নিমগ্ন হয়ে আমি কিছু দেখতে পারছিনা এই চলমান সময়ে। মনের সহিত যেই যোগ সেটা থাকছে না বেশিক্ষণ। তাই কোন দৃশ্য কিংবা মানুষের বর্ণনা, লেখায় ঠিক বর্ণনার ভঙ্গিমায় আর আসছে না৷ যেন কেবল তাকিয়ে থাকছি, দেখছি না৷ সেইদিন এক হলুদ রঙের ফুল দেখে, ডায়েরিতে লিখেছি, হলুদ রঙের ফুল দেখলাম৷ অথচ সেই ফুলটা ঠিক কতখানি হলুদ ছিল, রোদের ভেতরে সেই হলুদ রঙ চিকচিক করে কেমন যেন স্বর্ণরঙ হয়ে উঠছিল, এই দৃষ্টি বিভ্রম কিংবা বৈশাখী আলুথালু হাওয়া ফুলটাকে কিরকম বাকিয়ে ফেলছিল সেইসব কিছু আর লেখা হয়নাই৷ এই ভাবনার অবসরে একটা কবিতার ক্রিটিকাল এপ্রিসিয়েশনও লিখছিলাম, শেষের লাইনগুলো ছিল এরকম,
I’m the girl I seeEven though that's not really me...
এই কবিতা লেখকেরও রয়েছে আমার কতো কমপ্লেক্স মাইন্ডস্কেপ। যেন আয়নায় আমি তাকায়ে আছি, কিন্তু নিজেকে দেখছি না, দেখছি কবেকার জলজ এক নীম্ফকে, মাথায় গাঢ় সবুজ পাতার ক্রাউন, হেজেল রঙের চোখ কিংবা দেখছি হয়তো আমাকেই, কিন্তু আমার ভেতরের একক, দ্বৈত, ত্রৈধ বা গোত্রীয় সত্ত্বারা জেগে উঠছে। একেকজন আমার শান্ত, স্থির মনটা নিয়ে নানাদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। এরা সবাই মিলে আসল আমিকে আড়াল করতে করতে এতখানিই ঢেকে ফেলেছে যে সেইখানে আমি আর কেউ নই, নিজের মনের খোঁজ নিজেই পাচ্ছি না৷ কি করে সেই মনের খোঁজ পাবে সবচে প্রিয়তম প্রেমিক?
আমি নিমগ্ন হয়ে আর কিছুই দেখতে পারছিনা আজকাল, তবু ব্যস্ত রাস্তায় প্রেমিকের সজাগ দৃষ্টির দিকে তাকাই, চোখাচোখি হয়না, আমি তাকে দেখি, সে দেখে কতটুকু দূরত্বে থাকলে আমি নিরাপদে পার হতে পারব রাস্তা৷
এইভাবেই নিলীন হবার চেষ্টাতেই কেবল কেটে যাচ্ছে সমগ্র জীবন। আমি যেন স্বরবর্ণের অ, স্বরবর্ণের শুরুতে থেকেও লীন হয়ে রই ব্যাঞ্জনবর্ণের সাথে৷
এসবকিছু নানারকম ভাবতে ভাবতে পড়ার খাতা থেকে উঠে যায় মন, তত্ত্ব কপচানো বাদ দিই, পরীক্ষার খাতায় একটা নাম্বার বেশি পাবার লোভ বাদ দিই, তখন মনে মনে ওই অবস্থা আরকি “মাথার ভেতর ছিল এলভিস প্রিসলি, খাতার ভেতর তোমার নাম৷” আমিও তো ঠিক এই কথাটাই বলতে চাই, আর কোন কথা না, কেবল এটুকুই!
তারপর সব জটিল চিন্তাভাবনা সরে গেলে দেখি, মধ্য আকাশে রাত জাগার ক্লান্তি নিয়ে চাঁদ প্রায় ঝাপসা হয়ে আসছে৷ চারিপাশে ভোরের ঘ্রাণ। দিনের প্রতিটা আলাদা অংশ আমার আলাদা আলাদা ফুলের মতো লাগে, যেমন ভোরবেলাকে মনে হয় জেসমিন ফুল, দুপুরকে লাগে লাল টকটকে জবার মতো, বিকেল যেন প্রিয় আকাশমল্লী, সন্ধ্যাটা বিষণ্ণ দোলনচাঁপার মত যেই ঘ্রাণে জেগে উঠে মেলানকোলিয়া৷ রাত্রি বেলাকে কখনো মনে হয় অশান্ত বুনোফুল, রঙ, গন্ধ সবই আছে কেবল তাকে পাবার নিবেদন নাই! তাইতো রাত্রির সব রঙ বুকে নিয়ে আমি একাই বসে আছি।
লাল রঙের ফুলদানি বেয়ে বেয়ে পানির ফোটা পড়ছে, ফুলদানিতে দুইদিন আগের ফেডেড হয়ে যাওয়া গোলাপ। এইসব দৃশ্যকল্প মাথায় নিয়ে আমি ভোরবেলা ঘুমাতে যাই। অথচ স্বপ্নে সারাদিনের এইসব কিছু আসেনা। স্বপ্নে দেখি তোমার মুখ, তোমার হাসি, তোমার চশমা খুলে রাখা, তোমার তাকানো, সবকিছু আমি স্পষ্ট দেখি যাকিছু তুমিকেন্দ্রীক। এইভাবে স্বপ্নের গভীরে যেতে যেতে টের পাই, এটুকু জীবনে তুমি ছাড়া আর সমূহ স্মৃতি লুপ্ত হয়ে গেছে আমার। যেন আমি মীন, আর তুমি খরস্রোতা প্রবল নদী, আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছ। আমাকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাচ্ছ।
নিরন্তরাল
আদিবা নুসরাত
আদিবা নুসরাত




মন্তব্য