বেশ্যাবাড়ি যাবে কিনা ভাবতে ভাবতে হরেন আবার ভিটেতেই ফিরে এল। ঘরে ঢুকল না। লম্বা টানা দুয়ারে বসে নির্মিমেষ নয়নে সে তাকিয়ে রইল নিভাদের বাড়ির দিকে।
নিভাদের বাড়িটা উঠোনের ওদিকে। ওদের আছে দুখানা বড় বড় ঘর। একটি ঘরে নিভার বিধবা শাশুড়ি থাকে, অপরটিতে নিভারা বাস করে। নিভার স্বামীর নাইট ডিউটি থাকলে সময়-সুযোগ বুঝে রাত বারটার পরে সে হরেনের ফোনে মিসকল দেয়। হরেন নিঃশব্দে দরজা খুলে এদিক-ওদিক তাকায়। তারপরে দরজা ভেজিয়ে বেড়ালের পায়ে উঠোন পেরোয়। ওদিকে ততক্ষণে নিভাও দরজার আগল খুলে পাল্লা দুটি ভেজিয়ে রেখেছে। সেটা ঠেলে তেমনি নিঃশব্দে হরেন নিভার ঘরে প্রবেশ করে অতি সর্তকতার সঙ্গে দরজা বন্ধ করে। এই গোটা প্রক্রিয়াটা ঘটতে সময় লাগে তিরিশ সেকেন্ডেরও কম। এক ঘন্টার মধ্যে সব কাজ সেরে হরেন তেমনি করেই বেরিয়ে এসে আপন ঘরে সেঁধিয়ে যায়।
কিন্তু নিভা ইদানীং তাকে আর নিজঘরে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না। তার মিসকলের জন্য হরেন জেগে ঘুমায়, কিন্তু কল আর আসে না; আধো জাগরণে, আধো ঘুমে ভর হয়ে যায়। এখন রাতের বেলা সে মাঝে মাঝে দুয়ারে বসে থাকে, উঠোনে হাঁটে এটা দেখার জন্য নিভা কি তবে তাকে বাদ দিয়ে ঘরে অন্য লোক ঢোকায়?
নিভার স্বামী শংকর একটা বিস্কুট কারখানায় কাজ করে। টাকা বাঁচানোর জন্য সে অনেকটা পথ সাইকেলে যায় সাইকেলে আসে। তার এক হপ্তা ডে ডিউটি আর পরের হপ্তা নাইট। শংকর যত নাইট করবে তত তার মজা! এই ভেবে হরেন এতদিন খুশি ছিল। মনের মধ্যে পুলক জাগত। এখন সে ভেবে কুলকিনারা পায় না নিভা তাকে এমনি করে বাদ দিল কেন? সে কি অন্য পুরুষ বুকে তোলে? কে সে? তাদের এই হরু সরকারের বাড়ির কেউ? না বাইরের?
আগে আগে হত কী, শংকর বেরিয়ে গেলেই নিভা তাকে ফোন করত। চাপা গলায় বলত, কোথা আছ?
হরেন বলত, বাইরে। বাজারে।
কখন ফিরবে?
এই—। বলতে বলতে হরেন দুলে ওঠে।
আজকে চান্স আছে।
বেশ বেশ। হরেন উত্তেজিত হয়ে বলে। গলা কেঁপে যায়।
আসার আগে ভালো করে সাবান মেখে আসবে।
হরেন অবাক হয়। মাঝরাতে স্নান করব কেন?
হতভাগা গোটা বডিকে স্নান করাতে বলছি না; লিঙ্গটাকে ভালো করে স্নান করাবে—বুঝলে?
হরেন মজা পায়। বলে, আর?
ভালো করে পাউডার মেখে এসো। তোমার গায়ে বড্ড আঁশটে গন্ধ বেরোয়!
