ইচক দুয়েন্দে আশির দশকের বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র গল্পকার, যিনি বাস্তবতাকে সরল সামাজিক বর্ণনায় না রেখে ভাঙা স্মৃতি, স্বপ্ন, বিভ্রম ও মানসিক অস্থিরতার ভেতর দিয়ে নির্মাণ করেন। তাঁর গল্পে বাস্তবতা কখনো পুরোপুরি বাস্তব থাকে না; আবার জাদুবাস্তবতার সরল চমকেও সীমাবদ্ধ হয় না। বরং মানুষ, স্মৃতি ও ইতিহাস একসঙ্গে মিশে গিয়ে এক অদ্ভুত অস্তিত্ববোধ তৈরি করে। রমানাথকে কেন্দ্র করে লেখা এই গল্পটিও তেমনই—দেশভাগ, দারিদ্র্য, শিল্প, প্রেম, আত্মহত্যা ও নিঃসঙ্গতা মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে এক গভীর মানবিক ও বিষণ্ন জগৎ।
রমানাথ এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও সে কেবল একজন ব্যক্তি নয়; সে ভাঙা সময়ের সন্তান এবং স্মৃতির বহনকারী। গল্প যত এগোয়, তত বোঝা যায়—রমানাথের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। সে শুধু জীবনের ঘটনাগুলোর মধ্যে দিয়ে যায় না; বরং প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাকে ভেতর থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে।
গল্পের শুরুতে দিল্লির নাপিতদের প্রসঙ্গ আপাতদৃষ্টিতে রসাত্মক মনে হলেও এর ভেতরে গভীর বিষণ্নতা আছে। ছোট্ট রমানাথ নাপিতদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, কারণ তার জীবনে স্থিতিশীল পারিবারিক আশ্রয় নেই। বিশেষ করে বৃদ্ধ নাপিত চরিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ। লোকটি খুব কম কথা বলে, কিন্তু তার নীরব উপস্থিতি রমানাথকে এক ধরনের নিরাপত্তা দেয়। শিশুমন তাকে ঘিরে কল্পনার জগৎ তৈরি করে—গাধা, যমুনার ধারের কুটির, সন্ধ্যার গল্প। এখানে বাস্তবতার চেয়ে বেশি সত্য হয়ে ওঠে কল্পনা। বৃদ্ধ নাপিত যেন রমানাথের হারানো পিতৃসত্তার প্রতীক।
গল্পে গাধার মোটিফটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা সাহিত্যে গাধা সাধারণত হাস্যরস বা উপহাসের প্রতীক হলেও এখানে তা হয়ে ওঠে স্মৃতি, স্নেহ ও পরিচয়ের প্রতীক। মা তাকে “গাধামণি” বলে ডাকেন, আবার শেষদিকে রমানাথ অনুভব করে নৌকায় তার পাশে একটি গাধা শুয়ে আছে। অর্থাৎ গাধাটি বাস্তব প্রাণী নয়; এটি শৈশবের এক অবিনাশী ছায়া, যা তাকে শেষ পর্যন্ত অনুসরণ করে।
চিন্ময় চরিত্রটি গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর তৈরি করে। তিনি শিল্পী, কিন্তু একই সঙ্গে ভীষণ ব্যর্থ ও বিপর্যস্ত মানুষ। শিল্পের ভেতর তিনি মুক্তি খুঁজতে চান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিল্পই তাকে আত্মবিধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তাঁর আত্মহত্যার দৃশ্যটি বিশেষভাবে শক্তিশালী। সূর্যমুখী ফুলের আত্মহত্যার চিত্রকল্পের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন—সৌন্দর্যও কখনো কখনো মৃত্যুর ভাষা হয়ে উঠতে পারে। এখানে বাস্তবতা ও কল্পনা একাকার হয়ে যায়।
