জঙ্গল-কবিতা
বৃক্ষে, বীজে, ঘুঘু-ডাকে, হরিণ-কটাক্ষে ভরা এই শালবন
ঈশ্বর-রচিত এক জঙ্গল-কবিতা।
লতাঝোপ নড়ে উঠলে মনে হয়, সমুদ্যত চিতা
এ-বন পাহারা দেয়, হিংস্র কবির পোষা বাঘের মতন।
আমি জিপ থেকে নেমে, পায়ে হেঁটে, বৃক্ষের অক্ষর ছুঁয়ে ছুঁয়ে
এ-কবিতা পড়ি। দেখি, ঊর্ধ্ব-কমার মতো, সেগুন-মঞ্জরি
পাতার মর্মরশব্দে গাঁথা, যেন ছন্দের প্রহরী।
তবুও গাছের গুঁড়ি বেয়ে-ওঠা ময়ালের ভারে
পাতা ও পাখির ডিম কাঁপে, ছন্দ ভাঙে বারে বারে।
এই শালবনে দেখি, যে-কোনও স্রষ্টার
অন্তিম দুঃস্বপ্ন— এক ইতর বানর
ব্রহ্মাণ্ডের লোম থেকে কেবলই উকুন বেছে খায়
দেখি, এই বন শুধু মৃত মহিষের লাশে কৃমিদের কামনা জাগায়
(কোন কফি-ঘরে বসে এই কবিতার কবি মুখ ঢাকে, ক্রোধে, ব্যর্থতায়?)
আমি বৃক্ষ-পংক্তিদের মধ্যবর্তী শুঁড়িপথে ঢুকে,
অদ্ভুত টিয়ার ঝাঁক পার হয়ে, উপগত শজারুর মুখে
ব্যথার আনন্দ, আর ফুলে ফুলে প্রজাপতি উড়ে
মধুপানরত দেখে, মার্জিনে নদীর পাড়ে ঘুরে
নিশ্চিত বুঝতে পারি, কবি হিসেবে ভগবান
এখনও তরুণ, কাঁচা, ইন্দ্রিয়-তাড়িত, কিন্তু প্রতিশ্রুতিবান
টেলিফোন
টেলিফোন করতে আমি ভয় পাই।
যদি কেউ চিনতে না পারে!
যদি বলে, ‘কে আপনি? রণজিৎ? সরি, আমি
এই নামে কাউকে চিনি না।’
আমি কী বলব তাকে, ‘আমি তোর বাল্যবন্ধু, সুধাময়,
ভুলে গেলি, একসঙ্গে এত খেলা, এত ফুলচুরি!’
যদি সে উত্তরে বলে, ‘আপনি কারও বন্ধু নন।
একথা ভোলেন কেন বার বার? কী কারণে ডিস্টার্ব করেন?’
টেলিফোন করতে আমি ভয় পাই!
জানি আমি, একদিন, সত্যি সত্যি,
কেউ আর আমাকে চিনবে না।
গোপনে প্রতীক্ষা করি সেই দিনটির, সেই নীরব শাস্তির
যাতনা
যদি বলো, কী যাতনা, আজীবন সহিছে হৃদয়?
—হাবা বালকের মতো
কেবলই বিস্ময়বোধ, শত দুঃখকষ্ট মাঝে, কেবলই বিস্ময়!
ক্ষত
মহান শিল্পীদের জীবনীতে প্রায়শই পড়ি তাঁদের অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতা কথা। পড়ি, এবং ভীষণ বিভ্রান্তবোধ করি। ভাবি যে, যে-মানুষ ব্যক্তিজীবনে এতটা হৃদয়হীন এবং নির্মম, তাঁর শিল্পের আদৌ কী আমি দেব? যতই মহৎ হোক সেই শিল্পকীর্তি, তবু আমি তার কানাকড়ি মূল্যও দেব কি? পণ্ডিতেরা বলেন, ভুল, এই বিচার ভুল। শিল্পীও একজন মানুষ, আর সব মানুষের মতো তার ভিতরেও রয়েছে একই সঙ্গে সাধু এবং শয়তান। এবং নিজের ভিতরে এই সাধু-শয়তানের দ্বন্দ্ব থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে তার শিল্প। সুতরাং, শিল্পীর ব্যক্তিজীবন দিয়ে তার শিল্পের বিচার এক মারাত্মক ভুল। পণ্ডিতেরা সর্বদাই এত ঠিক কথা বলেন! এত খাঁটি সত্য কথা! এবং সব সত্যই কি অদ্ভুত নির্মম! কোমলতার পক্ষে কি কোনও সত্য নেই? না, কোমলতার পক্ষে কোনও সত্য নেই, শুধু বেদনা রয়েছে। সেই বেদনার কাছে আমি আজীবন গুম হয়ে থাকি। দেখি যে, আমার মনে গোঁজ হয়ে আছে একটিই কঠিন কথা। কথাটা এই যে, শিল্পী হবার তাড়নায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বামী-স্ত্রীতে মিলে সংসার ভেঙে দিয়ে, এবং নিজেদের সদ্যোজাত শিশুকন্যাকে তার গ্রামের মামাবাড়িতে ফেলে রেখে, প্যারিসে এসে রদ্যাঁর শিষ্য বনে যাওয়ার জন্যে রিলকে-র সমস্ত কবিতা আমার কাছে অস্পৃশ্য মনে হয়; অসুস্থ সঙ্গিনী ফ্রাঁসোয়া জিলো-র গালে জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার জন্যে পিকাসো-র সব ছবি আমি পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দিতে পারি। জীবনের অপরাধ ঢাকতে শিল্পের সাফাই হয় না। সেই অপরাধ, সেই আঘাত আরেকটি নীরব প্রাণে যে ক্ষত সৃষ্টি করে, শিল্পীর আজীবনের সকল শিল্পকর্ম দিয়েও সেই ক্ষতটির ক্ষমা হয় না, শুশ্রূষা হয় না। সমস্ত শিল্পের চেয়ে সেই ক্ষতটি বড়।
সমস্ত শিল্পের বিরুদ্ধে, সেই ক্ষতটিই ঈশ্বরের বিষণ্ণ কবিতা...
আলিঙ্গন
সঙ্গম কে চায়, বলো? শুধু একটি অন্ধ আলিঙ্গন
চাই আমি– জলমগ্ন, ব্যাকুল দু’হাতে
লাইফ-বেল্ট আঁকড়ে ধরে যেভাবে মানুষ ভাসে,
সেভাবে দু'জনে
দু'জনকে আঁকড়ে ধরে, অকূল সমুদ্রে
ঢেউয়ের দোলায় দুলি– নিস্তব্ধ, নির্জন!
জীবন সঙ্গমক্লান্ত। দিতে পারো, এই আলিঙ্গন?
বাবাকে
ভাত কাপড়ের দুশ্চিন্তা করেই
সমস্ত জীবনটা কাটলো আপনার।
কোনো শিল্প, কোনো সম্ভোগ, কোনো উদাসীনতা
আপনাকে স্পর্শ করল না।
আপনার কথা লেখা আমার পক্ষে অসম্ভব।
আপনি আমার লেখার জগৎ থেকে একটু দূরে রয়েছেন,
যেমন শহর থেকে একটু দূরে থাকে পাওয়ার স্টেশন।
নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের কথা
আজও মনে পড়ে সেই নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের কথা,
নদীতীরে বসে তিনি জাল বুনছিলেন।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মাছ ও জলের এই গভীর সংসারে
তিনি এত একা কেন, সূর্যাস্তের পর
কে তার প্রতীক্ষা করে, হাতে নিয়ে নিভু হ্যারিকেন।
আকাশে নিবদ্ধ চোখ, মৃদু হেসে, ছিল তাঁর সংক্ষিপ্ত উত্তর:
‘এখানে আমার কোনো নিকট-আত্মীয় নেই, শুধু
এক দূরসম্পর্কের ঈশ্বর আছেন।’
ঘোড়াদের বিষণ্ণতা
ঘোড়াদের বিষণ্ণতা বোঝে কেউ? পাকদণ্ডি পথে
তাদের ক্ষুধা ও ক্লান্তি, বেত্রাঘাতে কম্পিত কেশর
বোঝে কেউ? পর্যটক, পুলিশ, নক্ষত্র, মেঘ, পাইনের বন?
তীর্থযাত্রী পিঠে নিয়ে অনন্ত খাদের পথে
ঘোড়াদের বিশ্বস্ত চলন—
দেখি আর মুগ্ধ হই,
দেখি আর পাহাড়ি বিষাদে
স্তব্ধ হয়ে যাই।
এত রূপবান প্রাণী, অথচ কি সৎ!
বিশ্বাস হয় না— এই সুন্দর ছলনাময় গ্রহে
ঘোড়া কি অলীক প্রাণী? ঘোড়াই কি আসল বিগ্রহ—
সৌন্দর্য ও সততার অচ্ছেদ্য মিলনে?
এমনই ইশারা
দেখি ভণ্ড তীর্থযাত্রীদের পিঠে নিয়ে ঘোড়াদের বিশ্বস্ত চলনে—
ভণ্ডতর দেবতার উচ্চতর মন্দিরের দিকে।
নাস্তিকতা শুরু হয় ঘোড়াদের বিষণ্ণতা থেকে।
যাতনা
যদি বলো, কী যাতনা, আজীবন সহিছে হৃদয়?
—হাবা বালকের মতো
কেবলই বিস্ময়বোধ, শত দুঃখকষ্ট মাঝে, কেবলই বিস্ময়!
মানুষ দুর্বোধ্য প্রাণী
মানুষ দুর্বোধ্য প্রাণী। কখনও সাপের মুখে,
কখনও ব্যাঙের মুখে চুমু খায়; বেহালা বাজায়।
সমুদ্রে বেড়াতে গিয়ে সুদের হিসেব কষে সৈকতবালিতে
ভাঙা মন্দিরের পাশে: জ্যোৎস্নায়, একা বসে কাঁদে
নিশিডাকে সাড়া দেয়, সিংহ কন্যা মীন দেখে নক্ষত্রমালায়
সমস্ত মনের কথা বলে শুধু দু’চোখের সূক্ষ্ম ইশারায়
—
কবিতা দুর্বোধ্য হলে তবু সে কেন যে ক্ষেপে যায়!
আমরা নিখুঁত নই
‘মুনস্ট্রাক’ ছায়াছবির একটি সংলাপ অবলম্বনে
আমরা নিখুঁত নই। একটা ঘাসফড়িং নিখুঁত, একটা সন্ধ্যাতারা নিখুঁত, একটা বৃষ্টির ফোঁটা নিখুঁত। নিখুঁত একটা বসন্তের রাত। কিন্তু আমরা জন্ম থেকেই পঙ্গু, বেঢপ, মূর্খ এবং দিশাহারা। আমরা ধূর্ত, জালিয়াত, ভঙ্গুর, ভিখারি। আমরা জন্মাই শুধু ভুল স্বপ্নে ভুল কামে ভুল শহরে হেঁটে নিজেদের ধ্বংস করার জন্য, ভুল মানুষকে ভালোবেসে এবং আঘাত পেয়ে, বুক ভেঙে মরে যাওয়ার জন্য। শুধু, সবশেষে টের পাই, আমাদের ভুলগুলি কী মারাত্মক নিখুঁত!
রোজনামচা
মসজিদের আজান-ধ্বনির মতো একটি অতর্কিত মুহূর্ত আসে, যখন একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ হঠাৎ নির্ভুলভাবে নিজের নিয়তি টের পায়।
সে হঠাৎ বুঝতে পারে যে, যদিও তার মৃত্যু এখনও অনিশ্চিত এবং সম্ভবত এখনও তিরিশ বছর দূর, তবুও এই মুহূর্তটি থেকে তার সেই সুদূর মৃত্যু পর্যন্ত তার বাকি জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হবে এক নিস্তারহীন, নিথর বিষাদে ঢাকা। সে বেঁচে থাকবে, কিন্তু তার বেঁচে-থাকার প্রতিটি মুহূর্ত আসবে কালো কফিনের ভিতরে চালান হয়ে—সদ্যোমৃত শিশুর মতো, কোমল, শান্ত।
তখন সেই মানুষটা বিষণ্ণভাবে একবার আকাশের দিকে তাকায়, একবার নীলাচল পাহাড়ের দিকে। আকাশে পড়ন্ত বিকেলের লাল আলো, পাহাড়ে ঘন জঙ্গলের সবুজ স্তব্ধতা। পল্টনবাজার থেকে গুয়াহাটি এয়ারপোর্টে যাওয়ার ট্যাক্সি-ভাড়া ৫০০ টাকা, তার মনে পড়ে।
এখন সেই মানুষটা বেপরোয়াভাবে কানে হেডফোন গুঁজে ওয়াকম্যানে হিন্দি গান চালিয়ে দেয়। সে বুঝতে পারে, এতদিনে পৃথিবী তার ভীষণ রহস্যের শরিক করেছে তাকে, একটা ওয়ার্ক পারমিট তুলে দিয়েছে তার হাতে, দিয়েছে একটা বেলচা এবং একটা পাঁচ-ব্যাটারি টর্চ। উপরন্তু, একটা ক্ষয়া চাঁদ এবং একটা ক্ষুধার্ত শেয়াল সঙ্গে দিয়েছে।
তখন থেকে সেই মধ্যবয়স্ক মানুষটা, কানে হিন্দি গানের হেডফোন গুঁজে, নিজের বেঁচে থাকার প্রতিটি গর্ভ-মৃত মুহূর্তকে, শহরের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে, খুব যত্ন করে গোর দিতে থাকে...
কুকুর
রাস্তায় পড়ে-থাকা মরা কুকুরটাকে সন্তর্পণে বাঁচিয়ে গাড়ি, স্কুটার, রিক্সা চালায় মানুষ। যেন ওটা জ্যান্ত কুকুরই, রাস্তায় শুয়ে আছে। মানুষ জানে ওটা কুকুরের লাশ, জানে ওটার সঙ্গে একটা আধলা ইটের আর কোনও তফাৎ নেই, তবু মানুষ পারে না। ফলে ছোট্ট একটা আনমনা গণ্ডি তৈরি হয়, চারপাশে জট পাকিয়ে যায় গাড়িঘোড়া, রাস্তা পেরুতে না পেরে দাঁড়িয়ে থাকে স্কুলবালক, যেন কুকুরটা তারই পোষা, ডাক দিলেই উঠে চলে আসবে।
মুদ্দোফরাস না আসা পর্যন্ত, ওই মরা কুকুর হয়ে কিছুক্ষণ বেঁচে থাকার লোভেই আমি, আজও, মানুষের পিছন পিছন কুকুর হয়ে ঘুরি।
সূর্যাস্তের নোটবুক
The eternal silence of these infinite spaces frightens me.–Pascal.
১
‘পৃথিবীতে গিয়েছিলে,
কী নিয়ে এসেছো সঙ্গে করে?’
‘এনেছি ভিক্ষার বাটি
অনন্ত চোখের জলে ভ’রে।’
২
জৈন ধর্মগ্রন্থে
৮৪ লক্ষ নরকের বর্ণনা রয়েছে—
তার একটির বর্ণনা আমি, আত্মজৈবনিক ভাবে,
সত্য বলে জানি
৩
সমস্ত জগৎ যদি
ঈশ্বরের দ্বারা আচ্ছাদিত—
তাহলে প্রাণীরা কেন
অনাথ শিশুর মতো ভীত?
8
আত্মার ভিতরে আছে
নগ্ন ও নীলাভ রাত্রি
আত্মার ভিতরে
একটি ড্রাগন-মথ ওড়ে
৫
হে অনন্ত চরাচর!
হে মহা-স্তব্ধতা!
কথা বলো, কথা বলো, কথা বলো, কথা...
মাকড়সা
বাস্তবতার একমাত্র প্রমাণ স্মৃতি। একটি বৃদ্ধ মাকড়সার স্মৃতি। আমি দেখেছি সেই মাকড়সার জাল- যার মধ্যে আটকে আছে চাঁদ, জেলেনৌকো, কিশোরীদের গানের বই, অজস্র ডাকটিকিট, রঙিন প্লাস্টিকের গ্লোব, মৃত্যু-টেলিগ্রাম। আমি নিজে সেই জালের সরু তারের ওপর দিয়ে হেঁটেছি। হাততালির শব্দ, কাউনের হাসি এবং রোগা সিংহের গর্জন আমার দ্বারাই প্রমাণিত হয়েছে। এরপর আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে সার্কাসতাঁবুর বাইরে, এটাই নিয়ম। সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে দেখেছি, কীভাবে বিহার জুড়ে গ্রীষ্মের লু বয়, কীভাবে ধু ধু করে খুনকান্ত এম.এল.এ-দের নির্বাচনকেন্দ্রগুলি, কীভাবে পর্যটক বাঙালি দম্পত্তিরা আরো পরস্পর-বিচ্ছিন্ন হয়ে শিমুলতলা থেকে ফিরে আসে।
সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে দেখেছি, আমিই সেই বৃদ্ধ মাকড়সা...
