কোন ভাষাকে না বুঝে, ঐতিহ্যের অধিকারী না হয়ে আপনি কোন কিছুর বিনির্মাণ করতে পারবেন না।–জ্যাক দেরিদা
[জ্যাক দেরিদা বিংশ শতাব্দীর দর্শনচর্চায় এমন এক নাম, যিনি ভাষা, অর্থ, ঐতিহ্য, উত্তরাধিকার, দায়িত্ব ও ভালবাসার ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন। ‘বিনির্মাণ’ শব্দটি নিয়ে অনেক দিন ধরেই একটা ভুল ধারণা চালু আছে—অনেকে ভাবেন এটি বুঝি শুধু ভাঙা, অস্বীকার করা বা ধ্বংসেরই আরেক নাম। কিন্তু এই কথোপকথনে দেরিদা দেখিয়েছেন, বিষয়টি আসলে তা নয়; বরং এর ভেতরে আছে এক ধরনের সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল নৈতিক ভাবনা, যা অন্যকে বুঝে নেওয়ার মধ্য দিয়েই জিজ্ঞাসার জন্ম দেয়।
নিখিল পরগাঁওকরের প্রশ্নে দর্শনের বুৎপত্তি থেকে শুরু করে ‘ফিলিয়া’ বা ভালবাসা, ‘জুসেজ’ বা হ্যাঁ-বলা, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার, পুনরাবৃত্তি ও উদ্ভাবনের দ্বন্দ্ব, লেখকের দায় এবং পাঠের অনির্দেশ্য ভবিষ্যৎ—সবই আলোচিত হয়েছে। বিশেষ করে দেরিদার সেই উচ্চারণ—“কোন ভাষাকে না বুঝে, ঐতিহ্যের অধিকারী না হয়ে আপনি কোন কিছুর বিনির্মাণ বা পরিবর্তন করতে পারবেন না”—আমাদের সময়ের তাড়াহুড়া-প্রবণ বৌদ্ধিক আবহে এক গভীর সতর্কবার্তা হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়। পরিবর্তন মানে বিচ্ছেদ নয়; বরং উত্তরাধিকারকে ধারণ করে, তার ভিতর থেকেই নতুন সম্ভাবনা নির্মাণ করা।
বাংলায় রূপান্তর করেছেন সুশান্ত বর্মণ। অনুবাদের মধ্যেও যে পুনর্লিখন, পুনর্বিন্যাস এবং নতুন প্রেক্ষিতে পুনর্জন্ম ঘটে—এই সাক্ষাৎকার যেন তারও একটি দৃষ্টান্ত। বিন্দুর পাঠকদের জন্য আমরা বিশ্বাস করি, এই আলাপ কেবল দেরিদাকে বোঝার সুযোগ নয়; বরং ভাষা, সংস্কৃতি ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান নতুন করে ভাবার একটি আহ্বান।]
জ্যাক দেরিদার সাক্ষাৎকার
আলাপচারিতা: নিখিল পরগাঁওকর
অনুবাদ: সুশান্ত বর্মণ
~ • ~
⊡ নিখিল পরগাঁওকর: তিন হাজার বৎসর আগে গ্রিকরা প্রজ্ঞার প্রতি ভালবাসার মত করে যেভাবে 'দর্শন' শব্দটিকে বুঝেছিল, বর্তমানে শব্দটি তার সেই অর্থের কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছে- এই প্রশ্ন দিয়ে আজকের সাক্ষাৎকার শুরু করতে চাই। 'ভালবাসা' নাকি 'প্রজ্ঞা' কোনটি আজ প্রাসঙ্গিক?
