আচ্ছন্নতার ঘোর কেটে গিয়ে দেখা দিল সূর্যের আলোর পরম শুদ্ধ বিকিরণ। সূর্যের পূর্ণ দীপ্তিতে সমগ্র চরাচরকে আলোকিত করতে বাংলা নাটকের মধ্যগগনে সেসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) আবির্ভাব ঘটে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে ছিলেন নাট্যকার ও নাট্যাভিনেতা। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পারিবারিক নাট্যমঞ্চে মাত্র ষোলো বছর বয়সে অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত হঠাৎ নবাব নাটকে (মলিয়ের লা বুর্জোয়া জাঁতিরোম অবলম্বনে রচিত) ও পরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথেরই অলীকবাবু নাটকে নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৮৮১ সালে তার প্রথম গীতিনাট্য বাল্মীকিপ্রতিভা মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকে তিনি ঋষি বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৮৮২ সালে রবীন্দ্রনাথ রামায়ণের উপাখ্যান অবলম্বনে কালমৃগয়া নামে আরও একটি গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন। এই নাটক মঞ্চায়নের সময় তিনি অন্ধমুনির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

এরপর রবীন্দ্রনাথ শেকসপিয়রীয় পঞ্চাঙ্ক রীতি অনুসরণ করে রচনা করেন ‘রাজা ও রাণী’ (১৮৮৯) ও বিসর্জন (১৮৯০) নাটক। যা বহুবার সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয় এবং তিনি নিজে এই নাটকগুলিতে অভিনয়ও করেন।  রবীন্দ্রনাথের আরও দুটি উল্লেখযোগ্য কাব্যনাটক হল চিত্রাঙ্গদা (১৮৯২) ও মালিনী (১৮৯৬)। গীতিনাট্য ও কাব্যনাট্যে আপন প্রতিভা স্বাক্ষর রেখে তিনি প্রহসন রচনায় মনোনিবেশ করেন। গোড়ায় গলদ (১৮৯২), বৈকুণ্ঠের খাতা (১৮৯৭), হাস্যকৌতুক (১৯০৭) ও ব্যঙ্গকৌতুক (১৯০৭)। ১৯২৬ সালে তিনি প্রজাপতির নির্বন্ধ উপন্যাসটিকেও চিরকুমার সভা নামে একটি প্রহসনমূলক নাটকের রূপ দেন। এই নাটকটি সমকাল ও উত্তরকালে দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এবং সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এ নাটকের সংলাপ ও শিরোনামটি ঘুরেফিরত। এরপর রবীন্দ্রনাথ হালকা ও আমোদপূর্ণ জগৎ হতে খানিক অব্যহতি নিয়ে প্রবেশ করেন রহস্যময় মানব-মনের দুর্গম পথ পরিভ্রমণে।  সেটা ছিল ১৯০৮ সাল, যখন থেকে রবীন্দ্রনাথ রূপক-সাংকেতিক তত্ত্বধর্মী নাট্যরচনা শুরু করেন। তাঁর রচিত প্রকৃতির প্রতিশোধ (১৮৮৪) নাটকে তিনি কিছুটা রূপক-সাংকেতিক আঙ্গিক ব্যবহার করেছিলেন। তবে পূর্ণরূপে তিনি এ ধরণের রচনায় হাত দেন ১৯০৮ থেকে। এ ধারার নাটকগুলি হল: শারদোৎসব (১৯০৮), রাজা (১৯১০), ডাকঘর (১৯১২), অচলায়তন (১৯১২), ফাল্গুনী (১৯১৬), মুক্তধারা (১৯২২), রক্তকরবী (১৯২৬), তাসের দেশ (১৯৩৩), কালের যাত্রা (১৯৩২) ইত্যাদি।  রূপক-সাংকেতিক তত্ত্বধর্মী নাট্যরচনার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে প্রথম নটীর পূজা নাটকে অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে নাচ ও গানের প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন । যা পরবর্তীতে তাঁর নৃত্যনাট্য রচনার সহায়ক হয়ে ওঠে। শাপমোচন (১৯৩১), তাসের দেশ (১৯৩৩), চিত্রাঙ্গদা (১৯৩৬), চণ্ডালিকা (১৯৩৮) ও শ্যামা (১৯৩৯) তাঁর অন্যতম নৃত্যনাট্য। রবীন্দ্রনাথ নাটকের মধ্য দিয়ে কেবল গল্প বলেননি তিনি নানাবিধ রূপে নাটককে সাঁজিয়ে নাটকের সীমাকে যেমন প্রসারিত করেছেন তেমনি আসমুদ্রহিমাচলের সকল মানুষের অন্তর ও বাহিরকে ধারণ করেছিলেন আপন লেখা মাঝে। নাটক লিখেই তিনি ক্ষান্ত হননি সেই নাটককে মঞ্চস্থ করেছেন এবং নিজে অভিনয় করে তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন । রবীন্দ্রনাথ প্রধানত শান্তিনিকেতনে মঞ্চ তৈরি করে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে অভিনয়ের দল গড়ে মঞ্চস্থ করতেন। কখনও কখনও কলকাতায় গিয়েও ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করতেন তিনি।এই সব নাটকেও একাধিক চরিত্রে অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ।তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ১৯১১ সালে শারদোৎসব নাটকে সন্ন্যাসী এবং রাজা নাটকে রাজা ও ঠাকুরদাদার যুগ্ম ভূমিকায় অভিনয়; ১৯১৪ সালে অচলায়তন নাটকে অদীনপুণ্যের ভূমিকায় অভিনয়; ১৯১৫ সালে ফাল্গুনী নাটকে অন্ধ বাউলের ভূমিকায় অভিনয়; ১৯১৭ সালে ডাকঘর নাটকে ঠাকুরদা, প্রহরী ও বাউলের ভূমিকায় অভিনয়।নাট্যরচনার পাশাপাশি এই পর্বে ছাত্রছাত্রীদের অভিনয়ের প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথ পুরোন নাটকগুলি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ করে নতুন নামে প্রকাশ করেন।শারদোৎসব নাটকটি হয় ঋণশোধ (১৯২১), রাজা হয় অরূপরতন (১৯২০), অচলায়তন হয় গুরু (১৯১৮), গোড়ায় গলদ হয় শেষরক্ষা (১৯২৮), রাজা ও রাণী হয় তপতী (১৯২৯) এবং প্রায়শ্চিত্ত হয় পরিত্রাণ (১৯২৯)।11রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সকল প্রকার অসামঞ্জস্যতা দেখেছেন আর সামঞ্জস্যতা বিধানের নিমিত্তে একাধারে নাটক লিখেছেন, নাটক পরিচালনা করেছেন,নাটকে অভিনয় করেছেন এবং উত্তর প্রজন্মকে তিনি হাতে কলমে শিখিয়ে গিয়েছেন নাটকের সর্বপ্রকার কলাকৌশল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যের অনুরোধে, অন্যের মনস্তুষ্টির জন্য কখনও নাটক রচনা করেননি তাই নাটক রচনার মধ্যে তাঁর কবি-মানসের সমগ্র প্রেরণাই মুদ্রিত হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবি-মানসকে বিসর্জন দিয়ে তাঁর নাটক রচনা করেন নাই বলে তাঁর নাট্যরচনায় গীতিধর্মী প্রভাব প্রবল হয়ে উঠে12, যা বাংলা নাটকের ক্ষেত্রকে আদিগন্ত প্রসারিত করতে সহায়তা করেছিল।

তথ্যসূত্র ও টীকা:

1. সাহিত্য-সন্দর্শন", শ্রীশচন্দ্র দাশ, বর্ণ বিচিত্রা, ঢাকা, ৬ষ্ঠ সংস্করণ, ১৯৯৫, পৃষ্ঠা-৭৭

2. প্রাগুক্ত

3 . আখতার হামিদ খান ,বাংলা নাটকের অতীত ও বর্তমান, বুধবার ১৬ এপ্রিল ২০১৪,দৈনিক সংগ্রাম

4 . আধুনিক বাংলা নাটকের উদ্ভব ইউরোপীয় নাট্যসাহিত্যের প্রভাবজাত, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে এ দেশের প্রাচীন এবং মধ্যযুগের সাহিত্যেও যথেষ্ট পরিমাণ নাট্যউপাদান ছিল। এ প্রসঙ্গে সেলিম আল দীন বলেন, - আমাদের নাটক পাশ্চাত্যের মতো ‘ন্যারেটিভ’ ও ‘রিচুয়্যাল’ থেকে পৃথকীকৃত সুনির্দিষ্ট চরিত্রাভিনয় রীতির সীমায় আবদ্ধ নয়। তা গান, পাঁচালি, লীলা, গীত, গীতনাট, পালা, পাট, যাত্রা, গম্ভীরা, আলকাপ, ঘাটু,  হাস্তর, মঙ্গলনাট, গাজীর গান ইত্যাদি বিষয় ও রীতিকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। - সেলিম আল দীন, মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, ১ম সং, ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬; পৃ. ৪

5 . আবু সুফিয়ান আজাদ,বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, উত্তরণ,সপ্তম বর্ষ,ষষ্ঠ সংখ্যা, মে-২০১৭

6 .মুসলমান আমলে যে নাটক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তার কারণ তাঁদের ধর্মীয় নিষিদ্ধতা এ যুক্তি খাটে না। যুগে যুগে সামাজিক পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে আমোদ প্রমোদ বিলাস ব্যসনেরও রূপ পরিবর্তিত হয়। সম্ভবতঃ সংস্কৃত থিয়েটার বা নাটকের অভিনয়রীতি পরিবর্তিত হয়ে এ রাজদরবার থেকে লোকালয়ে সাধারণ মানুষের সমাজে নেমে আসবার জন্যে এর প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছিল। পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনী সম্বলিত সংস্কৃত নাটক ধীরে ধীরে সাধারণ লোকের মুখের ভাষা ও তার দাবির কাছে নিস্প্রভ ও প্রভাবহীন হ’য়ে পড়ছিল। তাই সর্বজন বোধ্য আমোদ প্রমোদের দাবিতেই হয়ত সংস্কৃত নাটক তার স্থান হারিয়ে ফেলেছিল। ... সুতরাং মুলমান ধর্মাবলম্বী শাসকের প্রতিবন্ধকতায় যে নাট্যমঞ্চ থেকে সংস্কৃত নাটক বিদায় নিয়েছিল এ ধারণা সম্ভবতঃ সত্য নয়।(ড. নীলিমা ইব্রাহিম, বাংলা নাটক : উৎস ও ধারা, ১ম সং, ঢাকা : নওরোজ কিতাবিন্তান, ১৯৭২; পৃ. ৪-৫)

7 . লেবেডেফ তাঁর ‘A Grammar of the Pure and Mixed East Indian Dialects’ গ্রন্থের ভূমিকায় বলেন-
‘ I translated two English dramatic pieces,namely_The Disguise and Love is the best Doctor into the Bengali language, abd having observed that the Indian preferred mimicry and the drollery to pain grave solid sense,however purely expressed-I therefore fixed on those plays and which were most pleasantly filled up with a group of watchman,chokeyfars,savoyards,canera,thieves,ghoonia,lawyers,gumosta and amongst the rest a corps of petty plunderers.’

8 .  অজিতকুমার ঘোষ, বাংলা নাটকের ইতিহাস, সংশোধিত ও পরিবর্ধিত ৮ম সং, কলিকাতা : জেনারেল প্রিন্টার্স য়্যাণ্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৯৯; পৃ. ১-২

9 . উইকিপিডিয়া

10 . সাফি উল্লাহ্, ,জমীদার দর্পণ: নাটকে নারীকণ্ঠ ,চিন্তাসূত্র, মার্চ ১১, ২০১৯

11 . সর্বজনের রবীন্দ্রনাথ, অধ্যাপক শুভঙ্কর চক্রবর্তী সম্পাদিত, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৪১২ ব., পৃ. ৭

12 . আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), ৫ম সং, কলিকাতা : এ.মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড, ২০০২; পৃ. ১১৩

মন্তব্য

BLOGGER: 1
  1. তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে থিয়েটার বা নাটকের সম্ভাবনা কি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে ?

    উত্তরমুছুন
মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ করুন।

নাম

অনুবাদ,16,আত্মজীবনী,18,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,উৎপলকুমার বসু,23,কবিতা,213,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,10,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,37,ছড়া,1,জার্নাল,3,জীবনী,3,দশকথা,24,পুনঃপ্রকাশ,10,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,1,প্রবন্ধ,60,বর্ষা সংখ্যা,1,বিক্রয়বিভাগ,23,বিবৃতি,1,বিশেষ,14,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,24,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,সম্পাদকীয়,10,সাক্ষাৎকার,12,স্মৃতিকথা,2,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: বাংলা নাটক: জন্ম ও বেড়ে ওঠার ইতিবৃত্ত | কানিজ ফাতেমা
বাংলা নাটক: জন্ম ও বেড়ে ওঠার ইতিবৃত্ত | কানিজ ফাতেমা
বাংলা নাটকের জন্ম ও বেড়ে ওঠার ইতিবৃত্ত জানাবে এই প্রবন্ধ। তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ।
https://1.bp.blogspot.com/-tR9g9KdTG3A/X6znlRbj7dI/AAAAAAAABHs/9jPcqL2c_1kzJQd-AqlFnAdd6Al6GI4gQCNcBGAsYHQ/s320/%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%2582%25E0%25A6%25B2%25E0%25A6%25BE-%25E0%25A6%25A8%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%259F%25E0%25A6%2595%25E0%25A7%2587%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%2587%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%25B9%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B8-%25E0%25A6%25AA%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25A8%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A7.png
https://1.bp.blogspot.com/-tR9g9KdTG3A/X6znlRbj7dI/AAAAAAAABHs/9jPcqL2c_1kzJQd-AqlFnAdd6Al6GI4gQCNcBGAsYHQ/s72-c/%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%2582%25E0%25A6%25B2%25E0%25A6%25BE-%25E0%25A6%25A8%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%259F%25E0%25A6%2595%25E0%25A7%2587%25E0%25A6%25B0-%25E0%25A6%2587%25E0%25A6%25A4%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%25B9%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B8-%25E0%25A6%25AA%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B0%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25A8%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A7.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2020/11/Kaniz-Fatema.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2020/11/Kaniz-Fatema.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy