সুশীল কাঁঠালগাছ
যে গাছটি ঘর ঘেঁষে, তিনি, সুশীল কাঁঠালগাছ— পাতা ঝরে
আর আমাদের ঘর মাঝে-মধ্যে শব্দ করে। জানালা খুলছি
কি খুলছি না, রোদের চোখগুলি টোকা দেয় পাতায় পাতায়।
পাখি আসে। রোজ আসে হলুদ কুটুম্ব। তারা কি নিত্যনতুন? প্রতিদিন, আমি তবে জন্ম হয়ে ওঠি? প্রতিটি দিনের জন্ম প্রতিটি রাত্রির মধ্যে? ছিল কাল, দৃশ্যলব্ধ যে চোখ আমার,
হলুদ কাঁঠালপাতা হয়ে সেও ঝরে আছে শান্ত আঙিনায়!
এখন, ছায়ায় শুয়ে মাছির ইয়ার্কি মারে গৃহস্থ কুকুর।
তিনটি বিড়ালছানা, বারান্দার প্লেটে, তাড়াচ্ছে রৌদ্রইদুর।
বাতাসের হর্ষধ্বনি; আম্মার বিছানা থেকে আসে মা মা গন্ধ।
এইসব অক্সিজেন, অক্সিজেন— স্বস্তি, সুখ আর স্বাস্থ্যপ্রদ,
আমাকে সংশ্লিষ্ট রাখে— সুশীলেরা এরকম হলে ভাল হয়।
মা, তোমাকে ধন্যবাদ, একটি সুশীল কাঁঠালগাছ রুয়েছ।
ঘর ঘেঁষে, তুমি, বন্ধু, রুয়েছ কি চিরায়ত সুশীলের চারা?
নিচু শব্দের তলে
অন্তর্লোকে, তোমার ভেতর তুমি মুখোমুখি : গোপন-দ্বৈত করছে গোপন কথোপকথন— শূন্যের স্মৃতি তোমার নয়নে আশ্রিত দীঘি— তপ্ত হাওয়া ও চতুর্দিকে রোদলাভা ঘিরে তরমুজ-মন লালচে আরও! বাহন চলেছে— এই ডিম-ভাজা কালচে কড়াই, কে যেন ভাজছে তোমার পায়ের একজোড়া ডিম! পথ, ভাষাগুলি বহন করছে, পিনকোডহীন— এবং শহর, কুয়াশা টানেলে রুগ্ন রুটির প্লাস্টিক মন। মানুষ শীর্ণ— ততোধিক তুমি বস্তুর ভাষা! মনে, চিরকুট, অনেক কবিতা শব্দ করছে টি-স্টলের ক্ষয়াটে চামচে। শিখেছো অনেক শব্দলীলার দূরের চেতনা। পাতা ঝরছে না, দু’একটা যেন ধূসর দেখেছো, কিন্তু, তোমার, হৃদয়ে হলুদ এতো-এতো-পাতা জমিয়ে রেখেছো! একটা চিহ্ন, লাল-জেল-বাড়ি, শিকার-শিকার খেলার মধ্যে যখন ভাষারা নির্জন হয়, করুণ জ্ঞান মনের লবণ চেটে-চেটে খায়— তুমি, কবিতার আমিষ রাঁধছো একাকি আলোয়— সাইরেন বাজে, মুহূর্তগুলি মর্মে-মর্মে খুন হতে থাকে, পাশে জেগে থাকো— শ্বাসে, চিরকুট লিখে রাখে খুন। পথ চলে যায়, তুমি যাচ্ছ না, চোখের চরণ পথের ফিকিরে দগ্ধ শোকে। কোথায় গিয়েছো, কোথাও যাবে না, যাবো-যাবো করে চোখের চেরাগে কেউ যদি দ্যাখে তোমার হলুদ পাতারা ঝরছে... বড় বিষণ্ণ, নিচু শব্দের তলে...
প্রমাণ
শুধুই বালু কাটছি আর ঝেড়ে ফেলছি আমি
কাছিমগুলি উঠে আসবে আজ রাত্রে;
চাঁদের নীচে আমি কেটেছি তোমার নীল ঊরু
সময় এক তোতলা আলো, আত্মভোলা—
ধূসর ডানা নেড়ে চলেছে পোতাশ্রয় মুখে
আলো দেখছি, কিন্তু পথ অলৌকিক;
আমি, হলুদ ডেগার হাতে হেঁটে যাচ্ছি, ধীরে—
দূরে, তোমার নয়ন খুলে রেখে এসেছি—
কেউ কী দ্যাখো! বিচ্ছুরিত তটরেখার তাস!
শুধুই বালু কাটছি আর ঝেড়ে ফেলছি আমি...
দেহ ও দেহাতীত
আমার ভেতরে, আমি নয়, অন্তরালে, ইচ্ছে মত্ততার,
কেউ একজন, চুপচাপ, উপলব্ধির শরীর সিঁড়ি,
বসে আছে, আর চোখগুলি, নিঃসীম গানের কক্ষ,
জ্বেলেছে নরম হ্যারিকেন : মাথা তুলে, হলুদ হরিণ,
দৌড়ে, চিমনির উপবনে— নিরবে, সন্ধ্যায়, বহুদিন,
আমি, চিবিয়েছি মৃদুচোখ, তর্ক ও দৈহিক পাঠ— নগ্ন,
নিঃসীম ব্যগ্রতা, বায়ুকুঞ্জে, আকাশের তল ছুঁয়ে, শ্বাস,
প্রবঞ্চক, কাম ও কৌতুক ঝরে নিঃশব্দের বাগিচায়—
নিজের, নিজের আলাপনে বেড়ে ওঠে শালগম, আঁশ,
এবং, মহাবিশ্বের দুর্গে, আমরা, পায়রা, মৌলস্বরে,
খড়কুটো এনে, চাঁদ থেকে, ভরে দিচ্ছি কামের কুসুম—
চিন্তায়, দেহ ও দেহাতীত, দোহে, একদেহ গমচাষী,
গমের গৌরব বুনে যাই, আর, শেষ হলে মুখরতা,
দেখি, দুখিচাঁদ, ঝুলে আছে নিজের, নিজের মধ্যে, একা...
কথা
হাওয়াকলে তৈরি করো কথা—
করোটিতে নাড়ো চিন্তাধ্বনি আর শব্দজিভ।
বুনে রাখো ব্যাকরণ, সতর্কচিহ্ন ও গোপন মুটিভ।
কথা— মানুষের এক আশ্চর্য প্রতিভা—
নিয়ত তুলছে মুভমেন্ট, হম্বিতম্বি, গল্প ও কবিতা
আর গিলে ফেলছে নিভন্ত কথাদের!
আমরা রচনা করছি কথার সিন্ডিকেট!
কথা ছাড়া অনিবার্য কিছু নেই—
এবং কথার কুহক খুলতে খুলতে আমরা মরে যাবো!
সমস্ত পুস্তকশাস্ত্র আমরাই লিখে যাচ্ছি—
চলো, কথা বলি—
এটাই চূড়ান্ত অস্ত্র।
সুশীল কাঁঠালগাছ ও অন্যান্য কবিতা
রশীদ হারুণ
রশীদ হারুণ




মন্তব্য