জ্যাক দেরিদা: ফ্রান্সে প্রত্যেক একাডেমিক বৎসরের শুরুতে যখন আমরা দর্শন শেখাই, তখন শিক্ষার্থীকে এর বুৎপত্তি জানাতে চাই। আমরা জানি যে গ্রিক ভাষায় 'ফিলোসফিয়া' অর্থ 'সোফিয়া' শব্দের প্রতি ভালবাসা বা বন্ধুত্ব বোঝায়। শব্দটি প্রজ্ঞা, চাতুর্য, দক্ষতা এমনকী সাধারণ জ্ঞানকেও বোঝায়। আর এখন আমরা কাকে বলে 'ফিলিয়া' (Philia) বা ভালবাসা বা বন্ধুত্ব বা আগ্রহ, তা জানতে চাই। আমরা 'ফিলোসফি' বা 'দর্শন' শব্দকে ব্যাকরণিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা শুরু করি। বর্তমানে প্রণয় ও মৈত্রী নিয়ে অনেক সুচিন্তিত রচনা লিখিত হয়েছে। আমি নিজেই 'বন্ধুত্বের রাজনীতি' নিয়ে একটি বই লিখেছি। দার্শনিক জিল দ্যলোজ (Gilles Deleuze) প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ফুকোর মত বন্ধুত্ব নিয়ে আগ্রহী। আমি স্বীকার করি যে দর্শন শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থকে আমরা অনেক সময় উপেক্ষা করি। প্রত্যেক দার্শনিকের দর্শন সম্পর্কে তার নিজের ব্যাখ্যা আছে। কখন বা কোথায় থেকে দর্শনের উৎপত্তি এবং এর মর্ম নিয়ে আলোচনা দার্শনিকদের মধ্যে একটি বহুলচর্চিত প্রসঙ্গ। দর্শনের উৎপত্তি কীভাবে? শব্দটি নিজে নিজের অর্থ প্রকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। দর্শনের ধারণাকে ব্যাখ্যা করার জন্য শুধুমাত্র শব্দটির উপর আপনি নির্ভর করতে পারবেন না। শব্দটি নিজেই পর্যাপ্ত নয়। কেউ যদি স্বীকার করে যে শব্দটি একটি গ্রিক বিশেষ্য এবং শব্দটি জন্মেছেও গ্রীসে। তাহলে দেখা যায়, শব্দটি জন্মাবার কারণ ও সময়কালে গ্রিসের অবস্থা সম্পর্কে একাধিক মত আছে। সেই সময়ের প্রত্যেকটি চিন্তাই কি 'দর্শন' অভীধা পাবার যোগ্য? আপনি জানেন যে দর্শনের আগেও গ্রিক-চিন্তার অস্তিত্বের কথা হাইডেগার দাবি করেছেন। কোন কিছুর সমাপ্তি টানত দর্শন। পারমিনিডিস অথবা হেরাক্লিটাসের কিছু চিন্তার কথাও এ প্রসঙ্গে বলা যায়। অতএব, দর্শন হল, বলা যায় চিন্তার সমাপ্তিকালের সূচনা।
⊡ নিখিল পরগাঁওকর: বিনির্মাণবাদ যে নেতিবাচক আখ্যা নয় এই দৃষ্টিকোণকে আপনি কয়েক বৎসর ধরে সমর্থন করে চলেছেন। একে সমালোচনা বা বিনাশাত্মক বলে বুঝতে মানাও করেছেন। অথচ 'লে মন্দে' পত্রিকায় ১৯৮২ সালে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে আপনি এমনটা বলেছিলেন যে বিনির্মাণ সবসময় ভালবাসার অনুষঙ্গী। আপনি এই 'ভালবাসা' শব্দটি নিয়ে কিছু কী বলবেন? ‘ফিলিয়া’ (Philia) যা বোঝায়, এই ‘ভালবাসা’ কী সেরকম কিছু?
জ্যাক দেরিদা: এই ভালবাসা অন্যদের প্রতি ইতিবাচক আগ্রহকে বোঝায়। অন্যদের সম্মান করা, অন্যদের প্রতি মনোযোগী হওয়া, অন্যদের অন্যজনত্বকে ক্ষুণ্ণ না করাকে বোঝায়। এটাই এর প্রাথমিক স্বীকৃতি। এমনকী এই ভালবাসার কারণে আপনি যদি পরবর্তীতে প্রশ্নমুখর হন, তবুও অন্যদের সম্মান দেয়াকে, প্রাথমিক স্বীকৃতি মানার বিষয়টি ভালবাসার অন্যতম অর্থ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। বিনির্মাণের মধ্যে খানিকটা নঞর্থকতা আছে, আমি তা অস্বীকার করছি না। আপনাকে অবশ্যই সমালোচনা করতে হবে আর কখনও কখনও বিরোধীতা তো করতেই হবে। যদিও নেতিবাচক কাজ সম্পর্কে আমি নিঃসন্দেহ, তবুও বিনির্মাণবাদ একেবারে নেতিবাচক নয়- সবশেষে একথাই আমি বলব।
