.header-button .inner > span { font-size: 18px !important; } .header-button .inner i.fa { font-size: 40px !important; } .comment-form-message { background-color: #f4f4f4 !important; font-size: 14px !important; }

বেড়া • আইরিন সুলতানা

বেড়া  ছোটোগল্প আইরিন সুলতানা
সেদিন সবুজের বয়স সাতে পড়েছে। সবুজের বাবা একটা দুই হাত লম্বা কদবেল গাছের চারাগাছ এনে বলল, এইখান তোমহার জন্মদিনের উপহার। ‘তুই দিন দিন বোড্ডো হোবি। চারাডাও তোমহার সাথে সাথে বোড্ডো হোবে। ফের নুন আর মরিচের গুড়া দেহেনে কৎবেল মাখা খাবোনে।’
সবুজ ফাঁকা ফাঁকা দাঁতে খিল খিল করে হাসল। লাফালো। হাত তালি দিল।  
সবুজদের বাড়ির সামনে উঠান। তারপর নিশ্ছিদ্র বেড়ার ফটকের বাইরে পায়ে হাঁটা চিকন পথ। পথের দুই ধারে বাগান। ডানে একটা ছোট পুকুর। পুকুর থেকে কয়েক হাত দূরে কোদাল দিয়ে চার কোপে মাটি সরালো সবুজের বাবা। 
তারপর কদবেলের চারাটা দেখিয়ে সবুজকে বলল, ‘লেহ এইঠে পুঁতেক। গর্তর মাঝখানত।’
সবুজ খ্যাংরা কাঠির মত চারা গাছটা দুই হাতে ধরে গর্তের মাঝে রাখে। তারপর বাবার সাথে হাত লাগিয়ে খুঁড়ে রাখা মাটি আবার ঢেলে দেয়। ছোট-বড় চারটে হাত চারাগাছটার আশেপাশে মাটি চাপা দিয়ে গর্তটা ঢাকতে থাকে। চারহাতে মাটি চেপে চেপে দেয়। 
পাশে রাখা কোদালের খুঁট দিয়ে আরও একবার মাটির উপরটা থপ থপ করে চেপে দিতে দিতে সবুজের বাবা বলে, ‘মাটির তলত শিকড় অ্যালা আর নড়িবেনি। তাইলে চারাডা বোড্ডো হোবে মাটি কামড়াহেনে।’
টিনের ছোট বালতিটার হাতল ধরে রেখে পুকুরে গিয়ে ফেলল সবুজের বাবা। ধুপুস করে আওয়াজ হল। তারপর ঢক ঢক। পানি ভরা বালতি পুকুর থেকে হেঁচকা টানে উঠিয়ে চারাগাছটার কাছে এসে দাঁড়াল। চারাগাছটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সবুজও।
‘নে রে ব্যাটা! পানি ছিটাহ দে।’
সবুজ আবারও খিল খিল করে হাসে। বাপ আর ব্যাটা চার হাতে বালতি থেকে পানি তুলে চারাগাছের গোড়ায় ঢালতে থাকে।
এরপর পাশে পড়ে থাকা চাটাই তুলে গাছটার চারিদিকে গোল করে বেঁধে দেয় সবুজের বাবা। চাটাইটার খোপ খোপ দিয়ে চারাটা একটু একটু দেখা যাচ্ছে। 
আ বেড়া কেনহে ফের এইঠে! সবুজ বাবার দিকে তাকিয়ে বলে। 
‘শুন ব্যাটা, কথায় আছে না? অতি বাড় বাড়াহ যাবেনি, ঝড়ত ভাঙ্গে যাবে। ফের অতি ছোট থাকিবানি। ছাগল মুড়ে খাবে। ছাগল যাতে গাছটা খাবার না পারে ওইতাহানে বেড়া দিনু।’
চারাগাছ আর সবুজ এক সাথে বাড়তে শুরু করে। কিন্তু চারাগাছ সবুজকে ছাড়িয়ে যায় দ্রুত। কৎবেল গাছটার তলে দাঁড়িয়ে সবুজ মেপে দেখে নিজে কতটুকু বড় হলো।
