.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি

বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি
এক

প্রায় হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে এক বিস্তৃত ভূখণ্ডে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিসত্ত্বার (Nationality) উদ্ভব ঘটেছিল। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের মতে, প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা ছিল উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে ছোটনাগপুর ও পূর্বে লুসাই পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই সময়ও বাংলা লিপিতে কয়েকটি ভাষা পাওয়া যায়। যথা- বাংলা, অসমিয়া, মনিপুরী এবং অতীতের মৈথালী ভাষা। বাংলা ভাষা এসেছে প্রাকৃত ভাষা থেকে যা সংস্কৃত সাহিত্যে (যথা কালিদাসের নাটকে) শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষারূপে দেখতে পাওয়া যায়।

ইতিহাসে বাঙালি অধ্যুষিত এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক মানচিত্র অনেকবার পরিবর্তিত হয়েছে। বৃটিশ যুগে বেঙ্গল নামে যে প্রদেশটি ছিল ১৯৪৭ সালে সেই প্রদেশটিকে দ্বিখণ্ডিত করা হয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্‌র দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। কীভাবে বাঙালির সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে এই বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করা হলো তার বিবরণ পাওয়া যায় ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জির লেখা ‘বাংলা ভাগ হলো’ গ্রন্থে। ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হলো এবং পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের ও পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই পূর্ব বাংলার জনগণ প্রথম থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়েছিল এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বর্বর শাসকদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। এসব ইতিহাস পাঠকদের জানা আছে, তাই বিস্তারিত বিবরণে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই যে, রাজনৈতিকভাবে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আজ বিভক্ত হলেও বাঙালির সংস্কৃতি এক ও অবিভাজ্য রয়ে গেছে। দুই বাংলার মানুষের সকলেরই আছে এক অতীত ইতিহাস, এক ঐহিত্য ও সংস্কৃতি।

দুই

বাঙালির সংস্কৃতির উৎস সন্ধান এবং আজকের বাংলাদেশে বাঙালির সংস্কৃতির স্বরূপ নির্ণয় করা এই নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়। তার আগে সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছু সাধারণ ধারণা তুলে ধরতে চাই। ‘সাহিত্য’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে বাংলাদেশের অন্যতম বাম ধারার লেখক রণেশ দাসগুপ্ত বলেছেন,
দু হাজার বছর আগেকার রোমান কবি দার্শনিক লুক্রেটিয়াস তার কাব্যগ্রন্থে দেখিয়ে যান প্রকৃতির সান্নিধ্যে মানুষের প্রত্যক্ষ যোগাযোগে শিল্পকলার জন্ম। বাঁশি ও নাচ থেকে শুরু করে কৌতুক ও কাহিনী সবই প্রকৃতির নানান শব্দ ও ছন্দ থেকে শেখা। কিন্তু লুক্রেটিয়াসের মতে শিল্পকলার জন্ম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায়, সার্থকতা আনন্দে।
তিনি আরও বলেন,
সভ্যতার সমগ্র ইতিহাসব্যাপী সংস্কৃতি তথা শিল্পকলা ও সাহিত্যের উপকরণ সঞ্চিত হয়ে এসেছে। কিন্তু শ্রেণী সমাজ তাদের কদর করতে পারেনি। যেখানে যেখানে শ্রেণী সমাজ বিদ্যমান, সেখানে সাহিত্য আজও তার সমৃদ্ধি সত্ত্বেও শৃঙ্খলিত, বিকৃত, খণ্ডিত, নিপীড়িত।
সংস্কৃতি কেবলমাত্র শিল্পকলা ও সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ব্যাপক অর্থে সামাজিক চিন্তা, পরিবার ও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় আচার ও সামাজিক সংস্কার- সবটাই একটি জাতির সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। মার্ক্স-এঙ্গেলস কর্তৃক নির্মিত ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলে যে, উৎপাদন ব্যবস্থা ও অর্থনীতি একটি সমাজের ভিত্তি এবং সংস্কৃতি, দর্শন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা হলো উপরিকাঠামো। সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটে। সংস্কৃতিরও একটা শ্রেণি চরিত্র আছে, যথা- সামন্ত সংস্কৃতি, বুর্জোয়া সংস্কৃতি ও প্রলেতারীয় সংস্কৃতি। শ্রেণি বিভক্ত সমাজে রাজনৈতিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও শ্রেণি সংগ্রাম চলে।

সাধারণভাবে একটি সমাজে শাসক ও শোষক শ্রেণির চিন্তা ভাবনা ও সংস্কৃতিই সেই সমাজে প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে। ‘জার্মান ইডিওলজি’ গ্রন্থে মার্ক্স-এঙ্গেলস লিখেছেন,
প্রতিটি ঐতিহাসিক যুগেই শাসক শ্রেণির আইডিয়াই হচ্ছে প্রাধান্য বিস্তারকারী আইডিয়া। ...যে শ্রেণির হাতে আছে বস্তুগত উৎপাদনের উপায়সমূহ, তারা মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎপাদনের উপায়সমূহও নিয়ন্ত্রণ করে।
অর্থাৎ সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সাহিত্য ও শিল্পকলায় শাষক শ্রেণিরই আধিপত্য থাকে এবং সেই অঙ্গনেও শ্রেণি সংগ্রাম চলে। এভাবে সমাজ বিকশিত হয় এবং সেই সমাজের সংস্কৃতিও পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়। আমরা বাঙালি জাতির অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত সাহিত্য, শিল্পকলা, সামাজিক চিন্তা ভাবনা অর্থাৎ এক কথায় বাঙালি সংস্কৃতি কীভাবে বিকশিত হয়েছে এই নিবন্ধে খুবই সংক্ষেপে সেটি দেখার চেষ্টা করব।

