— দ্যাখ, দ্যেরিদা বলেছেন যে প্রেজেন্স নিজেই একটা মেটাফিজিক্যাল ইল্যুশন। আমরা এই কফি হাউসে বসে আছি, কিন্তু আমাদের এই বসে থাকাটা আসলে একটা অ্যাবসেন্সের সাইন। কফিটাও আসলে কফি না — এটা হলো লেট ক্যাপিটালিজমের একটা সিম্বলিক রিপ্রেজেন্টেশন অফ কমোডিটি ফেটিশিজম, যেটাকে আমরা ডিকনস্ট্রাক্ট না করলে আমাদের পুরো এক্সিস্টেন্সটাই একটা লোগোসেন্ট্রিক ট্র্যাপে আটকে যাবে।
— তোর কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
— সেটাই তো পয়েন্ট! ঠান্ডা হওয়াটাই হলো টেম্পোরালিটির ডিফারেন্স। দ্যেরিদার ডিফেরাঁস— ফরাসিতে যেটা একই সাথে ডিফার এবং ডেফার— সেটা বোঝো? মানে আর্থটা সবসময় পিছিয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেভাবে আমার কফির উষ্ণতা—
— তোর নাম কী? তুই কোথা থেকে এসেছিস?
— আমার নাম? নাম নিজেই তো একটা সাইন। সিগনিফায়ার এবং সিগনিফায়েডের মধ্যে কোনো নেচারাল কানেকশন নেই, সস্যুর বলেছেন। আমাকে অর্ণব ডাকিস তোরা, কিন্তু জেনে রাখ, এই অর্ণব আইডেন্টিটিটা নিজেই একটা কনস্ট্রাক্ট—
— আমি রুমকি। আমি মার্ক্সিস্ট। এবং তুই যা বলছিস তার পুরোটাই বুর্জোয়া অ্যাকাডেমিয়ার সাবস্ক্রিপশন বেসড ফিলজফি। মানে তুই আসলে একটা ইন্টেলেকচ্যুয়াল পেওয়াল কিনেছিস এবং সেটাকে র্যাডিকালিটি বলছিস।
— র্যাডিকালিটি নিজেই একটা…
— না। থাম। আমাকে বলতে দে। পোস্টমডার্নিজম, এবং বিশেষত এই যে ডিকনস্ট্রাকশনের ফ্যাশন — এটা হলো লেট ক্যাপিটালিজমের সবচেয়ে সফল কালচারাল প্রোডাক্ট। কেন জানো? কারণ এটা ক্লাস কনশাসনেসকে ডিসলভ করে দেয় একটা ল্যাঙ্গুয়েজ গেমের ভেতরে। তুমি যখন বলো যে কোনো গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ নেই, তখন তুমি আসলে মার্ক্সিস্ট ন্যারেটিভটাকেও বাতিল করে দিচ্ছ। এবং এটা কার সুবিধায়? ক্যাপিটালের সুবিধায়।
— কিন্তু মার্ক্সিজম নিজেও তো একটা মেটান্যারেটিভ—
— হ্যাঁ! এবং লিওতার সেটা বলে খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু লিওতার যা বললেন না, সেটা হলো: মেটান্যারেটিভ ছাড়া পলিটিক্যাল অ্যাকশন সম্ভব না। তুমি ডিকনস্ট্রাকশন দিয়ে রাস্তা বানাতে পারবে না, হাসপাতাল চালাতে পারবে না। তুমি শুধু কফি হাউসে বসে কফি ঠান্ডা করতে পারবে এবং সেটাকে টেম্পোরালিটির ডিফারেন্স বলতে পারবে।
এই মুহূর্তে তৃতীয় একটি কণ্ঠস্বর প্রবেশ করে। কণ্ঠটি একটু ক্লান্ত, একটু তীক্ষ্ণ, এবং সচেতনভাবে নাটকীয়।
— এক্সকিউজ মি, কিন্তু তোমরা দুজনেই এই কনভার্সেশনে আমার নিউরোডাইভার্জেন্ট পার্সপেক্টিভকে সম্পূর্ণ ইনভিজিবল করে দিচ্ছ। আমি একজন অটিস্টিক ক্যুইয়্যার ব্রাউন পার্সন এবং আমার এপিস্টেমিক পজিশনটা তোমাদের নিউরোটিপিক্যাল ডিসকোর্স থেকে ফান্ডামেন্টালি আলাদা।
— তুমি কি আমাদের কনভার্সেশন শুনছিলে?
— আমি শুনছিলাম কারণ আমার অডিটরি প্রসেসিং আলাদা। আমি সেলেক্টিভলি শুনতে পারি না। এটা আমার নিউরোডাইভার্জেন্সের একটা অ্যাস্পেক্ট এবং এটাকে তোমরা যদি প্রিভিলেজড নিউরোটিপিক্যাল লেন্স দিয়ে জাজ করো তাহলে তোমরা এজিস্ট এবং অ্যাবলিস্ট।
— আমি জাজ করিনি। আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম।
— প্রশ্ন করাটাও একটা পাওয়ার ডায়নামিক। মিশেল ফুকো বলেছেন যে প্রশ্ন এবং উত্তরের ফর্মটাই একটা ডিসিপ্লিনারি মেকানিজম। তুমি যখন আমাকে জিজ্ঞেস করলে, তখন তুমি আমাকে একটা নর্মাটিভ এক্সপ্ল্যানেটরি ফ্রেমওয়ার্কে বাধ্য করলে।
— ঈশ্বর আছেন কিনা জানি না, কিন্তু ফুকো যে এইভাবে ব্যবহৃত হচ্ছেন এটা দেখলে তিনি নিজেই সম্ভবত নিজেকে ডিসিপ্লিন করতেন।
এই মন্তব্যটি করে রুমকি চুপ করে যায়। অর্ণব তার কফিতে চুমুক দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু কফি সত্যিই ঠান্ডা হয়ে গেছে। তৃতীয় ব্যক্তিটি — যার নাম পরে জানা যাবে তৃষা — একটু অপমানিত বোধ করে, কিন্তু সেই অপমানকে তৎক্ষণাৎ একটি কনসেপচ্যুয়াল ফ্রেমওয়ার্কে রূপান্তরিত করে।
— দেখো, আমি বুঝি তোমার সার্কাজমটা। কিন্তু সার্কাজম নিজেই একটা প্রিভিলেজড কমিউনিকেশন স্টাইল। অনেক নিউরোডাইভার্জেন্ট মানুষ সার্কাজম প্রসেস করতে পারে না। তুমি কি সেই বিষয়ে অ্যাওয়্যার?
— আমি অ্যাওয়্যার যে তুমি এইমাত্র ফুকো ব্যবহার করে একটা সাধারণ প্রশ্নকে পাওয়ার স্ট্রাগলে পরিণত করলে। এটাকে আমি মার্ক্সীয় টার্মে বলব: তুমি তোমার মার্জিনালিটিকে একটা ন্যারেটিভ ক্যাপিটালে রূপান্তরিত করেছ। এবং এই ক্যাপিটাল দিয়ে তুমি কনভার্সেশনে অথরিটি কিনছ।
একটু নীরবতা।
— ন্যারেটিভ ক্যাপিটাল? এটা কি তুমি এইমাত্র বানালে?
— না, এটা একটা ক্রিটিকাল থিওরির কনসেপ্ট। কিন্তু আমি স্বীকার করব যে আমি টার্মটা একটা নিউজলেটার থেকে পেয়েছি যেটার সাবস্ক্রিপশন আমি এক মাস আগে ক্যান্সেল করেছি।
— সাবস্ক্রিপশন ক্যান্সেল করেছ? বাহ। তাহলে তুমিও ক্যাপিটালিজমের লজিক মেনে নিয়েছ। অ্যান্টি-ক্যাপিটালিস্ট নিউজলেটারও সাবস্ক্রিপশন মডেলে চলে। এটাই হলো—
— হ্যাঁ, হ্যাঁ, এটাই হলো কনট্রাডিকশন। আমরা সবাই জানি। কিন্তু কনট্রাডিকশন স্বীকার করলেই ডায়ালেক্টিক্স শুরু হয়। তুমি কনট্রাডিকশনকে পয়েন্ট আউট করে সেখানেই থেমে যাচ্ছ। এটা ডায়ালেক্টিক্স না, এটা হলো ইন্টেলেকচ্যুয়াল ভয়্যারিজম।
অর্ণব এতক্ষণ চুপ ছিল। এখন সে হঠাৎ উজ্জীবিত হয়।
— কিন্তু দ্যেরিদা নিজেই বলেছেন যে ডায়ালেক্টিক্স হলো—
— দ্যেরিদা কী বলেছেন সেটা তুই পড়িসনি। তুই পড়েছিস দ্যেরিদা সম্পর্কে একটা থ্রেড যেটা কেউ এক্সে পোস্ট করেছিল এবং যেটা নিজেই দ্যেরিদা সম্পর্কে আরেকটা আর্টিকেলের সারসংক্ষেপ ছিল যেটা নিজে দ্যেরিদার একটা ইন্টারভিউর ট্রান্সলেশনের উদ্ধৃতি ছিল।
— সেটা কীভাবে জানলি?
— কারণ আমিও একই থ্রেড পড়েছি। এবং সেই থ্রেডটা আমি নিজেই রিটুইট করেছি। এটাই হলো আমাদের ডিসকোর্সিভ কমিউনিটি। আমরা দ্যেরিদার ছায়ার ছায়ার ছায়া নিয়ে কথা বলছি এবং নিজেদের ডিকনস্ট্রাক্টিভিস্ট মনে করছি।
তৃষা এখন একটু অস্বস্তিকর হয়।
— কিন্তু মার্জিনালাইজড পার্সপেক্টিভ তো রিয়েল। আমার অভিজ্ঞতা রিয়েল।
— অভিজ্ঞতা রিয়েল। কিন্তু তুমি যখন তোমার অভিজ্ঞতাকে একটা থিওরেটিক্যাল ফ্রেমওয়ার্কে প্যাকেজ করে একটা কফি হাউসে উপস্থাপন করছ, তখন সেটা অভিজ্ঞতা থাকছে না। সেটা হয়ে যাচ্ছে পার্ফরম্যান্স। এবং পার্ফরম্যান্স এবং অভিজ্ঞতার মধ্যে যে গ্যাপটা তৈরি হচ্ছে, সেটাই আসলে সবচেয়ে বেদনাদায়ক। তুমি কি কখনো ভেবেছ যে তোমার নিউরোডাইভার্জেন্সকে তুমি যখন এপিস্টেমিক প্রিভিলেজে রূপান্তরিত করছ, তখন তুমি আসলে নিজের সাফারিংকেই কমোডিফাই করছ?
নীরবতা। এবার একটু দীর্ঘ।
কফি হাউসের ভেতর থেকে কেউ একজন বাংলায় চিৎকার করে অর্ডার নেয়। মার্বেলের টেবিলে কাপের শব্দ। দূরে কোথাও কলেজ স্ট্রিটের গাড়ির হর্ন।
একজন চতুর্থ মানুষ বসে আছে। সে এতক্ষণ শুনছিল। তার নাম দেবাশিস। সে একটা ছেঁড়া নোটবুক নিয়ে বসেছিল এবং কিছু লিখছিল। এখন সে কলম রাখে।
— তোমরা কি জানো যে আমরা এখন একটা টেক্সটের ভেতরে আছি?
— কী?
— মানে, এই পুরো কনভার্সেশনটা লেখা হচ্ছে। কোথাও। কেউ আমাদের লিখছে। আমরা ক্যারেক্টার।
— এটা কি তোমার একটা মেটাফোর?
— না। আক্ষরিক অর্থে। এই কফি হাউসটা একটা ডিসকোর্স স্পেস — এটা শুধু ফিজিক্যাল লোকেশন না, এটা একটা টেক্সচ্যুয়াল কনস্ট্রাকশন। এবং আমরা এর ভেতরে ক্যারেক্টার হিসেবে কথা বলছি। যে আমাদের লিখছে, সে আমাদের দিয়ে একটা পয়েন্ট প্রমাণ করাতে চাইছে।
— কোন পয়েন্ট?
— সেটাই তো মজার। পয়েন্টটা নিজেও ডিফারড। মানে পয়েন্টটা আসছে না। পয়েন্টটা সবসময় পরে আসবে আসবে করে আসছে না। ঠিক যেভাবে দ্যেরিদার আর্থ কখনো পৌঁছায় না।
— এটা তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করছ? নাকি এটাও একটা পার্ফরম্যান্স?
দেবাশিস একটু হাসে। কিন্তু হাসিটা স্পষ্ট না।
— এটাই তো প্রশ্ন। আমি যদি বলি এটা পার্ফরম্যান্স না, সেটা একটা পার্ফরম্যান্স। আমি যদি বলি এটা পার্ফরম্যান্স, সেটাও একটা পার্ফরম্যান্স। অথেনটিসিটি নিজেই একটা পার্ফর্মড ক্যাটাগরি। সার্ত্র এটা এক্সিস্টেনশিয়ালিজমের ভাষায় বলেছেন, বাটলার এটা জেন্ডার পার্ফরম্যাটিভিটির ভাষায় বলেছেন। কিন্তু কেউ বলেননি যে এই রিয়ালাইজেশনের পরে কী করতে হবে।
— মার্ক্স বলেছেন। অ্যাকশন নিতে হবে।
— কোন অ্যাকশন?
— সেটা ডিপেন্ড করে।
— সেটা ডিপেন্ড করে না। অ্যাকশনের একটা ডিরেকশন আছে। ক্লাস স্ট্রাগল। এই যে তোমরা এখানে বসে পোস্টমডার্নিজম চোদাও, এই সময়ে বাইরে একজন চা-ওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে যার দিনে তিনশো টাকা আয় হয়। তার কাছে তোমাদের ডিকনস্ট্রাকশনের কোনো মানে নেই।
— এটা একটা ফ্যালাসি। চা-ওয়ালার কষ্ট রিয়েল, কিন্তু সেই কষ্টের বিশ্লেষণ ছাড়া শুধু অ্যাকশন অন্ধ। থিওরি ছাড়া প্র্যাকটিস অন্ধ, প্র্যাকটিস ছাড়া থিওরি শূন্য। এটাও মার্ক্সই বলেছেন।
— তাহলে আমরা এখানে বসে থিওরি চোদাই প্র্যাকটিসের জন্য?
— আমরা এখানে বসে থিওরি চোদাই কারণ আমাদের থিওরি চোদাতে ভালো লাগছে। সততার সাথে স্বীকার করো।
এই কথাটা বলে রুমকি একটু থামে। তারপর নিজেই বলে:
— এবং আমিও এই সৎ স্বীকারোক্তিটা করছি কারণ সততার একটা থিওরেটিক্যাল ভ্যালু আছে এবং এই মুহূর্তে এটা করা আমাকে ইন্টেলেকচ্যুয়ালি উচ্চতর পোজিশনে রাখছে। তাহলে এটাও একটা পার্ফরম্যান্স।
তৃষা এখন মাথায় হাত দেয়।
— মাথা ঘুরছে। এটা কি আমার নিউরোডাইভার্জেন্সের কারণে নাকি এই কনভার্সেশনের কারণে সেটা বুঝতে পারছি না।
— এটাই হলো আসল মেটামডার্ন অসিলেশন। তুমি একই সাথে দুটো ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে আটকে আছ এবং কোনোটাই বেছে নিতে পারছ না। এটা দোলাচল না — এটা হলো ডিসাইডিং না করার ফিলজফিকাল লাক্সারি।
— এই লাক্সারিটা কি প্রিভিলেজ?
— সব কিছুই প্রিভিলেজ যদি তুমি যথেষ্ট দূরে দাঁড়িয়ে দেখো। এবং সেই দূরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটাও একটা প্রিভিলেজ।
অর্ণব হঠাৎ বলে ওঠে:
— কিন্তু দ্যেরিদা—
— অর্ণব।
— কী?
— তুই কি অফ গ্রামাটোলজি পড়েছিস?
একটু থামে।
— পুরোটা না।
— কতটুকু?
— প্রথম... কয়েক পাতা।
— উইকিপিডিয়া?
— এবং একটা ইউটিউব লেকচার আর একটা স্পটিফাই পডকাস্ট।
— স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ফিলজফি?
— সেটা পেওয়াল্ড ছিল (ইন্টারনেটে কোনও ওয়েবসাইট, সংবাদমাধ্যম বা ডিজিটাল কন্টেন্ট দেখার জন্য টাকা বা সাবস্ক্রিপশন ফি প্রদানের একটি পদ্ধতি)
— তাহলে তুই গত আধঘণ্টা ধরে দ্যেরিদার নামে যা বলেছিস সেটা হলো: একটা ইউটিউব ভিডিও প্লাস উইকিপিডিয়া প্লাস কিছু থ্রেড প্লাস তোর নিজের ইমাজিনেশন, যেটাকে তুই দ্যেরিদা বলে উপস্থাপন করছিস। এটাকে তুই কী বলবি?
— এটাকে আমি বলব... ইন্টারপ্রিটেশন?
— এটাকে আমি বলব সোকাল অ্যাফেয়ার। অ্যালান সোকাল ১৯৯৬ সালে একটা ননসেন্স পেপার লিখেছিলেন যেটা পোস্টমডার্ন জার্নাল পাবলিশ করেছিল কারণ সেটা ঠিকঠাক শোনাচ্ছিল। তুইও তাহলে ঠিকঠাক শোনাচ্ছিলি।
— এটা কি অপমান?
— এটা ডায়াগনসিস।
দেবাশিস এবার নোটবুকে আবার লিখতে শুরু করে। তৃষা তাকে লক্ষ্য করে।
— তুমি এখন কী লিখছ?
— এই কনভার্সেশন।
— কেন?
— কারণ এটা একটা ডক্যুমেন্ট। এই কফি হাউসে যা ঘটছে সেটা একটা সিম্পটম। বাংলার ইন্টেলেকচ্যুয়াল কালচারের একটা সিম্পটম।
— তুমি কি আমাদের নিয়ে গল্প লিখছ?
— হয়তো গল্পটা আগেই লেখা হয়ে আছে এবং আমরা সেটা অ্যাক্ট করছি।
— এটা কি মেটাফিকশন?
— এটা হলো রিয়েলিটি। মেটাফিকশন এবং রিয়েলিটির মধ্যে যে বর্ডারটা তুমি ধরে নিচ্ছ, সেটাও একটা কনস্ট্রাক্ট।
অর্ণব হঠাৎ বলে:
— তাহলে আমরা কী করব?
এই প্রশ্নটা ঝুলে থাকে। কেউ উত্তর দেয় না। কফি হাউসের পুরনো ফ্যান ঘোরে। কোথাও বাঙালি পুরুষ কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের কিছু গুনগুন শোনা যায়।
তারপর রুমকি বলে:
— আরেকটা কফি অর্ডার দাও।
— এটাই কি তোমার উত্তর? প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন হিসেবে কফি অর্ডার?
— না। উত্তর হিসেবে না। কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে। আরেকটা কফি দরকার কারণ আরেকটা কফি দরকার। কোনো থিওরি ছাড়া।
— কিন্তু সেই সরলতাটাও কি একটা পার্ফরম্যান্স না? তুমি কি সত্যিই থিওরি ছাড়া কিছু করতে পারবে, নাকি তুমি এখন "থিওরি ছাড়া থাকার থিওরি" প্র্যাকটিস করছ?
রুমকি থেমে যায়।
— হ্যাঁ। সম্ভবত।
— তাহলে?
— তাহলে কফি।
তৃষা একটু হাসে। এই হাসিটা তার নিউরোডাইভার্জেন্টের অংশ কিনা সেটা সে বলে না।
দেবাশিস লেখা থামায়। সে কলম রাখে।
— তোমরা জানো, এই পুরো কনভার্সেশনে একটা মুহূর্তও আসেনি যখন আমরা আসলে একে অপরকে শুনেছি। আমরা শুধু রিপ্লাই করেছি। এবং রিপ্লাই করা এবং শোনা যে আলাদা, সেটা হলো এই পুরো ডিসকোর্সের সবচেয়ে বড় আইরনি।
— তুমি কি এখন শুনছিলে?
— আমি নোট নিচ্ছিলাম।
— তাহলে তুমিও শুনছিলে না।
— না।
আরেকটি নীরবতা।
— কিন্তু আমরা কি এখন শুনছি?
— হয়তো। কিন্তু এই ‘হয়তো শোনার’ মুহূর্তটাও যদি আমি নোট করি, তাহলে সেটা আর শোনা থাকে না। এটাই হলো হাইজেনবার্গ আনসার্টেইন্টি প্রিন্সিপল অফ ডিসকোর্স। তুমি যখন অবজার্ভ করছ, তুমি পরিবর্তন করে দিচ্ছ।
— এটা কি ফিজিক্সের সঠিক প্রয়োগ?
— না। কিন্তু ভুল প্রয়োগটা যথেষ্ট পোয়েটিক্যালি কাজ করছে।
অর্ণব হাসে। এই হাসিটা সম্ভবত প্রথম খাঁটি মুহূর্ত।
তারপর সে বলে:
— আমি সত্যিই দ্যেরিদা পড়িনি। আমি পড়তে চেয়েছিলাম কিন্তু অনেক কঠিন মনে হয়েছিল। তারপর ভেবেছিলাম, না পড়েই যদি কথা বলা যায়...
— যায়। এটাই প্রমাণিত হলো।
— এটা কি খারাপ?
রুমকি একটু ভাবে।
— খারাপ না। কিন্তু সৎ না। এবং অ্যাকাডেমিক ডিসঅনেস্টি সম্পর্কে সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস হলো এটা নিজেকে ইন্টেলেকচুয়াল স্বাধীনতা হিসেবে ড্রেস আপ করে।
তৃষা বলে:
— আমিও কি পারফর্ম করছিলাম?
— হ্যাঁ।
— আমার নিউরোডাইভার্জেন্স কি রিয়েল?
— সেটা তুমি জানো। কিন্তু রিয়েল অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতার থিওরেটিক্যাল আর্মর—দুটো আলাদা জিনিস। তুমি আর্মরটা ছাড়া কথা বলতে পারো?
দীর্ঘ নীরবতা।
— জানি না। আর্মর ছাড়া ভয় লাগে।
— এটাই হলো সত্যিকারের কথা। এই একটা বাক্যে থিওরি নেই, সাবস্ক্রিপশন নেই, পার্ফরম্যান্স নেই।
দেবাশিস আবার লিখতে শুরু করে। তারপর থামে।
— আমি এখন একটা সমস্যায় পড়েছি।
— কী সমস্যা?
— আমি এই মুহূর্তটা লিখতে পারব না।
— কেন?
— কারণ লিখলেই এটা পার্ফরম্যান্স হয়ে যাবে। কিন্তু না লিখলে এটা হারিয়ে যাবে। এবং এই দুটো বিকল্পের মাঝে আমি আটকে আছি।
— এটাই হলো রাইটিংয়ের এথিক্স।
— এটাই হলো রাইটিংয়ের ট্র্যাজেডি।
কফি আসে। চারটা কাপ। গরম। ধোঁয়া উঠছে।
কেউ কথা বলে না। কিছুক্ষণের জন্য শুধু কফি হাউসের শব্দ — চেয়ারের ক্যাঁচক্যাঁচ, দূরের কথা, রাস্তার শব্দ।
তারপর অর্ণব বলে:
— এটা কি ভালো কফি?
— না।
— শুধু এটুকুই?
— শুধু এটুকুই।
আজকের ডিসকোর্স সেশন থেকে টেকঅ্যাওয়ে: ডিকনস্ট্রাকশন শিখলাম, দ্যেরিদা পড়িনি, কফি খেলাম, নিজের সাফারিংকে ন্যারেটিভ ক্যাপিটালে কনভার্ট করে ইন্টেলেকচ্যুয়াল ব্র্যান্ডিং করলাম, এবং বিলটা ভাগ করার সময় সবাই সাডেনলি মেটিরিয়ালিস্ট হয়ে গেলাম।
দ্যেরিদার ডিকনস্ট্রাকশন না ডিসকাউন্টেড কনফিউশন?
অরিজিৎ লাহিড়ী
অরিজিৎ লাহিড়ী




মন্তব্য