বুটের সবুজ খেত ঝিকমিক করছিল চাঁদের আলোয়। চারজন কিশোর মাঠে বসে। জনমানুষের সাড়াশব্দ নেই। ওরা মুঠো মুঠো বুটের লতা তুলে এনে আগুনের মধ্যে দেয় ফুটতে থাকে। কিশোররা আগুনের আভায় মুখর দেখে নিজেদের। বুটের খোসা ছিঁড়ে মুখে ছোঁড়ে দানা। হঠাৎ মানুষের চিৎকার। দৌড়ের শব্দ, কুকুরের ঘেউ ঘেউ। মুহূর্তে এক নগ্ন নারী ছুটে যায়। কুকুরের ডাকও। কিশোররা ছোটে। পড়ে থাকে বুটের খোসা, ছাইয়ের তলে আনেভা আগুন। সখা কখন যেন বিচ্ছিন্ন হয় কিশোরদের মাঝ থেকে। দিগ্বিদিক কুকুরের ডাকে ছোটে। সময়- দিন-রাত সব যায় হারিয়ে। কখনো সেই নগ্ন নারী চাঁদের আলোয় রোদে-ধরা আয়নার মতো দীপ্ত জ্বলে ওঠে। হারিয়ে যায়। ভূমির সীমা লুপ্ত। বাতাসে কুকুরের ডাক। দৌড়ে চলে দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসে সখার দমবন্ধ হয়ে আসে। ফাঁকা চরাচরের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ে হঠাৎ মাথা কাজ করে না, চোখে কিছুই দেখে না, কানে কিসসু শোনে না—চেতনাজুড়ে একটা বাঁকা রামধনু। ডাকে, ডাকতে থাকে। কুকুর নেই, নারী নেই, তাদের কোনো চিহ্নও কোত্থাও নেই। ফসল পুড়ে যাবার পরে আঁকাবাঁকা রেখায় চিড়-ধরা মাটির মতো দাঁড়ায় তৃষ্ণার্ত সখা। খিলখিল হাসির শব্দ। চমক ভাঙে, সখা ঘুরে তাকায়। এক বিশাল বাঁশঝাড়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে সেই নগ্ন নারী। একা, নতুন-কাস্তের-মতো মুখটি তার হাসছে, চোখে পৃথিবীর সব কৌতুক জমাট বাঁধা, স্তনে আগ্নেয় লাভার ছটা, পায়ে চড়ুই পাখির চটুল ছন্দ।
সখা কিশোর থেকে সেই রাতে তরুণে পরিণত হয়। সুদর্শন সে, চওড়া বুক, দীর্ঘ দেহ, মোচ উঠেছে, চুলে তেল দিয়ে বানানো ভাঁজ। কিশোরী ও মেয়েরা সখার সামনে দিয়ে ছুটে যায়। সখা দেখে না তাদের, শুধু অবাক রাতের ধারালো মেয়েটিকে কল্পনায় ও স্বপ্নে খুঁজতে থাকে। একদিন সখা কাস্তে হাতে ছন কাটছিল। উঁচু ভিটায়, চারদিকে বন্যার পানি তখনও নেমে যায়নি। মাঝে মাঝে চিরিৎ চিরিৎ করে দু'চারটে ভেমটা কিংবা ইনি সাপ পালাচ্ছে কান্তের তল দিয়ে। সখা শিহরিত হতে হতে নিজেকে খুব সাহসী ভাবে। কেমন সুন্দর একা একা ৫ টাকায় ঠিকা মারছে। ছনবনের মাঝ দিয়ে পায়ে চলার পথ। একটা মেয়ে ৩/৪টা ছাগল তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। সখা মেয়েটির সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটির দুই কাঁধে হাত রাখে। তীব্র তাকায়। মেয়েটা ঢোঁক গেলে, আতঙ্কে নীল। শেষে মরিয়া হয়ে বলে, 'সখা চাচা, তুমার কী হইছে?' মেয়েটার পরনে সাধারণ রঙিন শাড়ি, মুখটা শ্যামলা, নাকটা চাপা, গলার কাছে ময়লা। স্তন এখনো ফোটেই নাই। কয়েক মিনিট পর সখা বলে, 'যাঃ ভাগ।' মেয়েটি চলে যাবার পরে থুথু ছিটায় চারদিকে।
সখা অস্থির সময় কাটায়। বাড়িতে শুধু মা। জমিজমা নাই। দু'চার বিঘা আধি জমি করে। প্রতিদিন মজুর খেটে যা পায় তা দিয়ে টেনেটুনে সংসার চালায়। যতই অস্থিরতা থাক, কাজ করে চলে। ধান কাটা, আঁটি বাঁধা, মাড়াই করা, সব কাজে ওস্তাদি দেখিয়ে দু'পয়সা বেশি আয় করার চেষ্টা করে। ঘন কাজ, তবু মন তীক্ষ্ণ অস্থির। বন্ধুদের সঙ্গ আগের মতো মধুর ঠেকে না। দূরে সরে থেকে থেকে আনমনা ঘুরে বেড়ায়। এক রাতে ঘুম আসে না, জেগে থাকতে থাকতে সখা মায়ের নাকডাকার শব্দ শুনছিল। গ্রামটা নিজুম। নিঃশব্দে সে বিছানা ছেড়ে উঠানে যায়। অর্ধেক চাঁদ আকাশ থেকে জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছে। পাড়ার মাঝ দিয়ে সে টহল দিতে দিতে চলে। আমগাছের তল দিয়ে, খেজুর গাছের পাশ দিয়ে, কাগজিলেবু গাছের গা ঘেঁষে। শেষ বাড়িটার কাছে থামে। বাড়িটার চারদিকে চক্কর দেয় ঝোপজঙ্গল খানাখন্দ দেখেশুনে। শীত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। একটা ঘরের কাছে থামে। ভিতরে জাল্টাজাল্টির শব্দ। সখার ইচ্ছা জাগে জানালা দিয়ে দেখবে কী হচ্ছে সেখানে। জানালার নীচে মানকচুর ঝাড়, সখা একটা বিরাট মানকচুর পাতার তলে বসে থাকে। ঘর থেকে আসা শব্দ একটু একটু করে সখার কানে ঢোকে। বিন্দু বিন্দু গাঢ় উত্তেজিত হয় সে। ইচ্ছা, দরজা ভেঙে ঢুকে পড়বে ঘরটায়। দেখবে, দেখবেই। দুর্মর বাসনায় কেঁপে কেঁপে ওঠে। সে যাবেই। রাত বাড়ে, শীত জমাট হয়, মানকচুর বিশাল পাতার উপরে শিশিরেরা ফোঁটা-ফোঁটা দানা পড়ে। সখার ইচ্ছা হিম নিতে আসে, ঘরের ভিতরের সব শব্দ ধূসর হারায়। তার একটু তন্দ্রা আসে। যখন চোখ কচলে দাঁড়ায়, ঘর থেকে আসা শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শিশিরে ভিজছে। সখা পা বাড়ায় বাড়ির পথে।
সখার প্রতিরাতেই ঘুম আসে না। পাড়া ঘুমুলে ঘুরে বেড়ায়। পাড়ার সব গলিঘুঁজি অন্ধকারে তার মুখস্থ। গ্রামেরও মুখস্থ হয়ে যায়। চোরের দেখা সে একদিনও পায় না। জ্বিন-ভূত দেখবার মতো সাহসের অভাব তার হয় না। তাই নিঃসঙ্গ পথচলা। রাতে হঠাৎ হঠাৎ নগ্ন সেই নারী সাঁৎ করে সামনে থেকে সরে যায়। পরমুহূর্তে তাকে পায় না কোথাও। একদিন রাতে চোখ বুজে নিজেকে হুকুম দেয়, কোথায় যাবে যাও। যখন চোখ খোলে, দেখে, সামনে দু'কামরার ছোট্ট বাড়ি। একটা ঘরে টিমটিমে বাতি জ্বালানো। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ঘরের ভিতরে চোখ দিয়ে ভাবে চোঁ দৌড় দেবে। কিন্তু পা চলে না, সরেও না। ঘরের মধ্যে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে, গায়ে একরত্তি কাপড় নেই, দুই হাত মুখে চেপে ধরে কাঁদছে। সখার সঞ্চিত সব উত্তেজনা নেতিয়ে পড়ে, অভিভূত, স্তম্ভিত সে—মেয়েটিকে সমগ্র দেখে, স্তন যোনি বা চোখ পৃথক দেখতে পায় না। সব একাকার। মেয়েটি মুখ থেকে দুহাত সরিয়ে নিয়ে হাসতে শুরু করে। আচমকা ঘুরে উঠানমুখো ঘরের দরজা খুলে দেয়। সজনে গাছে চড়ে একটা পলকা ডাল ভেঙে, সখা দেয়াল টপকায় বাড়িটার। মেয়েটির ঘরে ঢোকে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি দরজা বন্ধ করে। সখা তৎক্ষণাৎ বরফ। এত কঠিন, হাতুড়ি পিটলেও ভাঙবে না। মেয়েটির হুকুমে সে দিগম্বর হয়। মেয়েটি খিলখিল হাসে, 'পাঁঠার হোল মলে মলে খাড়া হয় না!' ঝটিতি সে সখাকে জাপটে ধরে বিছানায় টেনে নিয়ে যায়। সখা ছটফট আপত্তি করেও নিস্তার পায় না।
দিন যায়। সখার একটা খ্যাতি হয়ে যায়, নিঃসন্তান গৃহে সে তিনদিন তিনরাত কাটালে সেখানে সন্তান আসে। প্রচারটা গোপনে গোপনে হয়। লুকিয়ে লুকিয়ে রাতে বাঁজা মেয়েরা আসে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে, 'আমার দুর্নাম ঘুচাও।' দু'একটা আব্দার সে সানন্দে রাখে। অবিরত হানা শুরু হলে পর্যুদস্ত পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। মেয়েরা নির্বাধ কান্না ঢেলে সখার পা ধরে, 'বাবা, আমায় একটা ছেলে দিন।' সখা তিতিবিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করে, 'আমি কি খানকা শরিফ খুলেছি?' মেয়েরা জানায় দরকার হলে তারা তাও খুলে দেবে। মা ঘুষ খেয়ে মেয়েদেরকে খোঁজ দেন সঘার। একরাতে সে ঘুমানোর আয়োজন করছিল। মায়ের ডাকে দরজা খুলে দেখে, বিগতযৌবনা এক মেয়ে খাঁড়িয়ে। মা পরিচয় দেন, 'বাজান, এই খুব ধনী মিয়া, সাত কোশ মাটি ভাঙা আসছে, তুর দুয়া লিতে চায়। দে বাজান, দুয়া দে। আমাক না পয়সা দিছে, তুকও দিবেনি। দে বাজান দে।' দূরদূরান্ত থেকে সন্তানাকাঙ্ক্ষী মেয়েরা কৃষ্ণপক্ষের রাতগুলোতে সখার উঠানে ভিড় জমায়। এরা কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না। চুপচাপ বসে থাকে উঠানের কোণে কোণে, মনে হয় কেউ কাউকে দেখতে পায় না। নীরবে অপেক্ষা করে। কখন ডাক পড়ে। কারো কারো ডাক পড়েই না সে-রাতে।
সখা কিষান খাটা ছেড়ে দেয়। বাড়িতে অত্যাচার সইতে না পেরে ঘরে ঘুমানোও ছাড়ে। ঘুরে বেড়ায়। তার একটা বড় শখ দেখা দেয়, সেটা হলো ছিপ নিয়ে বড় বড় পুকুরের ধারে নিভৃতে বসে থাকা। মাছ যদি ধরা পড়ে তবে সখা ষোলো আনা খুশি হয়। ধরা না পড়লে চৌদ্দ আনা। কারণ নিভৃতে বসে থাকা তখন সে অবিরাম বাড়াতে পারে। সেটা সে সপ্তাহে ঠেলতে পারে। ইচ্ছা করলে, মাসে। তার নিবিষ্ট মাছ ধরা দেখে মনে হতে পারে পুরাকালের এক ঋষি সে। তপস্যায় বসেছে। সখা দূর দূরান্তের গ্রামে গ্রামে যায়। ডাকও পড়ে। নিঃসন্তান ধনী মানুষের সংখ্যা কম নয়। তারা তাকে দেখেই ঘন ঘন মাথা নাড়ে, 'বটে। তুমিই কি সেই সাধু নও? বটে! বটে!' সখাকে আর কিছুই বলতে হয় না। তার আপ্যায়ন শুরু হয়ে যায়। সখা সব লোকের বাড়িতে থাকে না। শুধু সেইসব জোতদারের বাড়িতে থাকে যাদের রয়েছে চমৎকার টলমলে জলে-ভরা পুকুর। মাছ না-থাকায় সখার কিছু পরোয়া নেই। বাড়ির মালিক ও চাকররা সব্বাই অবাক হয়। তারা সখার সব ইচ্ছা পূরণ করে নিঃশব্দে। সখা ৫টা বাক্য মাত্র বলে। নিরুদ্বেগ কল্পনাহীন লাগামহীন জীবন চালিয়ে যায়।
আগে সখা কেঁচোর টোপ দিয়ে মাছ ধরত। আর্দ্র জায়গা, বিশেষ করে গোবরের গর্ত উল্টোলে কেঁচো মিলত অনায়াসে। নতুন জীবনে সভাভাবে মাছধরা চর্চায় তা আর শোভনীয় নয়। নতুন টোপ ঠিক হয় ময়দা। পানি দিয়ে ময়দা একটু আঠালো করে বঁড়শিতে বিধিয়ে ছুঁড়ে দাও পুকুরের জলে। যে মাছ উঠুক আপত্তি নেই। এতে একটাই অসুবিধা, পুকুরের জলে বেশিক্ষণ থাকলে আটা গলে যায়। বা চালাক মাছ ঠুক-ঠুক করে খেয়ে পালিয়ে যায়। কাঁহাতক এসব সহ্য করা যায়। সুতরাং অন্য পন্থা নিতে বাধ্য হয় সখা। পিঁপড়ের টোপ। গাছে গাছে পিঁপড়েরা বাসা বাঁধে। সেইসব বাসা নামিয়ে এনে ভেঙে ভেঙে বঁড়শিতে গেঁথে মাছ মারা শুরু করে সখা। রাখাল চাকররা প্রথম প্রথম কাজটা করে দিত সানন্দে। কিন্তু পিঁপড়ের কামড় আর নানা গোলযোগে টোপ আসতে দেরি হয়ে যেত। সখা নিজেই নেমে পড়ে শেষে। চতুর্দিকে আপত্তি, তার মতো সাধু মানুষের কোনোমতেই এই হালকা কাজ মানায় না। কোনোমতেই মানায় না। কিন্তু সখা নামবেই। তার সিদ্ধান্তের পরদিন সে দেখে অন্যরকম ব্যাপারস্যাপার। সখার ঘরের বাইরে পিঁপড়ের ভাঙা বাসার এক বিরাট পাহাড়। আর উঠানে অসংখ্য পিঁপড়ে। লক্ষ লক্ষ। তার ঘরে ঢুকে কামড়ায়নি এই তার ভাগ্য। উঠানে পা দেবার পর তাকে আর হাঁটতে হয় না। পিঁপড়েগুলো যেদিকে যায় সেদিকে সে ভেসে চলে। হাঁটতে আর হয় না। এক মজার ঘটনা। পিঁপড়েগুলো তাকে ভাসিয়ে হাঁটিয়ে তাড়িয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উথালপাথাল এগোয়। এক বিরাট পুকুরের ধারে পৌঁছে পিঁপড়েরা থেমে যায়। বিশাল সেই পুকুরের গম্ভীর সলজ্জ জল