হা জিন একজন চীনা আমেরিকান কবি এবং ঔপন্যাসিক। হা নামটি তার প্রিয় শহর হারবিন থেকে এসেছে। তার লেখা রহস্য ঘরানা আন্দোলন ও মিনিমালিজমের সাথে সম্পর্কিত। তার প্রকৃত নাম জিন জুয়েফেই। জন্ম ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬, চীনের লিয়াওনিংয়ে।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় হা জিন পিপলস লিবারেশন আর্মিতে যোগ দেন। তখন তার বয়স মাত্র ১৩। তবে তিনি উনিশ বছর বয়সে সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন।
১৯৮৯ সালে তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে বিক্ষোভ, গণহত্যা ও পরে চীনা সরকারের দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসিত হন এবং ইংরেজিতে লেখার সিদ্ধান্ত নেন।
তার কবিতা বইয়ের মধ্যে বিটুইন সাইলেন্সেস (১৯৯০), ফেসিং শ্যাডোস (১৯৯৬), ধ্বংসাবশেষ (২০০১) এবং আ ডিস্ট্যান্ট সেন্টার (২০১৮)।
জিনের আন্ডার দ্য রেড ফ্ল্যাগ (১৯৯৭) ছোটগল্পের বইটি ফ্ল্যানারী ও'কনর অ্যাওয়ার্ড জিতেছে। তাছাড়া দ্য ব্রাইডগ্রুম (২০০০) এবং আ গুড ফল (২০০৯) নামে তার আরো দুটো ছোট গল্পের বই রয়েছে।
উপন্যাস ওয়েটিং (১৯৯৯) এর জন্য জিন ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ফিকশন এবং পেন/ফকনার অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন। তিনি তিনটি পুশকার্ট পুরস্কার এবং একটি কেনিয়ন রিভিউ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। অন্যদিকে ওশান অফ ওয়ার্ডস (১৯৯৬) "পেন/হেমিংওয়ে অ্যাওয়ার্ড" পেয়েছে। কোরিয়ান যুদ্ধের সময়কার উপন্যাস ওয়ার ট্র্যাশ (২০০৪) দ্বিতীয়বার পেন/ফকনার অ্যাওয়ার্ড জিতেছে। ফিলিপ রথ , জন এডগার ওয়াইডম্যান এবং ইএল ডক্টরোর পর একাধিকবার এই পুরস্কার জিতেছেন এমন একমাত্র লেখক তিনি। ২০১৪ সালে তিনি আমেরিকান একাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারসে অন্তর্ভুক্ত হন। ব্যক্তি ও পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব-উত্তেজনা, আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী, এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি ও কর্তব্য অন্বেষণ করার জন্য তিনি তার লেখায় সরল, অলংকরণহীন ইংরেজি গদ্য ব্যবহার করেন।
জিন ম্যাসাচুসেটসে থাকেন। বর্তমানে সেখানকার বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন ।
চীনা কবি হা জিন-এর কবিতা
একটি কেন্দ্র
তোমাকে অবশ্যই তোমার নীরব কেন্দ্র আঁকড়ে থাকতে হবে,
যেখানে তুমি করো যা কেবল তুমি করতে পারো।
অন্যরা যদি তোমাকে পাগল বা বোকা বলে,
তাদের জিভকে তা বলতে দাও।
যদি কেউ তোমার অধ্যবসায়ের প্রশংসা করে,
এতে খুব বেশি খুশি হয়ো না—
কেবল একাকীত্বই তোমার দীর্ঘস্থায়ী বন্ধু।
দূরবর্তী কেন্দ্রকে তোমার ধরে রাখতে হবে।
পৃথিবী-আকাশ কাঁপলেও নড়বে না।
অন্যরা যদি তোমাকে তুচ্ছ মনে করে,
এর কারণ তুমি যথেষ্ট সময় ধরে রাখোনি।
যতদিন তুমি থাকো, ধরো বছরের পর বছর
অবশেষে তুমি দেখতে পাবে একটি পৃথিবী
ঘুরতে শুরু করছে তোমার চারপাশ ঘিরে।
বহুদূরের যাত্রী
এগিয়ে যাও: যত দূরে যাবে,
ততই ছোট হয়ে যাবে
তাদের চোখে
যারা আর হাঁটতে পারে না
যতক্ষণ না তারা তোমাকে একদিন
আর দেখতে পাবে না। তারপর
তারা ঘোষণা করবে যে তুমি
অদৃশ্য হয়ে গেছো, যে
তোমার বোকা সিদ্ধান্ত তোমাকে
মরুভূমিতে একাকী ভূতে পরিণত করেছে।
এগিয়ে যাও, পিছনে ফিরে তাকাবে না।
সর্বদা পর্যাপ্ত খাবার এবং জল বহন করো
এবং কারও মানচিত্র অনুসরণ করবে না
তোমার নিজেরটা ছাড়া। প্রতিদিন
তোমার জন্য হয়তো
তাজা উত্তেজনা থাকবে, কিন্তু কোনও মনোহর স্থানে
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করবে না। যদি তুমি
কোনও পথ পাড়ি দাও,
কোনও সহযাত্রীর সাথে দেখা হবে
আশা করো না। যদি দৈবক্রমে
তুমি পথভ্রষ্ট হও, তোমার তখনও
সূর্য আর তারা থাকবে।
প্রতিভা
কতো মানুষ চায় তুমি মাঝারি মেধার হও
যাতে প্রমাণ করতে পারে তুমি তাদের মতোই?
এখন যখন তুমি আলাদা হতে চাও,
তোমাকে যন্ত্রণা এবং আঘাত সহ্য করতে হবে—
অবশ্যই এমন মুঠি থাকবে যা একসাথে
বিভিন্ন দিক থেকে তোমাকে আঘাত করবে।
এমনকি তোমাকে যদি পুরো গ্যাংও আক্রমণ করে
অবশ্যই পাল্টা লড়াই করবে না, কারণ
তারা তোমাকে বিভ্রান্ত করতে চায়
আর দেখতে চায় তুমি কাদায় গড়াগড়ি খাচ্ছো।
মনে রেখো তোমার প্রতিভার মধ্যে
ধৈর্য এবং সহনশীলতাও অন্তর্ভুক্ত।
উঠো, চুপচাপ সরে যাও, এবং
সমস্ত কোলাহল পিছনে ফেলে দাও।
অনুকূলে দৌড়াবে না
জীবন ছোট এবং অনিশ্চিত বলে,
বলো না তুমিও অনায়াসে বাঁচতে চাও।
সময়কে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে বলে গর্ব করো না —
প্রতিদিন তুমি সিনেমা দেখবে আর ডিম সাম খাবে
বন্ধুদের সাথে তখন অলসভাবে গল্প করবে।
অন্যদের মতো ব্যস্ত থাকা আরও ভালো
যারা এক বাটি ভাত কিংবা একটা পোশাকের জন্য কাজ করে।
দেখো জাহাজ ঘাটে ওইসব পদক্ষেপ কতটা স্থির,
বন্দর ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলোর দিকে তাকাও —
ভারী, তারা তথাপি অনেক দূরে যাচ্ছে।
অসুবিধা
তোমার ক্ষতির কথা আর কখনও বলো না।
আসলে, তুমি অনেক কিছু হারিয়েছো:
বাড়ি, চাকরি, পরিবার, দেশ।
তুমি এমন একটা জায়গায় এসে পড়েছো
যেখানে সবকিছুই অচেনা,
যেখানে তোমাকে নতুন করে শুরু করতে হবে।
কখনও কখনও তুমি একটা শিশুর মতো
যে সবেমাত্র কথা বলতে শুরু করেছে,
কখনও কখনও তুমি এক বুড়ো মহিলার মতো,
বিভ্রান্ত, নিজেকে সামলাতে অক্ষম।
এই বছরগুলো তুমি
যাপন করেছো ক্ষতি থেকে ক্ষতি থেকে ক্ষতিতে,
শত অসুবিধায় ছিলে ঘেরা।
কিন্তু কার জীবন, যদি অর্থপূর্ণ হয়,
কোনও দুর্দশায় নিহিত নয়
আর নির্মিত নয় কষ্ট দিয়ে?
দুঃখ-কষ্ট নিয়ে কথা বলা বন্ধ করো।
কোটি কোটি মানুষের তুলনায়
দুঃখ-কষ্ট কখনোই সমান হয় না —
তোমার উচিত নিজেকে ভাগ্যবান মনে করা
যে তুমি আবার শুরু করতে পারবে।
বিচ্ছিন্ন
তবুও আমি তাদের প্রশংসা করি যারা বিচ্ছিন্ন
যেকোনো ভূমি থেকে, যারা, জন্ম থেকেই
বাড়ির সন্ধানে বহুদূর ভ্রমণে
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা তাদের পথ খুঁজে পায়—
তারার মাধ্যমে, তাদের শিকড় বেড়ে ওঠে—
কাল্পনিক আকাশের শেষ প্রান্তে।
তাদের জন্য, জীবন একটি জটিল যাত্রা
এবং প্রতিটি বিরতি এক নতুন প্রস্থান। তারা
জানে তারা রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে যাবে,
কিন্তু যতক্ষণ তারা বেঁচে থাকে,
মৃত্যু তাদের সঙ্গী হয়—
তাদের কল্পনা করা গন্তব্য অবধি,
যদিও তাদের কোন ধারণা নেই কাদের মানচিত্র
তাদের পদচিহ্ন করতে পারে আপডেট।
কবরস্থান
আমি সেই কবরখানার সৌন্দর্য দেখেছি,
যেখানে ঘাসে ভরা ঢাল রোদ লেগে ঝলমল করে
এবং উত্তর আটলান্টিক সাগরের জোয়ার আছড়ে পড়ে
নুড়িপাথর এবং গ্রানাইটের ধাপে।
বাঁকানো পথ থেকে সমাধিস্তম্ভ ছড়িয়ে রয়েছে,
যেখানে ফুল ছাঁটে মেক্সিকান শ্রমিকরা।
প্রত্যেক জায়গা খুবই শান্তিপূর্ণ এবং রৌদ্রোজ্জ্বল,
এবং সবকিছুই সুন্দরভাবে সাজানো।
বুঝতে পারছি কেন তোমরা দুজনেই সেখানে যেতে চাও
এবং তোমাদের পরিবারের জন্য প্লটও কিনেছো
যারা এখনও আমাদের মাতৃভূমি ছাড়েনি।
কোথায় শেষ করতে হবে তা জানা
তোমার বিচরণশীল হৃদয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ভেসে চলা
এই জীবনকে স্থির হতে সাহায্য করতে পারে।
আসলে, একটি সুন্দর কবরখানা হলো একটি গ্রাম
অথবা অন্য ধরনের শহর, যেখানে
মানুষ পরে বসতি গাড়তে পারে।
ঈর্ষা করি আমি তোমার যাত্রার সমাপ্তি নিয়ে তোমার স্পষ্টতাকে,
কিন্তু আমি এখনও নিশ্চিত নই যে কোথায় যাব,
কোনও জায়গার সাথেই কখনও সংযুক্ত নই।
এমনকি এই জীবনের পরেও, আমি হয়তোবা ঘুরে বেড়াতে থাকব।
বাড়ির জন্য পেট পোড়া
বাড়ির জন্য পেট পোড়া গভীর এক হৃদয়-যন্ত্রণা, যদিও
তুমি আর জানো না বাড়ি কোথায়।
বাড়ি হলো অন্য ধরনের অস্তিত্ব —
একবার হারিয়ে গেলে, আর উদ্ধার করা যায় না
তোমার চিন্তাভাবনা আর স্মৃতিতে ছাড়া।
ঘুরে ঘুরে পড়া পাতাগুলি কাউকে দুঃখ দিতে পারে,
কিন্তু তুমি বিলম্বিত শরতের দৃশ্যে অভ্যস্ত।
পরের বসন্তে গাছগুলি সবুজ হয়ে উঠবে।
এখন এত নীল অনুভব করার দরকার নেই।
আজকাল তোমার মনে এত বাড়ি জেগে ওঠে,
সবই এমন জায়গায় যেখানে তুমি কখনও যাওনি।
তোমার ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং তোমার অতীতের
জন্য পেট পোড়া আর কিছুই নয় নিরুপায় এক
পথিক হওয়া ঠেকানোর কল্পনা ছাড়া।
দুর্ভাগ্য
নেমে আসছে আবার দুর্ভাগ্য।
এবার কোন রূপে দেখা দেবে?
দুর্যোগ এবং মৃত্যু তুমি দেখেছ
এবং ভেঙে পড়া পরিবার তোমাকে কাঁপিয়েছ
তাদের সদস্যরা সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে।
অনেকবার তুমি ভেঙেই পড়েছিলে বলা যায়,
বিলাপ করতে, "আর নেই - আমার সব শেষ!"
কিন্তু তুমি নিজেকে তুলে ধরেছিলে
এবং আবার রওনা দিয়েছিলে, যদিও
তোমাকে হঠাৎ বাঁক নিতে হয়েছিল,
নতুন পাহাড় এবং উপত্যকা পার হতে হয়েছিল
আরেক ধরনের টলটলায়মানতা শিখতে শিখতে।
এখন, দুর্ভাগ্য আসছে
কিন্তু তুমি আর কাঁপো না,
এর সঙ্গময়তায় ইতিমধ্যেই অভ্যস্থ:
একটি ভয়াবহ মুখোশের নীচে
বহু দেবতার মুখ, যার মধ্যে সুযোগও রয়েছে।
নির্বাসন বেছে নেওয়া
যদিও তুমি প্রায় মধ্যবয়সী
এখনও নিজেকে তুমি উপড়ে ফেলতে চাও
এবং অনেক দূরে যেতে চাও যাতে নতুন করে শুরু করতে পারো।
বের হওনি এখনও তুমি, কোথায়
শিকড় গাড়বে তা অনিশ্চিত।
তুমি প্রায়ই চাও সেই শিল্পীর মতো যদি হতে পারতে
যে একটা ছোট্ট দ্বীপ কিনেছিলো যাতে
সে নিজের জমিতে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারে।
সে শাকসবজি করতো এবং মুরগি পালতো, কাঠমিস্ত্রির কাজ করতো,
তার কুটিরের ওপারে ঢাল জুড়ে
বাঁশ এবং ফলের গাছ লাগাতো।
তার দ্বীপে প্রতিটি ঋতু বসন্তের মতো ছিল,
যেখানে সে কেবল জোয়ারের শব্দ এবং পাখির গান শুনতে পেত।
এটা এত সুন্দর এবং শান্ত ছিল যে তার দম বন্ধ করে দিত।
ভুলে যেও না সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো
এবং এমনকি তার স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছিলো
কারণ সে বুঝতে পারছিল না কীভাবে এগোতে হবে,
পাগলামি আর ভয়ে সে এতটাই ভেঙে পড়েছিলো।
শুরু থেকেই তার জানা উচিত ছিল
যদি সে নির্বাসন বেছে নেয় তবে নিজস্ব কোনও জমি থাকবে না
—চলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা
তার মধ্যে বারবার জেগে উঠবে—
রাস্তা ছাড়া সে আর কোনও বাড়ি খুঁজে পাবে না।
অন্য কোথাও শিকড় গাড়ার স্বপ্ন দেখো না।
একবার শুরু করলে, তোমাকে ডিঙ্গির মতো বাঁচতে হবে,
মেনে নিতে হবে বিচরণশীল এক ভাগ্য
ভেসে বেড়ানো বন্দর থেকে বন্দরে, বন্দরে...
হা জিন-এর কবিতা
ভাষান্তর: রথো রাফি
ভাষান্তর: রথো রাফি




মন্তব্য