মদ নিয়ে যাব? খেলে আর গন্ধ লাগবে না।
না।
সেদিন তো খেলে।
আজ খাব না। সেদিন সকালে মুখ থেকে গন্ধ বেরোচ্ছিল। শাশুড়ি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। তাই এলেই হাতে বোতল ঝুলিয়ে আসবে না।
তবে এক বোতল ভদকা নিয়ে যাই। তুমি হাফ আমি হাফ; তোমার ভালো লাগবে।
হরেন কাজ করে মাছের দোকানে। সেই কোন ভোরে তাকে উঠতে হয়, মাছের আড়তে যেতে হয়, মাছ নিয়ে এসে বসতে হয় সকাল সাতটার মধ্যে। তখন তার মালিক ঘরে খেয়ে-দেয়ে-ঘুমিয়ে, পোঁদ দুলিয়ে আসে। টাটে বসে হরেনের দিকে হাত বাড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলে, হিসেবের কাগজটা দে। হরেন বিনাবাক্যব্যয়ে প্যান্টের পকেট থেকে কাগজটা বের করে দিয়ে হাঁকতে থাকে, জ্যান্ত মাছ, তাজা মাছ, পুকুরের ভালো মাছ—ইত্যাদি। এখানে কাজ করে হরেন দিনে ২০০ টাকা রোজ পায়। মাছ বেচা শেষ হলে, বেঁচে যাওয়া মাছ বাক্সে বরফ চাপা দিয়ে রেখে, সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে একটা বেজে যায়। তারপরে স্নান, খাওয়া, ঘুম। দুপুরের রান্না মা করেই রেখে দেয়। সন্ধেতে সে বাইরে যায়। কখনও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারে, কখনও গঙ্গার ধারে গিয়ে গাঁজা টানে।
নিভার ঘরে এই যে রাত বা রাতের কয়েক ঘন্টা কাটানোর ব্যাপারটা শুরু হয়েছে নিভার বিয়ের পাঁচ মাস পর থেকেই। নিভার তখন নতুন বিয়ে হয়েছে, তাদের এই বারো ঘর এক উঠোনের বাড়িতে সকলেই ভাড়া থাকে। এখানে কেউ কারো নয়। ছোট ছোট ঘর—ইটের দেল, টালির চাল। দশটা ঘর আছে এখানে। মাঝে বড় উঠোন। সেই উঠনে সাইকেল, বাইক বা টোটো রাতে রাখা থাকে। উঠোনের মাঝে আছে একটি পেয়ারা ও একটি জামগাছ, প্রায় একত্রেই জড়ামড়ি করে বেড়ে উঠেছে তারা। প্রায় নিরক্ষর এই সকল পরিবারের সদস্যদের জীবিকা বলতে কারখানায় কাজ, পাটকলে চাকরি বা হকার। দিন আনা দিন খাওয়া অবস্থা সবারই। এহেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত সকল পরিবারের ছোঁড়ারাই একটু গা ঘসাঘসি করত নিভার সঙ্গে। কারণ নিভা অমনই। নিভা তাদের কারও সঙ্গে হেসে কথা বলত, কারো দিকে আবার তাকাতই না। হরেন তেমন করে কথাটথা বলত না। মুখোমুখি হলে কেবল হাসত আর ঘাড় নেড়ে বলত, বউদি ভালো আছ? এমনি একদিন দুপুরের দিকে বাড়ি ফাঁকা পেয়ে সেই বৃহৎ উঠোনে গাছ থেকে গাছে বাঁধা দড়িতে জামাকাপড় শুকোতে দিয়ে দিতে হরেনের ঘরের দিকে এগিয়ে এল নিভা। তখন হরেন দুয়ারে বসেছিল। আজকে সে দুপুরেই গাঁজা টেনে এসেছে। ফলে গা-টা গরম গরম লাগছিল। ঘরে একটা ঝুলন্ত পাখা আছে বটে তবে তাতে তেমন গায়ে হাওয়া লাগে না। সে বাইরে বসেছিল খালি গায়ে, একটা হাফপ্যান্ট পরে। নিভা এসে বলল, তোমাদের এই বাড়িটাতে কি ভূত আছে ঠাকুরপো?
ভূত! বলে হরেন এদিক-ওদিক তাকাল। কিন্তু খটখটে এই রোদের দুরন্ত দুপুরে সে কোনো ভূত দেখতে না পেয়ে বলল, কই, দেখিনি তো কোনোদিন!
আছে আছে। বলে নিভা ঘাড় নাড়ে।
দেখলে নাকি বৌদি?
দেখিনি, তবে ভয় পেয়েছি।
কালকে?
হ্যাঁ। তোমার দাদা নাইট ডিউটিতে গেলেই এই ভয়টা আমি পাই। তুমি যদি সেই সময়টায় আমায় সাথ দিতে!
এইভাবে তার সঙ্গে নিভার রাতের উদ্দাম জীবন শুরু হয়। নিভার গা প্রচুর গরম। টানা একঘন্টা করে গেলেও ওর কিছুই হয় না, সে আরো চায়। বেশ্যাপাড়া মাঝেমাঝেই যায় হরেন। কিন্তু নিভার মতন মেয়ে সে আগে দেখেনি।
একদিন সে বেশ্যাপাড়া থেকে বেরুচ্ছে দেখল পাড়া ছাড়িয়ে চৌমাথায় একটা ক্যাম্প হচ্ছে। বিনা পয়সায় স্বাস্থ্য শিবির। একটা ম্যারাপ করা আছে। অল্প বয়সী কিছু ছেলে মেয়ে মাথায় সাদা টুপি আর পোশাকের উপর একটা সাদা ফতুয়া পড়ে মাইকে নানা কথা হাঁকছে, লোকজনকে লিফলেট বিলি করছে। এমনি একটা চার ভাঁজ করা কাগজ হরেনও পেল। সে দেখল তাতে লেখা আছে—
১) একে অপরের সাথে কথা বললে
২) একসাথে ওঠাবসা করলে
৩) একসাথে কাজ করলে
৪) একসাথে লেখাপড়া করলে
এইচ আই ভি ছড়ায় না।
হরেন দাঁড়িয়ে গেল। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার! সে কাগজখানার ভাঁজ খুলে দেখতে থাকল সেখানে দাঁড়িয়েই। চারভাঁজের কাগজে কত কী যে নানা আকারের হরফে লেখা আছে। সে এতটুকু পড়ল। ভাবল বাকিটা ট্রেনে বসে পড়বে। সে কাগজখানা মুড়ে প্যান্টের পকেটে ঢোকাতেই তার দিকে এক সুন্দরী, অবিবাহিতা মেয়ে এগিয়ে এল। বলল, আসুন, আপনার টেস্টটা করে নিই।
টেস্ট? হরেন হাঁ করে তাকাল।
হ্যাঁ, রক্ত পরীক্ষা। সামান্য একটু রক্ত নেব আমরা। মশা কামড়ানোর মত ব্যথা লাগবে। আধঘন্টা বসলেই রিপোর্ট দিয়ে দেব।
পয়সা লাগবে?
না। ফ্রিতে।
সুগার হয়?
হ্যাঁ।
তাইলে করে দিন।
রাজি হয়ে গেল হরেন। মাগনায় হচ্ছে যখন তখন একটু রক্ত নাহয় দিলই সে। আর কিছুটা সময় বসল কোনো গাছের নিচে। রক্ত দিয়ে নাহয় একটু চা-সেবা করে নেবে।
রক্ত নেবার লাইনে তার আগে তিন-চারজন ছিল। সকলেই তার মতন গরিব। কেউ রিক্সা টানে, কেউ ভ্যান। হরেনের মতন তাদের মুখেও একমুখ দাড়ি-গোঁফ। তবে ওদের কাঁধে গামছা আছে, হরেনের নেই। ওদের মত সেও সামান্য ইনকাম করে। তাতে মা-বেটার চলে যায়। বছর তিরিশের হরেনের বিয়ে দেবার চেষ্টা করেনি তার মা। বলে, ও আমার মাথা পাগলা ছেলে, হালকা বুদ্ধি ওর, কে ওকে মেয়ে দেবে? বরং ও যেমন আছে তেমন থাক।
তাই বলে তো শরীর থেমে থাকে না। শরীরের একটা চাহিদা আছে, কামনা-বাসনা আছে। নিভা যখন তাকে ত্যাগ দিল, একত্রে থেকেও এখন এমন আচরণ করে যেন সে হরেনকে চেনে না, তাকে দেখেনি; তার শরীরের উপরে চড়ে বসেনি। সেই অভিমানে একটা বিধবাকে পটিয়ে ফেলল সে। বিধবাটি লোকের বাড়ি কাজ করে, আর একেবারে শেষবেলায় মাছ কিনতে আসে। তাকে অনেক কম দামে মাছ দিত হরেন। এই করতে করতে ভাব হয়ে গেল। হরেন বলল, কষ্ট করে আর রোজ রোজ মাছ নিতে আসো কেন অতদূর থেকে, রাস্তার ধারেই তো তোমার বাড়ি, ফেরার পথে আমিই নাহয় বাড়িতে মাছটা পৌঁছে দিয়ে যাব। এইভাবে মাছ দিতে গিয়েই এখনও অবদি তার সঙ্গে তিনবার করেছে হরেন। আর এই করতে গিয়েই তার লিঙ্গে একটা বড় মতন ঘা হল। লিঙ্গের পাশটা নরম হয়ে, ঘা ফেটে গিয়ে চামড়া উঠতে লাগল।
এমনই একদিন দুপুরে বাড়ি ফাঁকা দেখে জোর করে তার ঘরে ঢুকে পরে হরেন। রেগেমেগে বলে, আমি কী এমন করেছি যে তুমি আর ডাকো না? কেন দেবে না তুমি আমায়?
সেদিন আর কথা বাড়ায়নি নিভা। ওই অবস্থায় তাকে বিছানায় টেনে নিয়েছিল। নিভা তার হাফ প্যান্টখানা টেনে নামাতেই বড় ঘা-টা চোখে পরে গেল। বিরক্তিমুখে বলল, ঘা হল কী করে?
ও এমনি।
এমনি!
গরমে চুলকে।
বাইরে মারাও?
না না।
বেশ্যাপাড়া যাও?
না না।
এই উত্তরে যেন ফুঁসে উঠল নিভা। বছর কুড়ির মেয়েটা গর্জে উঠে বলল, তাহলে এমনি হল কেন হামারজাদা? চুলকে তো এমনি ঘা হয় না! এদিকেও মারাবে আবার বেশ্যাপাড়াতেও গিয়ে চুদে আসবে, ওটি হবে না। তুমি আমার দরজায় আর ঘা দেবে না।
আর তোমার ভূতের ভয়?
সে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমার রূপ আছে, যৌবন আছে, ভূত ভাগানোর লোক আমি ঠিক পেয়ে যাব।
রক্ত দেওয়া হয়ে গিয়েছিল হরেনের। সাইডে গাছের নিচে বসে পকেট থেকে সে লিফলেটখানা বের করল। ভাঁজ খুলে দেখল তাতে লেখা আছে-
এইচ আই ভি নিয়ে বেঁচে থাকা ব্যাক্তির উপর—
বাড়ি
বাজার
সম্মেলন
সামাজিক মেলামেশা
কোনো ভেদাভেদ করা যাবে না।
সে কাগজটা আবার গুটিয়ে নিল। বিধবা বউটি তার থেকে কিছুটা বড়, বছর ছত্রিশ বয়স হবে। তার দুই মেয়ে, তাদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। নাতিও হয়েছে একটা। লোকের বাড়ি রান্নার কাজ করে। তার সঙ্গে তিনবার হয়েছে, আরো করা যায়, কোনদিকেই কোনো অসুবিধে নেই; কিন্তু সময় করে যাওয়া হয় না তার। তাছাড়া মাঝে মাঝে তাকে বেশ্যাপাড়া আসতে হয়। বেশ্যাদের সঙ্গে না করলে মনে জোর লাগে না, মন ফসফস করে।
রিপোর্ট এসে গেল। সেটা হাতে নিয়ে হতভম্ভের মত খানিক দাঁড়িয়ে থেকে হরেন বলল, রোগ কিছু নেই তো আমার?
না।
সুগার?
ঠিক আছে।
তাহলে আমার রক্তের গ্রুপটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?
গ্রুপের টেস্ট হয়নি।
তাহলে?
এইচ আই ভির টেস্ট হয়েছে। সঙ্গে র্যামডম সুগার। দুটি রিপোর্ট ভালো আছে।
এইচ আই ভির টেস্ট বলতে?
তখন যে বললাম এইডসের টেস্ট।
ও! খারাপ কিছু নেই তো?
না। আমার তাহলে এইডস হয়নি?
না।
তাহলে ঘা কেন হয়?
কোথায়?
অস্থানে।
আপনাকে তাহলে ডাক্তার দেখাতে হবে। হাসপাতালে গিয়ে দেখিয়ে নিন।
কোন হাসপাতাল?
আপনার বাড়ির কাছে যা আছে।
রিপোর্ট পকেটে ভরে খুশি মনে ঘরে ফিরল হরেন। এইডস নেই মানে সে ঠিক আছে। সে খুশি। কিন্তু চিন্তার কথা লিঙ্গটাকে নিয়ে। কার সঙ্গে করে ঘা-টা হল সে কিছুতেই বুঝতে পারল না। বিধবার সঙ্গে, না বেশ্যাপাড়ায় না বউটিরই সঙ্গে? হরেন ভাবনায় পরে গেল।
সে বাড়ি ফিরতেই তার মা তাকে ঘরের এক কোণে টেনে নিয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে ফিসফিস করে বলল, ফিরলি?
হ্যাঁ।
কিছু শুনলি?
কী?
রাস্তায় কিছু শুনিসনি?
না, কী শুনব?
মা আবার দেওয়ালের দিকে চোখ ঘুরিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখে বলল, চারিদিক কেমন চুপচাপ দেখতে পাচ্ছিস?
হ্যাঁ, কেন?
এটাই হচ্ছে কথা! মায়ের গলা এবার উত্তেজিত হয়ে ওঠে।
কী কথা?
শংকরের বউ পালিয়েছে।
মানে!
হ্যাঁ।
কার সঙ্গে পালাল?
আস্তে আস্তে, অত চিল্লাচিস কেন? সবাই শুনে ফেলবে আমরা আলোচনা করছি। গলা চেপে কথা বল।
হরেন সাবধান হয়ে গেল। মা বলল, শোন এর মধ্যে অনেক রহস্য আছে।
কী রহস্য?
সে মাগী ভোরবেলা বাড়ি ছেড়েছে; এখন সন্ধে হয়ে এল, তার কোনো পাত্তা নেই, খবর নেই।
কারো বাড়ি যায়নি তো?
কার বাড়ি যাবে? ছেনালি মাগির তিনকুলে কেউ ছিল নাকি যে যাবে! শঙ্কর কোত্থেকে যে মেয়েটাকে জুট্যে আনল, কে জানে বেশ্যাবাড়ির মেয়ে কিনা—এই নিয়ে ওর বুড়ি মা আমার কাছে কমদিন আক্ষেপ করেছে!
তাহলে?
শঙ্কর এই একটু আগে থানায় গেল। কিন্তু থানা কী করবে? অমনি ঢলানি বেশ্যা মেয়েমানুষের এই হয়! কম ছেলেকে নিয়ে ঘরে ঢুকেছে? ওর বুড়ি মা একদিন তোর কথা আমাকে বলতে এসেছিল। তোকে নাকি ওর ঘরে ঢুকতে দেখেছে। আমিও অমনি চাট্টি কথা শুনিয়ে দিয়েছি! বলেছি, আমার ছেলে ভোলাভালা, মাথায় বুদ্ধি কম বলে ওর বিয়ে দিইনি, কারণ ও বউকে সামলাতে পারবে না। আর ইদিকে তুমি আমার ছেলের নামে বদনাম দিচ্ছ? আমার ছেলে ওসব বোঝে? কোন দেওর বোউদির সঙ্গে গল্প করতে ঘরে যায় না? গেলেই কি সে লাগিয়ে বসে আছে? আমি বলে দিয়েছি জানিস!
বেশ করেছ মা।
ওসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।
তাহলে কী নিয়ে ভাবব?
কিছু না। তুই আনন্দ কর। আর ভাব, একটা বেশ্যা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, বেশ হয়েছে। কদিন পরে আমি শংকরের মাকে বলব, ও নচ্চার মাগী গেছে বেশ হয়েছে, ছেলের ফের বিয়ে দাও। ও, ওইটুকুন মেয়েছেলে, পাড়ার সবকটা ছেলেকে তুর্কি নাচন নাচিয়ে দিল! আমি শংকরকেও বলেছি, কার জন্যে ছোটাছুটি করে মরছিস? যে গেছে, তর ভালোর জন্যেই গেছে; এবার ভদ্র দেখে একটা মেয়েকে বিয়ে কর।
তা মা সে গেল কার সঙ্গে?
হানিফের সঙ্গে।
হানিফ? মুসলমান!
হ্যাঁ।
হানিফের দুটি বউ আছে।
যে গেছে সে নিশ্চয় জেনেই গেছে।
মা এতসব জানলি কী করে তুই?
আমার পাড়া বেড়ানোর অব্যেস; আমি জানব না তো কে জানবে? বলে মা তার দিকে গর্বিত মুখে তাকাল। বলল, সকালে ওকে না দেখে আমি আগেই বুঝেছিলাম, সে মেয়ে আর নেই। এখন দ্যাখ, আমার কথাই মিলল! এই জন্যে আমি তোর বিয়ে দিইনি।
হরেন ঘুরে মার দিকে তাকাল। তার মা নিজের বোধ-বুদ্দির তারিফ করে বলে চলেছে, এইজন্যে আমি তর বিয়ে দিইনি। একে তোর ইনকাম নেই, তার উপরে তুই একটু খ্যাপাটে গোছের, মাথায় বুদ্ধি কম; এই অবস্থায় তোর বিয়ে দিলে শংকরের বউয়ের মতন হয় তোর বউ পালাত নয়ত দুনিয়ার লোকের সঙ্গে মারিয়ে বেড়াত। সেটা কী ঠিক হত? আমরা এই মা-বেটায় দুটিতে মিলে বেশ আছি, বাইরের মেয়েছেলের উৎপাত নেই, চোখ রাঙ্গানি নেই। নিভার মতন তোর বউও পালালে কি যে দুর্গতি হত তোর! তার উপরে ছেলেপুলে হলে তাদেরকে ফেলেই চলে যেত। তখন আর এক ঝামেলা! তার চেয়ে এই ভালো। ঝাড়া হাত-পা হয়ে বেঁচে থাক, যেমন জোটে তেমনি খা।
হানিফের কথা শঙ্করদা জানে?
কে জানে! বলে হাত উলটে দেয় মা।
তুই বলিসনি কিছু?
আমি কেন বলতে যাব? আগ বাড়িয়ে বলে চড় খাই আর কী!
আমি বেরুচ্ছি।
এই তো ফিরলি, আবার কোথায় যাবি?
একটু ফাঁকে গিয়ে বসি।
বসার কী আছে! কিছু খেয়ে যা। খালি পেটে বাইরে যাস নে।
কী খাব? সেই তো আলুসেদ্ধ আর মুড়ি! বাইরে আমি কচুরি খেয়ে নেব।
তবে আমার জন্যেও চাট্টি নেসিস গরম গরম। বলে মা আবার ঢুকে যায় নিভার পালানোর কাহিনিতে। টগবগ করে ফুটতে ফুটতে মা বলে, শঙ্করের প্রথম বিয়ে হয়েছিল কুড়ি বছর বয়সে। সেই বউটা পালালো। তারপরে এই বুড়ো বয়সে শঙ্কর আবার বে করল। নিজের চল্লিশ আর বউয়ের কুড়ি, সহ্য হয়? কোন মেয়েমানুষ এমনধারা বয়সের তফাত মেনে নেয়? নিভাও নেয়নি। তাই তো পেট বের করে, নাভি দেখিয়ে, বুকের আঁচল খুলিয়ে সে বাড়িময়, ঘরময়, উঠোনময় আর পাড়াময় ঘুরে বেড়াত। এমন খানকি মাগী সে, মন সবসময় করে পুরুষ পুরুষ! নিভার শাশুড়ি যখন তোকে নিয়ে বলতে এল, আমিও অমনি দুকথা শুনিয়ে দিয়েছি! বলেচি, আগে ঘরের বউকে শাসন করো তারপরে পরের ছেলের দোষ ধরতে আসবে! আমার ছেলেকে এমন শিক্ষা দিয়েছি যে সে কখনও এক ছিনাল মেয়েমানুষের পেছুপেছু ঘুরবে না। অমন গায়ে পড়া, পুরুষ ঘেঁষা, ঢলানি মেয়ে শঙ্কর এই বয়সে জোটালো কোত্থেকে বল দিকি!
হরেন কথা বলে না। সে বেরিয়ে যায়। তাদের বারো ঘর এক উঠোনের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে, পতিত রেললাইনের পাশে বিহারি কুলি লাইনের বস্তি ছাড়িয়ে সে বুড়ো বটের কাছে যায়। সেখানটা গোল করে বাঁধানো। আলো-আঁধারিতে হরেন সেখানে বসে। তখন পকেটের মধ্যে গজগজ করে ওঠে কাগজটা। চারভাঁজের লিফলেট। এটার কথা সে ভুলে গেছিল। নিভা যা ঝাঁকুনি লাগিয়েছে মনের ভেতর, ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। সে কাগজখানা বের করে। উল্টেপাল্টে, ভাঁজ খুলে কটি লাইন তার মনে ধরে। সেখানে লেখা আছে—
যদি আপনার
এইচ আই ভি সেস্টাসের কারণে
কেউ বিভেদ তৈরি করে
তাহলে তার অভিযোগ রাজ্যের ন্যায়পালের কাছে করুন। এই সম্পর্কিত আরও তথ্য জানার জন্য ১০৯৭-এ কল করুন।
হরেন ফোন করল না। লিফলেটটা ভাঁজ করে নিয়ে পকেটে পুরে রাখল।
এই সময় সে নিভার কথা ভাবছিল না। বরং তার মনে পড়ছিল সেই বিধবা বউটার কথা।
হরেন যখন যৌনরোগে আক্রান্ত হল
অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী
অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী




মন্তব্য