আমার একটা ডাক নাম আছে। খুব কাছের দুই একজন বন্ধু ছাড়া এই নামটির খবর কেউ জানে না তেমন একটা। এই নামটি যিনি রেখেছিলেন তিনি সম্প্রতি পরলোকগত হলেন।
তাঁর মৃত্যুর খবরে ফেসবুক জুড়ে যে হাহাকার দেখলাম, বিশেষ করে যারা সাহিত্যের ছোটোকাগজ বা লিটলম্যাগে নিয়মিত লিখে থাকেন, তাতে এই বোধগম্য হলো যে, পরলোকগত সেই ভদ্রলোক, যিনি বস্তুত ছিলেন একজন প্রথাবিরোধী লেখক কি গভীর তাঁর প্রভাব সাহিত্য তথা সাহিত্যিকদের মাঝে! লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত এমন কাউকে পেলাম না ফেসবুকে, যিনি তাঁর এই প্রয়ানে হাহাকার করেন নি, অন্তত যাঁরা তাঁকে চিনতেন বা জানতেন!
আমি কি তাঁকে চিনতাম বা জানতাম! হয়তো বা চিনতাম, আবার হয়তো চিনতাম না! হেয়ালী মনে হচ্ছে, তাই না! সত্যি কথা বলতে কি মানুষটি নিজেও আমার কাছে একটা এনিগমা সেই কিশোর বয়স থেকে, মৃত্যুতেও তাই থেকে গেলেন!
কতো বছর আগের কথা মনে নেই! বাবার অবসরের পরে আমরা চিটাগং থেকে ফিরে এলাম আমাদের হোম টাউন রাজশাহী শহরের বাসায়। ভর্তি করানো হলো আমাকে কলেজিয়েট স্কুলে, ক্লাস নাইনে। আমাদের বাসা ছিলো শহরের ফায়ার ব্রিগেড মোড়ে।
হোম টাউনের প্রতি মায়া ছিলো না তেমন একটা আমার কারন বাবার চাকারীর কারনে জন্ম, বেড়ে ওঠা স্কুল জীবনের প্রায় ৮টা বছরই আমার পার হয়েছে ঢাকা, খুলনা আর চিটাগং এ। তাই হোম টাউনে ফিরে এলেও রাজশাহী আমার কাছে তখনো এক অচেনা, অজানা শহর। সে অবশ্য অন্য গল্প, সে গল্পে আজ না যাই…
ফায়ার ব্রিগেড মোড়ে রতন মামার চায়ের দোকান ছিলো একটা। এখন আছে কী না জানি না। সন্ধ্যার দিকে সেদিন ঝিরিঝিরি হালকা বৃষ্টি হচ্ছিলো মনে আছে। খুব মৃদু বৃষ্টি যে বৃষ্টিতে শরীর ভেজে না বললেই চলে। মা আমাকে দোকান থেকে সিঙ্গাড়া আনতে পাঠিয়েছেন। আমি রতন মামার দোকানে এলাম সিঙ্গাড়া নিতে। একটু দেরী হচ্ছিলো কারন সিঙ্গাড়া কেবলে ছাড়া হয়েছে গরম কড়াইয়ে। তৈরী হতে একটু সময় লাগবে।
আমি দোকানের একটা টুলে বসে অপেক্ষা করছি। ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাবার কারনে একটা হ্যাচাক বাতি জ্বালানো হয়েছে দোকানের এক কোনে। লোকজনের আনাগোনা তখনো শুরু হয় নি। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, আর দোকানের আলো-আঁধারের খেলায় এক ধরনের পরাবাস্তব পরিবেশ তখন সেখানে। খানিক বাদেই একজন মানুষ এলেন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে কিছুটা ভিজে গিয়েছেন। তাঁকে ঢুকতে দেখে রতন মামা সালাম দিলেন। রুমাল দিয়ে মুখ টা মুছতে মুছতে তিনি এসে বসলেন আমার সামনে রাখা টুলে।
আমি অনেক দিন ধরে খেয়াল করেছি, এই দোকানে প্রতি সন্ধ্যার পর এই ভদ্রলোক আরো ৩/৪ জন মানুষের সাথে আড্ডা দেন নিয়মিত ভাবেই। আগেও ২/৩ বার দূর থেকে কানে এসেছে তাদের কথাবার্তা! কিছু বুঝতে পারতাম না কি নিয়ে আলোচনা করছেন তাঁরা বা আলোচনার মর্মার্থ! শুধু এতোটুকু বুঝতাম যে, এই মানুষগুলো অন্যান্যদের মতো নন। তাঁরা পড়ালেখা করা জ্ঞানী মানুষ। তাদের পৃথিবী আলাদা, জগত আলাদা...
আমার অপার কৌতুহল কাজ করতো ঐ ৩/৪ জনের দলটাকে নিয়ে। কী বলে তাঁরা, কী বিষয়ে আলোচনা করে এগুলো জানতে ভীষণ ইচ্ছে করতো, তবে এটাও বুঝতাম যে তাঁদের আলোচনার বিষয়বস্তু বোঝার মতো বয়স বা জ্ঞান কোনটাই আমার হয়নি তখন। তবুও অদম্য এক উত্তেজনা এবং কৌতুহল কাজ করতো ঐ গ্রুপটাকে দেখলে। কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করতাম কী বলে তাঁরা! ভীষণ শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে কথা বলতেন তাঁরা, আমি আজও এতো সুন্দর এবং সাবলীল বাংলা উচ্চারণে কথা বলতে শুনিনি কাউকে।
গ্রুপের বাকি সদস্যদের একজন ছিলেন নাকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। এই তথ্য জানার পরে কিশোর বয়সের কৌতূহল গেলো আরো বেড়ে! তার মানে সাধারণ কোনো মানুষজন এঁরা না দেখা যাচ্ছে।
এর কিছুদিন পরে আবিষ্কার করলাম, ইংরেজি বিভাগের সেই অধ্যাপকটি মাঝে মাঝে অনেক রাতে আমাদের বাসার সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যান নদীর ধারের দিকে। রিভারভিউ স্কুলের ঐ দিকে, যে সাইডে ডিসি সাহেবের বাংলো আছে। মাঝে মাঝে তাঁর হাতে পলিথিন ব্যাগে মোড়ানো পাউরুটি আর কলা দেখা যায়। তা এতো রাতে উনি কী করেন নদীর ধারে বসে একা একা...! হেঁটেও আসেন বেশ কিছুটা দূরে তাঁর কুমারপাড়ার বাসা থেকে, সেটাও দেড় কিলো হবে অন্তত। অপার কৌতুহল জন্মালো গভীর রাতে একা একা হেঁটে বেড়ানো ইংরেজি সাহিত্যের এই অধ্যাপককে নিয়ে।
কৌতুহল আরো কয়েকগুন বেড়ে গেলো যখন কানে এলো ঐ অধ্যাপক সাহেব নাকি ইংরেজি সাহিত্যে তখনো পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া ব্যাক্তি আর এমফিল, পিএইচডি নাকি করেছেন Oxford থেকে। ওরা নাকি তাঁকে Oxford এ অধ্যাপনার প্রস্তাবও দিয়েছিলো কিন্তু রাজশাহী শহর, আর এখানকার বন্ধুদের আড্ডা মিস করবেন বলে তিনি থাকেন নি ইংল্যান্ডে।
প্রতিদিন এই সমস্ত কিছু না কিছু তথ্য কানে আসে আর উত্তেজনার পারদ বাড়তে থাকে গ্রুপটাকে নিয়ে। ততোদিনে এটা বুঝে গিয়েছি যে এঁরা সাধারন মানুষজন নন, প্রত্যেকেই এঁদের একেকজন স্কলার। তো আমি ইতিমধ্যে সেই ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপকের নিজে থেকে একটা নামও দিয়ে ফেলেছি। লম্বা একহারা শরীরের গড়ন আর গৌড় বর্ণের কারনে আর কিছুটা চেহারাগত সাদৃশ্যের কারনে উনাকে আমার পশ্চিমবঙ্গের অভিনেতা ভিক্টর ব্যানার্জির মতো লাগতো, তাই উনাকে এই নামে মনে মনে ডাকতে শুরু করলাম। আমার এই কৌতুহলের অংশীদার ছিলো আমার কৈশরের এক প্রতিবেশী বন্ধু রনক (এখন রাজশাহী কোর্টের আইনজীবী)। ওর সাথে শেয়ার করতাম বিষয়গুলো।
হয়তো গরমের রাত সাড়ে এগারোটা, ইলেকট্রিসিটি ধুম করে চলে গেলো। আমরা বাসার সামনের রাস্তায় বেরিয়ে আসতাম সবাই। আমাদের বয়সী স্কুলের ছেলে-মেয়েদের কাছে তো ছিলো এ এক সৌভাগ্যর বিষয়। কেউ খেলছে, কেউ আড্ডা দিচ্ছে। রনকদের বাসা পাশেই ছিলো। ও বাসার সামনে এসে আমার নাম ধরে ডাকতেই আমিও বেরিয়ে এসে যোগ দিতাম ওর সাথে। জানি ইলেক্ট্রিসিটি অন্তত এক ঘন্টার আগে আসবে না! এই তো সুযোগ একটু বাসার বাইরে আসার!
সবাই গল্প করা নিয়ে ব্যস্ত, কেউ খেলছে, কেউ আড্ডায় কিন্তু আমি আর রনক হয়তো অন্য কিছুর জন্য অপেক্ষায় আছি, বুকের মধ্যে চাপা উত্তেজনা নিয়ে। রাস্তা ধরে হেঁটে বেড়াচ্ছি আমরা উদ্দেশ্যহীনভাবে। ১০/১৫ মিনিট কেটেছে হয়তো হঠাৎ রনক হ্যাঁচকা টান দিলো আমার হাতে। কানের কাছে আস্তে করে বললো—“ঐ দ্যাখ, ভিক্টর আসছে!” ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালাম দূরের রাস্তার দিকে। ইলেকট্রিসিটি নেই, তবুও আলো-অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে কুমার পাড়ার ঐ দিকের রাস্তা ধরে এক হারা গড়নের, ফর্সা, লম্বা একটা মানুষ এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে হাঁটতে হাটঁতে। কালো প্যান্ট আর অফ হোয়াইট ফুল শার্টের হাত দুটো গোটানে। এই ড্রেসেই প্রায় সময় দেখি লোকটাকে, মানে ভিক্টরকে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ভিক্টর রাস্তা ধরে। যতো কাছে এগিয়ে আসছে আমাদের বুকের ধুপধাপ শব্দ ততো জোড়ালো হচ্ছে। রাস্তার এক কোনে আমরা দুই বন্ধু জড়োসরো হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। চোখ দুটো বেরিয়ে আসবে যেনো উত্তেজনায়! ভিক্টোর এসে গেছে প্রায়! মনে হচ্ছে, তাকে ঘিরে আমাদের এই গোপন কৌতুহল যেনো সে জেনে ফেলেছে কোনো এক অলৌকিক উপায়ে!
আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে ভিক্টোর। পেছন, পেছন একটা ধূসর রঙের কুকুর। এই কুকুর টা কে মাঝে মাঝেই দেখা যায় ভিক্টরের সাথে। ভিক্টরের হাতের পলিথিন ব্যাগে মোড়ানো পাউরুটি আর কলা!
“এতো রাতে কোথায় যায়!”—আমি চাপা গলায় বললাম রনকের কানে কানে! পাছে ভিক্টর আবার শুনে ফেলে, এই ভয়ে!
“ডিসির বাংলোর দিকে!”—রনক জানালো উত্তরে। “রিভার ভিউ স্কুলের সামনে, নদীর বাধের উপরে রাখা বেঞ্চে গিয়ে বসবে এখন!”
“এখন তো প্রায় পৌনে বারোটা বাজে! বাসায় ফেরে কখন তাহলে!”—আমি বললাম!
“রাত দুই টার দিকে!”—রনকের উত্তর।
“বলিস কী! এতো রাতে!”
“হুম!”
“তুই জানলি কী করে রনক, যে রাত দুই টার দিকে ফেরে!”
“আরে বুদ্ধু! আমি পেছন পেছন ফলো করে গেছি না দু দিন!”
“তাই! কবে গিয়েছিলি!”
“গত সপ্তাহে! সাথে তারেকও ছিলো!”
“আচ্ছা, ও করে কী রে রনক বেঞ্চে বসে এতো রাতে, একা একা! ভয় করে না লোকটার! নির্জন, শুনশান ফাঁকা নদীর ধারে বসে থাকে মধ্যরাত অব্দি একা একা!”
“পলিথিনে মোড়া খাবার যে টা দেখলি না হাতে! ওটা কুকুরটাকে খাওয়ায়! তারপর সিগরেট ধরিয়ে ধ্যান করে বেঞ্চে বসে চুপচাপ!” –রনক জানালো।
“কী আশ্চর্য! বলিস কী!”
“হুম! ফায়ার ব্রিগেড মোড়ে যখন আসে তখন পরিচিত ৩/৪ টা ফকির আছে ওর, এদেরকে নিজ হাতে তুলে ভাত খাওয়ায়! খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সামনে বসে থাকে! ওদের এক পীর আছে। ওলি বাবা। তাকে খুব মান্য করে ওদের গ্রুপের সবাই!”
“ওহ আচ্ছা! পীরটাকে দেখাস তো একদিন আমাকে রনক!”
“আচ্ছা দেখাবো! পোস্ট অফিসের পিওনদের মতো খাঁকি কালারের একটা ড্রেস পড়ে থাকে ওদের অলি বাবা! চুপচুপ বসে থাকে সারাদিন। কারো সাথে কথা বলে না। ভিক্টোর সপ্তাহে ২ দিন দুপুরে এসে নিজ হাতে তুলে ভাত খাওয়ায় ওদের অলি বাবাকে রতন মামার দোকানে!”
“তাই! তাহলে দেখতে হবে তো এই সীন! মিস করা যাবে না কি বলিস!”
“আচ্ছা দেখিস! কিন্তু ভুল করেও পীরের চোখের দিকে সরাসরি তাকাবি না!”
“কেনো কি হবে তাকালে!”
“এতো কিছু বলতে পারবো না! যা বললাম তাই করবি! না হলে ক্ষতি হবে তোর!”
রনকের এই উত্তরে আমি একটু চমকে উঠি।
সিঙ্গাড়া ভাজা প্রায় হয়ে গেছে। আমি অপেক্ষা করছি। বাইরে বৃষ্টি সামান্য বেড়েছে মনে হচ্ছে। দোকানের ভেতরের আলো-অন্ধকারের মাঝেই হঠাৎ খেয়াল করলাম সামনে বসে থাকা, চোখে চশমা, কদম ছাঁট চুলের মানুষটি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমার একটু অস্বস্তি লাগতে শুরু করলো। কিন্তু তিনি তাকিয়েই থাকলেন এক দৃষ্টিতে। পলকহীন সেই দৃষ্টির সামনে আমি খুব অসহায় বোধ করছি।
জানিনা, কতো সময় পার হয়েছে। হঠাৎ আমাকে উদ্দেশ্য করে মানুষটি চমৎকার বাংলায় বলে উঠলেন—“খোকা! তোমার নাম কী?”
আমি বললাম! লক্ষ্য করলাম! কাজ করতে করতে রতন মামা মনোযোগ দিয়েছেন আমাদের আলোচনায়!
“খোকা! তোমার চোখের পাতা জুড়ে মহাজাগতিক বিস্ময়! অপার বিপন্নতার ধারাপাত! এই চোখ নিয়ে সবাই জন্মায় না পৃথিবীতে খোকা, তুমি জানো এটা…?”
আমি চুপ করে রইলাম! বুঝতে পারছি না কিছুই তাঁর কথার আগা পাশ তলা! আবার শুরু করলেন তিনি, “আমি তোমার নাম রাখলাম সিদ্ধার্থ! তুমি চেনো তাকে?”
আমি না সূচক মাথা নাড়লাম!
“তিনি একজন নির্বান প্রাপ্ত, আলোকিত মানুষ! মহামতি সিদ্ধার্থ! তাঁর নামে তোমার নাম দিলাম সিদ্ধার্থ!“
সিঙ্গাড়া রেডি হয়ে গেছে। আমি বিল মিটিয়ে গরম সিঙ্গাড়ার প্যাকেট নিয়ে ফিরে এলাম বাসায়! মা কে প্যাকেটা দিয়ে আমি চুপচাপ চলে এলাম আমার দোতলার ঘরসংলগ্ন ছাদে। ছাদের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ভাবতে লাগলাম অদ্ভুত সেই মানুষটির কথা, যিনি আমাকে আজ নতুন এক নামে ডেকেছেন। আমি জানি হয়তো ইতিমধ্যেই উনাদের গ্রুপের অন্য লোকজনও চলে এসেছে রতন মামার দোকানে। শুরু হয়ে গেছে জমজমাট আড্ডা। হয়তো ভিক্টোরও চলে এসেছে আড্ডায় এরই মধ্যে।
আজ প্রায় ২০ বছর পার হয়ে গেছে। সেই আড্ডা এখনো হয় কি না, জানিনা আমি। কিছুই জানি না বস্তুত…
গত কাল শুধু ফেসবুক জানালো, ইচক দুয়েন্দে নামের একজন বিস্ময়কর প্রতিভাধর লেখক গত হয়েছেন তাঁর রাজশাহী শহরের বাসায়! নিজের নামকে উল্টো করে লিখতেন তিনি। ডাক নাম ছিলো কচি। তাকে উল্টো করলে ইচক দুয়েন্দে। একাই থাকতেন রাজশাহী শহরের শিরোইলে তাঁদের বিশাল প্রায় পরিত্যক্ত এক বাসায়! নির্জনতম একটা যাপন ছিলো তাঁর! একাকী, নিভৃত এক যাপন! আর বিস্ময়কর শব্দের পৃথিবী!
একজন মানুষ হারিয়ে গেলেন গতকাল। যিনি বহু বছর আগে পরম মমতায় স্কুল পড়ুয়া এক কিশোরের মাথায় রেখেছিলেন তাঁর করতলের ছোঁয়া আর সেই কিশেরটিকে ডেকেছিলেন সিদ্ধার্থ নামে…
ইচক দুয়েন্দে, আমাদের ভিক্টর…
আশিক মাহমুদ
আশিক মাহমুদ




স্মৃতি আরো স্মৃতি ডেকে আনে। ক্রসচেক না করলে আমার স্মৃতির পাতা ঝালমুড়ি-চানাচুরের ঠোঙা— পরিত্যক্ত খবরের কাগজ। স্মৃতি মোতাবেক উনি মওলাবাবা। ওলিবাবা নন। ইন্তেকালের পর মওলাবাবাকে সমাহিত করা হয় ভদ্রা-জামালপুরে ওলিবাবার দরবার-প্রাঙ্গনে।
উত্তরমুছুনমাদ্রাসার/ফায়ারব্রিগেডের মোড়ে অনেকে বসতেন প্রাচীন ঐ আড্ডায়। ইচক, একেডি, রুহুল প্রামাণিক, বান্না ভাই, বকুল ভাই, পুলকদা, অসিত, কখনও টুকুন ভাইও নিশ্চয়ই স্থানীয় আরো কয়েক জন (নাম মনে পড়ছে না), পরের দিকে রফিক, আমি। ওখানেই রেমনের সাথে আমার পরিচয় হয় এক সন্ধ্যায়।
চায়ের দোকানের পাশে, পেছনের দিকে, কম বয়েসি বটগাছের একটু আড়ালেই বটে, বড়ো ড্রেনের সাথে— সুফি ধারার 'থান' ছিল বসার, ধুপ-ধুনা-আগরবাতি সহযোগে। ওখানে আমার পরিচয় হয় অরুণদার সাথে অন্য এক সন্ধ্যায়। বললেন, শিল্পী আমানের কথায় আমাকে খুঁজছিলেন তিনি। রাস্তার উল্টাপাশে মওলাবাবা শুয়ে-বসে থাকতেন মলিন কাপড়ে। মাদ্রাসার মাঠেও বসা হতো। আগে-পরে হাঁটা ছিল অসীম স্যারের সাথে। জেলখানার দেয়াল ধরে পদ্মার পাড়। হাঁটতে হাঁটতেও কবিতা লেখা যেত: "এটা পদ্মার পাড়— নিঝুম রাত্রে পথ কেটে চলা একেডির সংসার।"
ঐ মোড় ঐ সংসার তো আর নাই। আগুনভরা চুলা নিয়ে স্বচ্ছ হলুদ বাল্বের স্বপ্নবিহবল, অলীক দোকানের মফস্বল উঠে গেছে। একেডি আর আসেন না। পরে আর কেউই না— ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে। নানা কিছুর মধ্য দিয়ে দোকানে-থানে-মাঠে, আরো নানা স্থানে, আমাদের আড্ডাগুলো নাই আর। ঐ রাজশাহীই তো আর নাই। মিশে গেছে উন্নয়নের ধুলায়।