তিন

সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আলোচনা করতে হলে সমাজে ধর্মের প্রভাবের বিষয়টিও আলোচনার দাবি রাখে। মনে রাখতে হবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই বাঙলাকে বিভক্ত করা হয়েছিল। সেই জন্য ধর্ম বিষয়ক আলোচনাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজ ও সংস্কৃতিতে ধর্মের প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না। কার্ল মার্ক্স তার ‘থিসিস অন ফয়ারবাখ’ শীর্ষক রচনায় এই বিষয়টি আলোচনা করেছেন। কিন্তু আমরা যদি কোনো জাতির সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ধর্মীয় ব্যাপারটিকেই একমাত্র ও প্রধান বিষয় বলে মনে করি তা হবে ভুল।

তবে পাশ্চাত্যের কোনো কোনো পণ্ডিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকেই সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রধান নির্দেশক বলে প্রচার করেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যামুয়েল হান্টিংটনও বুর্জোয়া প্রচারমাধ্যম কর্তৃক বহুল প্রচারিত একজন পণ্ডিত। তিনি ১৯৯৬ সালে ‘The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন যেখানে তিনি বর্তমান পৃথিবীকে নয়টি সভ্যতায় ভাগ করেছেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে গুলিয়ে ফেলেছেন। তার মতে, উত্তর আফ্রিকার আরব দেশগুলো এবং তুরস্ক ও পকিস্তান পর্যন্ত এশিয়ার এই মুসলিম সংখ্যাগরীষ্ঠ দেশগুলো এবং ভারতের রাজ্য কাশ্মীর এবং বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে একটি সভ্যতা ও একক সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই বিশাল অঞ্চল জুড়ে দেশগুলোর মধ্যে যে ভাষাগত, ঐতিহ্যগত এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য রয়েছে তা তার কাছে কোনো ধর্তব্যের বিষয় ছিল না। সবগুলোকে তিনি ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতি বলে অভিহিত করেছন। এই তথাকথিত সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে ভারতের কাশ্মীর রাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত তা সহজেই বোধগম্য। তিনি ইতালি, গ্রীস ও রাশিয়াকে অপর একটি সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত করেছেন কারণ এই দেশগুলোর জনগণ অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। তার মতে শ্রেষ্ঠ সভ্যতা হচ্ছে পাশ্চাত্যের সভ্যতা যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, পশ্চিম ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। বলাই বাহুল্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির এই যদি হয় মাণদণ্ড তবে আমরা ঘোর সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় মৌলবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলতার জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ব।

ধর্ম সংক্রান্ত সামাজিক সংস্কার বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উপাদান কখনোই ছিল না, এখনো নেই। এই নিবন্ধের পরবর্তী অংশে আমরা ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাব এবং বাঙালি সংস্কৃতির উপাদানসমূহ খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।

চার

বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে এই ভূখণ্ডণ্ডে কীভাবে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল তা বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। কারণ অবিভক্ত বাংলার সংখ্যাগরীষ্ঠ মানুষ ছিল মুসলমান এবং আজকের বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই মুসলমান। এই মুসলমান জনগোষ্ঠীর পূর্ব পুরুষরা ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং পেশায় কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী ও তাঁতী। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহুকাল আগে থেকেই বেদ বিরোধী একটি মতবাদও বেশ প্রবলভাবে উপস্থিত ছিল যা তাদের লোকায়ত সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয়। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ সুজিত আচার্য ‘বাংলায় ইসলাম ধর্মের সূচনাপর্ব’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, এই দেশে মুসলিম শাসকদের তরবারির জোরে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তিত হয়নি। তার মতে, ধর্মান্তরিত হওয়ার এই প্রক্রিয়ায় ‘অনুঘটকের কাজ করেছিল তৎকালীন বাংলার ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ!’ বর্ণহিন্দুদের নিষ্ঠুর অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তারা এক সময় বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিল। পালদের রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তারও ঘটেছিল। পরবর্তীতে কর্ণাটক থেকে আসা ব্রাহ্মণ্যবাদী সেনদের (সুজিত আচার্যের মতে এরাও বাঙালিদের কাছে বিদেশি বলেই গণ্য হতো) রাজত্বকালে বৌদ্ধদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়। এর পরে এলো সুফি মতাবলম্বী ইসলাম ধর্ম প্রচারকগণ। সুফি মতবাদের মধ্যে ছিল একটি উদার, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি (অন্যদিকে শরীয়া মতাবলম্বীরা ছিল কট্টর প্রতিক্রিয়াশীল)। তাদের হাত ধরেই দলে দলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। সুফি মতবাদের সঙ্গে তাদের লোকায়ত সংস্কৃতির একটা সাদৃশ্যও তারা খুঁজে পেয়েছিল। তাছাড়া এই ধর্ম প্রচারকগণ নিম্নবর্ণের শ্রমজীবীদের নিয়ে জঙ্গল সাফ করে কৃষি জমি উদ্ধারের কাজে সহযোগিতা ও নেতৃত্ব দান করেছিলেন। এটা বেশি করে ঘটেছিল বাংলার পূর্বাঞ্চলে। সেজন্য বাঙলার পশ্চিমাঞ্চলের তুলনায় পূর্বাঞ্চলে মুসলমানরা সংখ্যায় অনেক বেশি।

বাঙলায় নিম্নবর্ণের হিন্দুদের দলে দলে ধর্মান্তরিত হওয়ার ঐতিহাসিক কালপর্বের এক চিত্র পাওয়া যায় প্রখ্যাত সাহিত্যিক শওকত আলীর লেখা ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে।

মধ্যযুগেই হিন্দু মুসলমানের মিলিত এক চমৎকার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। পালাগান, যাত্রা, লোককাহিনী ইত্যাদির মধ্যে এই সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়। উপরন্তু বৌদ্ধ ধর্মের সহজিয়া মতবাদ আগে থেকেই আজকের বাঙালির পূর্বপুরুষদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। এই সহজিয়া মতবাদের দুটি ধারা আছে। একটি ধারা হলো সগুণ, অপরটি নির্গুণ। সগুণ ধারার প্রতিনিধি ছিলেন ব্রাহ্মণ ঘরে জন্মগ্রহণ করা কিন্তু জাতিভেদ প্রথার বিরোধী মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্য, যার অনেক মুসলমান শিষ্যও ছিল। এই ধারার আরেকজন প্রতিনিধি হলেন চণ্ডীদাস, যিনি বলেন গেছেন, ‘সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই’।