চিন্ময়ের চিঠিতে যে বিড়াল হত্যার স্মৃতি, অপরাধবোধ ও অদ্ভুত দুঃস্বপ্ন উঠে আসে, তা গল্পকে প্রায় কাফকাসুলভ আবহ দেয়। বিশেষ করে বিড়ালদের ভোজনের দৃশ্যটি অত্যন্ত স্মরণীয়। তিন ডজন বিড়াল সারি দিয়ে বসে খাচ্ছে, আর চারপাশে এক শীতল স্তব্ধতা—দৃশ্যটি একই সঙ্গে বাস্তব ও অবাস্তব। মনে হয় যেন মৃত্যুর পর কোনো গোপন আচার চলছে। এখানেই ইচক দুয়েন্দের ভাষার শক্তি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দেশভাগ ও উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতাও গল্পে গভীরভাবে এসেছে। শেয়ালদা স্টেশনের অংশ শুধু সামাজিক বাস্তবতার বর্ণনা নয়; এটি পরিচয় হারানোর কাহিনি। জগন্ময়ী অপেক্ষা করেন, কিন্তু কেউ আসে না। প্ল্যাটফর্ম তখন হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা ও পরবাসের প্রতীক।
বিজন ও রমানাথ—দুই ভাই যেন মানুষের দুই ভিন্ন প্রবণতার প্রতীক। বিজন বাস্তববাদী; সে বেঁচে থাকার কৌশল জানে। আর রমানাথ ধীরে ধীরে কল্পনা, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই বৈপরীত্য গল্পটিকে আরও গভীর করেছে।
রমানাথের জ্বরের অংশে লেখক চেতনাপ্রবাহের কৌশল ব্যবহার করেছেন। আলো, রঙ, কণ্ঠ, বিভ্রম—সব মিলিয়ে জ্বর যেন তাকে অন্য বাস্তবতায় নিয়ে যায়। সে মায়ের গলা চেপে ধরে; এই দৃশ্য শুধু ভয়ংকর নয়, প্রতীকীও। দেশভাগ, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার জমে থাকা আতঙ্ক এখানে বিস্ফোরিত হয়।
প্রফেসর চরিত্রটিও স্মরণীয়। তাঁর আত্মহত্যার প্রস্তুতি যেমন করুণ, তেমনি হাস্যকর। “কিছুই তো হল না” গানটি একশো বার একসঙ্গে শুনতে চাওয়ার ইচ্ছা আসলে গভীর অস্তিত্ববাদী শূন্যতার প্রকাশ। জীবন যেন কিছুই দেয়নি, তবু মানুষ একই শূন্যতার পুনরাবৃত্তির মধ্যে বেঁচে থাকে।
মণিকা রায়ের প্রেমপত্র গল্পে সামান্য কোমলতা নিয়ে আসে। বানানভুলে ভরা চিঠিগুলো সাহিত্যিক নয়, কিন্তু আন্তরিক। তবু রমানাথ সেই ভালোবাসাকে গ্রহণ করতে পারে না। কারণ সে নিজেই নিজের ভিতরে বন্দি। মণিকার আত্মহত্যা তাই কেবল ব্যর্থ প্রেমের নয়; এটি যোগাযোগহীনতার ট্র্যাজেডি।
গল্পের শেষ অংশে রমানাথের যাত্রা এক ধরনের আত্মবিলোপে পরিণত হয়। সে নিজের পরিচয়ের চিহ্নগুলো মুছে ফেলতে চায়। পদ্মার চর তখন শূন্যতার প্রতীক হয়ে ওঠে। শেষ দৃশ্যে নৌকার পাশে শুয়ে থাকা কল্পিত গাধাটি যেন তার শৈশব, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া আত্মপরিচয়ের শেষ অবশিষ্ট।
ইচক দুয়েন্দের এই গল্প শুধু একটি পরিবারের ইতিহাস নয়; এটি ভাঙা মানুষদের মহাকাব্য। এখানে কেউ সম্পূর্ণ নয়, কেউ মুক্ত নয়। তবু মানুষ স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসতে চায়, স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। আর সেই কারণেই গল্পটি শেষ পর্যন্ত শুধু হতাশার নয়; এটি মানুষের গভীর নিঃসঙ্গতা ও মানবিকতার এক অনন্য শিল্পরূপ।
রমানাথ: ভাঙন, স্মৃতি ও এক অদ্ভুত বাস্তবতার নন্দন
চঞ্চল নাঈম
চঞ্চল নাঈম




মন্তব্য