এখন, সমালোচনা করার জন্য, নাকচ করার জন্য, উপেক্ষা করার জন্য আপনাকে প্রথমে 'হ্যাঁ' বলতে হবে। এমনকী অন্যের বিরোধীতা করার জন্য যখন অন্যকে সম্বোধন করবেন, তখন আপনাকে কিছু প্রতিজ্ঞা করতে হবে। সেসব হল- অন্যকে অন্য হিসেবেই সম্বোধন করা, তার অন্যজনত্বকে খর্ব না করা এবং অন্যদের স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করে নেয়া। এটা খুবই সহজসাধ্য ইতিবাচকতা। যদি চান তাহলে একে প্রধান নৈতিকতা হিসেবে ধরতে পারবেন। অতএব এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিনির্মাণের একটি নীতিমালা পাওয়া যায়। প্রচলিত ধারণার বাহিরেও একটা ব্যাপার আছে। আপনি জানেন আমি প্রায়ই রোজেনভিগ অথবা এমনকি লেভিয়ান থেকে একটা কথা প্রায়ই উদ্ধৃত করি। কথাটি হল ‘হ্যাঁ’ অন্য শব্দদের মত নয়। যদি আপনি উচ্চারণ নাও করেন, তবুও প্রত্যেকটা ভাষার মধ্যে একটি ‘হ্যাঁ’ বাচক শব্দ নিহিত রয়েছে। আপনি যদি ‘না’কে কয়েকবার বর্ধিত করেন, তবুও সেখানে একটি ‘হ্যাঁ’ থেকে যায়। হাইডেগারের ব্যাপারটা হল এটাই। আপনি তো জানেন, হাইডেগার বছরের পর বছর ধরে বলে চলেছেন যে, চিন্তা শুরু হয় প্রশ্ন দিয়ে। আর এই প্রশ্ন করতে পারা হল চিন্তার উৎকর্ষের পরিচায়ক। তারপর একদিন এই বক্তব্যের স্ববিরোধীতা বাদ দিয়ে তিনি বললেন- হ্যাঁ, চিন্তার প্রতি অনুরাগের চাইতে প্রশ্ন ছাড়া আরও অন্য কোন কিছু মূলগত হতে পারে। একে তিনি ‘জুসেজ (Zusage)’ বলেছেন। এটা একটি জার্মান বিশেষ্য। এর অর্থ গ্রাহ্য বা স্বীকৃত বা হ্যাঁ বলা, নিশ্চিত করা। অতএব এই জুসেজ শুধুমাত্র প্রশ্নের পূর্বাবস্থা নয়, বরং যে কোন প্রশ্নকালের কথাও বটে। কোন প্রশ্ন করার আগে নিশ্চয় অপরজনকে বলতে হবে যে, আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই। এমনকী বিরোধীতা বা প্রতিবাদ করার আগেও আপনাকে অবশ্যই বলতে হবে যে 'অন্তত আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই'। দুজনের সাধারণ উপস্থিতিকে স্বীকৃতি দিয়ে আমি 'হ্যাঁ' বলব। এর মানে দাঁড়াল যে ভালবাসার অর্থ হল ইতিবাচকতার পুনঃইতিবাচকতা।
⊡ নিখিল পরগাঁওকর: আপনার লেখা পড়তে গিয়ে অনেক পাঠককে একটি বিষয় গুরুত্বের সাথে নিতে হয়। বিবেচনায় রাখতে হয় যে, এক ভিন্ন অবস্থান থেকে এর সমালোচনা করা বেশ অসম্ভব। এটা অনেকে বুঝতে পারে, কারণ আপনার লেখাগুলোর কোন কোনটি ভাষার পরম্পরা এবং প্রজন্মান্তরে ভাষার পরিচলন নিয়ে। যা পাঠককে একটি কাঠামোবদ্ধ অবস্থানে থাকতে বাধ্য করে। অতএব, এখন কেউ যদি প্রশ্ন খোঁজে অথবা বাহ্যিক অবস্থানে না দাঁড়ানোর কারণে স্থানচ্যুত হয়, তাহলে তার কি পরিবর্তনের বিরোধীতা করা ছাড়া উপায় থাকে না?
জ্যাক দেরিদা: আচ্ছা, আপনি জানেন, এই পরম্পরার ধারণার উপর সবকিছু নির্ভর করে। যখন আপনি বংশানুক্রমে একটি ভাষাকে ধারণ করবেন, তার মানে এই নয় যে আপনি সর্বতোভাবে এই ভাষায় লীন হয়ে গেছেন, অথবা এই ভাষার দ্বারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রভাবিত হয়েছেন। উত্তরাধিকারসূত্রে, মানে আপনি সক্ষম, হ্যাঁ, অবশ্যই, পরিবর্তনের জন্য বা নির্ধারণ করার জন্য এই শব্দটি সঠিক। এটা সেরকম কিছু, যা অনুবাদ করে, নির্বাচন করে, সাড়া দেয় বা দায়িত্ববোধ তৈরি করে। যখন এই দায়িত্ববোধকে আপনি বংশানুক্রমিক বলে মনে করবেন, তখন আপনি শুধুমাত্র ঐতিহ্যকে প্রসঙ্গ করলেন না, সাথে সাথে আপনি কেবল রক্ষণশীলতা আর এই ঐতিহ্যকে যেমন আছে তেমন রেখে দেয়ার পক্ষে থাকলেন। একে জাগিয়ে তোলার জন্য, টিকিয়ে রাখার জন্য। এটা হল এক ধরনের প্রক্রিয়া, বিষয়ানুগ এবং অর্থবোধক প্রক্রিয়া। অতএব কোন সন্দেহ নেই যে রক্ষণশীল অবস্থানকে ধারণ করা (Take Up) এবং পুনরাবৃত্ত করার একটি লোভ রয়েছে। কিন্তু এটা সর্বাংশে প্রয়োজনীয় নয়, এবং আমি এটাও বলব যে কোন নতুন কিছুকে বাস্তবায়ন করার জন্য, আপনাকে তা উত্তরাধিকারসূত্রে পেতে হবে। ভাষার গভীরে, সংস্কৃতির অন্তরে আপনাকে থাকতে হবে। কোন ভাষাকে না বুঝে, ঐতিহ্যের অধিকারী না হয়ে আপনি কোন কিছুর বিনির্মাণ বা পরিবর্তন করতে পারবেন না।
⊡ নিখিল পরগাঁওকর: পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কোন বিভেদ নেই…
জ্যাক দেরিদা: অবশ্যই, অবশ্যই কিছু পুনরাবৃত্তি, এক ধরণের পুনরাবৃত্তি। কিন্তু পছন্দের বিষয় পুনরাবৃত্তি এবং উদ্ভাবন নয়। বরং এটা হল দুই প্রকারের পুনরাবৃত্তি এবং দুই প্রকারের উদ্ভাবন। সুতরাং আমি মনে করি ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করার অভিনব প্রক্রিয়া আছে, পাশাপাশি সক্রিয় অথবা উদ্ভাবনাহীন প্রকারও আছে। কিন্তু আমি এটা বলবনা যে, কোন নতুন কিছু উদ্ভাবন করার জন্য অথবা কোন পরিবর্তনকে সম্ভব করে তোলার জন্য আপনাকে ঐতিহ্যের সাথে প্রতারণা করতে হবে অথবা ঐতিহ্যকে ভুলে যেতে হবে।
ফরাসী ঐতিহ্য নিয়ে যেভাবে কাজ করেছি সেকথা বলি। আমার এমন অনুভূতি হয়েছিল যে কবিতা বা কোন লেখকের বৈশিষ্ট্য যত বুঝতে পারছিলাম, ততই আমি যেন সক্ষম হচ্ছি। কাউকে যখন কোন কিছু পুনরায় করতে দেখি, তখন আমি আরও কিছু লিখি বা প্রতিবাদ করি। তার মানে, সেটা হল প্রচলিত রচনার বিরোধীতা করে নতুন এবং অন্যরকম লেখার ইশারা দেয়া। যখন আমি গেনেট বা এরকম কোন লেখক সম্পর্কে লিখি, আমি তখন তাদের মত করে লিখি না। আমাকে উদ্দেশ্য করে যা লেখা হয়েছে, যা আমার চিন্তাবৈশিষ্ট্যকে বহন করে, তাদের সেই লেখাগুলোকে আমি আন্তরিকভাবে বোঝার চেষ্টা করি।
-----
এসব যে একেবারে আমার নিজস্ব, তা নয়, কিন্তু এটা আলাদা ব্যাপার। এটা যে শুধু দর্শন বা সাহিত্যে হয়, সেরকম নয়। এটা সবসময় ঘটে। অন্য কারো সাথে কথা বলতে গেলে অন্যেরা কী বলছে তা আপনাকে বুঝতে হবে। আপনাকে এর পুনরুৎপাদন করতে পারতে হবে, একেই বুঝতে পারা বলে। উত্তর দেয়ার জন্য, সাড়া দেয়ার জন্য এর প্রয়োজন। এতে আপনার প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হবে, অন্য কোন রকম। আপনার প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারার সম্ভাব্যতা থাকার বিষয়টিও সাড়া দেবার মধ্যে পড়ে। তাই আমি সংস্কৃতির প্রতি প্রতিক্রিয়া এবং দায়বদ্ধতার শর্তে সবকিছুকে রাখব।
⊡ নিখিল পরগাঁওকর: আপনি বলেছিলেন যে সাধারণ্যে ছড়িয়ে যাওয়া 'ইটেরাবিলিটি'র (Iterability) একটি প্রসঙ্গ হল ভাষা। এর মানে হল নতুন এবং বিরক্তিকর প্রসঙ্গের মধ্যে একে একীভূত করা যেতে পারে।
জ্যাক দেরিদা: একটি সংস্কৃত শব্দমূল 'Itera’ নিয়ে আমার মধ্যে একটি অস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। এর অর্থ আবার, একই, আবর্তন, পুনরাবৃত্তি এবং অন্য কোন কিছু, কিছু পরিবর্তন।
⊡ নিখিল পরগাঁওকর: ... অতএব ভাষা নতুন প্রসঙ্গে নতুন কাঠামোর পুনঃসৃষ্টি করে। যেরকম তৈরি করতে পারে সেরকমভাবে সম্ভাব্য অর্থের পরিসরকে সংক্ষিপ্ত করা অসম্ভব হয়ে পরে। অর্থবহভাবেই এটা পর্যাপ্ত, কারণ, 'ইটেরাবিলিটি' একথা বলে যে, লেখকের প্রবণতাকে উল্লেখ করার মাধ্যমে কোন লেখার অর্থকে বর্ণনা করার চেষ্টা করতে পারবে না। নিজের বইয়ের ভাগ্যের জন্য একজন লেখককে দায়বদ্ধ করার সম্ভাবনা আছে কি? নীৎসের সাথে আপনার কথোপকথনের কথা ভাবছি। তার লেখা যেভাবে পুনর্কথিত হয় অথবা পুনর্কথিত হওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠে তার দায় কি লেখকের? সম্ভাব্য যত প্রকারে পুনর্কথিত হতে পারে, সেগুলো একজন লেখক কি আগেভাগে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?
জ্যাক দেরিদা: যদি শুধু 'হ্যাঁ' এবং 'না' এর মাধ্যমে উত্তর পেতে চান, তাহলে বলব 'না'। কিন্তু যদি আপনি আমাকে আরো সময় দেন, তাহলে আমি আরও বেশি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়বো। যতটা সম্ভব একজন লেখক তার নিজের লেখার দায় বহন করার চেষ্টা অবশ্যই করবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তাকে অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে খুব সাবধান থাকতে হবে। খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ না করার চেষ্টা করতে হবে। বরং আপনি যা লিখেছেন, মানুষ সে সম্পর্কে সম্ভাব্য যতভাবে তাদের মতামত তুলে ধরবে, তার সবগুলো সম্পর্কে দূরদর্শী হতে হবে। আগেভাগে সবকিছু জানতে পারা এবং বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা- এক কর্তব্যবোধ মাত্র। যখন কোন বিশেষ কাজ, কোন এক বাক্য, একগুচ্ছ কথামালা প্রকাশ হয়, তখন আপনি কোনকিছু আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। যখন পথরেখার সন্ধান পাওয়া যায়, তখন তা আপনার নাগালের বাইরে, আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অন্যভাবে বলা যায় যা ভেবেছেন তার বাইরেও এটা হয়তো ছড়িয়ে গেছে, স্থানান্তরিত হয়েছে, ব্যবহৃত হয়েছে। যখন উল্লেখ করেছেন, তখন থেকে আমি নীৎসে সম্পর্কে একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করতে চাচ্ছি। নাজীদের দ্বারা নীৎসের এক অবমাননাকর ব্যাখ্যা আছে- একথা তো বাস্তব। আর একথা নিশ্চিত যে নীৎসে এমন চাননি। তারপরও নাজীদের দ্বারা নীৎসেকে একমাত্র প্রবীণ দার্শনিক বা লেখক বলার ব্যাপারটা কীভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে? নাজীদের সাথে তার এই সম্পর্কের মাঝে কিছু একটা আছে। নীৎসের আলোচনায় এই জাতীয় কিছু একটা থাকতে পারে। নীৎসে নিজে একজন নাজী- এমন সিদ্ধান্তকে অবশ্যই না টেনে এর সম্ভাব্যতাকে বিশ্লেষণ করে একথা আপনি বলতে পারেন। নাজীদের সাথে নীৎসের যেসব বিষয়ে সম্পর্ক আছে, সেসব বিষয়কেও আলোচনায় নিয়ে আসতে পারেন। বংশের ব্যাপার কিছু একটা, বংশতালিকার মত কিছু একটা আছে, এটা যে ঠিক সে বিষয়ে আমাদের ধারণা রয়েছে।
আমি যা বলেছি, তার মধ্য থেকে সক্রিয়, প্রতিক্রিয়াশীল অথবা ডানপন্থী রক্ষণশীল অবস্থানগুলো মানুষ উল্লেখ করবে- এ বিষয়ে আমি যে নিশ্চিত, সে কথা আমাদের সামনে পরিষ্কার। আমি লড়াই করব, আমি অবশ্যই একে প্রতিরোধ করব। আবার আমি জানি যে আমি একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। লোকে যে কোন একটি বাক্য নিয়ে ব্যবহার করতে পারে। ধরুন এই বিকেলে আমি আপনাকে বলেছি এমন একটা কিছু উদাহরণ হিসেবে ধরি। অবশ্যই আমার মনমতো। ধরুন, মনে করি প্রবচনের বিকাশ, ভাষাগত পার্থক্য এমন যে তা যেন কর্তৃত্ববাদিতা এবং একচেটিয়া অধিকারকে প্রতিরোধ করে। অবশ্য সাথে সাথে আমি এই কথায় এটাও যোগ করব যে আমি অবশ্য জাতীয়তাবাদেরও বিরোধী ছিলাম। ভিন্নতার প্রত্যাশায় এটাও এক প্রকারের জাতীয়তাবাদীতায় লীন হয়ে যাওয়া। এখন কেউ হয়ত বলতে পারে- ‘ও, আচ্ছা, একটি বৈশ্বিক ভাষাকে আপনি ভাগ করার পক্ষে?’
অতএব, আমরা আপনার মতামতকে জাতীয়তাবাদের পক্ষে অথবা প্রতিক্রিয়াশীল ভাষাতাত্ত্বিক সহিংসতার পক্ষে ব্যবহার করতে পারি। এরকম হতে থাকবে এবং যতদূর সম্ভব চলতে থাকবে। তার মানে, আমি একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমি কেবল আমার সর্বোচ্চ কাজটি করতে পারি। প্রথম বাক্যের পূর্বে আর একটি বাক্য যোগ করে ভুল বোঝাবুঝিকে দূর করার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেবার মাধ্যমে চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু আপনি সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। আর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, এর অর্থ এই নয় যে, আপনি একজন সীমাবদ্ধ সত্ত্বা এবং একজন সীমিত সামর্থের মানুষ। ভাষার কাঠামো, গতিচিহ্নের, পথচিহ্নের গঠন নিয়ে কাজ করা দরকার। যখন আপনি কোনকিছুর প্রতীক পাবেন, সেই প্রতীকের উৎস- এটাই হল পথচিহ্নের গঠন- যা তার থেকে স্বাধীন হয়ে যায়। চিহ্নটি নিজের উৎসমূল থেকে মুক্ত হয়ে পড়ে। পথচিহ্নের সন্ধান পাওয়া যাওয়ার সাথে সাথে এটা মুক্ত হয়। আপনি বইটির ভাগ্যকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। এই সাক্ষাৎকারের ভবিষ্যৎ আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না (হাসি) … আপনি প্রথমে লিখে নিচ্ছেন, এরপর পুনরায় লিখেন, নতুনভাবে সাজান এবং একটি নতুন উপাদান তৈরি করেন। হয়ত আমার কথাগুলো শুনতে অন্যরকম লাগছে। তবে, আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। কিন্তু আমি জানি যে- যা বলেছি তার সবকিছু প্রকাশ হওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।
⊡ নিখিল পরগাঁওকর: কিন্তু, একটা অন্তর্নিহিত বিশ্বাস, কোন একটা অন্তর্লীন সম্পর্ক তো আছে...
জ্যাক দেরিদা: এটা বিশ্বাসের ব্যাপার। কোন এক ভাল বিশ্বাসের। কিন্তু এটা বিশ্বাস, এটা বিশ্বাস...
জ্যাক দেরিদার সাক্ষাৎকার
বিনির্মাণে ভালবাসা
বিনির্মাণে ভালবাসা




মন্তব্য