নির্গুণ ধারার প্রতিনিধি ছিলেন ধর্ম নিরপেক্ষ বাউল সাধকরা। আমাদের অতি পরিচিত লালন শাহ তাদেরই অন্যতম। বাউল সঙ্গীতের একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলেন মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন ‘হারামণি’ নামক গ্রন্থে। এই গ্রন্থের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন,
আমাদের ইতিহাস আজ পর্যন্ত প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্তু মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি, -এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই, একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি।

এই তো আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য দুই বাংলার হিন্দু মুসলমানের রক্তের মধ্য দিয়ে আজও প্রবাহিত। যদিও মাঝে মধ্যে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছে তবুও আমি বলব যে, ওটা আমাদের সংস্কৃতির প্রধান দিক নয়। ওটা ছিল রাজনীতির কূট-কৌশলের পরিণতি, যার শিকার হয়েছিল সাধারণ মানুষ। আমাদের সমাজে বিবাহ ও কিছু খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে প্রভেদ থাকলেও একত্রে উৎপাদনে অংশগ্রহণ করা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব ও ক্রিয়াকর্মে একত্রে যোগ দেওয়া, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রতিবেশির বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে আগেও ছিল, এখনো আছে। বৃটিশরা ক্ষমতায় আসার পরপরই যে মহান কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল, সে সকল কৃষক বিদ্রোহে, রংপুরের বিদ্রোহে, মেদেনীপুরের চোয়াড় বিদ্রোহে, ১৮৫৭ সালে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে (সিপাহী বিদ্রোহ), নীলচাষীদের বিদ্রোহে, পাবনার প্রজা বিদ্রোহে, তিতুমীরের নেতৃত্বে পরিচালিত সশস্ত্র যুদ্ধে হিন্দু মুসলমানের সমান অংশগ্রহণ আমরা দেখতে পাই। এটাই আমাদের ঐতিহ্য।

পাঁচ

মধ্যযুগেই বাঙলায় কাব্য, লোকসাহিত্য ও সঙ্গীত গড়ে উঠেছিল। এই সংস্কৃতির মধ্যে সে যুগের শ্রেণি সংগ্রামও দেখতে পাওয়া যায়। একদিকে দেখব লক্ষণ সেনের রাজসভার রাজকবি জয়দেবের কবিতা যা রাজার তোষামোদী, ভোগ-বিলাশ ও বিকৃতিতে ভরা। অপর দিকে জনসাধারণের মধ্যে সেই সব কবিতাই জনপ্রিয় ছিল যার মধ্যে পাওয়া যায় দুঃখ, দারিদ্রের ছবি এবং মুক্তি পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়াত অধ্যাপক অতীন্দ্র মজুমদার মধ্যযুগের বাঙালি সংস্কৃতি প্রসঙ্গে বলেন, একদিকে সামাজিক গোঁড়ামি, ঐশ্বর্যবিলাস এবং কামনা বাসনার সোৎসাহ আতিশয্য, কাব্য-কবিতাগুলোর অধিকাংশই যৌন-কামনা বাসনায় মদির ও মধুর’। অন্যদিকে সেই সময়ের কাব্যে রয়েছে, ‘নিদারুণ দারিদ্র, ক্ষুধা, অভাব, শোষণ, বঞ্চনা, যন্ত্রণা ও মৃত্যু’।

আমাদের সংস্কৃতিতে, কাব্যে ও শিল্পকলার মধ্যে শ্রেণি সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ এভাবে দেখতে পাওয়া যায়।

আগেই বলা হয়েছে যে, আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে ধর্ম নিরপেক্ষতা বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে অবস্থান করেছিল। সুফি মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত ধর্মান্তরিত শ্রমজীবী মুসলমানরা সহজাতভাবেই ছিল অসাম্প্রদায়িক। তাদেরকে বলা হতো আতরাফ। অন্যদিকে পশ্চিম থেকে আগত বহিরাগত তথাকথিত অভিজাত মুসলমানদের বলা হতো আশরাফ। তারা আতরাফদের অর্থাৎ শ্রমজীবী দরিদ্র মুসলমানদের ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের চোখে দেখত। এই আশরাফ-আতরাফের দ্বন্দ্বের এক চিত্র আমরা পাই মুকুন্দরামের ‘কবিকঙ্কণ চণ্ডী’র মঙ্গলকাব্যে।

অন্যদিকে হিন্দু সমাজের মধ্যে জাতিভেদ প্রথার কারণে সেখানেও দ্বন্দ্ব ছিল প্রবল। উচ্চবর্ণের কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে নিম্নবর্ণের হিন্দু, ম্লেচ্ছ ও মুসলমানদের স্পর্শ এমনকি ছায়াও এড়িয়ে যাওয়ার এক ধরনের বিকৃত মানসিকতা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা দেখব, বর্ণহিন্দুদের এই বিকৃত মানসিকতা অথবা আশরাফদের তথাকথিত আভিজাত্য কোনোটাই বাঙালির সুস্থ সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।

ছয়

বৃটিশ শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জগতে এক বিরাট পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক নতুন ধরনের জমিদারি ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এর মধ্য দিয়ে এক নতুন জমিদার শ্রেণি তৈরি হয় এবং প্রজারা তাদের দাসে পরিণত হয়। পাশাপাশি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দালালি করে কোলকাতা কেন্দ্রীক এক নতুন অতি ধনী মুৎসুদ্দি শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এই জমিদার ও নব্য ধনীরা প্রায় সকলেই ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু। তারা রাজধানী কোলকাতায় এক উৎকট সংস্কৃতি তৈরি করে যা ‘বাবু কালচার’ নামে পরিচিত। বাইজী নাচ, মোরগ লড়াই, পতিতালয়ে গমন ইত্যাদি ছিল এই বাবু কালচারের বৈশিষ্ট্য। ১৮৬০ সালে মহাকবি মাইকেল ‘একেই বলে সভ্যতা’ শীর্ষক এক নাটকে এই বাবু কালচারের তীব্র সমালোচনা তুলে ধরেন। একই বছর তিনি আরেকটি নাটক রচনা করেন- ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’। এই নাটকে লম্পট জমিদারের প্রজার স্ত্রীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টিকে নিয়ে মাইকেল নানা ব্যাঙ্গ ও উপহাস করেন।

