০০১
গতরাতে নিশ্চিত হয়েও বাস্তবতা এড়িয়ে গেছি বিশ্বাস না করে! গত মার্চে তোলা ছবিসহ কচি’র মৃত্যু সংবাদের স্ট্যাটাস লিখেও মুছে ফেলেছি ভোরবেলায়। সারাদিন নিজেকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করলাম। শৈশবের স্মৃতি নিয়ে কথোপকথনের সর্বশেষ বন্ধুটাও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলো।
০০২
দিনাজপুরে আব্বার বন্ধুর ছোট ছেলে কচি’র সাথে পরিচয় মুক্তিযুদ্ধের আগে। তারপর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, অবশেষে ১৯৭৮ সালে ক্যাডেট কলেজ থেকে মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে এসে রাজশাহী শহরে যখন বন্ধু খুঁজে বেড়াচ্ছি, তখন আবার কচিকে খুঁজে পাওয়া। দুজনে মিলে লেটারপ্রেসে ছাপা লিটল ম্যাগাজিন কুশল সংলাপ প্রকাশ, ওর উত্তরঙ্গ প্রকাশনী থেকে পত্রিকা, বই প্রকাশে সহয়তা… আরো কত কিছু্। রাজশাহী শহরে প্রথমবারের মতো দর্শনীর বিনিময়ে কবিতা পাঠের আসরের আয়োজন। কচি’র একটা বুদ্ধিভিত্তিক বিশাল জগত থাকলেও আমাদের কথোপকথন ছিল খানিকটা শিশুতোষ, যেন শৈশবে ফিরে দুই বন্ধু গল্প করে যাচ্ছি। সকালে হাঁটাহাঁটির সময় মোটামুটি নিয়মিত কথা হতো কচি’র সাথেই।
০০৩
আমাদের পরিবারের সবার সাথে ওর চমৎকার সম্পর্ক। হাঁটাচলায় কিছুটা অসুবিধা হলেও ঠিকই সে পৌঁছে যেত আমাদের বাড়িতে। এইতো কিছুদিন আগেও রশ্মির সাথে কত গল্পগুজব আড্ডা দুষ্টুমি। একগুচ্ছ বই উপহার। আজ সকালে রশ্মিকে স্কুলে পৌঁছে দেয়ার সময় যখন বললাম, “ইচক আল্লাহর কাছে চলে গেছে! মনটা ভালো নেই।” সে আমার হাতটা ধরে রাখে শক্ত করে।
অন্যরা কচিকে যেভাবেই চিনুক না কেন, মানুষ কচির সাথে নির্মল মুহূর্তগুলো কিংবা এটা সেটা আইডিয়া শেয়ার… যেটা হয়তো অন্যকারো সাথে কখনোই সম্ভব না৷ হঠাৎ প্রচন্ড একটা শূন্যতার মধ্যে ফেলে গেল কচি।
০০৪
কচি একা মানুষ ছিল। কখনোই কোন সম্পর্কে জড়িয়েছে কিনা শেয়ার করেনি। হয়তো ইচ্ছেও করেনি তার৷ কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এতোটা গোছানো মানুষ কম দেখেছি। ১৯৮১-৮২ সালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়ারি প্রকাশ করার আগে যখন হাত পাকানোর জন্য দুটো বই প্রকাশ করল, তখন সেগুলোর প্রচ্ছদ আঁকার সুযোগ দিয়েছিল আমাকে। কিন্তু তার নিজ হাতে বাঁধাই করার দক্ষতা দেখে এতটাই অবাক হয়েছিলাম, যে নিজের অভ্যাসের মধ্যেও প্রভাব আনার চেষ্টা করে গেছি। ওদের পরিবারের জমি-জমার দলিলপত্রগুলো কী যে চমৎকার করে বাঁধাই করে রাখা, সেটাও কখনো দেখিনি আগে। শৈশবের আবেগ বহন করার মতো বন্ধুত্ব বেঁচে থাকা মানে জীবনের জন্য মস্ত বড় আশীর্বাদ।
০০৫
আমার ছোটবেলার বন্ধু কচি শামসুল শামসুল কবীর কচি যে পরবর্তীতে ইচক দুয়েন্দে লেখালেখি শুরু করেছিল, শৈশবের স্মৃতির সব শেষ সুতোটাও ছিঁড়ে গেল গতকাল। গত রবিবার, মানে ১০ই মে দেশে ফিরে বেশ লম্বা সময় কথা হলো কচির সাথে। সে সব সময় বলতো, হাতের কাজ সেরে ফেলো জলদি, সেদিনও বললো। তারপর শরীর স্বাস্থ্য মন সেটা নিয়ে নানাবিধ বিশ্লেষণ, বলছিল এখন কি তার খাদ্য অভ্যাস বদলে ফেলেছে। তারপর… হাসপাতালের খবর... এইতো
শৈশবের আবেগ বহন করার মতো বন্ধুত্ব
এনামুল করিম নির্ঝর
এনামুল করিম নির্ঝর




মন্তব্য