‘কোথাও একটা এমন দেশ আছে, মানুষ যেখানে মানুষকে ভালোবাসে’–জ্বলন্ত নাটকে ঋত্বিক ঘটকের শেষ গান। সেই ভালোবাসার দেশেই হয়তো চলে গেছে ঋত্বিক। গান শেষের গান আমাদের সবার একান্ত ভালোবাসার মানুষ।
বাঁচা-মরা তো হাতের পাঁচ। সকলেই মরে যায়। সাংঘাতিক এই ভয়ংকর একান্ত প্রশ্নটির আজও কেউ উত্তর দিতে পারেনি। মৃত্যু আমাদের নির্বিশেষে হনন করে। বেঁচে থাকে শুধু মানুষের কর্মকৃতি— যে যেখানে স্বাক্ষর রেখে যায় বৃহত্তম মানুষের কল্যাণকামনায়। তা সে-ও অবিনশ্বর নয় মানুষের প্রয়োজন ফুরোলে কালপটে তা-ও ধুয়ে-মুছে যায়। ঋত্বিক নেই, কিন্তু তার স্বাক্ষর মনে হয় শিল্পগত ভাষায় মানুষের চিন্তাভাবনার বিষয়গত হয়ে থাকবে। থাকবে এই কারণেই যে প্রত্যেকটা ছবিরই কোনো-না-কোনোখানে একটা চিরায়ত চোখের প্রহরা আছে। ক্যামেরা জানে না। তাই ক্যামেরা ছাড়া যাঁরা কিছু দেখেন না, তাঁরাও দেখতে পাবেন না। পেলেও যৎসামান্য। বোধগতভাবে ছবিটা যে ফ্রেমের বাইরে ঢেউ ভাঙছে, এটা বুঝতে তাঁদের অসুবিধে আছে। এই ‘নোটেশন’ খানিকটা অন্টোলজিকাল৷ এই বীক্ষা, এই ঈক্ষণ, ঐক্যবোধসূত্র-সঞ্জাত। এখানেই ঋত্বিকের ছবিতে শিল্পের স্বাক্ষর ছেনি-হাতুড়িতে লেখা থাকবে। বিশেষ করে ঋত্বিক সম্পর্কে এই কথাটা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝব, ততই মঙ্গল। তাতেই সংশ্লিষ্ট শিল্পকর্মেও ‘ফর্মে’ আমাদের গৌরব বাড়বে। শিল্পকর্মে এর ভালো-ভালো নজির দেশি-বিদেশি ছবিতে কিছু কম নেই।
চোখ ছাপিয়ে দৃষ্টির বিষয়গত কথা। কবিতার বাইরে কাব্য। গান ছাপিয়ে গান। মৃৎশিল্পীর কাছে প্রতিমার চক্ষুদানের রাতের মতো। অনুরাগের অতগুলো দীপ মনে হয় তার চোখে বিয়ের রাতেও জ্বলেনি। আর যে-চোখ পেয়ে একটা পুতুল-প্রতিমার অঙ্গে-অঙ্গে দেবীর ঝলকানি লাগে! কথা, কাব্য, সবকিছু একটা চোখে বিধৃত হয়ে যায়৷
ঋত্বিকের ছবির সংখ্যা খুব বেশি নয়। কোন পূর্ণাঙ্গ ছবিতেই ব্যাকরণ ঠিক নেই। আপাত অসঙ্গতি, ধাক্কা, অভ্যস্ত চোখে বিভ্রম ঘটায়। কিন্তু এই প্রমাদের যতটা দায়িত্ব ঋত্বিকের, ততটাই যে দেখে তার। কারণ মাথার হিশেবে আমরা চোখকে কখনও দেখতে শেখাইনি। প্রথমত ছবির সরগম আমরা খুব কমই জানি। আর এ তো খানিকটা নোটেশনের বাইরের কথা।
ইদানীং ঋত্বিক প্রায়ই বলত, Life is a predicament । প্রায়ই। ভীষণ একটা অন্তর্দ্বন্দ্ব কথাবার্তায় ব্যক্ত হত। বুঝতাম জীবনটা যাপন করার ব্যাপারেই একটা সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। চিরায়ত সংকট। তবু যে যখন এই সংকটে পড়ে তার কাছে তখন এটা মহাসংকট। সংকট উভয়ত। প্রাণেরও, প্রাণীরও। তারপরই কলকাতার পথে-প্রান্তরে দেখি এক নচিকেতার বিশৃঙ্খল অবিসংবাদী পদযাত্রা। অমৃতের সন্ধানে চূড়ান্ত আত্মপীড়ন। এবং সেই হনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিজেকে বস্তুর এলিমেন্টাল অধিষ্ঠানে ফিরে পাওয়া। যুগসন্ধির এই সংক্রান্তি তিথিতে এই কাপালিকব্রতও মিথ্যার সত্য। ঈপ্সিত যখন সোনার পাথুরে বাটি, তখন সবটাই অংকের হিশেবে আসতে বাধ্য। কালের হিশেবে সবটাই ঘটনা। সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে যদিও সেটা অঘটন বলে গণ্য হতে পারে। সুতরাং অনভিপ্রেত।
ছবি করতে-করতে ছবি হয়ে যাওয়াটা একটা কাব্যের সত্য। এ-ও এক দৃষ্টিকোণ। কোনো লেন্সেই এর সঠিক কোনো নিশানা নেই। ঋত্বিকের কর্মকৃতি এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিশিষ্ট। তাই সামাজিক সহজিয়া শিল্পজ্ঞানের সপ্রেম পরিসরে কারও লেন্সেই তা কথঞ্চিৎ ধরা পড়ে। কেন-না ক্যামেরার বাইরের চোখটি সবসময়ই স্বাভাবিক সব উদ্ভাসিত সত্য, তার পার্সপেকটিভ ও অ্যাঙ্গেলে অভ্যস্ত। নতুনত্ব যা টেনে বার করেন দেখি এক সমালোচক। মানুষের মাথারও তো বয়স হচ্ছে। ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতরে পড়ে সে-ও কিছু না-থাকলেও দেখতে চাইছে। কিন্তু এটা তো মর্মান্তিক। আসলে মরমী যাঁদের হবার কথা তাঁরা মুখ ঘুরিয়ে বসে আছেন। শিল্পজ্ঞানের পরিচয় যদি বা দিচ্ছেন, সেটা হয় এত পিওর যে সাধারণ মানুষ একটা সমাহিতির পর্যায়ে নিজেকে উন্নত করতে না-পারলে সেটা বুঝতে পারছে না। আর শিল্পগত আঙ্গিক ও ব্যাকরণবোধের অভাব থাকায় গোটা ছবিটাকে মনে হচ্ছে তার বড়ো একটা সিঁদুরে মেঘ। গোধনের মতো ভয় পাচ্ছে সে। সইতেও পারছে না, বলতেও বাধা আসছে। দেশ ও দশ মাথায় রেখেও যে শিল্পগতভাবে সার্থক ছবি করা যায়— ঋত্বিক তারই উত্তরে এক জ্বলন্ত স্বাক্ষর।
ঋত্বিক সম্পর্কে শিল্পগত এইসব কথা আজ সে নেই বলেই অবান্তর নয়। কেন-না তার শিল্পকর্ম তত্ত্বগতভাবে এইসব অনুসন্ধানের অপেক্ষা রাখে। ব্যাকরণগত ভুলভাল বাদ দিলে তার ছবির একটা দিক আছে যেটাকে সত্যজিৎবাবু বলেন, anthropomorphism (মানুষই ভগবান)। সেটা শিল্পগতভাবে আমাদের দেশে Romance of Film Art-এর বিষয়গত হতে পারে ।
অযান্ত্রিক ছবিটির কথাই বলি। ধুলোর ঝড় ও জলের ছড়া— ফিল্ম তৈরির একটি সুচারু প্রতীকের মাধ্যমে সামনের পথের নিদারুণ বিপত্তির আভাস দিয়ে বিমলের জগদ্দল তো রওনা হয়ে গেল। ভাঙা সানকিতে পাগলের এক সাংকেতিক তবলা লহরা শুনলাম আমরা। জীবনের চড়াই-উৎরাই ধরে বিমলেরা যেমন শোনে। চমৎকৃত হলাম আমরা। কিন্তু পরে সেই জগদ্দলকেই দেখি এক জায়গায় পাহাড়িয়া পথ ধরে খাড়াই থেকে ‘ব্যাক’ করে, ‘কোমা’য় আচ্ছন্নপ্রায়, দুর্বার গতিতে নিচে নেমে আসছে। ড্রাইভার বিমল তখনও স্টিয়ারিঙে ঘর্মাক্ত কলেবর। কিন্তু অবরোহণ অনিবার্য হল। আমি কিন্তু দেখলাম আর-এক অপরাহত বিমল, ঋত্বিককে; জগদ্দলের দুদিকে তার লম্বা ঠ্যাং ফাঁক করে দাঁড়িয়ে দুর্বার গতিতে জনতার মধ্যে নেমে আসছে। An ascent in the great fall. If at all to crash, crash into the consciousness of the people. Dialectically conscious perspective.
যন্ত্রেরই জয়গান। কিন্তু কৃষিভিত্তিক জনক রাজার দেশে যন্ত্রের নোটেশন এখানে অবরোহণের পর্দায় বিধৃত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যন্ত্র ও যন্ত্রী, দুজনেরই মঙ্গল। তথা আরোহণপর্বে তাই আমাদের সকলেরই প্রায় অল্পবিস্তর বিমলের দশা। শিল্পের সত্যি কিন্তু বিমল ও জগদ্দল— দুটোকেই অতিক্রম করে। দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিকোণ কি শুধু আরোহণের পর্দা জুড়ে? না, আরোহণ-অবরোহণ দুটোকেই সমানভাবে গণ্য করে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত সেই সত্য মানুষের সজ্ঞান চৈতন্যের অধিষ্ঠানে?
এরকম আরও নজির আছে মেঘে ঢাকা তারা, কোমলগান্ধার, সুবর্ণরেখা, তিতাস একটি নদীর নাম ও যুক্তি তক্কো আর গপ্পো-তে। সব ছবিতেই পরিব্যাপ্ত ঋত্বিক ঘটক এই দৃষ্টিকোণ থেকে।
ঋত্বিকের ছবি সম্পর্কে শিল্পগত মতামত আমার খানিকটা এই ধরনের। A conscious perspective, rooted in the collective unconscious. Anthropomorphism, myth, symbol, archetypal slant, juxtaposed images— সবই এই দৃষ্টিকোণ থেকেই শিল্পসঙ্গতভাবে কম-বেশি সব ছবিতেই ছড়ানো-ছিটানো।
আমার সঙ্গে তার ছিল একটা ভালোবাসার সম্পর্ক। শিল্পসম্মত আলোচনা করেছি, এমন একটি রাতের কথাও আমার মনে পড়ে না। যা হয়েছে সবই কথার কাটুমকুটুম।
অমনটি আর জমবে না ঠিকই। কিন্তু অমন জমানো অনেকেই জমায়। হাতে হয় তো কিছুই থাকে না। দুঃখ যা, তা এই হাতে-শূন্যের গ্লানিতেই।
তবু জানি, ভালোবাসা বেঁচে থাকবে। ঋত্বিকের ছবিতেই বেঁচে থাকবে। প্রজাপতির ডানায় ভালোবাসা যতদিন কাঁপবে।
প্রথম প্রকাশ- চিত্রভাষ, জানুয়ারি-মার্চ ১৯৭৬
সূত্র- শিবাদিত্য দাশগুপ্ত ও সন্দীপন ভট্টাচার্য (সম্পা.), সাক্ষাৎ ঋত্বিক, দীপায়ন
[ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে বিজন ভট্টাচার্যের লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করা হল। –সম্পাদক]
গান শেষের গান
বিজন ভট্টাচার্য
বিজন ভট্টাচার্য




মন্তব্য