মৌসুমে মৌসুমে কৎবেল গাছ শক্তপোক্ত হল। ফল এলো। চারপাশটা কদবেলের সুবাসে ভুর ভুর করে। গাছের তলে কদবেল গড়াগড়ি খায়। বাড়ির লোকেরা নুন আর লাল মরিচ গুঁড়া দিয়ে কদবেল মাখা জিভে রেখে চোখ বন্ধ করে খায়। 
এইসব শৈশব, কৈশর আর কদবেল গাছটাকে পাশ কাটিয়ে সবুজ রাজধানী চলে আসে। এই শহরে কদবেল গাছ আর চিনতে পারে না সবুজের চোখ। শুধু মৌসুমে মৌসুমে কোনো স্কুল-কলেজের সামনে ভ্যানগাড়ি ভরা কদবেল দেখলে খানিক থামে। 
একদিন তিতুমীর কলেজের সামনে ভ্যানগাড়ি থেকে নাকে শুঁকে শুঁকে কদবেল বেছে নিলো। বিক্রেতা মামা নুন আর মরিচ গুঁড়া দিয়ে কদবেল মেখে দিল। সেই কদবেল মাখা খেতে হয় কাঠি দিয়ে। সবুজ কদবেল নিয়ে অফিসে ঢোকে। নিজের কাজের টেবিলটায় কদবেল রাখে। কাঠি দিয়ে একটু একটু করে কদবেল মাখা তুলে জিভে রেখে খায়। গোটা অফিস কদবেলের সুবাসে ভুর ভুর করে। সহকর্মীরা উঠে এসে ঘিরে ধরে সবুজকে। কদবেল মাখার ভাগ বসায় ওরা।
এরপর আরেকদিন। বৃক্ষমেলাতে এক গাছের পাতা দেখে চেনা চেনা লাগে সবুজের। 
মেলার স্টলের কর্মীরা বলে, ‘এটা কদবেলের কলম চারা। নিয়া যান। টবে লাগাইতে পারবেন। সামনের বছর থেকেই ফল আসবো।’
সবুজ প্রতিদিন গ্রামের বাড়ির বাগানে পুকুরের কাছে কদবেল গাছটার চেহারা ভুলে চলেছিল। বাবা মারা গেছে। মা নেই আর। সবুজের আর গ্রামে যাওয়া হয় না। শুনেছে ওখানে ভিটে, জমি আর পুকুর ভাগাভাগি হয়ে গেছে।
‘কদবেল গাছটা কার ভাগে পড়েছে?’
‘অ! ওই গাছডা তো দেওয়াল তুলার পথত পড়হেছিল। তো কাটে ফেলালো ফের।’
ছাগলের হাত থেকে বেড়া দিয়ে বাঁচানো গেল গাছটাকে। কিন্তু মানুষের হাত থেকে বাঁচাতে বেড়া দেওয়ার কথা কেন বলে গেল না বাবা? 
সবুজ মনে মনে কথা কাটাকাটি করে বাবার সাথে। বৃক্ষমেলার স্টলের কর্মী সবুজের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। 
এই কদবেলের চারাটা ছোটবেলার মত ছোট নয়। প্রায় চার ফুট। আর ঝোপালো। যে কদবেল গাছ সবুজদের গ্রামের বাড়ির বাগান জুড়ে বেড়ে উঠেছিল তা নাকি এখন টবে লাগিয়ে রাখা যাবে শহরের সরু বারান্দায়। গাছের ফলের অপেক্ষায় ছোটবেলা কেটে যাবে না আর। কলম চারার এমনি জাদু।
কদবেল গাছটার পাতা খেতে খুব মজা পেত সবুজ। স্বাদটা যেন কেমন ছিল? বৃক্ষমেলায় দাঁড়িয়ে কদবেল চারাটার একটা পাতা ছিড়ে মুখে দিল সবুজ। কেমন একটু কষ কষ। স্টলের কর্মী এখনও সবুজের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। 
সবুজ বলল, ‘না অত স্বাদ পেলাম না তো!’
মেলার স্টলের কর্মীর মুখে অনিশ্চয়তা। বলল, ‘ফল অনেক ধরব। খাইয়া মজা পাইবেন। লইয়া যান।’
সবুজ সাতটা কদবেল চারাগাছ নিল। গাড়িতে চড়িয়ে বাড়ি আনল। গাড়ির পেছন থেকে গাছগুলো একটা একটা করে নামাচ্ছে, ওই সময় ওর মেয়েটা দৌড়ে এলো। সবুজ মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। আগামীকাল মেয়ের ঠিক সাত বছর হবে। 
সবুজ সাতটা কদবেল গাছ পাশাপাশি রেখে মেয়েকে সামনে দাঁড় করালো। 
‘এই নাও মামনি, তোমার জন্মদিনের উপহার। এই গাছ আর তুমি এক সাথে বড় হবে। তারপর নুন আর মরিচ গুঁড়ো দিয়ে আমরা কদবেল মাখা খাবো।’
সবুজের মেয়ে হাত তালি দিয়ে লাফিয়ে ওঠে। খিল খিল করে হাসে আর বলে, নুন ... নুন।
এলাকায় একটা পার্ক আছে। নামকাওয়াস্তা পার্ক। মাঠে ঘাস হয় না। ফুল গাছে ফুল নেই। বড় কয়েকটা গাছ আছে এই যা। গাছ লাগালে নাকি থাকে না। যেদিন চারা লাগানো হয় সেদিনই কেউ না কেউ তুলে নিয়ে যায়। চারাগাছের পাতা ছিড়ে ছিড়ে নাকি লোকে কান চুলকায়। তারপর গাছ মরে যায়। যতদিন হাত বরাবর থাকছে ততদিন চারা গাছ সামলে রাখা চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দেওয়ার মত ডিউটি। যদি বৃষ্টি আর বাতাসে তরতাজা হয়ে কোনো চারাগাছ মাথাচাড়া দিয়ে মানুষের উচ্চতা ছাড়িয়ে যায় তবেই কিছু আশা থাকে।
ওই পার্কে ছোট একটা পুকুর আছে। শহরে কি আর পুকুর থাকে? ওটা আসলে লেক। পার্কটা দেখভাল করে এলাকার সমিতি। সবুজ একদিনের মধ্যে সমিতির অনুমতি জোগাড় করে। টবে নয়, পার্কের মাটিতে সারি করে কদবেল গাছ লাগাবে সবুজ।   
মেয়ের জন্মদিনের দিন বিকেলে কদবেলের সাতটা চারাগাছ আর সাত বছরের মেয়েকে নিয়ে পার্কে আসে সবুজ। পার্কে মালি ছিল। কিন্তু সবুজ নিজে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে কয়েক হাত দূরে দূরে গর্ত করে। মেয়ে সবুজের পাশে পাশে থাকে। 
‘এই যে মামনি! একটা একটা করে চারাগুলো এই গর্তের মধ্যে দাও তো দেখি।’
মেয়ে আর বাবা মিলে সাতটা চারাগাছ মাটিতে বুনে দেয়। ত্রিশ বছর আগে সবুজ সাত বছরের ছিল। আজ ওর মেয়ের মধ্যে সেই সাত বছরের নিজেকে দেখে সবুজ। চারাগুলো মাটিতে বুনে বাবা আর মেয়ে মিলে মাটি চেপে চেপে দেয়। কোদাল দিয়ে মাটি ঠুকে দেয়। সবুজ হাসে। বাবার হাসি দেখে মেয়েও হাসে খিল খিল করে। 
মালি পানি দেওয়ার পাইপ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সবুজ বলে, ‘বালতি নেই?’
টিনের বালতি নেই। প্লাস্টিক ভুলিয়ে দিয়েছে মানুষের মন থেকে টিনের বালতির স্মৃতি। লেকে ডুবিয়ে দিল প্লাস্টিকের বালতি। টিনের বালতির মত সেই ধুপুস আওয়াজ হয় না প্লাস্টিকের বালতিতে। পানি ভরে নিল সবুজ। তারপর বাবা আর মেয়ে চার হাতে পানি ঢেলে দিল সবকটা গাছের গোড়ায়। 
গাছে পানি দেওয়া শেষে বড় চাটাই তুলে নিল সবুজ। মালি আর সবুজ মিলে প্রতিটা গাছের চারদিকে গোল করে ঘিরে চাটাই বেঁধে দিল। চাটাইয়ের গায়ে ল্যামিনেটেড কাগজ সেঁটে দিল এক এক করে। কাগজে লেখা, আমাকে বেড়ে উঠতে দাও। চারাগাছটার মনের কথা যেন। কিন্তু কাকে বলছে এ কথা চারাগাছটা? 
ওদিকে সবুজের মেয়ে মন খারাপ করেছে। 
বাবা, ওরকম করে বেড়া দিচ্ছ কেন? 
সবুজ একটু থামে। তার মনেও এমন প্রশ্ন জেগেছিল সাত বছর বয়সে। তখন বাবা বলেছিল ছাগলে মুড়ে খাবে। সবুজ মেয়ের দিকে তাকায়।  
‘গাছগুলো তো নইলে তোমার সাথে সাথে বড় হতে পারবে না মা। ওরা গাছগুলো খেয়ে ফেলবে।’
‘গাছ কে খাবে বাবা? কারা ওরা?’
চারাগাছগুলো ঘিরে বেড়ার গিঁট বাঁধতে বাঁধতে সবুজ মেয়েকে বলে, মানুষে মুড়ে খাবে রে মা। মানুষে মুড়ে খাবে।
 

বেড়া 
আইরিন সুলতানা 


মন্তব্য

নাম

অনুবাদ,35,আত্মজীবনী,27,আর্ট-গ্যালারী,1,আলোকচিত্র,1,ই-বুক,7,উৎপলকুমার বসু,26,ঋত্বিক-ঘটক,3,কবিতা,323,কবিতায় কুড়িগ্রাম,7,কর্মকাণ্ড,16,কার্ল মার্ক্স,1,গল্প,70,ছড়া,1,জার্নাল,4,জীবনী,6,দশকথা,25,দিনলিপি,1,পাণ্ডুলিপি,11,পুনঃপ্রকাশ,16,পোয়েটিক ফিকশন,1,প্রতিবাদ,1,প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা,4,প্রবন্ধ,162,প্রিন্ট সংখ্যা,5,বই,4,বর্ষা সংখ্যা,1,বসন্ত,15,বিক্রয়বিভাগ,21,বিবিধ,2,বিবৃতি,1,বিশেষ,24,বুলেটিন,4,বৈশাখ,1,ভাষা-সিরিজ,5,ভিডিও,1,মাসুমুল আলম,35,মুক্তগদ্য,37,মে দিবস,1,যুগপূর্তি,6,রিভিউ,5,লকডাউন,2,শম্ভু রক্ষিত,2,শাহেদ শাফায়েত,25,শিশুতোষ,1,সন্দীপ দত্ত,14,সম্পাদকীয়,18,সাক্ষাৎকার,22,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ,18,সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ,55,সৈয়দ সাখাওয়াৎ,33,স্মৃতিকথা,14,হেমন্ত,1,
ltr
item
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন: বেড়া • আইরিন সুলতানা
বেড়া • আইরিন সুলতানা
ছোটোগল্প • বাঙলা ভাষার লিটল ম্যাগাজিন • বিন্দু
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEh-AsLbKfbPb0FWGtCNyZQT63lBwkLJq59keb1YjCX0UzYjWGTJbCNPjDkCOG4WYiNBsh6JDWR0QaXnEuqcrbnJ0YVQ3Wo-AQLA7xnPGG4Aflt2oIPaJz124AL3axrOf4t4tnvVPu7sIXa40t8qU5-44T2qbq2iW7Gj-VGm9wPbo9zG37Zyv_VJQoxn4ds/s16000/short-story-airin-sultana-bindu-littlemag.png
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEh-AsLbKfbPb0FWGtCNyZQT63lBwkLJq59keb1YjCX0UzYjWGTJbCNPjDkCOG4WYiNBsh6JDWR0QaXnEuqcrbnJ0YVQ3Wo-AQLA7xnPGG4Aflt2oIPaJz124AL3axrOf4t4tnvVPu7sIXa40t8qU5-44T2qbq2iW7Gj-VGm9wPbo9zG37Zyv_VJQoxn4ds/s72-c/short-story-airin-sultana-bindu-littlemag.png
বিন্দু | লিটল ম্যাগাজিন
https://www.bindumag.com/2026/04/short-story-by-airin-sultana.html
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/
https://www.bindumag.com/2026/04/short-story-by-airin-sultana.html
true
121332834233322352
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts আরো Readmore উত্তর Cancel reply মুছুন By নী PAGES POSTS আরো এই লেখাগুলিও পড়ুন... বিষয় ARCHIVE SEARCH সব লেখা কোন রচনায় খুঁজে পাওয়া গেল না নীড় Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy