১৭ অক্টোবর ট্রেনে কাটা পড়া পা নিয়ে কাতরাতে কাতরাতে শুধু দাদা দাদির সাংসারিক স্মৃতির পুনরাবৃত্তি যতটুকু, ততটুকু জ্ঞান থাকা অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ফাহাদ তালুকদার কয়েক ঘণ্টা পর বার্লির পায়েস খাচ্ছেন কেননা ব্যথার তীব্রতায় তিনি এখন জ্বরাক্রান্ত। পায়েসের বাটি থেকে চামচ দিয়ে পায়েস তোলার ভঙ্গি যেন জ্বর রপ্ত করে ফেলেছে বিগত কয়েক ঘণ্টায়। একবার সম্পূর্ণ চামচ ডুবিয়ে পায়েস তোলেন তো পরেরবার আধা চামচ। এমনিভাবে জ্বর ১০৩ ও ১০২ ডিগ্রির কাঁটায় পেন্ডুলামের মতো দুলছে। তালুকদারের স্ত্রী, বিবাহের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে যার নামটি গ্রামে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি, অগুরুত্বপূর্ণ নামে থাকাকালীন সময়ে তিনি শুনেছেন তার স্বামী ফাহাদ তালুকদারের দাদা-দাদি পেন্ডুলামের মতো দুলে দুলে সাংসারিক জীবন অতিবাহিত করেছেন এবং তার দাদা একদিন দুলতে দুলতে সংসার থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছেন। মারা যাওয়ার আগে তার হাসপাতালযাপনের মাত্র কয়েকটা দিনে গ্রামের বার্লি খেতগুলো উজাড় হয়ে যায় এবং তার মৃত্যুর মাত্র কয়েকটা দিন পর সেইসব খেতের নাড়া পরিষ্কার করে রেলপথ নির্মাণ করা হয়। গ্রামের মানুষরা, যারা কিনা তালুকদার পরিবারের পুনরাবৃত্তির জীবন সম্পর্কে সজাগ ছিলেন এবং এ-সম্পর্কে শীতের ঘন কুয়াশার দিনে এ-কান ও-কান করতেন তারা সেবার সদলবলে অস্পষ্ট বিড়বিড় ধ্বনির কোরাস তুলে বার্লির শুকনো নাড়ার স্তুপের কাছে পৌঁছে নাড়ায় আগুন লাগিয়ে দাউ দাউ জ্বলে ওঠা আগুনের শিখার উপর হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তারা অবশ্যই বার্লি চাষ করতে থাকবেন কেননা তারা তাদের পূর্বপুরুষদের বার্লি চাষ করতে দেখেছেন। কৃষিবিজ্ঞান তারা বোঝেন না, বোঝেন ঐতিহ্য ও পরম্পরা। তাদের সৌন্দর্যবোধ এতটুকু যে তারা এখন ফাহাদ তালুকদারের স্ত্রীর মানসিক দুর্দশা নিয়ে চিন্তিত কারণ তারা জানেন ফাহাদ তালুকদার সুস্থ হয়ে উঠলেও হুইল চেয়ার বা ক্রাচের সাহায্যে চলাচল করতে হবে। ঘন শাদা কুয়াশার দিনে সদ্য উন্নয়নের ছোঁয়া পাওয়া একদল বিভ্রান্ত মানুষ তাদের পূর্বপুরুষের রক্ত বহন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যখন রেললাইনের পাশের বটগাছের নিচে বসে একজন অন্যজনের মুখটিও ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছিলেন না, তখন তাদের মুখ থেকে খুরশিদা তালুকদার উচ্চারণের বিশেষত্ব বলে দেয় তাদের কপালে স্পষ্ট ভাঁজ। এভাবে গ্রামের লোকজনের মুখে মুখে ফাহাদ তালুকদারের স্ত্রী উচ্চারিত হতে থাকলে তার নাম জানা যায় খুরশিদা তালুকদার, যিনি এখন স্বামীর জিহ্বার নিচ থেকে থার্মোমিটার বের করে স্কেলের দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পায়েস ক্রমশ বাটির তলায় ঠেকছে দেখে খুরশিদা তালুকদার হাসপাতালে বসে ফাহাদ তালুকদারের দাদীর অভিজ্ঞতা জাবর কেটে কেটে অনুমান করলেন গ্রামের বার্লিক্ষেতগুলো উজাড় হতে শুরু করেছে। ডালি ডালি বার্লি তালুকদার পরিবারে যাওয়াতে কৃষকদের লাভ হচ্ছে, হাটের মোড়লকে খাজনা দিতে হয় না। এই উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে কৃষকেরা আলতা ও রঙিন কাচের চুড়ি কিনে বাড়িতে ঢুকলে তাদের স্ত্রীদের অলক্ষে থেকে যায় স্বামীদের কপালের ভাঁজগুলো। তারা ভাবেন আজ তাদের বিবাহবার্ষিক। এক গোপন উৎসব গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ঢুকে পড়লে নারীরা বার্লির অভাববোধ করেন। অসহায়ত্ব দেখা দেয় তাদের অভিজ্ঞতায়। কারণ তারা মনে করেন, তাদের স্বামীদের প্রিয় খাবার হতে পারে বার্লি কারণ, তাদের স্বামীরা বংশপরম্পরায় বার্লি চাষ করতে থাকেন যদিও তারা তাদের স্বামীদের মুখ থেকে কখনো প্রিয় খাবার সম্পর্কিত কোনো কথা শোনেননি। এই অভিজ্ঞতার অসহায়ত্বের পর তাদের স্বামীদের কপালের ভাঁজ যখন তাদের চোখে পড়ে, তাদের কাছে তখন তা অর্থবহ হয়ে ওঠে, তাদের কাছে ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ওঠে। গ্রামের নারীরা প্রতীকে আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমাতে যান। ঘুম থেকে উঠে তারা রঙিন কাচের চুড়ি খুলে বার্লির ক্ষেতে কাজ করতে করতে ভাবেন, এবার তারা অবশ্যই কিছু বার্লি আলাদা করে রাখবেন। গ্রামের নারীরা আলতা খুলে রাখতে পারেন না জন্য প্রত্যেকে একে অপরের পায়ের আলতা খেয়াল করেন। তারা তখন স্মরণ করেন তাদের বিবাহের স্মৃতি। তাদের মনে হতে থাকে গ্রামে একইদিনে সকল যুবকের বিয়ে হয়ে যায় এবং পরবর্তী পাঁচ বছর গ্রামে আর কোনো বিবাহযোগ্য যুবক থাকে না। তাদের মনে পড়ে বিয়ের সাজসজ্জা-আসবাবপত্র এবং আলতার রঙ একইরকম লাল। তারা লাল পায়ের পাশ থেকে বার্লি তুলছেন। তাদের স্বামীরা একই ক্ষেতে কাজ করতে করতে দেখছেন তাদের স্ত্রীরা বার্লি থেকে লাল পাগুলো আলাদা করছেন। এই দৃশ্যের আড়ালে খুরশিদা তালুকদারের স্বামীর রেলে কাটা পড়া লাল পা-এর বিষয়টি স্মরণ করে পুরুষদের কপালে যে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে গ্রামের নারীরা তা হয়তোবা খেয়াল করেন না। তারা জানেন না তাদের স্বামীরা ইতোমধ্যে ঢুকে পড়েছেন খুরশিদা তালুকদারের মানসিক দুর্দশায়। যিনি ফাহাদ তালুকদারের দাদির গল্প জাবর কেটে কেটে বাটিতে বার্লির শাদা পায়েস নিচ্ছেন এবং বিয়ের শাড়ি দিয়ে ঢাকা ফাহাদ তালুকদারের রেলে কাটা পড়া লাল পা-এর কথা স্মরণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। ক্ষেতের পাশে কয়েকটা কুকুরের আচরণ দেখে নারী ও পুরুষ কৃষকেরা স্মরণ করতে পারেন বাঙলা মাসের নাম। তাদের মনে পড়ে গ্রামের লোকেরা ভাদ্র মাসে বিয়ে করেন কেননা তারা প্রকৃতিতে দেখেছেন এই মাসে প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা বেশি থাকে। এই মাসের মধ্য রাতগুলোর বাতাসে তারা সঙ্গীর গায়ে আবিষ্কার করেন পাকা তালের গন্ধ। তারা গন্ধের উৎস আবিষ্কারের নেশায় সমস্ত শরীরের সাথে স্মৃতিও হাতরাতে থাকলে তাদের মনে পড়ে প্রত্যেকটা তালগাছকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে রেখেছে পুকুর।
২
উৎসবের আমেজ ফুরাতে-না-ফুরাতেই গ্রামে মরণের হাওয়া বইতে শুরু করে। যেই হাওয়ার উৎস গ্রামের লোকেরা জানেন না কিন্তু গন্তব্য জানেন। তারা অনুমান করেন এই আত্মা-পতনের হাওয়া কার আত্মার দিকে বইছে। এসময় তাদের গ্রামের স্ত্রীলোকেরা বিয়ের শাড়ি পরে তাদের স্বামীদের স্বাগত জানান। পরদিন তারা এই হাওয়ায় তাদের লালপেড়ে শাড়িগুলো শুকাতে দেন। গ্রামের উঠোনগুলোতে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে এই হাওয়া তালুকদার পরিবারে ঢুকে পড়লে সেখান থেকে কান্নার রোল শোনা যায়।
ফাহাদ তালুকদারের দাফন কাফন শেষ করে গ্রামের লোকেরা বিড়বিড় করে “মিনহা খ্বলাকনাকুম, ওয়া ফিহা নুয়িদুকুম, ওয়া মিনহা নুকরি জুকুম ত্বারাতান উখরা” বলতে বলতে বার্লি খেতে পৌঁছে শুকনো নাড়ায় আগুন লাগিয়ে দাউদাউ জ্বলে ওঠা আগুনে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করছেন যে, তারা অবশ্যই বার্লি চাষ করতে থাকবেন কেননা তারা তাদের পূর্বপুরুষদের বার্লি চাষ করতে দেখেছেন।
গ্রামের খেতগুলো ফসলহীন হয়ে পড়লে এবং শুকনো নাড়া পুড়ে যাওয়ার পর শহর থেকে বৈদ্যুতিক খুঁটি বোঝাই গাড়ি আসতে দেখা যায়। বটগাছের নিচে ঘন শাদা কুয়াশায় বসে থাকা মানুষরা আরো বেশি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কেননা একদিকে সদ্য উন্নয়নের ছোঁয়া অন্যদিকে খুরশিদা তালুকদারের মানসিক দুর্দশা।
ফাহাদ তালুকদারের মৃত্যুতে গ্রামের লোকজন ব্যক্তিগত মৃত্যুর ধারণার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকা অবস্থায় গ্রাম প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করে উঠলো। তারা একে অপরের কপালের ভাঁজগুলো প্রত্যক্ষ করে চমকে উঠলো। তারা প্রত্যেকটি মুখের মাঝে খুঁজতে শুরু করল পরিচিত মুখগুলো। তাদের স্ত্রীরা বিদ্যুতের আলোয় কপালের ভাঁজ টের পাবে বলে তারা খুরশিদা তালুকদারের মানসিক দুর্দশার কথা আর মনে রাখল না।
ক্ষেতের মাঝ বরাবর বেরিয়ে যাওয়া রেলপথ দিয়ে প্রতিদিন দুইবার করে ট্রেন আসা যাওয়া করে। গ্রামের মাঝ বরাবর থেকে একটু পূর্বে তালুকদার বাড়ি থেকে শ'খানেক গজ উত্তর-পশ্চিম কোণায় একটি ছোট্ট স্টেশন। তালুকদার বাড়ি ও স্টেশনের মাঝখানে তালুকদার পরিবারের পারিবারিক গোরস্থান। যেখানে দেখা যাচ্ছে সমাধি নামক ফুলগাছটিতে ফুল ফুটেছে এবং স্বাভাবিক কবরের চেয়ে আয়তনে ছোটো কিন্তু বাঁধাই করা একটি কবরে মোমবাতি জ্বলছে। যদিও গোটা গ্রাম এই মুহূর্তে বৈদ্যুতিক আলোয় ঝলমল করছে। এমনকি তালুকদার বাড়ির উঠোনে উঁচু করে লটকানো বাল্বটি থেকে কয়েকটা সূক্ষ্ম আলোর রেখা কবরস্থানে এসে পড়ছে। মোমবাতি জ্বলা কবরটির পাশেই আরেকটি নতুন কবর। এটি অবশ্য স্বাভাবিক কবরের মতোই লম্বা ও চওড়া। খুরশিদা তালুকদারকে দেখা যাচ্ছে ছোটো কবরটির পাশে দাঁড়িয়ে গোপন একটি পোটলা থেকে রঙিন কাচের চুড়ি বের করে হাতে পরছেন। বড়ো কবরটির পাশে দাঁড়িয়ে স্ফীত ও আংশিক উন্মুক্ত তলপেটকে শাড়ি দিয়ে ঢেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন। দীর্ঘশ্বাসের উত্তাপ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি গ্রামের লোকজনদের চোখ ও স্মৃতি থেকে শেষবারের মতো চলে গেলে ছায়ামুক্ত কবরগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং দেখা যায় যে, সারিবদ্ধ কবরগুলোর উত্তরে সারিবদ্ধ সমাধি ফুলের গাছ। সর্বপশ্চিমের কবরটির ইটে শ্যাওলার আস্তরণ বেশি হওয়ায় অনুমান করা যায় সেটাই সবচেয়ে পুরাতন কবর। এই কবরটির উত্তরে যে সমাধি ফুলগাছ, তার পূর্বদিকের একটি ডাল ঝুঁকে পড়েছে পূর্বে এবং সেখান থেকে একটি গাছ জন্মেছে। গাছটি আরেকটা কবরের লাশের সিথান বরাবর। এই গাছ থেকে আরেকটি গাছ এবং তারও দক্ষিণে কবর। এভাবে বেশ কয়েকটা কবর সারিবদ্ধভাবে সমাধি ফুলগাছের সাথে সমান্তরালে রচিত হয়েছে।
গ্রামের মানুষরা ব্যক্তিগত মৃত্যুর ধারণা অতিক্রম করে এভাবে: মাঠে কাজ করে ক্লান্ত হলে তাদের ইচ্ছে করে ছায়ায় বসতে, ছায়ায় বসলে শুইতে ইচ্ছে করে, শুয়ে পড়লে তারা ঘুমিয়ে যায়।
তারা দেখে মৃত মানুষরা ঘুমায়। তারা মৃত মানুষকে ক্লান্ত মনে করে।
তারা তালুকদার পরিবারের কবরস্থানের মতো উজ্জ্বল এবং আপন স্মৃতিতে পতিত।
প্রথম বিবাহবার্ষিক এবং জাদুবাস্তবতার এক বছর
নাজমুল হোসাইন
নাজমুল হোসাইন




মন্তব্য