১
একটা হল্লা করা দিন!
রঙ বিহীন শুরু হয় অতি সাধারণ সেই উৎসব।
কোথাও একটু সবুজ নেই।
নেই হাতের মুঠোয় চলে আসা প্রজাপতি, ঘাসফড়িং বা কাঁচপোকা।
রাতের আকাশ তারাহীন।
মেঘের সমুদয় ঢেউ পেরিয়ে একফালি চাঁদ ভাসছে স্বমহিমায়।
তারই মৃদু আলো এসে গড়িয়ে পরে পায়ের ওপর।
হাঁটার পথে অগণিত ফুলের রেণু, ঝরা পাতা।
কোথাও-বা ধীর গতিতে পথ চলা খোলস-বন্দী শামুক।
একটা আমেজহীন দিন,
রাত নিয়ে এলো নিয়মমাফিক।
একটাও হাত ছিল যে চুলের খবর নিবে
কিংবা আঙুলে আঙুল গলিয়ে কয়েক কদম নিরবেই পাড়ি দিবে উদ্দেশ্যহীন।
শেষ সময়ের মতো শেষ হয়ে যাওয়া দিন
এত শান্ত অথচ উত্তাপে ভরপুর চারদিক!
বুঝি বিশুদ্ধ বায়ুর অভাব বড্ড বেশি!
পাহাড়ের গায়ে হাত রেখে যেখানে শীতলতা খোঁজে আগন্তুক,
তার পাশে বসে দুয়েকটা কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছে।
সেইসব নাবিকদের নিয়ে যারা রবিনসন হতে চেয়েছিল কোন এক কালে।
যাদের কম্পাসের গায়ে আঁকা মিথোলজি-পদ্ম।
দিন চলে গেছে মধ্যরাতের কোলে।
একটা করুণ বাঁশির সুর ক্ষণে ক্ষণে বেজে ওঠে।
পাঁজর ছিদ্র করে বেড়িয়ে আসে দীর্ঘশ্বাসে চাপা পড়া কান্না।
নাম না জানা কোনো এক সাদা বালির দ্বীপ,
তারই তীর ঘেঁষে তৈরি ছোট্ট একটা ঘর,
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা পাইন বন।
নুড়ি পাথর কুড়িয়ে জমা করা, বালির ওপর নাম লেখা, ঘর বানানো।
একটা দুইটা নুড়ি কালো পকেটে পাচার করা,
এরপর... এক মাধবীর হাতের মুঠোয় পৌঁছে যাক সেই স্মৃতি।
২
এই বৃহস্পতি বৃহস্পতি প্রেম—
সাদা শার্টের কলার ছুঁয়ে ছুঁয়ে গলে পড়ছে মেঘ।
কোথাও কোথাও গড়িয়ে পড়ছে দিনের মধ্যভাগের মেটে-আলো।
পায়ের তলায় ভেজা মাটি,
মরা পাতার সোঁদা গন্ধ!
আমি বুঝি মাতাল হাওয়া—
কাঁপতে কাঁপতে গড়িয়ে পড়ি কানের পাশে,
আলতো করে ছুঁয়ে ফেলি—
কপাল জুড়ে থেমে থাকা মসৃণ চুল,
নিকোটিনে পোড়া ঠোঁটের শুষ্ক চামড়া,
অথবা
কৌতুহলী সেই দুটো চোখের পাতা—
যাদের ভাষা পড়তে পারি অনায়াসে।
এই বৃহস্পতি বৃহস্পতি প্রেম—
সময় থেমে আছে লোকচক্ষুর অগোচরে।
কথা নেই।
নেই স্থবিরতাও।
কেমন কলকলে শব্দ পাঁজরের জমিনে আছড়ে পড়ে বারবার!
৩
একেক দিন একেক রকম থাকে আকাশের রঙ।
দেখেছি ফিরতি পথে— মেঘেদের চঞ্চলতা,
বাতাসের গতিবেগ আর ছুটে চলা লোমহর্ষক সময়।
ইদানিং ইকবাল রোডে পা রাখলেই মনে হয়
এখন বৃষ্টি শুরু হলে—
আমরা একসাথে ঝিরিঝিরি শব্দ শুনতে পাবো।
একেক দিন একেক রকম লাগে দুঃখের পরিধি।
কামিনী গাছ তলায় যে কুকুর ছানাটি খেলছে, ছোটাছুটি করছে,
তার গায়ের গাঢ় বাদামি রঙ এসে মিশে গেছে আমাদের চায়ের কাপে।
একটা বেপরোয়া শৈশব পেছনে ফেলে আমরা ক্রমশ বার্ধক্যের পেছনে ছুটছি।
যেখানে প্রেম কিংবা মোহের দীনতা ছাড়া আর কিছুই নেই।
একেক দিন একেক রকম সুখ খোঁজে মন, শান্তি চায় মগজ।
কোনোদিন একটা বেলা এমনেই গড়িয়ে যায় ছেলেখেলায়।
কত গল্প, কত শব্দ আর কবিতা এসে ধাক্কা খায় পাঁজরায়।
আমাদের একসাথে দেখা চড়ুই পাখির সোনালী বিকেলকে
বিদায় জানাতে আসে এক পাতা ঝরা নীল সন্ধ্যা।
৪
একটা পিছুটান ভরা দুপুর,
পাতার গা বেয়ে নেমে আসা চনমনে রোদ।
উত্তাপ ছিল না এতটুকু,
ছিল না এতটুকুও অস্বস্তি।
আমি সমস্ত দুপুর জুড়ে শান্ত রইলাম।
হাওয়ার ঝাপটায় চুল ওড়া
একটা সাধারণ বিকেল—
বেহিসাবি দিনের সবটা দুঃখ নিয়ে চলে গেল।
দিয়ে গেল মুঠো ভর্তি গলানো স্মৃতি!
শেষটা কোথায় জানা নেই তবে
শুরুটা এত বেশি নাটকীয় ছিল—
আমি আজও ভাবতে ভাবতে শিহরিত হই।
পিলে চমকে ওঠা এই সন্ধ্যায় পুরোপুরি ভারাক্রান্ত হয় মন।
যে সকালের শুভ্রতা আর সতেজ আলো আমাকে দিনভর ভালো রাখতে পারেনি,
আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।
এমন সকাল রোজ আসে না।
আগে তো কখনো আসেনি।
হয়তো আর আসবেও না এমন করে।
যা কিছু পেয়েছি দু-হাত ভরে,
তার সবটুকু জুড়ে খাটি শোকরানা।
আমি ভুলিনি, ভুলতে পারিনি কোনদিন।
খোদা তো দিয়েছিলেন সহজ করেই।
আমরাই হাতে হাতে করেছি কঠিন।
৫
একরাশ গোমরাহির পথে আটকে আছে মন ও মগজ।
তোমাদের ধোলাইখালপাড় ছুঁয়ে বেড়ে ওঠা ভাটফুল আর বুনো হাঁসেরা
নজরে জিরিয়ে নেয় এবেলার ময়লা রোদে।
তাদেরই ভীড়ে একটু একটু করে হারিয়ে যায় দিনের শেষ প্রহরটুকু।
জিতুকে দেখেছিলে?
তোমাদের সেই হিন্দু পাড়ায়, বৈষ্ণবদের ভীড়ে।
নীল আকাশের নিচে, সবুজ ঘাসের চাদরে পা ছড়িয়ে,উদাস হয়ে ভাবছে -- মালতীকে।
তাকে পড়তে গিয়ে কখনো বা তোমার চোখমুখ মনে পড়ে যায় নির্দ্বিধায়।
তোমার হাওয়ায় ওড়া চুল, বুকপকেটে খুচরা কিছু লজেন্স।
যেন তোমাকে ভাবনায় এনে এমন ছেলেখেলার অধিকার আজও কেউ কেড়ে নিতে পারেনি।
হিরণ্ময়ী-- হিরণ যে জিতুকে জিতে নিলো।
বলিনি তোমায় সে কথা।
তুমি এখন আর কবিতা পড় না।
জানো না কোন কোন কবিতায় তোমাকে সাজিয়েছি নিজের মতো।
এরপর ইকবাল রোডে গেলে তোমাকে মনে পড়বে।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সারা রাস্তায় জলকাঁদা মাখামাখি হয়ে আমি কার কাছে যাবো এবার?
কে বলবে তার সীমিত প্রেমিকাদের সঙ্গ হারিয়ে ফেলার গল্প?
কে শোনাবে কেন দেশে দেশে যুদ্ধ হলে প্রতিবার আমাদের মায়েরা ছেলের কাফনে মোড়ানো নিথর দেহটা দেখে - রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে।
বড় গোমরাহির পথে আটকে আছে ভেতর-বাহির।
আমি হারিয়ে যাব এই ভয়ে কেউ আর ব্যস্ত হবেনা।
মাঠে ময়দানে আবারো আন্দোলন শুরু হবে।
কিন্তু কেউ আর আমাকে শত্রুর নজর থেকে লুকিয়ে রাখবে না।
কেউ বোঝাবে না, কেন আমার উচিত ছিল দলের ভেতরে থাকা,
বৃষ্টি হলে ছাতা গুটিয়ে ভেজা কাপড়ে সারা রাস্তায় খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে শহর না দেখা।
তোমাদের ধোলাইখালপাড়, তোমাদের ছোট্ট বসতবাড়ি, ভাগের জমি আর, ছোট্ট পুকুর।
কোথাও আর যাওয়া হবেনা।
জানা হবে না, কেন তোমার অবর্তমানে বোনেরা সুর করে কাঁদে।
অথচ তাদের পুতুল খেলার বয়সটা ঠিকঠাক ফুরায়নি।
পাঁচটি কবিতা
আরজু আহমেদ
আরজু আহমেদ




সুন্দর
উত্তরমুছুন