ডিপ্রেশন
মাঝে-মধ্যে ডিপ্রেশন, ছোট ছোট স্পেল-এ, সমুদ্র এবং মনের পক্ষে ভালো। একটা-দুটো ছোট্ট ঝড়ে নিম্নচাপ ও শোকদুঃখ সাফ হয়ে যায়। তখন আবার সমুদ্র জাহাজের এবং মন যৌনতার সুনীল জলপথ হয়ে ওঠে। যারা আজীবন ফুর্তিতে থাকে, বা থাকতে চেষ্টা করে, তারা একরকমের ক্লাউন। জীবনের সার্কাস-ক্লাউন। তাদের মুখের চিরস্থায়ী আত্মতৃপ্ত হাসি আসলে এক ড্রাগ-খোর মেক-আপম্যান-এর হাতে ঘন সাদা রঙ দিয়ে আঁকা; তারা এক চাকার সাইকেলে চড়ে কেবলই হুমড়ি খেয়ে পড়ে ট্রাপিজ-কন্যার নগ্ন উরুর কাছে। জীবনের আসল নায়ক হচ্ছে বিষণ্ণ মানুষেরা, যেমন ব্যাসদেব, হোমার, যুধিষ্ঠির, মৈত্রেয়ী, গৌতম বুদ্ধ, যিশু খৃস্ট। এইসব নাম মানবচৈতন্যের এক একটি মহৎ ডিপ্রেশন-এর নাম।
ফুর্তির চেয়ে অশ্লীল এবং বেদনার চেয়ে পবিত্র এই জগতে আর কিছু নেই।
ঘণ্টাধ্বনি
ওজন মুদির ধর্ম। সন্দেহ, তোমার।
প্রশ্নাতীত বাটখারা। দুলে-ওঠা ধাতব পাল্লায়
ডুবন্ত নৌকোর ছায়া; উর্ধ্বে, ঝড়ে অস্থির কাঁটায়
তোমার আমূলবিদ্ধ চোখ, চির-অবিশ্বাসী; দস্যুর মাস্তুলে
গাঁথা নৃমুণ্ডের মতো তিক্ত, গুরুভার।
এই ঠোঙা-ভর্তি নুন ঘিরে ক্রোধে দুলে-ওঠা সমুদ্র-পাল্লার
যেটুকু কপালফের, সেটুকুই মৌল প্রতারণা—
মুদি ও তোমার মধ্যে সম্পর্কের নিহিত বেদনা।
নরক
‘হয়তো আমাদের এই গ্রহ অন্য কোনো গ্রহের নরক।’ বলেছিলেন হাক্সলি, শিউরে ওঠার মতন কথা। হয়তো সেজন্যেই এই পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ দুঃখী, অধিকাংশ জন্তু হিংস্র, অধিকাংশ পোকা হিজড়ে, এবং অধিকাংশ জল লোনা। হয়তো সেজন্যেই এই নরক শাসন করে এক উলঙ্গ দানবী, যার নাম ‘অতৃপ্ত বাসনা’। হয়তো এমন আরেকটা গ্রহ আছে, যেটা আমাদের গ্রহের নরক। হয়তো সেই গ্রহের বর্ণনাই লিখিত হয়ে চলেছে আমাদের বেদ-বাইবেল-কোরানে, দান্তে ও মিলটনে, ব্যাংকের পাসবুকে আর রাতের দুঃস্বপ্নে, নিরবচ্ছিন্নভাবে আমাদের ছোট ছোট পদস্খলনে
প্রতীক্ষা
হাতঘড়ি যারা পাঁচ মিনিট ফাস্ট করে রাখে, আমি তাদেরই একজন।
যেখানেই যে ডাকে, আমি পাঁচ মিনিট আগে গিয়ে হাজির হই। কারণ কেউ আমার জন্য প্রতীক্ষা করছে, এটা আমি ভাবতে পারি না। শুধু আমার জন্য কেউ বাসস্টপে দাঁড়িয়ে আছে, একা, ব্যাকুল চোখে তাকাচ্ছে জটপাকানো ভিড়ের প্রতিটি দুর্বোধ্য মুখের দিকে, খুঁজে নিতে চাইছে আমাকে-এমন করুণ এবং শুদ্ধ প্রতীক্ষার দৃশ্য ভাবতেই আমার কষ্ট হয়। তাই নিজে আগে পৌঁছুই এবং চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি।
প্রতীক্ষা করতে আমার ভালো লাগে।
প্রতীক্ষার মধ্যে অদ্ভুত একাকিত্ব আছে, শূন্যতা আছে, শান্তি আছে।
ছবি-তোলার হাসি
প্রমাণ হিসেবে রইল আমাদের ছবি-তোলার-হাসি—
নক্ষত্রশোভিত এই কালো অ্যালবামে।
ব্যগ্র অথচ লাজুক, প্রতীকী অথচ আন্তরিক,
এই হাসি আমাদের অন্তিম শনাক্তচিহ্ন,
আমাদের অদম্য রূপকথা।
আমাদের বাকি সব হাসিগুলি মতলব-বাতিল,
আমরা জানি। তাই, প্রিয় ক্যামেরাম্যান,
অচেনা এবং অবাঞ্ছিত হিসেবে
বিতাড়িত হবার মুহূর্তে,
ওই একটিমাত্র হাসি আমাদের না-বলা নজির, যে
আমরা নিরন্তর প্রলয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে
সবরকম অশ্রু এবং অন্ধকার ভেদ করে,
পিরামিডের পাথর পিঠে নিয়েও,
একটু হাসিমুখেই ব্যক্ত হতে চেয়েছিলাম—
তোমার অ্যালবামে, তারই প্রমাণ হিসেবে
রইল আমাদের ছবি-তোলার হাসি।
মিথুন পদাবলী
১
কিশোরের মন থেকে তুলে আনি এক রতি নারী
যুবকের মন থেকে তুলে আনি অন্ধকার খাদ
গোপনে মেশাই, আর
বৃদ্ধের জীবন থেকে উঠে আসা চাপা আর্তনাদ
২
হাতির দাঁতের মতো উরু দু’টি জেগে আছে সবুজ চাদরে
দরজা ভেজানো কি? কর্ণেল শহরে গেছে?
রামের বোতল আর আর্মি-ক্যাম্প থমথম করে
৩
বালিতে ঘষেছ মুখ, গদাধর,
নুনছাল উঠেছিল, জ্বালা করেছিল?
ওই জ্বালা—কিশোরীর প্রথম আস্বাদ, তুমি
পেয়েছিলে বালি থেকে। তৃপ্ত হয়েছিলে?
8
সমুদ্রগুল্মের মধ্যে বিস্ফারিত প্রাচীন ঝিনুক—
ডুবুরির উপকথা। এত নীচে, এই জলতলে
কিছু বোঝা অসম্ভব—দুঃখ কিংবা সুখ।
জলভরা চোখেরতা
জলভরা চোখে যদি এই পৃথিবীকে দেখো,
মনে হবে বৃষ্টিভেজা গ্রামের শ্মশান
রাস্তা ও ছাতিমগাছ, রিকশা-স্ট্যান্ড, বাড়িঘর,
মাঠ ও মন্দির
সমস্তই যেন একটি মৃতদেহ ঘিরে
খুব ধীরে আবর্তিত—
দূরে নদী, খেয়াঘাট, পাগলের গান
অর্জুন গাছের নীচে
অর্জুন গাছের নীচে, সন্ধ্যার সময়
চতুর্দিকে আত্মীয় ও প্রতিহিংসাময়
শহরের খোলা মাঠে, শীর্ণ গীতিগ্রন্থ হাতে, নীরবে দাঁড়াই।
যেদিকে তাকাই, দেখি, বহুতলে নিচুতলে, সংসারের ছলে,
মানুষের ঘরে ঘরে সঙ্গমেও সংঘর্ষ বেধেছে;
যুদ্ধবিরতির সন্ধ্যা বয়ে আনছে চক্রান্ত ও ভয়।
এই তো ঘোষণাকাল—কবিতার শব্দে, জলে-স্থলে
শঙ্খে ফুঁ দিয়ে বলি, ‘যুযুধান মানুষেরা, শোনো—
এই চরাচরে আমি
যেখানে দণ্ডায়মান, সেখানেই ধর্ম ও জয়।’
দোল
এক রাতে সব চুল পেকে যায়— এরকম ভয়াবহ রাত
জীবনে এসেছে যাঁর, তাঁর শাদা চুল
আবিরে রাঙাতে চাই, আবিরে রাঙাতে চাই আমি
এক রাতে সব চুল পেকে যায়— এরকম ভয়াবহ রাত
জীবনে এসেছে যাঁর, তাঁর শান্ত পায়ে
সামান্য আবির দিয়ে প্রণাম জানাতে চাই,
প্রণাম জানাতে চাই আমি...
তোমার শরীরে ঢুকে
তোমার শরীরে ঢুকে দেখেছি, তোমার
আত্মার করুণা নেই, দয়া নেই, দীর্ঘশ্বাস নেই,
বিষণ্ণ সঙ্গম শেষে ভেবেছি, তা হলে
কোথায় প্রকৃত প্রেম— তোমার আমার?
তুমিও নিশ্চিতভাবে
আমাকে দেহের মধ্যে গুঁজে নিয়ে দেখেছ, আমার
আত্মার করুণা নেই, দয়া নেই, দীর্ঘশ্বাস নেই।
বিষণ্ণ সঙ্গম শেষে ভেবেছ, তা হলে
কী করে পাতবে তুমি এমন সংকীর্ণ, কূট পুরুষের সাথে
স্বার্থপর, নারকী সংসার?
তোমার আমার দুটো ক্ষুদ্ৰ মন দ্বিগুণ দুর্ভেদ্য ক্ষুদ্রতায়
খিল গুঁজে আটকেছে নিখিল জগৎ—
ভিতরে টু-রুম ফ্ল্যাট—দুর্গের, চেয়েও শক্ত, আগ্রাসী, অসৎ
তোমার আমার এই গূঢ় পেন্টাগন!
আমাদের দেখামাত্র ক্রুদ্ধ মেঘে বজ্রধ্বনি বাজে,
আমাদের দেখামাত্র ভয় পায় পশু-পাখি, আর
আমাদের দেখামাত্র
প্রবল ঘৃণায় কাঁপে বনস্থলী, সমুদ্র, পাহাড়।
একটি অশুভ ফুল
উৎসর্গ: বোদলেয়ার
একটি অশুভ ফুল দিতে চাই ঈশ্বরের বিষণ্ণ কবরে!
মোদোমাতালের ইচ্ছা। যথেষ্ট বয়স হল, ধর্ম ধর্ম ভাব
এখনও জাগেনি মনে। এখনও নিঃশ্বাসে ঘন বীর্যের আগুন
ড্রাগনের মতো ঝরে— নারী ও নক্ষত্র ঝলসে যায়
তবু ভাবি, এই মদ গুড় থেকে মল্ট থেকে আঙুর বা লাউপানি থেকে
কীভাবে নির্গত হয়? কোন্ বুড়ো বিজ্ঞানীর নগ্ন লালসায়
প্রতিটি বস্তুতে এত মদ ভরা আছে!
শুঁড়িখানা বন্ধ হলে যে বিশাল রাত্রি, তার রক্ষিতা-খোঁপায়
অশুভ ফুলটি আমি পেয়ে যাই। কিন্তু মৃত ঈশ্বরের কবর কোথায়?
গির্জা ও মন্দিরে খুঁজি, গোরস্থানে, গ্রন্থাগারে খুঁজি—
নাইট-ক্লাব থেকে এক দীর্ঘকায় সুবেশ শয়তান
বেরিয়ে আমাকে বলে, ‘নরকের পূর্বদিকে যান!’
শুঁড়িখানা বন্ধ হলে মদের স্রষ্টার প্রতি মাতালের কৃতজ্ঞতা জাগে।
একটি অশুভ ফুল দিতে চাই ঈশ্বরের বিষণ্ণ কবরে—
শুধু একবার, অন্ধ অনুরাগে!
আইডিয়া
আইডিয়ারা সব সময় ডেঞ্জারাস্।
যা বিপজ্জনক নয়, তা কোনো আইডিয়াই নয়।
নাস্তিকতা, প্রথম প্রেম, ঈশ্বরকণা, চন্দ্রাভিযান, শ্রেণিযুদ্ধ, নিশ্চেতন মন-এগুলি আইডিয়া।
কিন্তু মুখোশনৃত্য, গোলাপচাষ কিংবা তিব্বত ভ্রমণ কোনো আইডিয়া নয়।
পাগল, তুফান, এবং আইডিয়ার সঙ্গে
কক্ষনো চালাকি করতে নেই।
গ্রামাঞ্চলে বাস্তুসাপ, শহরে মেয়র-
এই অব্দি জানা ভালো।
এর চেয়ে বেশি চিন্তা, যেমন, ক্ষুধার অন্ন, ক্রুদ্ধ গ্রাম,
কেন্দু পাতার ন্যায্য দাম, বারুদ এবং বিস্ফোরণময়।
উলঙ্গ নারীর মতো
আইডিয়াকে ভয় করতে হয়।
একটি দুঃখের কথা
একটি দুঃখের কথা, পথে ও বিপথে ঘুরে,
প্রত্যাখ্যাত হতে হতে, গান হয়ে ওঠে।
শহরে, চলন্ত ট্রেনে, মন্দিরের পথে
শোনা যায় সেই গান- ধুলোমাখা, অন্ধ, মায়াময়
যে কোনও গরিব দেশে ভিখারিরা সুগায়ক হয়।
কোথা থেকে আসে সুর,
ছেঁড়া-ফ্রক-পড়া এক বেদনার পিছু পিছু,
কুকুরছানার মতো, কোথা থেকে আসে?
খেলা করে, কোলে ওঠে, শূন্যতা ও বাসি রুটি ভাগ করে খায়
তারপর একদিন, রক্তচক্ষু সূর্যের জগতে
কারা এসে বেদনাকে তুলে নিয়ে যায়
কুকুরছানাটি শুধু শুয়ে থাকে, বোবা চোখে,
প্রান্তরের সীমাহীন ঘাসে
একটি দুঃখের কথা, পথে ও বিপথে ঘুরে,
প্রত্যাখ্যাত হতে হতে, গান হয়ে মিলায় আকাশে
রাইটার্স বিল্ডিং
একটি প্রাণীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে
একটি জগতের মৃত্যু হয়
লালদিঘির পাড়ে
একটা ঢোঁড়া সাপ যখন একটা ব্যাঙ খায়
তখন সে সেই ব্যাঙটার চোখে দেখা
রাইটার্স বিল্ডিং-টাকেও খেয়ে ফেলে
লালদিঘির পাড়ে
গ্রহ-শান্তির জড়ি-বুটির দোকান ঘিরে
টিফিন টাইমে জড়ো হয়
রুগ্ন, দুঃখী, অসহায় মানুষের দল
ধূর্ত, কামুক, ধান্দাবাজ মানুষের দল
তাদের মুখের কুটিল বলিরেখায়
জড়ি-বুটির শুকনো জটিলতা
বিবাদিবাগে ঘুরে ঘুরে আমি
জীবনের কেরানিগিরি দেখি
আমি জীবনের ঘুষ-খাওয়া এবং
লাথি-খাওয়া দেখি
আমি ব্যাঙ ও ঢোঁড়া সাপ দেখি
জি.পি.ও-র নির্নিমেষ গম্বুজ-ঘড়ি দেখি
আমি বুঝতে পারি
একটি প্রাণীর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে
একটি নতুন জগতের জন্ম হয়
একটি নতুন রাইটার্স বিল্ডিং-এর জন্ম হয়
ট্রাফিক পুলিশ
শহরে যখন কেউ পাগল হয়, তখন সে ট্রাফিক পুলিশ হয়ে যায়। নিজের খেয়ালে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে, দিনের পর দিন। নিখুঁত তার হাতের মুদ্রা, অটুট তার গাম্ভীর্য। কেবল তার নিয়ন্ত্রিত গাড়ি-ঘোড়াগুলি সম্পূর্ণ অলীক। যেসব গাড়ি-ঘোড়া কাউকে চাপা দেয় না, কোনো প্রিয়জনকে বাসস্টপে নামিয়ে দিয়ে যায় না...
ব্যক্তিগত দিকনির্দেশ
তুই কি উত্তরে যাবি? দেখিস সেদিকে
কৃষি বিপ্লবের আগে দীর্ঘ ধানক্ষেত জুড়ে কলরোল, তাপ
অদূরে তরণী, সেথা ঠাই নাই তোর
তুই কি দক্ষিণে যাবি? দেখিস সেদিকে
সমাধিফলকে ভারি আভা-গার্দ ছায়াচিত্র
অদূরে প্রহরী, —অন্ধ অয়দিপাউস
তুই কি পশ্চিমে যাবি? দেখিস সেদিকে
মৃত বাদুড়ের ঠোঁটে তোর প্রিয় ডাকনাম,
অদূরে সূর্যাস্ত, তোর শয্যাসঙ্গী নাই
অমৃতের পুত্র, তুই ভিখিরির মতো হেঁটে
সপ্রতিভ পূর্বদিকে কক্ষনো যাবি না।
কাক-মাতা
কার্নিশে করুণ কাক দেখলেই মনে হয় মা
উদ্বিগ্ন পাখির চোখ, কলকাতা শহর থেকে ছেলে ফিরছে না
বই-ঠাসা ঘর, বৃষ্টি, ফুটবল, ছবি-আঁকা খাতা
পড়ে আছে কতদিন; লেখার টেবিল জুড়ে ধুলো, বাঁশপাতা
জমে উঠছে ধীরে ধীরে, ঘুণ-ধরা স্মৃতির মতন
ছেলে কি খেয়েছে আজ? চিঠি দিয়ে গেছে কি পিওন?
মায়ের বিষণ্ণ চোখ সন্তানের অমঙ্গল-ভীত—
ছেলে তো মাতাল খুব, হদ্দ-একা, যৌনতা-তাড়িত
মায়েদের কাকজন্ম লেখা আছে আকাশের গায়
সে-লেখা পড়েছি আমি, অন্তিম আগুন জ্বেলে মায়ের চিতায়
কার্নিশে করুণ কাক দেখলেই মনে হয় মা
মর্মবেদনার পাখি, জন্মে জন্মে আমি তারই ছা
অর্জুন গাছের নীচে
অর্জুন গাছের নীচে, সন্ধ্যার সময়
চতুর্দিকে আত্মীয় ও প্রতিহিংসাময়
শহরের খোলা মাঠে, শীর্ণ গীতিগ্রন্থ হাতে, নীরবে দাঁড়াই।
যেদিকে তাকাই, দেখি, বহুতলে নিচুতলে, সংসারের ছলে,
মানুষের ঘরে ঘরে সঙ্গমেও সংঘর্ষ বেধেছে;
যুদ্ধবিরতির সন্ধ্যা বয়ে আনছে চক্রান্ত ও ভয়।
এই তো ঘোষণাকাল—কবিতার শব্দে, জলে-স্থলে
শঙ্খে ফুঁ দিয়ে বলি, ‘যুযুধান মানুষেরা, শোনো—
এই চরাচরে আমি
যেখানে দণ্ডায়মান, সেখানেই ধর্ম ও জয়।’
ছবিআয়না মুখ
পূর্বকালে কিছু প্রতিমাশিল্পী পূজার্থী-গৃহের সুন্দরী বধূদের মুখ আয়নায় দেখে সেই মুখের ছাঁদে দুর্গাঠাকুরের মুখ বানাতেন। বধূটি হতেন মডেল, কিন্তু তাঁর মুখ সরাসরি দেখার অধিকার নেই পরপুরুষ শিল্পীর, তাই আয়না থাকত বধূটির হাতে। ঘরের বধূর মুখ-বসানো সেই দুর্গাপ্রতিমার পুজো হত সেই পূজার্থী পরিবারের ঠাকুরদালানে। এইভাবে মূর্তিশিল্পের একটি ঘরানা তৈরি হয়েছিল, যাকে বলা হত ‘ছবিআয়না মুখ’। কাজটা কঠিন ছিল শিল্পীদের, কিন্তু সেই কাজে ছিল শিল্পের শুদ্ধতা ও সুখ। বধূটি কি দেখতে পেত প্রতিমাশিল্পীর মুখ, একই আয়নায়? এই প্রশ্নে ঢাক বাজে, আজও বাজে, ত্রিশূল-বিদ্ধ অসুর গর্জায় ....
আমি ফুল
ন্যূনতম মধু দিয়ে সর্বাধিক পাখি ও পতঙ্গ
আকর্ষণ করি—আমি ফুল, আমি সৃষ্টির মন্ত্রণা।
আকৃষ্ট প্রণয়ীদের আত্মহারা ঠোঁটে, পায়ে, শুঁড়ে ও ডানায়
পরাগবিস্তার করি মধুলোভী মহাবিশ্বে—ফুলের মেলায়।
এ জগতে মধু কম, পাখি বেশি, তাই
কিঞ্চিৎ মধুতে যাতে প্রত্যেকের মুখ ফেরে, সেজন্য গোপনে
মধুতে মিশিয়ে রাখি সুতিক্ত বেদনা—
ন্যূনতম মধু দিয়ে সর্বাধিক পাখি ও পতঙ্গ
আকর্ষণ করি—আমি ফুল, আমি কবির ছলনা!
প্রত্যাখ্যান
সকল বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থেকে
জেনেছি যে, প্রত্যাখ্যান অনিবার্য।
তাই, তোমার সঙ্গে
নিষ্ফল যোগাযোগগুলি এড়িয়ে চলেছি।
তোমার অপরিচয়, তোমার নিষেধ
ঘুরে ঘুরে লক্ষ করছি শুধু,
অন্ধকার মর্গের চারপাশে ডোমদের সন্তানের মতো।
অবিচল দূরত্ব রক্ষা করেছি। যাতে
তোমাকে-আমাকে ঘিরে কোনও গুজব
লোকালয়ে না ছড়িয়ে পড়ে।
একমাত্র সম্ভাব্য কোনও সান্ত্বনা-এই গুজব;
তবু তাকে
প্রতিরোধ করে চলেছি, সতর্কভাবে, যেন আমাদের
গোপন আলোকচিত্র প্রতি মুহূর্তে অন্য কোথাও বিশ্লেষিত হচ্ছে।
এভাবে, তোমার সঙ্গে
রচনা করেছি এক সম্পর্ক,
যা কোনওক্রমে, প্রত্যাখ্যানের অতীত।
আমার জীবন
একজন ভিক্ষুক ঠিক যেটুকু সময়
একটি মানুষের কাছে ভিক্ষাবাটি ধরে থাকে,
ভিক্ষার আশায়—
আমার জীবন ঠিক সেটুকু সময়।
মৃত্যুর মুহূর্তে আমি
বাটিতে মুদ্রার শব্দ শুনতে পাব কি?
হে ভিক্ষুক, হে মানুষ, হে নিস্তব্ধ বাটি,
আমার জীবন যেন ব্যর্থ না হয়।
রজনীগন্ধা
মৃত্যুর পর একটা অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে যায়। শরীর পচতে শুরু করে, বেরুতে থাকে দুর্গন্ধ। ক্রমশ সেই দুর্গন্ধ বিকট আর ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, যেন অন্ধ ক্রোধে আক্রমণ করে চারপাশের সমস্ত কিছুকে। সত্তর বছর ধরে যে শরীরটা ছিল হালকা সুবাসে ভরপুর, চল্লিশ বছর ধরে যে শরীরের সুগন্ধে মুখ গুঁজে ঘুমিয়েছে তার প্রিয় নারী, সেই নারীও নাকে রুমালচাপা না দিয়ে সেই শরীরের পচে-ওঠা মড়ার কাছে যেতে পারে না। তাই মৃতদেহ তাড়াতাড়ি আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হয়, কিংবা কবর খুঁড়ে মাটি চাপা দিতে হয়।
তাহলে, প্রাণ মূলত এক গোপন সুগন্ধ, যা আজীবন শরীরের ভিতর বাসা বেঁধে থাকে, এবং মৃত্যুর মুহূর্তে শরীরকে ছেড়ে চলে যায়?
ওই পাখিটা পাখিমাত্র
যে মুহূর্তে তুমি বুঝতে পারবে ওই পাখিটা দেবী নয় ,
ওটা একটা নগণ্য পাখি মাত্র, সেই মুহূর্তে তুমি
পক্ষী—নিপীড়ন থেকে চিরতরে মুক্ত ও স্বাধীন!
তোমার গলায় গান , ফুলেরা তোমার ইচ্ছাধীন!
যে বাগানের মধ্যে তুমি, মূর্খ তরুণের মতো,
একটা মোহিনী পাখির ছলনায়
ঢুকে পড়ে, তার ক্রীতদাস হয়েছিলে,
সেই বাগানের গেটে লেখা ছিল সুস্পষ্ট বিজ্ঞপ্তি;
‘প্রেমের ভিতরে সবরকম স্বাধীনতা নিষিদ্ধ।’
তুমি আহাম্মক, তুমি পাখিটার চটকে অন্ধ, তুমি সেই
সতর্কবাণী লক্ষ করোনি। এমনকী সেই বাগানের
প্রতিটি চুম্বন—বেঞ্চির ক্ষয়া পাটাতনে
সাদা পক্ষী - বিষ্ঠা দিয়ে লেখা ছিল:
‘প্রেমের ভিতরে সর্বপ্রকার নিপীড়ন আইনসিদ্ধ।’
তুমি পাখির নখরায় অন্ধ, তুমি সেই
সতর্কবাণী পড়তে পারোনি। তাই সেই অহংকারী, সুন্দরী পাখির
ইমোশনাল অত্যাচারে, ঠোঁট আর নখরের আঘাতে আঘাতে
একটা থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো মরতে বসেছিলে।
তবু তুমি বেঁচে গেলে, শেষমেশ, বাগানের ক্রুদ্ধ করুণায়।
একদিন রাতে একটা হ্যান্ডসাম, নেশাগ্রস্ত চাঁদ
পাখিটাকে ফুসলে নিয়ে চলে গেল ভিন্ন বনে, ভিন্ন জ্যোৎস্নায়।
তুমি মুক্তি পেলে দীর্ঘ পক্ষী নিপীড়ন থেকে, ভোর হল গাছের পাতায়।
সুন্দরী পাখির সঙ্গে রাত্রির বাগানে আর কখনো যেয়ো না,
‘ওই পাখিটা পাখিমাত্র’— এই মন্ত্র কক্ষনো ভুলো না।
বন্ধু
শ্রীসুধেন্দু দাস, বন্ধুবরেষু
হাসপাতালের গেটে বন্ধু আর বিবর্ণ আপেল
ছাড়া আর কিছু নেই পৃথিবীতে। শুধু একটা দৈব সাইকেল
মধ্যরাতে ছুটে চলে ব্লাড-ব্যাঙ্কে, নৈশ ফার্মেসিতে।
ধারের টাকায় কেনা রক্ত ও ওষুধ যেন
কাজ করে দ্বিগুণ শক্তিতে।
দুরকম বন্ধু আছে পৃথিবীতে: একজন
ভিজিটিং আওয়ারে আসে, ফিরে যায় সূর্যাস্তের আগে।
অন্যজন বসে থাকে হাসপাতালের গেটে,
অনন্ত দুঃখের রাত জাগে।
নির্বাচিত কবিতা
রণজিৎ দাশ
রণজিৎ দাশ




মন্তব্য