অক্টোবর বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকীতে, ভ়সেভলদ মেয়েরহোলদ কবি ভ্লাদিমির মায়েকভস্কির “মিস্ট্রি-ব্যুফেল”-এর নির্দেশনাকালে সার্কাসের ভাঁড়ামির নানা উপাদানের সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবী কাব্যকে জুড়ে দেন এবং শহরের চৌকে/চকে হাজার হাজার দর্শকের সামনে তা উপস্থাপন করেন। সমজাতীয় নাটকীয় অনুষ্ঠান এই নব্য-মজুরের দেশের বহু জায়গায় বহু বছর ধরে জনপ্রিয় থেকেছে। এ ছিল এক নতুন ধরনের Agit-Prop/বিক্ষোভ প্রচারমূলক নাটকের শুরুয়াৎ রাস্তায়, কারখানার গেটে, বাজারে, ডকে, খেলার মাঠে, গোয়ালঘর সহ বিবিধ জায়গায় অভিনীত হত। প্রকৃতিগতভাবে খুল্লমখুল্লা রাজনৈতিক এই নাটকগুলি দর্শকদের তাদের কর্মস্থলে বা বাসস্থানেই খুঁজে নিত, নাটকের হলে তাদের টেনে আনবার চেষ্টা তারা করত না। এ কার্যত জনগণের গণতান্ত্রিক মেজাজের স্বতঃস্ফূর্ত দলিল এবং প্রাত্যহিক ঘটনা ও অগ্রগতির প্রকাশক হয়ে উঠল।
এই পথেই গোটা দুনিয়াকে এ ছুঁয়ে ফেলল, আধুনিক থিয়েটার বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চিনে ঢুকবার দুবছরের মধ্যেই এর পথ সংস্করণ কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিক-কৃষকের সমাবেশের শুরুতে জায়গা পেতে থাকে ও অভিনীত হতে থাকে। লং মার্চের গোটা পর্ব জুড়ে এবং তার পরেও, বহু চলমান থিয়েটার গোষ্ঠী গণফৌজের সঙ্গেই ঘুরত। ভারতে, ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামে জনগণকে টেনে আনবার ও সামিল করবার প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ফল হিসেবে পথনাটক উঠে এলো, স্বাধীনতার পরে, গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির সাথে যুক্ত হয়ে এ জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখল।
কিছু গুরুত্ববহ কালপর্বে, বিভিন্ন দেশেই পথনাটক আত্মপ্রকাশ করল— স্পেনে গৃহযুদ্ধের সময়ে, ভিয়েতনামে ৪৫ বছর ধরে চলা জাপান, ফরাসি ও মার্কিন হানাদার ও দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কালে, কিউবাতে বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই (এবং এখনও ব্যাপকভাবে এর চর্চা হয়ে থাকে), লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা জুড়ে, যেখানে যেখানে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সংগঠিত হয়। এমনকি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেও, মেক্সিকোর খামারকর্মী ও নিগ্রোদের কাছে সংগ্রাম ও সংগঠনের হাতিয়ার হিসেবে পথনাটক খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। টালমাটাল ষাটের দশকের শেষে ফ্রান্সে এর আবির্ভাব হয়। ব্রিটিশ যুক্তরাষ্ট্রেও শ্রমিক জমায়েতে ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলিতে এ খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
যে দর্শক একবার হলেও কোনো পথনাটকের অভিনয় দেখেছে সে একে এক ধরনের জঙ্গি, রাজনৈতিক প্রতিবাদী থিয়েটার হিসেবেই বিশিষ্টতা দান করবে যা প্রায়শই প্রাসঙ্গিক শক্তি বহন করে থাকে।
যদি কেউ পথনাটকের পরম্পরা নির্ধারণ করতে চায়, সে চাইলেই পারে গোটা দুনিয়া জুড়ে শতাব্দীর পর শতক চর্চিত বহু নাটকীয় বা আধা-নাটকীয় আঙ্গিকের সঙ্গে এর এক আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করতে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, প্রাচীন গ্রিসের বাচ্চানালিয়ান উৎসব বা মধ্যযুগীয় ইউরোপের জাঁকজমকময় নাট্যদৃশ্যের অভিনয়ে থিয়েটারের উপাদান যেমন থাকত, এক ধরনের সামাজিক সমালোচনাও তাতে থাকত।
এদের ধর্মীয় ও আচারগত বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও এগুলিতে প্রায়শই বহু ইতরভাষ্য [অধার্মিক, জাগতিক] থাকত যাকে কোনোমতেই ধার্মিক বলা চলে না এবং এগুলির মূল শক্তি ছিল ঈশ্বর ও তার মনুষ্য প্রতিনিধিদের নিয়ে মশকরা করবার ক্ষমতা, যা জনপ্রিয়ও ছিল। রেনেসাঁর কালে ভাঁড়ের অভিনয়গুলিতে (যা বর্তমান ভারতের মাদারির খেলার সমতুল) সমাজকে ব্যঙ্গ করবার অগুনতি উপাদান ছিল যা কিনা জনগণের আবেদনের ক্ষেত্রে যথেষ্টমাত্রায় দায়ী ছিল, ভারতে, বহু লোকনাট্যেই প্রাসঙ্গিক ইস্যুর উল্লেখ এবং “কমিক”/হাসির পর্ব বর্তমান যা ধর্মীয় বা সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানের উপর (ভিত্তি করে)/ প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করে কৌতুক সৃষ্টি করে থাকে, সব থেকে বেশি পরিমাণে ব্যঙ্গ করা হয় পণ্ডিত ও কোতোয়াল চরিত্রদের, চতুর্থ শতকের অনবদ্য সেই সংস্কৃত নাটক “মৃচ্ছকটিক”-এ, শার্ভালিক নামের সেই ব্রাহ্মণ চোর একটি বাড়িতে সিঁদ কাটবার আগে তার পৈতে দিয়ে মেপে নেয়।
যাই হোক, পথ নাটকের বহিরাঙ্গিক বৈশিষ্ট্যের সাথে পরম্পরাগত উপস্থাপনমূলক শিল্পকলার সংযোগ/সম্পর্ক নিয়ে ছানবিন করা একরকম, কিন্তু “পরম্পরাগত” হয়েও স্বকীয় পথনাটকের বৈশিষ্ট্য হিসেবে সেগুলোকে পেশ করা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার।
অথচ এটিই গত মাসে ভারতের বাণিজ্যমেলা কর্তৃপক্ষের সাংস্কৃতিক শাখা করে বসল। তারা ১৬ দিন ব্যাপী পরম্পরাগত পথনাটক উৎসব সংগঠিত করল উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা, আসাম, গুজরাট, মহারাষ্ট্রের একটি করে ও রাজস্থানের দুটি দলকে নিয়ে।
যুক্তিটা সম্ভবত দাঁড় করিয়েছিল এই যে, রাস্তার ধারে না-হলেও যদি খোলা মঞ্চে বা প্রাঙ্গনে কোনো নাটক অভিনীত হয়, তবে তাকেও “পথনাটক” হিসেবে জাহির [চিহ্নিত] করা যাবে। এখন, এত হালকা চালের সংজ্ঞা বাস্তবে চলে না। যে কোনো নাটকের শেষেই নায়ক যদি মারা যায় তবে তাকে ট্র্যাজেডি বললেই হবে বললে যেমন হাস্যকর ঠেকে, এও তাই। এটা এ কারণে হাস্যকর নয় যে সমস্ত অ্যারিস্ততলবাদী ও সাহিত্যের অধ্যাপকেরা একে হাস্যকর মানবেন, বরং এ কারণেও যে এই ধরনের সংজ্ঞা আমাদের ট্র্যাজেডি বা অন্যান্য “নায়ক মারা যাবে” গোছের নাটকগুলি সংক্রান্ত বোঝাপড়ায় কোনোরকম পুষ্টি জোগাতেই অক্ষম।
একইভাবে, পরম্পরাগত নাটকদের “পথনাটক” বলে দেগে দেওয়া হলে একদিকে এই নাটকগুলিকে, অন্যদিকে পথনাটকগুলিকেও ভুল ভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
যদিও এ মাপকাঠিতেও টিএফএআই উৎসবে অভিনীত সমস্ত নাটককে পথনাটক বলা চলে না। আদতে, রংসম্পদের (কর্ণাটক) “সাংগ্যা বাল্যা” আলো, বাহারি সাজপোশাক ও প্লেব্যাক সংগীত সমেত “পাক্কা” মঞ্চ উপস্থাপনাই৷ অনুষ্ঠানের কার্ডে অন্যান্য জিনিসের সাথে মঞ্চ, সাজসরঞ্জাম, সৃজনমূলক ব্যবস্থাপনা, সমন্বয়সাধন, আলো, মেক-আপ, কস্টিউম/সাজপোশাক, এমনকি সহকারী নির্দেশনার জন্যেও ধন্যবাদজ্ঞাপন করা ছিল। এই দলটির এই নাটক খোলা হাওয়ায়, প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় কখনোই অভিনীত হয়নি। তাদের প্রায় একশোর বেশি মঞ্চায়ন/অভিনয় টিকিট কেটে আসা বা আমন্ত্রিত দর্শকদের জন্য সাধারণ মঞ্চে-ই হয়েছে। মনের মাধুরী মেশালেও “সাংগা বাল্য” কে পথনাটক বলা চলে না।
ধরা যাক, আঁকিয়া নট বা ভাওনা রীতিতে হাটবার কেন্দ্রীয় নাট্য সমাজের (আসাম) “সীতাহরণ বালিবধ”-এর কথা। যখন এই রীতির জন্ম হল পনেরো শতকে, এর এক জোরালো প্রচারমূলক ক্রিয়াশীলতা ছিল। শংকরদেব মানুষের মধ্যে বৈষ্ণব নীতি ছড়িয়ে দিতে এর ব্যবহার করেন। এটি ছিল এক ধরনের চলমান, ভ্রমণমূলক থিয়েটার যা সমকালীন উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের উত্তাল ভক্তিতরঙ্গের চূড়ায় চেপে বইছিল। এখন এই নাট্য রীতির এক কৃত্রিম ক্ষয়প্রাপ্ত ভগ্নাবশেষ পড়ে আছে যা কেবল নামঘর আর সত্রগুলিতে অভিনীত হয়ে থাকে।
উড়িষ্যার প্রহ্লাদ নাটক ছিল এক জাঁকালো নৃত্যনাট্য যার জন্য দর্শককে একদিকে রেখে এক সাধারণ মাপের অভিনয়-স্থল দরকার। এক ভারী ও জবরজং চার ধাপযুক্ত কাঠের মঞ্চ এই নাট্যরীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ এবং এর ব্যাপক ব্যবস্থাপন প্রয়োজনীয়। যদিও পথনাটকের প্রাণপূর্ণ তেজ ও নমনীয়তা এর রয়েছে, কিন্তু পথনাটকের বুনিয়াদি চাহিদা, চলমানতা এতে অনুপস্থিত।
আমি নাট্যোৎসবের অন্যান্য অভিনয়গুলির বিশদ বর্ণনা করে দেখাতেই পারি কীভাবে পথনাটকের ন্যূনতম শর্তই এগুলি পূরণ করেনি। কিন্তু এটি সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার না। জরুরি ব্যাপার এইটাই যে পরম্পরাগত পথনাটক পরিভাষাটি কালাতিক্রমণ দোষে দুষ্ট। ভারতে যদি পথনাটকের কোনো নির্দিষ্ট পরম্পরা থেকে থাকে তবে তা হল স্বাধীনতা সংগ্রামেরকালে আমাদের দেশের মানুষের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী পরম্পরা; বিশ্বের অন্যান্য অংশে তা হল এক ন্যায্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার লক্ষ্যে জনগণের সংগ্রাম।
আজকের ভারতে, নাটক ও অন্যান্য শিল্পের জগতে পরম্পরার অর্থ দাঁড়িয়েছে আচার-অনুষ্ঠান, অধ্যাত্মবাদ, পুরাণ, জাদু ও অলৌকিকের কাহিনি, রং, পোশাক ও নানা দর্শনীয় পৌত্তলিক কৃত্য। পথনাটক এই পরম্পরাকে প্রত্যাখ্যান করে।
পথনাটক যেই রীতিগুলি গ্রহণ করছে সেই বিচারে ভারতের প্রথাগত নাট্যরীতিগুলির চেয়ে পিস্কাতোর ও ব্রেখটের তৈরি নাট্যপরম্পরার সাথেই পথনাটকের মিলের জায়গা বেশি। পশ্চিমের ও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে, এর রীতি সবচেয়ে নতুন ও আধুনিক। ভারতশুদ্ধু গোটা দুনিয়া জুড়েই রাজনৈতিক প্যামফ্লেট, পোস্টার, দেয়াল লিখন ও বিক্ষোভমূলক বক্তব্যসহ সবকিছুই পথনাটকের সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। উনিশ শতকের মধ্যভাগে মজুররা যখন ইউনিয়নের মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিত করতে শুরু করল তখন পথনাটকের জন্ম হয়ে পড়ল অবশ্যসম্ভাবী। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের গোড়ায় রাজনৈতিক বিক্ষোভ প্রদর্শন যখন ঘনঘন হতে থাকে তখন এর আত্মপ্রকাশ হয়ে পড়ে অনিবার্য। বলা চলে, এটি এক বিশ শতকীয় ব্যাপার যা আধুনিক বিশ্বের নির্দিষ্ট প্রয়োজনের ভিত্তিতে জন্মেছে।
মোদ্দায় এ হল এক জঙ্গি রাজনৈতিক প্রতিবাদী নাটক। এর কাজ হল মানুষকে বিক্ষুব্ধ করা ও সংগঠনের লড়বার প্রশ্নে মানুষকে জড়ো করা। সেই ভাবনায়, এর মতাদর্শগত পরম্পরা প্রায় দেড়শো বছরের, এর আনুষ্ঠানিক পরম্পরা ৭০-৮০ বছরের বেশি নয়। তাই পরম্পরাগত পথনাটকের প্রশ্নই ওঠে না।
পথনাটকের নামে অন্যান্য মালপত্র গছিয়ে দেবার চেষ্টাও কম হয়নি। সরকারি আধিকারিক, স্বেচ্ছাসেবী ও মিশনারী সংস্থার মদতে কিছু গোষ্ঠী স্বাস্থ্যবিধি, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজনীয়তার প্রচার করতে চেয়েছে এই নাট্যরীতির মাধ্যমে। এই সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। এই নাট্যরীতি নিজেই এ ধরনের জবরদখলি চেষ্টাকে প্রতিরোধ করে। এটি কোনো বেমানান পরম্পরার দ্বারা নিজেকে খানিক “যথাযথ” করে তোলার চেষ্টাকেও রুখবে একইভাবে।
ভারতের থিয়েটার আজকাল ‘পরম্পরার কাছাকাছি’ যাবার রাস্তার সন্ধানে আছে বা “পরম্পরাবদ্ধ” হতে চাইছে। এমন বিশেষজ্ঞের অভাব নেই যারা পথনাটকের কর্মীদের লোকনাট্যের থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজবার পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু যেহেতু পথনাটক আধুনিক বিশ্বের প্রয়োজনের/চাহিদার সঙ্গেই নিজেকে সচেতনভাবে শনাক্ত করে থাকে, তাই অতীতের সঙ্গে তৈরি করে এক নৈতিক জটিল সম্পর্ক। এটি জানে পরম্পরার কাছ থেকে কী গ্রহণ করবার আছে ও কী বাদ দেবার আছে।
(এপ্রিল ৬, ১৯৮৬)
অনুবাদ- দেবরাজ দেবনাথ
কৃতজ্ঞতা- মার্কসবাদী পথ
পথনাটকের পরম্পরা
সফদার হাসমি
সফদার হাসমি




মন্তব্য