তাদের অভ্যর্থনা জানায়। সখার মন মুগ্ধ থমকে যায়। পিঁপড়েরাও। যেন সাগর সখা নিঃসীম সময় ধরে দেখে সেই পুকুর। সম্বিত ফিরে তাকিয়ে দেখে পায়ের তলায় একটি পিঁপড়েও নেই। শুধু ৫টা পিঁপড়ে রানওয়েতে বিমান ওড়ার মতো সখার সামনে উড়ছে। সেগুলো বাতাসে ডানা মেলে আকাশে ভাসতে ভাসতে সেই সাগরের মতো বিশাল পুকুরের উপরে উঠে যায়। মাঝ-পুকুরের আকাশে তাদের সব ক'টির ডানা পটাপট ভেঙে জলে পড়ে যায়। সখা শুধুই চোখ কচলায়। বার বার। ওভাবে ভোর বেলায় আর পাহাড়ে দেখতে হয় না। সখা মাছ ধরার চেয়ে মাছের টোপ সংগ্রহে খরচ করে বেশি সময়। সরসর উঠে যায় গাছের মগডালে। গন্ধ শুঁকে ওঁকে পিঁপড়ের আস্তানায় হানা দেয়। সখার হাত পা পিঁপড়ের ছোট ছোট কামড়ে লাল-লাল হয়। উত্যক্ত হয়েও, উৎসাহে তার একটুও কমতি হয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পিঁপড়ের বাসা খোঁজে ও নামায়। কই জিয়োল ও মাগুর মাছ টপাটপ তার টোপ খায়। যে-বাড়িতে সে তিনদিন তিনরাত কাটায় সেখানে মাছের অভাব থাকে না। সেই সব বাড়ির বড় বড় মাটির চাড়ি ভর্তি হয়ে যায় কই জিয়োল মাগুর মাছে। গৃহকর্তারা অবাক বলে, 'আমার পুকুরে এত এত মাছ জানতামই না। এত তো আমার সাত পুরুষে শেষ করতে পারবে না।'
আগের দিনটায় দস্তুরমতো পিঁপড়ের কামড় খাওয়ায় সখার গোটা শরীরটা ফুলে গিয়েছিল। ভোরবেলায় তার ঘুম ভাঙে গা-ম্যাজম্যাজে ভাব নিয়ে। নিদারুণ অবসাদ তার শরীরে। অভ্যাস-মতো তবু সে ঢক ঢক করে তিন গ্লাস পানি খেয়ে হাঁটতে বেরোয়। সূর্য প্রখর হওয়ার আগে পর্যন্ত সে আলপথে খালিপায়ে ঘুরে বেড়ায়। শিশিরে শিশিরে পথ ভেজা। নাস্তা করবার পর আবার বের হয় যখন, চারদিকে চনমনে রোদ। ম্যাজম্যাজে শরীর নিয়ে চলে টোপের সন্ধানে। একটা আমগাছে উঠে এ-ডালে সে-ডালে ঘোরে। বিশাল গাছ। কাঠবিড়ালির মতো স্বচ্ছন্দ তার গতি। শরীর স্থবির ঠেকে, খোঁজার নেশায় তা চাপা পড়ে। ভাগ্যটা খারাপ ছিল। পিঁপড়ের বাসা মিলছিল না। পিঁপড়ের দেখা নেই। একটা পিঁপড়ে দেখা গেলে পিছু পিছু বাসায় হানা দেওয়া যায়। সেদিন যেন আকাশে উড়ে গেছে সব। কোনো কোনো ডালে তার ৫বার ঘোরা হয়। কিন্তু কোথায়! একটা বাসা। একটা বাসা যে শুধু তার চাই। বাসি টোপ কিছু ঘরে আছে সখার। বাসি টোপে মাছ ধরার রুচি হয় না। খুঁজতে খুঁজতে মাথা এলোমেলো ঘোরা শুরু করে। তাড়ি খাবার পর এক-চুমুক ঘুমিয়ে উঠলে মাথাটা যেমন হয়। সখার চোখে গভীর সবুজ ঝাপটা দেয়, পরমুহূর্তে ধাঁধানো লাল, পরে কালো আলোর ধাক্কা। শেষে দিগন্ত-জোড়া সরিষা ক্ষেতের ফুলগুলো ফুটে ফুটে আকাশে উড়তে থাকে।