ইংরেজ শাসন ছিল খুবই নিষ্ঠুর, বর্বর ও নির্মম। জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন ও শোষণের কারণে বাঙলায় দেখা দিয়েছিল মহাদুর্ভিক্ষ। তবে এই বর্বরতা সত্ত্বেও ইংরেজ শাসনের ফলে আমাদের দেশে একটি শিক্ষিত শ্রেণির সৃষ্টি হয় যারা পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তারা বাঙলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজ জীবনে এক নতুন জাগরণ এনেছিলেন। এই জাগরণের প্রথম পুরুষ ছিলেন রাজা রামমোহন রায় যার উদ্যোগে হিন্দু সমাজে প্রচলিত বর্বর সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হয়েছিল (১৮২৯)। তিনি হিন্দু ধর্মের সংস্কার করে একটি উদারপন্থী ব্রাহ্ম ধর্মের প্রবর্তন করেন। এই নবজাগরণের আরেকজন হলেন আমাদের ইতিহাসের মহত্বম পুরুষদের অন্যতম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনিই প্রথম বাংলায় গদ্য সাহিত্য রচনা করেন। শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি উদ্যোগী হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষ। তারই প্রচেষ্টায় হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ আইন প্রবর্তিত হয়েছিল (১৮৫৬)। তিনি বহু বিবাহের বিরুদ্ধেও প্রচারাভিযান চালিয়েছিলেন। সতীদাহ প্রথা বাতিল ও বিধবা বিবাহের প্রবর্তন খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। রক্ষণশীল উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজপতিদের প্রবল বিরোধিতার মুখেই তা কার্যকর করা হয়েছিল।

একই সময় এক আশ্চর্য সাহিত্য প্রতিভা মাইকেল মধুসূদন দত্তের আবির্ভাব ঘটে। তিনি বাংলার কাব্য সাহিত্যকে ভূমিতল থেকে সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গে তুলে নিয়ে আসেন। পৈত্রিক ধর্ম ও পৈত্রিক বিশাল জমিদারি ত্যাগ করা এই সাহসী মানুষটি আনুষ্ঠানিকভাবে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলেও সেই ধর্মের প্রতিও তার কোনো আস্থা ছিল না। তার কাব্যে এবং উপরে উল্লিখিত নাটকদ্বয়ে তিনি উদার গণতান্ত্রিক চেতনাবোধের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মাইকেলই প্রথম তার কাব্যে নারীকে স্বীয় ব্যক্তিত্বের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তার ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যটি বিশ্বমানের মহাকাব্য হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। এই কাব্যে তিনি আবার রামায়ণকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে হিন্দু ধর্মের অবতার রামচন্দ্রকে বেশ খাটো করে দেখিয়েছেন।

পতুর্গিজ পিতা ও ভারতীয় মাতার সন্তান হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও ছিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে র‌্যাডিকাল চিন্তাধারার মানুষ। নাস্তিকতার অভিযোগে তাকে হিন্দু কলেজের অধ্যাপকের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। তার অনেক শিষ্যও ছিল।

বাঙলার সাহিত্য ও সমাজে এই যে জাগরণ তা কোলকাতা কেন্দ্রীক উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এর বাইরে হিন্দু ও মুসলমান প্রজাকূল ও শ্রমজীবী মানুষ অজ্ঞনতার অন্ধকারেই পড়ে ছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীতেই হিন্দু সমাজের মধ্যে নারী শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সেখানেও রক্ষণশীল হিন্দুদের পক্ষ থেকে প্রবল বিরোধিতা এসেছিল। তারপরও ধীরে ধীরে নারী শিক্ষা প্রসার লাভ করে। সাহিত্য জগতেও দুই একজন নারী লেখিকার পরিচয় পাওয়া যায়।

নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি সেই সমাজের সংস্কৃতির একটি বিশেষ দিক- এ কথা এই নিবন্ধের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা দেখব, তুলনামূলক উদারপন্থী ব্রাহ্মধর্মের একজন প্রভাবশালী নেতা কেসবচন্দ্র সেন নারীশিক্ষার পক্ষপাতী হলেও তিনি ছিলেন নারী স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী।

এতে অবশ্য খুব বেশি বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ ঊনবিংশ শতাব্দীতেই মহান ফরাসী বিপ্লব (বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব) সম্পন্ন হওয়ার পরও ইউরোপ ও আমেরিকায় নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। অক্টোবর বিপ্লবের পর রাশিয়াতেই প্রথম নারীরা ভোটাধিকার পেল।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে মার্ক্সের সমসাময়িক একজন উঁচুমানের তাত্ত্বিক ও শ্রমিক আন্দোলনের নেতার পরিচয় পাই (অবশ্য মার্ক্সের সঙ্গে তার মতাদর্শিক পার্থক্য ছিল বিরাট)। তার নাম পিয়েরে জোসেফ প্রুধোঁ। তিনি La Pornocracie গ্রন্থে অবাধ্যতা এবং এই ধরনের কয়েকটি কারণে স্বামী তার স্ত্রীকে হত্যা করতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করেন। এই তো ছিল গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে ইউরোপে নারীদের অবস্থান!

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিন্দু সমাজে নারী নিপীড়ক যে সকল সামাজিক বিধি নিষেধ ছিল তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের কয়েকটি গল্পে এবং পলাতকা কাব্যের বেশ কয়েকটি কবিতায় তিনি শুধু নারী জীবনের চরম বেদনা ও অসহায়ত্বের চিত্রই তুলে ধরেননি একই সঙ্গে প্রতিবাদেও ফেটে পড়েছিলেন।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার একাধিক উপন্যাসে সমাজে নারীরা কীভাবে লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত হচ্ছে তার মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছেন যা সহজেই পাঠককে নারী বিরোধী সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলে।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবিতায় লিখলেন নারী ও পুরুষের সাম্যের কথা।

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘সহমরণ’ কবিতায় একটি মর্মস্পর্শী কাহিনী তুলে ধরেন। সদ্য বিধবা হওয়া এক নারীকে চিতায় পোড়ানো হচ্ছে। সেই নারী অর্ধদগ্ধ দেহ নিয়ে পালিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীতে। তাকে উদ্ধার করে মুসলমান মাঝি। পরে তাদের মধ্যে প্রেম ও বিবাহ হয় এবং তারা সুখী দাম্পত্য জীবন যাপন করতে থাকে। এখানে কবি শুধু সতীদাহ প্রথারই বিরোধিতা করেননি, একই সঙ্গে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে প্রেম ও বিবাহকে সমর্থন জানাচ্ছেন।

চারণ কবি মুকুন্দ দাস তার রচিত কয়েকটি যাত্রায় হিন্দু সমাজে প্রচলিত পণ প্রথাকে তীব্র ধিক্কার জানান।

সেই সময় সম্ভ্রান্ত মুসলমান নারীদের থাকতে হতো বোরখার অন্তরালে, যাদেরকে বেগম রোকেয়া ‘অবরোধবাসিনী’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার আবির্ভাব ঘটে। তিনি কট্টর প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম সমাজপতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেই মুসলমান মেয়েদের জন্য শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তার রচিত বিভিন্ন লেখায় তিনি পুরুষতান্ত্রিকতাকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন। আজকের বাংলাদেশ বেগম রোকেয়ার সেই ঐতিহ্যকেই অনুসরণ করে আসছে। যদিও এখনো মেয়েদের পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়তে দেওয়া উচিৎ নয় বলে একটি মৌলবাদী দল (হেফাজতে ইসলাম) প্রচার করে বেড়াচ্ছে।

সাত

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক জাগরণ তার মধ্যে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের লেশমাত্র ছিল না। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস রচয়িতা, সাহিত্য সম্রাট নামে পরিচিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরেই হিন্দু জাতীয়তাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। অবশ্য বঙ্কিম প্রথম জীবনে ছিলেন পরিপূর্ণরূপে অসাম্প্রদায়িক এবং এমনকি সাম্যের কথাও তিনি বলেছিলেন। তার ‘সাম্য’ নামক গ্রন্থটি আমাদের ইতিহাসে একটি মাইলফলকও বটে। এই গ্রন্থে তিনি নারী পুরুষের সাম্যের কথা বলেছেন। কৃষকের নির্যাতিত হওয়ার করুণ বর্ণনাও আছে এই গ্রন্থে। এই সাম্য গ্রন্থটির ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বঙ্কিম তার দ্বিতীয় সংস্করণ বের করেনি। পরবর্তী বঙ্কিমের মতে, ওই গ্রন্থে নাকি অনেক ভুল ছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বেশ প্রবল হয়ে উঠলেও আমরা এর বিরুদ্ধ ধারাও দেখতে পাই। অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে এবং হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে দঁড়িয়েছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত, শিবনাথ শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখ।

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে মীর মোশাররফ হোসেন ছাড়া তেমন কোনো বড় মাপের মুসলিম সাহিত্যিকের নাম উল্লেখ করা যায় না। মীর মোশাররফ হোসেন ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকে জমিদারদের তীব্র ভাষায় সমালোচনায় করেছিলেন। এই জন্য আবার বঙ্কিম এই নাকটটি নিষিদ্ধ করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছিলেন। সেই সময় আরেকটি শ্রেণি ভিত্তিক নাটক দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। ‘গো-জীবন’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে মীর মোশাররফ হোসেন হিন্দু মুসলমানের ঐক্যের প্রয়োজনে মুসলমানদের প্রতি গো-মাংস ভক্ষণ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।

হিন্দু জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি মুসলিম জাতীয়তাবাদও গড়ে উঠেছিল যার প্রধান ব্যক্তি ছিলেন নবাব আবদুল লতিফ। ফরিদপুরে জন্মগ্রহণকারী এই ব্যক্তিটি আসলে কোনো নবাব ছিলেন না। তিনি ছিলেন সরকারি কর্মচারী। বৃটিশ সরকার তাকে নবাব উপাধিটি দিয়েছিল। মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তারা তাদের ঐতিহ্য খুঁজতেন এই দেশের বাইরে আরব, ইরান ও তুরস্কের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মধ্যে। নবাব আবদুল লতিফ ও বিচারপতি সৈয়দ আমির আলী বাঙলার মুসলমান জনগণকে ইংরেজের প্রতি অনুগত থাকার এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। এই লক্ষ্যে ১৮৬৩ সালে নবাব আবদুল লতিফ ‘ক্যালকাটা মহামেডান লিটারেরি সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনে বাংলা ভাষার চর্চা নিষিদ্ধ ছিল। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত তথাকথিত অভিজাত মুসলমানরা ঘরে উর্দু বলাকে আভিজাত্যের লক্ষণ বলে মনে করত। এরাই পাকিস্তান আন্দোলনে মদত জুগিয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তাদের সেই আভিজাত্যকে গুঁড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আমাদের সাহিত্য জগতে এক আশ্চর্য প্রতিভার আবির্ভাব ঘটে। তিনি বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের সংস্কৃতিকে কী বিপুলভাবে সমৃদ্ধ করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও নজরুলগীতি বাঙালির সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছিল। রাজদ্রোহিতার অভিযোগে বৃটিশ সরকার নজরুলের পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ ও নজরুল কর্তৃক সম্পাদিক ধূমকেতুর কয়েকটি সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে। একই কারণে তিনি কারাদণ্ডও ভোগ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ মূলত ভাববাদী কবি হওয়া সত্ত্বেও এবং তার নৈবেদ্য থেকে গীতাঞ্জলি পর্ব পর্যন্ত সময়কালে তিনি আধ্যাত্মিকতায় মগ্ন থাকলেও তার সমগ্র সাহিত্যে মানুষের জয়গান উঠে এসেছে। তিনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের পক্ষে সচেষ্ট ছিলেন। ১৯০৭ সালে পাবনায় অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কংগ্রেসে প্রদত্ত ভাষণে মুসলমানদের অধিকতর সুবিধা প্রদানের জন্য অভিমত প্রকাশ করেছিলেন। শরৎচন্দ্রের লেখাতেও মুসলমানদের প্রতি দরদ লক্ষ করা যায়।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আরও কয়েকজন প্রতিভাবান কবি ও সাহিত্যিকের পরিচয় আমরা পাই। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন কবি জীবনানন্দ দাস, কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি জসীম উদ্‌দীন, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, ছোটগল্পকার সোমেন চন্দের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার ছোটগল্প ও উত্তরকালের কয়েকটি উপন্যাসে শ্রেণি সংগ্রামকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন। তার ছোটগল্প ‘হারানের নাত জামাই’ ও ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ মেহনতী মানুষের শ্রেণি সংগ্রামের ভিত্তিতে রচিত অসামান্য দুটি রচনা।

সুকান্তের কবিতায় শ্রেণি সংগ্রাম আরও উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। তার কাব্যের নান্দনিক গুণও অসামান্য। ছোটগল্প লেখক বড়মাপের সাহিত্য প্রতিভা সোমেন চন্দ ১৯৪২ সালে ঢাকার রাস্তায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

জসীম উদ্‌দীন আরেক প্রতিভাবান কবি। তার ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যগন্থে তিনি দরিদ্র হিন্দু নমঃশুদ্র পরিবারের মেয়ের সঙ্গে দরিদ্র মুসলিম কৃষক পরিবারের ছেলের প্রেমকে মহান করে চিত্রিত করেছিলেন। অসাম্প্রদায়িকতার ও হিন্দু-মুসলমান মিলনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করে গেছেন বাংলা সাহিত্যে।

বিংশ শতাব্দীতে বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মুকুন্দ দাসের মতো কয়েকজন প্রতিভাবান যাত্রাশিল্পী ও কয়েকজন কবিয়ালের সাক্ষাৎ আমরা পাই। মুকুন্দ দাস রাজদ্রোহিতার অপরাধে কারাবরণ পর্যন্ত করেছিলেন। কবিয়ালদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা চট্টগ্রামের কবিয়াল রমেশ শীল, পশ্চিম বাংলার দরিদ্র পরিবারের সন্তান কবিয়াল শেখ গোমানি, ময়মনসিংহের বিড়ি শ্রমিক লোককবি নিবারণ পণ্ডিত, কোলকাতার মেটিয়াবুরুজের শ্রমিক কবিয়াল গুরুদাস পাল প্রমুখ। তারা সকলেই সাম্যবাদী আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন।

চল্লিশের দশকে গণসঙ্গীত বাংলার সংস্কৃতিতে এক নতুন উপাদান সংযোজন করেছিল। গণসঙ্গীত রচয়িতা হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সলীল চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের গান, নাটক, কবিতা বাঙলার সংস্কৃতিকে আরো সমৃদ্ধ করেছিল। এই প্রসঙ্গে বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘নবান্ন’ নাটকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আট

গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে বাংলা সাহিত্যের প্রগতির ধারা এক বিশাল উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভাগের কারণে সাতচল্লিশ পরবর্তী পূর্ববঙ্গে (আজকের বাংলাদেশে) তা বড় রকম ধাক্কা খেল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রথম থেকেই বাঙালির সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র করতে শুরু করে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দেওয়া এবং রোমান বা আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রচলন করার প্রয়াস ছিল আমাদের এই ঐতিহ্যবাদী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করারই চক্রান্ত। কিন্তু সেই চক্রান্ত সফল হয়নি। সাতচল্লিশ পরবর্তী নতুন তরুণ মুসলিম সমাজ রুখে দাঁড়ালো এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এক বিরাট পরিবর্তন এলো। ‘ইসলামি তমুদ্দুন’ বা পাকিস্তানি ভাবধারার কবি ও লেখকগণ পিছিয়ে পড়লেন। আবির্ভাব ঘটল বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একদল তরুণ, প্রতিভাবান কবি ও লেখকের। বিশিষ্ট শিল্পী মর্তুজা বশির ভাষা আন্দোলনের ওপর একটি হাতে আঁকা স্কেচ অঙ্কন করেছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের উদ্যোগে ঢাকায় আর্ট কলেজ স্থাপিত হলো। জয়নুল আবেদীন একের পর এক ছবি আঁকতে লাগলেন যার মধ্যে প্রগতিশীলতার উপাদান ছিল বিপুল পরিমাণে। ষাটের দশকে আরেক দল তরুণ কবি ও সাহিত্যিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও শ্রেণি সংগ্রামের বিষয়টিও নিয়ে এলেন কাব্যে ও সাহিত্যে। মওলানা ভাসানীর ওপর লেখা ‘সফেদ পাঞ্জাবি’ এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আসাদের ওপর লেখা ‘আসাদের শার্ট’- কবি শামসুর রাহমানের এই দুটি কবিতা ছিল রাজনৈতিক কবিতা। ষাটের দশকে আবু বকর সিদ্দিকি একাধিক উচ্চমানের গণসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতে এই পরিবর্তনটি সূচিত না হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারত না।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্রটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে প্রেরণা যুগিয়েছিল। এই চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল যা পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচিত হয়। জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ‘Stop Genocide’ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। প্রামাণ্যচিত্রটি নান্দদিক দিক দিয়েও উঁচুমানের এবং তা বিদেশে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে সমর্থন যোগাতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। একাত্তর সালেই শিল্পী কামরুল হাসান পাকিস্তানের সামরিক শাসক গণহত্যাকারী ইয়াহিয়া খানের যে ব্যাঙ্গচিত্রটি অঙ্কন করেন তা ছিল একটি অসাধারণ শিল্পকর্ম। এই চিত্রের মধ্য দিয়ে ইয়াহিয়া খানের যে হিংস্র রূপটি ফুটে উঠেছিল তা পাকিস্তানি শাসকদের বর্বরতা ও হিংস্রতার চিত্রটি যথার্থভাবেই ফুটিয়ে তুলেছিল।

