মানুষ জন্ম নিয়েছে তাই মারা যাবে। এইটা এত সাধারণ ও অবধারিত যে আমরা প্রাত্যহিক জীবনে একে উহ্য করে রাখি। তাছাড়া আর কীই বা করার আছে আমাদের?
আছে হয়ত।
ইচক দুয়েন্দে, সরকারি নাম শামসুল কবীর কচি, ইন্তেকাল করেছেন। ১৯৬০-২০২৬। তাঁর বিরচিত লালঘর ও টিয়াদুর এই দুইটি গ্রন্থ আমি সৌভাগ্যবশত হাতে পাই। তবে দূর্ভাগ্যবশত উভয়ের কোনোটাই সমাপ্ত করতে পারি নাই। যে পরিমাণ মনোযোগ দাবি করে, বই দুইটা, তা আমার কাছে ছিল না। কিছুটা কঠিনপাঠ্য বই।
তিনি আমার ভাইদের ভাই ছিলেন। সাক্ষাতে কোনোদিন কথা হয় নি। কিন্তু তাঁর বিষয়ে অনেক শুনেছি। এইরকম সিরিয়াস লিটারারি ক্যারেক্টার আমার খুব পছন্দনীয়। আমি সিরিয়াস মানুষ ভালবাসি। জীবনের পাতলা চামড়া উহু আহু সালামালিকুমগুলিকে যাঁরা ঘষা দিয়ে তুলে ফেলেছেন। এবার দেখা যাচ্ছে কোমল, লাল, স্বচ্ছ পর্দাটুকু। যা দিয়ে জীবনকে রক্ষা করা হয় শুধু। সাজগোজ ভঙচঙ নয়। জাস্ট রক্ষা করা।
ফর্ম মানে সীমা। লিমিট। ভিটগেনস্টাইন বারম্বার এই লিমিট কথাটা ব্যবহার করেছেন। জীবন তার লিমিটের কারণেই জীবন। ফলে তা জীবনের বাড়তি নয়, বরং যমজ। বা যমজের থেকেও কমতি। আপন। ভাষাও সেই একই অর্থে আপন। অথচ কয়টা লোক ভাষাকে আপন ভেবে সেইমতো কাজ করে? খুব কম।
ভাষাকে বেশিরভাগ লেখকেরা ব্যবহার করেন, মধ্যবিত্ত যেইভাবে ব্যাংক থেকে লোন করা টাকা ব্যবহার করে। সুদে আসলে ফেরত দিয়ে মধ্যে থেকে যতটুকু নিজের কাজে লাগানো যায়। এতটুকুই। কোনো অধিকার বোধ করেন না তারা। উল্টাপাল্টা হইলে থানা পুলিশ জেল হাজত। তাই ভয়ে ভয়ে ভাষা ব্যবহার করেন লেখকেরা৷
কিন্তু কিছু লেখক তা করেন না। মনে আছে ছাত্রজীবনে হাংরি আন্দোলনের কবি শৈলেশ্বর ঘোষের একটা কথা ভাল লেগেছিল—“যে ভাষাকে আক্রমণ করে সেই ভাষাকে বাঁচায়”। পরে বুঝেছি হাংরির মধ্যে একটা মর্দে মুমিন যুদ্ধংদেহী ব্যাপার আছে। উনারা আক্রমণ পরাজয় লড়াই ইত্যাদি কথা না বললে ভাত হজম করতে পারেন না। ফলে বারবার এইসব সামরিক কথা না বলেও যে ভাষাকে আপন করা যায়, এমন লেখকদের আমি পড়তে চেয়েছি পরবর্তীকালে। যারা সামরিকতার মর্মোদ্ধারে নিবিড় হয়ে গেছেন। মানুষ কোথায় কখন আঘাত ও আনন্দ পেয়েছে, তার খবর নিতে যেয়ে এমন এক সাংবাদিকতার আরম্ভ করেছেন যার পৃথিবীজোড়া সমিলতা আছে। শ্রেণীতে শ্রেণীতে, ধর্মে বিধর্মে, জাত ও অজাতের মধ্যে যার বার্তা অব্যবসায়িক অথচ লাভজনক।
টিয়া ও বাদুড়ের মিলনাত্মক সংগ্রাম অনেকটা এইরকমই। আমি টিয়াদুর শেষ করব। এর সার্থকতা বিচারের থেকে সহজ ও সামান্য আমার অভিপ্রায়। শিশুশিক্ষায় দেশ ভরে উঠেছে। মতামত ব্যক্ত করাকেই এখন লেখা হিসাবে চিনতেছে মানুষ। তবে সেই পরিচয়েও লাভ হচ্ছে না। আরো মজা দাও মজা দাও বলে চীৎকার করতে থাকা গর্তহীন পাঠকপাঠিকাদের চোখেও অশ্রুজল। দেশে দেশে যুদ্ধ হচ্ছে। মুখে হাসি বুকে বল। তবু এর কিছুই যখন জগতের প্রবলতা ও মৃদুতাকে জীবনমুখী করে তুলতে পারল না, হয় টাকা নয় খ্যাতির চাপে, শুধুই লোকের আশা পুরাইতে, ভয়ে ভয়ে, বা লোভে উন্মাদ হয়ে, ভাজা কইমাছের ঝাঁক ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টিপরবর্তী ‘এইবার কী করবো’ ‘এইবার কী করবো’ ‘এইবার কী করবো’–
তালগাছে গিয়া উঠব কি?
কীভাবে উঠবা, তুমি তো মরা, তোমার বন্ধুরা মরা, তোমাদের অন্তস্থল ফ্রায়েড চিকেন হয়ে গেছে।
সেই তুলনায় ইচক দুয়েন্দেকে জ্যাতা মনে হচ্ছে। তার ভুতূড়ে জাহাজে কত ফুল ফল, বিষুবরেখার গায়ে আলো ঝলমল, ছেলেগুলা মেয়েগুলা, ওরা মিলনপ্রত্যাশী, ওরা হাসিমুখে ভালবেসে নিতে পারে ফাঁসি।
জয়গুরু। লালঘর, টিয়াদুর, এবং একটি ইংরেজি বই, নামটা মনে আসলো না, সেগুলির লেখক ইচক দুয়েন্দের জয় হোক।
মৃত্যু তো হবেই।
১৭-০৫-২৬
ইচক দুয়েন্দে: সিরিয়াস লিটারারি ক্যারেক্টারের বিদায়
মনজুরুল আহসান ওলী
মনজুরুল আহসান ওলী




মন্তব্য