সখা চোখ খুলে দেখে, চতুষ্পার্শ্বে অন্ধকার। একটা কাঁটাঝোপের উপরে পড়ায় একটু বেঁচেছে সে। উঠে হাঁটার চেষ্টা করতে গিয়ে টলে পড়ে যায়। সময় যে কত তা জানা নেই। সখা হামাগুড়ি দেয়। শরীর ক্ষতবিক্ষত। ঘোর অন্ধকারে ঘরে ফেরে। সখা আগের সন্ধ্যায় আস্তানা নিয়েছিল জোতদার বাড়িটায়। একদিন পুরো কাটাল অথচ একটাও মাছ আনতে পারল না। অবশ শরীরটাকে সে হেঁচড়ে ঘরে ঢুকিয়ে খিল লাগায়, উদ্গত কান্না আর চিৎকারের লোভ চেপে রেখে। লুকিয়েচুরিয়ে ঘরে ফিরেছে সে। সখা নিশ্চিত, কেউ তাকে দেখে নাই। লেপের তলে একটু গরম ধরেছে, তখুনি কড়ানাড়ার শব্দ। কড়ানাড়া, কুকুরের ঘেউঘেউয়ের মতো বাড়তেই থাকে। মেঝেতে শুয়েছিল সখা। হামাগুড়ি দিয়ে দরজার কাছে যায়। খোলা দরজা দিয়ে পৌষের হাড়কাঁপানো বাতাস নিয়ে বিশাল এক মেয়েমানুষ ঢোকে। বয়স অন্ততঃ বছর-চল্লিশ। গোটা শরীরটা থলথল করছে মাংসে ও চর্বিতে। হাতে একথালা ভাত ও তরকারি। সেই শীতের মধ্যেও খাত থেকে গরম ভাপ উঠছে। মন খিদের চোটে নেচে ওঠে। সখা গোগ্রাসে খেয়ে ফেলে ভাত, কবুতরের মাংসের তরকারি দিয়ে। খেয়ে সারা করতে-না-করতে, মেয়েটি খেপে ওঠে। মিনমিনে স্বরে শুরু করে, পরে জোরেসোরে দাবি জানাতে থাকে, 'হুজুর, আমাক একটা ব্যাটা ছোওয়াল দ্যান।' সখা কাঁপতে থাকে, শীতে, ভয়ে। শরীরের ক'জায়গার হাড় ভেঙেছে তার নেই ঠিক। এখন একে কোত্থেকে দেবে ছেলে। শেষে মরিয়া হয়ে বলে, 'তোমার সবসময়ই কি কার্তিক মাস?' মেয়েটি বলে, 'ই! ই!' সখার উপরে সে ক্রুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়ে। আবারও দাবি জানায়, 'আমাক একটা ব্যাটা ছোওয়াল দে।' নড়বড়ে সখা শুধু ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকে। মেয়েটি সখাকে কিছুতেই উত্তেজিক করতে পারে না। ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে সে, সখাকে কোলে তুলে নেয়, দরজা দিয়ে অন্ধকারে ছুড়ে দেয় তাকে।
সখা বাড়ি ফেরে বাঁশের খাটিয়ায় চড়ে। শরীরে একরত্তি শক্তি ছিল না তার। রক্তহীন ফ্যাকাসে গায়ের রং। আশেপাশের সব গ্রামের লোকেরা ভেঙে পড়ে তার অসহায় শরীরটা দেখার জন্যে। ভিড় জমে। লোকেরা হাসে, টিটকারি দেয়। দিন যায়, ভিড় কমে। সখার পায়ে ও গায়ে ঘাগুলো বাড়তে থাকে। জমানো টাকাপয়সা ছিল না তার। দরকারও বোধ করেনি কোনোদিন। সাধু হিসেবে সে যত বড় হয়ে উঠেছে বন্ধু ততই কমে গেছে তার। শুধু শিষ্যা বেড়েছে দিনে দিনে, দূরে দূরে। এখন বিপদের সময়ে একটাও বন্ধু পায় না যে ধার করবে চিকিৎসার জন্যে। শিষ্যারা অদ্ভুতভাবে দূরে দূরে থাকে, কাছে আসে না। শুধু গভীর রাতে ঘুম ভাঙলে মনে হয়, জানালা দিয়ে যেন ওদের মধ্যেকার কেউ কেউ উঁকি দিয়ে গেল। সখার ডান পায়ের ঘা-টা দিন দিন বড় হয়। পচে পড়ে যায় পাঁচটা আঙুল। চিকন অস্থিগুলো ঝুলে থাকে। একদিন বৈশাখের মেঘমুক্ত দিনে সখাকে দুজন প্রতিবেশী বাঁশের খাটিয়ায় করে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। সখা ফিরে আসে বক হয়ে। টিঙটিঙে শরীরে একটা পা নেই, ঘা একটু কমেছে।
দিন যায়। ঘা বাম পা-কেও গ্রাস করে। আঙুলেরা ঝরে যায়। হাসপাতালে। পায়ের ঝামেলামুক্ত স্বাধীন মানুষ হয়ে ফেরে সে। একটা বাকশে। তলে চাকা লাগানো। সঙ্গে একটা চৌকস ১২/১৩ বছরের ছোঁড়া। তারা ১০-৬ আনা অংশে ভিক্ষা শুরু করে। ওরা দু'জনে মিলে এক টাকা কামালে ছোঁড়াটি পাবে ১০ আনা, ও সখা পাবে ৬ আনা। সখার জীবন এর ফলে বেশ আনন্দময় হয়ে ওঠে। তার শরীরে একটু তাজা হাওয়া লাগে। ঘুমাও বাকশে, ঘুরে বেড়াও বাকশে। পারতপক্ষে সখা পানি খায় না। প্রস্রাব করবার ভয়ে। ছোঁড়াটিকে খাবার কিনতে দিলে বেশিরভাগ পয়সা সে মেরে দেয়। আর বায়না ধরলেও ছোঁড়াটি কক্ষনো তাকে খাবার দোকান কিংবা হোটেলের সামনে নিয়ে যাবে না। আধপেটা থাকে সে বেশিরভাগ সময়। কোনোকোনোদিন ছোঁড়াটি দিনের শেষে হিসাব মিলিয়ে বলে, আজ খাবার পয়সা হবে না। কোনো বাড়িতে খেতে দিলে প্রায় সবটাই খেয়ে ফেলে ছোঁড়া। সখা শুধু বসে থাকে, তাই শরীর তাজা-ই থাকে। বেঁচে যায় ঘন ঘন বাহ্যির ডাক থেকে। মনে মনে আল্লাহকে সে ধন্যবাদ দেয়।
দিন যায়। সথার বাম হাতে পচন ভালভাবে ধরে। ঘা বাড়ে। হাড় বেরিয়ে আসে। সখা গুনে গুনে পয়সা জমায় হাসপাতালে গিয়ে ভালোভাবে হাত কাটাবার জন্যে। আগের দুবার পয়সার অভাবে হাসপাতালে খুব কষ্টে কেটেছে তার। বর্ষার সময় রোজগার কমে যায়। এ সময়টা শহরের দিকে থাকলে একটু আধটু পসার জমে। কয়েকদিন পর-পর বৃষ্টিতে তার উপার্জন বন্ধ হবার উপক্রম হলে সখা হাসপাতালে ভর্তি হতে চায়। ছোঁড়াটি প্রথমে রাজি হয় না। কিন্তু সখা হবেই। ছোঁড়াটি কোলে করে তাকে এমার্জেন্সিতে নিয়ে যায়। যাবার সময় খুচরো পয়সা পড়া শুরু হয় পথে। তৎক্ষণাৎ সখাকে সার্চ করে পয়সা কেড়ে নেয় সে। সখা হাসপাতালে থাকলে সে তো বেকার, এ ক'দিন তার চলবে কী করে? তাই পয়সাগুলো নিজের কোমরে রাখে।
সখা এক হাত নিয়ে ফেরে। নতুন জীবন শুরু হয়। গ্রামে গ্রামে হাটে হাটে বাকশে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ডান হাতে পচন ধরায়, একবার সময় করে সেটি হাসপাতালে রেখে আসে। হাত পায়ের ঝামেলামুক্ত স্বচ্ছন্দ স্বাধীন সখা ঘোরে আর ঘোরে। ছোড়াটারও উৎসাহের শেষ নেই। সখা যেদিকে যেতে চায় সেদিকে সে তাকে নিয়ে যায়। আজকাল ছোঁড়ার টেরিকাটার অভ্যাস হয়েছে। একটা আয়না রাখে। একদিন সখা ও ছোঁড়ার মুখ একসঙ্গে আয়নায় ধরা পড়ে। দু'জনেই চমকে উঠে দু'জনের দিকে তাকায়। সখা ছোঁড়াটির নাম রাখে বখিল। বখিলকে সখা যত গ্রামে যেতে বলে তার সবকটিতে অন্ততঃ একবার করে যাওয়া হয় তাদের। দীর্ঘ সেই ভ্রমণ। মাসের পর মাস ধরে চলে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৫টা করে গ্রাম অতিক্রম করে। অ্যাদ্দিন পরে তাকে চেনার মতো লোক আর ছিল না। জোতদাররা তাকে দূরে দূরে ঠেলে দেয়। সখা পছন্দমতো জোতদারের বাড়ির বাচ্চার সঙ্গে খাতির জমায়। তার কাছে ১০/১২ বছরের পুরনো পিঁপড়ের টোপ ছিল। এক-এক-টুকরো টোপ সেই বাচ্চাদের হাতে তুলে দিয়ে বলে, 'বাবা, পৌষ মাসের প্রথম বুধবারে কানপাড়ার চরায় খুব ভোরে এসো।' বাচ্চারা অনুগত মাথা নাড়ায়, হাঁ, তারা যাবেই।
পৌষ মাসের প্রথম বুধবার। কানপাড়ার চরার মধ্যখানে আদিগন্ত কুয়াশার মাঝে সখা ও বখিল অপেক্ষা করে। সূর্য একটু একটু আলো ছড়ায়, কুয়াশা ছিঁড়ে ছিঁড়ে। একটু একটু করে কিশোর কিশোরী ও শিশুরা আসে। ভিড় জমে। সূর্য ঝিকমিক করে। বখিল বড় একটা মাটির চাঙড় কুড়িয়ে নেয়। যদ্দূর তাকাও বুটের লতায় ছাওয়া জমি। ধুলা ও শিশিরের পাতলা আন্তরে ঢাকা কালো সবুজ লতারা। বড় বড় ঢিল ও চাঙড়গুলো আস্ত আছে। বখিল ভাষণ দেয়, 'ভায়েরা আমার, বোনেরা আমার, ঐ দ্যাখ্ বাকশে শুয়ে আছে আব্বাজান। দ্যাখ, দেখে নে। সে কি পাপী ছিল, নাকি ছিল মহাপুণ্যবান মানুষ, জানি না। শুধু শুনেছি, একদা সে ছিল এক দৃপ্ত মোরগ। তাঁর শেষ ইচ্ছা, তোদের ছুড়ে-মারা ঢিলের নীচে শুয়ে থাকবে সে অনন্তকাল।' কথা শেষ করে বখিল সখাকে লক্ষ্য করে মাটির চাঙড় ছুঁড়ে মারে। কিশোর কিশোরী ও শিশুরাও তাকে অনুসরণ করে ঢিল ছোঁড়া শুরু করে। একটা ঢিল ছুঁড়েই তারা ক্ষান্ত হয় না। অবিরত ছোট-ছোট হাতে ঢিল সংগ্রহ করে ছুঁড়তে থাকে। সখা ও তার বাকশের কোনো চিহ্ন থাকে না কোথাও। সূর্য ফুটে উঠতে উঠতে সে জায়গায় ঢিলের পাহাড় হয়ে যায়। আশেপাশে বুটের সতেজ লতারা উধাও। শিশুরা ঢিল কুড়াতে-কুড়াতে ছুঁড়তে-ছুঁড়তে ক্লান্ত হয়ে চড়ার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ে। শীতের রোদের মনমাতানো উত্তাপ। সূর্যের ভিতরে এক নগ্ন নারী হাসে, শিশুদের ঘুম দেখে।
(রচনাকাল: ১৯৮৪)
সখা
শামসুল কবীর (ইচক দুয়েন্দে)
শামসুল কবীর (ইচক দুয়েন্দে)





মন্তব্য