পাকিস্তানি শাসকরা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে রেডিও-টেলিভিশনে নিষিদ্ধ করেছিল। অবশ্য এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করেছিলেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি শাসকদের আক্রমণকে অগ্রাহ্য করেই তিন দিন ধরে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়েছিল। এটি কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডই ছিল না, তা ছিল একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগ্রাম। ষাটের দশকে পল্টন ময়দানে গোর্কির ‘মা’ নাটকটিও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ষাটের দশকের প্রথম দিকেই ছায়ানট নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে যা বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে এবং বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চায় প্রেরণা যুগিয়েছিল। এর কিছুদিন পরই কামাল লোহানীর নেতৃত্বে ‘ক্রান্তি’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং আরও পরে সত্যেন সেনের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘উদীচী’ নামক আরেকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। ক্রান্তি ও উদীচী এই দুটি সংগঠন সংস্কৃতিকে মেহনতী মানুষের মুক্তি সংগ্রামের হাতিয়ার বলে মনে করত। সেই সময় ঢাকার পল্টন ময়দানে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে ক্রান্তি গণসঙ্গীত, নৃত্যনাট্য ও একটি নাটিকা পরিবেশন করে। এর মধ্যে ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও মেহনতী মানুষের শ্রেণি সংগ্রামের উপাদান। ক্রান্তি বিভিন্ন শিল্প অঞ্চলে ও গ্রামে-গঞ্জেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছিল যা শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যে শ্রেণি চেতনা বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

পঞ্চশ ও ষাটের দশকে কয়েকজন প্রতিভাবান সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীর সাক্ষাৎ আমরা পাই। তার মধ্যে অন্যতম আলতাফ মাহমুদ ১৯৭১ সালে শহীদ হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে দাঙ্গা হয়েছিল পাকিস্তান ও ভারত দুই দেশেই। পূর্ব পাকিস্তানে কিছু ভাড়াটে লোক সরাসরি সরকারি মদদে এই দাঙ্গা সংঘটিত করেছিল। কিন্তু দাঙ্গা প্রতিরোধে এগিয়ে আসে সাধারণ বাঙালি। দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয় যার চেয়ারম্যান ছিলেন মওলানা ভাসানী, আহ্বায়ক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

এই সকল ঘটনা ষাটের দশকে একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, সাংস্কৃতিক পরিবেশও তৈরি করেছিল। আমরা তাই দেখতে পাই মুক্তিযুদ্ধের এক বছরের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের উত্তাপ থাকা অবস্থাতেই বাংলাদেশে যে সংবিধান প্রণীত হয়েছিল তাতে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’ কথাটি সংবিধান থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছিল।

নয়

স্বাধীন বাংলাদেশে এক নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বাঙালি সংস্কৃতিকে আরও উচ্চতর জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জিয়াউর রহমান সংবিধানের মাথায় ‘বিসমিল্লাহ’ শব্দটি যোগ করে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেওয়ার প্রয়াস নিয়েছিলেন। এরপর এরশাদ ‘রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম’ কথাটি যোগ করে সংবিধানে সংশোধনী আনেন। তবে এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে রাজপথে প্রতিবাদের ঝড়ও উঠেছিল। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে জামাতে ইসলাম মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে থাকে। কয়েকটি সশস্ত্র ইসলামি মৌলবাদী দলও সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা পরপর অনেকগুলো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। তাদের হত্যাহাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন কয়েকজন অধ্যাপক, লেখক, প্রকাশক, খ্রিস্টান পাদ্রী, বিচারকসহ বেশ কিছু নিরীহ মানুষ যার মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান এমনকি বিদেশি নাগরিকও ছিলেন। তাদের দৃষ্টিতে যারাই ইসলাম বিরোধী তাদেরকেই তারা সন্ত্রাসী কায়দায় হত্যা করত। এখনও তাদের গোপন তৎপরতা অব্যাহত আছে। রাজনৈতিক দল জামাতে ইসলাম, কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ও আরও কিছু ধর্মভিত্তিক সংগঠন বাঙালি সংস্কৃতিকেই আঘাত করতে চেয়েছিল। তারা বাঙালির নববর্ষের উৎসবকেও ইসলাম-বিরোধী বলে ঘোষণা করে। এমনকি ২০০১ সালে পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা ফাটিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে একটি গোপন ইসলামি সন্ত্রাসবাদী দল।

এই মৌলবাদী সংগঠনগুলোর অবস্থান বরাবরই নারী-পুরুষের সাম্য ও নারী প্রগতির বিরুদ্ধে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, গত শতাব্দীর ষাটের দশকে পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান যে মুসলিম পারিবারিক আইন প্রবর্তন করেন তাতে মুসলমান পুরুষদের একাধিক স্ত্রী রাখাকে নিষিদ্ধ করা হয়। তখন জামাতে ইসলাম মুসলিম পুরুষের চার স্ত্রী রাখার অধিকারের দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল।

গত তিন দশক ধরে প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করে আছেন নারী। নারীরা সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও পুলিশে আছেন। বলাই বাহুল্য সেখানে তারা বোরখা পরেন না। প্রতি বছর লক্ষাধিক নারী শ্রমিক শ্রম বাজারে যোগ দিচ্ছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও পারিবারিক জীবনে নারীরা লাঞ্ছিত এবং বহু ক্ষেত্রে স্বামীর দৈহিক অত্যাচারের শিকার। এখনো মুসলিম পারিবারিক উত্তরাধিকার আইনে কন্যা পুত্রের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। এই ক্ষেত্রে সমান অধিকারের কথা ওঠা মাত্রই কয়েকটি মৌলবাদী দল হুঙ্কার দিয়ে রাস্তায় নামলে সরকার পিছিয়ে আসে। হিন্দু মেয়েরা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতা-মাতার সম্পত্তির কিছুই পায় না।

মাত্র কয়েক বছর আগে ২০১৬ সালে হেফাজতে ইসলাম নামে একটি দল সরকারের কাছে বাংলা পাঠ্যপুস্তকে অনেকগুলো সংশোধনী আনার দাবি করে। হেফাজতের দাবি অনুসারে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে ২৯টি সংশোধনী আনা হয়। এই সংশোধনী অনুসারে বাদ পড়ে শরৎচন্দ্রের মতো লেখকের গল্পও। বাদ পড়েছিল হুমায়ূন আজাদের কবিতা (যাকে মৌলবাদীরা কাফের আখ্যা দৈহিকভাবে মারাত্মক জখম করেছিল), সত্যেন সেনের রচনা, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর রামায়ণ-কাহিনী, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভ্রমণকাহিনী ‘পালামৌ’ ইত্যাদি।

অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের দাবি অনুসারে যুক্ত করা হয় খলিফা ওমরের জীবনী ও আরও কিছু ইসলামি সাহিত্য।

সরকারের এই আপোষনীতি এবং অন্যদিকে কোনো কোনো বিরোধী দলের জামাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও বাঙালির সংস্কৃতির বিকাশের ধারাকে রুদ্ধ করে দেওয়া সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ আমলে গত ৫০ বছরে মঞ্চনাটক ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। উৎপল দত্তের ভাবশিষ্য মামুনুর রশীদ বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। একই সঙ্গে তিনি নির্দেশক ও অভিনেতা। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, নাটক হবে মেহনতী মানুষের মুক্তি সংগ্রামের হাতিয়ার। নান্দনিক বিবেচনাতেও তার নাটকগুলো উৎকৃষ্ট মানের। সদ্য প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হকের দুটি নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘নুরুল দিনের সারা জীবন’- দুটি অনবদ্য রচনা। মৃত্যুর আগে আগে তিনি শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’-এর যে অনুবাদ করছিলেন তা তার একটি অসামান্য সৃষ্টি। আতাউর রহমানের নির্দেশনায় এই নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল। অভিনয় শিল্পে আমরা পেয়েছি ফেরদৌসী মজুমদারের মতো অত্যন্ত প্রতিভাবান নাট্যশিল্পী। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি বেশ উন্নতমানের। এখানে তানভীর মোকাম্মেলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ কর্তৃক নির্মিত ‘আগুনের পরশমণি’ ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ পরিচালিত ‘গেরিলা’- এই দুটি উল্লেখযোগ্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। তারেক মাসুদ কর্তৃক নির্মিত বহুল প্রশংসিত ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রে আমরা দেখতে পাই ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মীয় কুসংস্কার ভিত্তিক বিশ্বাস কীভাবে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধের সময়। আরেকজন চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকির ‘টেলিভিশন’ চলচ্চিত্রটিতে ধর্মীয় গোঁড়ামিকে উপহাস করা হয়েছে। নান্দনিক দিক দিয়ে চারটি চলচ্চিত্রই বেশ উঁচু মানের।

এই সময়কালে আমরা কয়েকজন প্রতিভাবান ঔপন্যাসিক ও গল্পলেখকের সাক্ষাৎ পাই। তাদের মধ্যে সশওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, সত্যেন সেন, হরিপদ দত্ত, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হরিশঙ্কর জলদাস প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কর্তৃক লিখিত সাহিত্য সমালোচনা এবং সমাজ বিশ্লেষণমূলক কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ ও প্রবন্ধ বাংলাদেশের বর্তমান সাহিত্য জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে।

অনেক বাধা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বাঙালি সংস্কৃতি এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিক্রিয়াশীলতার বাধাকে অতিক্রম করেই গণমানুষ এগিয়ে যাবে তার জয়যাত্রার পথে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’। রবীন্দ্রনাথের সেই কথায় আস্থা রেখে আমিও ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী। দুই বাংলার মানুষ মিলিতভাবেই অগ্রসর করে নেবে বাঙালির সংস্কৃতিকে।

ঋণ: গণশক্তি, শারদ সংখ্যা ২০২৩

বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি
হায়দার আকবর খান রনো


মন্তব্য

নাম

অনুবাদ,37,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,1,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,উৎপলকুমার বসু,26,ঋত্বিক-ঘটক,3,কবিতা,341,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,16,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,76,ছড়া,1,জার্নাল,4,জীবনী,6,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,21,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,168,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,2,বিবৃতি,1,বিশেষ,24,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,41,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,18,সাক্ষাৎকার,23,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,14,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি
বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি
বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি প্রসঙ্গে হায়দার আকবর খান রনোর প্রবন্ধ৷
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhz176LhyphenhyphenyTrg5Qg-7cF2OkNc_EgRSokHFz9BivrdbhiCDC3D6UV66-yFHyj_ccTV-QPsk5rg3JflILXsHTBDrrQXOvhO8IgJxsop_oXErwqfrrJIyRy41OtSSzZlnLf938vwrri61tYO96fBUv3gjQlDilnwiIL8mq2cnynzxMq_TzahgrGxdfavFMm6I/s16000/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%20%E0%A6%93%20%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BF%20%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A6%BF%20%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7%20%E0%A6%B0%E0%A6%9A%E0%A6%A8%E0%A6%BE%20%E0%A6%87%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B8.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhz176LhyphenhyphenyTrg5Qg-7cF2OkNc_EgRSokHFz9BivrdbhiCDC3D6UV66-yFHyj_ccTV-QPsk5rg3JflILXsHTBDrrQXOvhO8IgJxsop_oXErwqfrrJIyRy41OtSSzZlnLf938vwrri61tYO96fBUv3gjQlDilnwiIL8mq2cnynzxMq_TzahgrGxdfavFMm6I/s72-c/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%20%E0%A6%93%20%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BF%20%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A6%BF%20%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7%20%E0%A6%B0%E0%A6%9A%E0%A6%A8%E0%A6%BE%20%E0%A6%87%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B8.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/05/bangladesh--bengali-culture.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/05/bangladesh--bengali-culture.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy