.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

বর্ষা এলেই আমার মনে আঁধার নেমে আসে

বর্ষা এলেই আমার মনে আঁধার নেমে আসে আবু হেনা তিমু
বৃষ্টি নামলে জনপদটা অন্যরকম হয়ে যায়। দূরের গ্রামগুলো কুয়াশার ভিতর ঝাপসা হয়ে থাকে। নিচু জমিতে জমে থাকা পানির উপর আলো ভেঙে পড়ে। চারদিকে এমন এক আবছা নীরবতা নামে, যেন পৃথিবী নিজের শব্দ নিজেই গিলে ফেলেছে। এই সময়েই নীলয়ের মনে হয়, পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো এমন একজন মানুষকে ভুলে থাকা, যার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে, অথচ শেষটা ঠিকমতো শেষ হয়নি।

মায়ার সঙ্গে তার শেষ বিকেলটি এখনো অক্ষত আছে। সেদিন বিকেলের আগেই আকাশ কালো হয়ে উঠেছিল। জাউলাবাড়ির পুকুরপারে মাইনুদ্দিনের চায়ের দোকানে তারা জানালার ধারে বসেছিল। পুকুরের জল স্থির ছিল, তার উপর মাঝে মাঝে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা এসে নিঃশব্দ বৃত্ত এঁকে মিলিয়ে যাচ্ছিল। কথা হচ্ছিল, কিন্তু কথার ভিতর কোথায় যেন অদৃশ্য এক টান জমছিল। কয়েকটি বাক্য, কিছু অভিমান, কিছু অস্পষ্ট ব্যাখ্যা। তারপর মায়া শান্ত গলায় বলেছিল, “আমাদের একটু দূরে থাকা দরকার।”

এইটুকুই।

নীলয় ভেবেছিল, এর পরে নিশ্চয় আরেক দিন আসবে। কোনো এক শান্ত দুপুরে আবার বসা যাবে। কে কোথায় আঘাত পেয়েছে, কোন কথাটা ভুল ছিল, কোথায় ভুল বোঝাবুঝি জমেছিল, সেসব খুলে বলা যাবে। কাছের কাউকে হারাতে বসলে শেষ মুহূর্তেও মানুষের মনে হয়, এখনো কিছু বাকি আছে। একটি বাক্য, একটি ব্যাখ্যা, একটি সুযোগ। কিন্তু সেই দ্বিতীয় দিন আর আসেনি। কথোপকথনটি দরজার কাছে এসে থেমে গিয়েছিল। বাইরে তখন বৃষ্টি নেমেছিল, ভেতরে শুধু একটি অসমাপ্ত নীরবতা।

তারপর থেকে সেই বিকেলটি নীলয়ের মাথার ভিতর বারবার ফিরে আসে। একই টেবিল, একই বৃষ্টি, একই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা। সে প্রায়ই ভাবে, ওই মুহূর্তে যদি অন্যভাবে উত্তর দিত। যদি একটু চুপ থাকত। যদি বলত, থাকো, আজ যেও না। তার মনে হয়, মস্তিষ্ক যেন অসমাপ্ত ঘটনার কাছে সহজে হার মানে না। যা শেষ হয় না, তাকে সে বারবার ফিরিয়ে আনে। যেন কোথাও একটি অদেখা দরজা রয়ে গেছে, আর আরেকবার ফিরে গেলে হয়তো তা খুলে যাবে।

মায়া তাকে একসময় খুব সাধারণ কিছু জিনিস দিয়েছিল। অথচ এখন সেই সাধারণ জিনিসগুলোই অদ্ভুত ভারী হয়ে আছে। রাত জেগে কাজ করলে হঠাৎ একটি ছোট্ট বার্তা, “খেয়েছ?” কোনো লেখা শেষ হলে মন দিয়ে পড়ে মতামত দেওয়া। অকারণে ফোন করে বলা, “আজ তোমার গলা ক্লান্ত শোনাচ্ছে।” এই ক্ষুদ্র, প্রায় অদৃশ্য মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে তার দিনযাপনের ভিতর একটি নরম আশ্রয় গড়ে দিয়েছিল। মানুষটি সরে যাওয়ার পরে নীলয় প্রথমে তাকে নয়, নিজের দিনের ভিতর তৈরি হয়ে থাকা ফাঁকা জায়গাগুলো দেখতে পেয়েছিল।

কিছু মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের অনুপস্থিতি থেকে যায়। চেয়ারে, পর্দায়, ঘরের বাতাসে, রাতের নীরবতার ভিতর। তখন বোঝা যায়, মানুষটি শুধু মানুষ ছিল না। তার সঙ্গে নিরাপত্তার একটি মৃদু বোধ জড়িয়ে ছিল। পৃথিবীর ভিড়ে অন্তত একজন আছে, যে না বললেও বুঝবে। এই বিশ্বাসের ভাঙনই বোধহয় বিচ্ছেদের সবচেয়ে নীরব আঘাত।

শেষের দিকে মায়া বদলে গিয়েছিল। কখনো অকারণে খুব কাছে এসেছে, কখনো হঠাৎ কয়েক দিন অদৃশ্য থেকেছে। আগে যে মানুষটি প্রতিটি ছোট কথায় সাড়া দিত, পরে সে দীর্ঘ নীরবতায় ঢেকে থাকত। নীলয় প্রথমে ভেবেছিল ব্যস্ততা। পরে বুঝেছিল, দূরত্ব। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই দূরত্বই তাকে আরও গভীরে টেনে নিয়েছিল। যত কমে গেছে, তত বেশি করে সে খুঁজেছে। নিশ্চিত অনুপস্থিতির চেয়ে অনিশ্চিত উপস্থিতি মানুষকে বেশি বেঁধে রাখে। কারণ সেখানে প্রত্যাশা মরে না, ক্ষীণ হয়ে এলেও জেগে থাকে।

কয়েক মাস পরে একদিন নীলয় হঠাৎ টের পেল, সে আসলে মায়াকে পুরোপুরি মনে করতে পারছে না। মুখ মনে আছে, কিন্তু কণ্ঠের ভিতরের সুরটি ঝাপসা। তার বদলে মনে আছে কিছু কল্পনা। তারা একসঙ্গে কোথাও যাবে। কোনো এক শীতের বিকেলে ধলেশ্বরীর পারে বসে থাকবে। খুব সাধারণ কিছু কথা হবে। এমন কিছু ভবিষ্যৎ, যা কখনো ঘটেনি।

তখন তার মনে হলো, সে হয়তো বাস্তব মায়াকে নয়, বরং মায়াকে ঘিরে নিজের ভিতরে গড়ে ওঠা পৃথিবীটাকে মিস করছে। একটি সম্ভাবনাকে। একটি অপ্রাপ্ত ভবিষ্যৎকে। কখনো কখনো মানুষকে নয়, মানুষটিকে ঘিরে নিজের কল্পিত জীবনের ক্ষতিই আমাদের দীর্ঘদিন ধরে তাড়া করে।

স্মৃতি কোনো নিয়ম মানে না। একদিন বিকেলে ভেজা মাটির গন্ধে হঠাৎ তার বুক ধক করে উঠল। আরেকদিন দোকানে একটি পুরোনো গান বাজছিল। তারপর একটির সঙ্গে আরেকটি জুড়ে যেতে লাগল। সেই চায়ের দোকান। সেই নীল শাড়ি। ভেজা চুল কানের পেছনে সরিয়ে নেওয়ার ভঙ্গি। ফোনের পর্দায় ছোট্ট একটি হাসিমুখ। একটি চিন্তা থেকে দশটি চিন্তা জন্ম নিতে লাগল। নীলয় বুঝল, স্মৃতি কখনো দরজায় কড়া নাড়ে না। সে সরাসরি ঘরে ঢুকে পড়ে, এসে বসে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে চারদিক ভরে ফেলে।

সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটা অন্যখানে।
মায়াকে হারানোর দুঃখের চেয়েও তাকে বেশি কষ্ট দেয় নিজের কাছে ফিরে আসা প্রশ্নগুলো।
আমি কি যথেষ্ট ছিলাম না।
আমি কী ভুল করেছিলাম।
আমার ভিতরে এমন কী ছিল, যা তাকে দূরে সরিয়ে দিল।
সে কি আমাকে এখনো ভাবে।

এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর সে পায় না। অথচ প্রশ্নগুলো রয়ে যায়। আত্মসম্মানের ভিতর খুব সূক্ষ্ম এক চিড় ফেলে। মানুষ তখন অন্য কাউকে নয়, নিজের অপূর্ণতাকেই বেশি দেখতে শুরু করে। ভাঙনের পরে আমরা প্রায়ই হারানো মানুষটির চেয়ে নিজের ভিতরের অস্বীকৃত অংশগুলোর মুখোমুখি হয়ে পড়ি।

এক সন্ধ্যায় বৃষ্টি পড়ছিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীলয় হঠাৎ বুঝল, এত দিন সে যে মানুষটাকে খুঁজছিল, হয়তো তাকে পুরোপুরি নয়। সে খুঁজছিল সেই সময়ের ভিতর নিজের যে সংস্করণটি ছিল, তাকে। যে মানুষটি অপেক্ষা করতে জানত, ছোট ছোট ঘটনায় আনন্দ পেত, একটি বার্তায় যার দিন বদলে যেত। সে মায়াকে যতটা মিস করেছে, তার চেয়ে বেশি মিস করেছে সেই দিনগুলোর আবেগের ঘনত্বকে। সেই নির্ভরতাকে। সেই নিজেকে।

নিচে বৃষ্টির জল পড়ছিল। দূরের আলো ভেঙে কেঁপে উঠছিল। অনেক দিন পরে নীলয়ের মনে হলো, কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তাদের ভিতর জন্ম নেওয়া অনুভূতিগুলো সঙ্গে সঙ্গে মরে না। তারা ধীরে ধীরে শরীর ছেড়ে যায়। কখনো একটি গান হয়ে। কখনো ভেজা মাটির গন্ধ হয়ে। কখনো একটি প্রশ্ন হয়ে।

বর্ষা এলেই তার মনে এখনো আঁধার নামে।
তবু সেই আঁধারের ভিতর সে আজ আর শুধু একজন মানুষকে খোঁজে না। সে খোঁজে কয়েকটি বিকেল, কিছু অসমাপ্ত বাক্য, আর নিজের ভিতরে একসময় বেঁচে থাকা সেই মানুষটিকে, যে বিশ্বাস করত, কারও পাশে বসে থাকলেই পৃথিবী একটু কম একা হয়ে যায়।

বর্ষা এলেই আমার মনে আঁধার নেমে আসে
আবু হেনা তিমু


মন্তব্য

নাম

অনুবাদ,37,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,1,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,উৎপলকুমার বসু,26,ঋত্বিক-ঘটক,3,কবিতা,340,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,16,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,76,ছড়া,1,জার্নাল,4,জীবনী,6,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,21,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,167,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,2,বিবৃতি,1,বিশেষ,24,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,41,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,18,সাক্ষাৎকার,23,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,14,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: বর্ষা এলেই আমার মনে আঁধার নেমে আসে
বর্ষা এলেই আমার মনে আঁধার নেমে আসে
প্রেমের গল্প • বিন্দু • বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের লিটল ম্যাগাজিন
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhC85ry-Rf1x147AQpyB4xWBeqhsg7ydFz0eqKdxK0FYR3dWbG7_d5_Y55xth1gigYmC5vh0RNjBvcRy-npYIqUgOZ_sjW2T7xwGqxY1GttjUs88dnYEgEzsjC5ODJtHTQHlVj_frA7kUaO9VDYfBej6aYGhbmTp2xfjOFfkxfap1gtDC1Sia1TXscGtDA/s16000/%E0%A6%86%E0%A6%AC%E0%A7%81%20%E0%A6%B9%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A6%BE%20%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A7%81%20%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhC85ry-Rf1x147AQpyB4xWBeqhsg7ydFz0eqKdxK0FYR3dWbG7_d5_Y55xth1gigYmC5vh0RNjBvcRy-npYIqUgOZ_sjW2T7xwGqxY1GttjUs88dnYEgEzsjC5ODJtHTQHlVj_frA7kUaO9VDYfBej6aYGhbmTp2xfjOFfkxfap1gtDC1Sia1TXscGtDA/s72-c/%E0%A6%86%E0%A6%AC%E0%A7%81%20%E0%A6%B9%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A6%BE%20%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A7%81%20%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AA%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%20%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%B2%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%97.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/05/short-story.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/05/short-story.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy