কার্ল মার্কস। জন্মেছিলেন জার্মানীতে ৫ মে ১৮১৮ সালে - আজ থেকে দুইশত বছরেরও বেশি আগে। কিন্তু চিন্তা ও কর্মের দ্বারা তিনি হয়েছেন সারা দুনিয়ার। তার অবদান গোটা বিশ্বকে আজো প্রভাবিত করে চলেছে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রথম রচনায় মার্কস লিখেছিলেন: মানব জাতির কল্যাণ সাধন এবং নিজেদের চরম উৎকর্ষ অর্জন পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ দুটোই আমাদের অবশ্যম্ভাবী ও মুখ্য পথ নির্দেশক হওয়া উচিৎ।
তরুণ বয়সে মার্কস ছিলেন প্রচণ্ড আবেগে ভরপুর রোমান্টিক প্রেমিক। সাহিত্য রচনাও করেছিলেন কিছুদিন। বিশ্ব সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাবলীর গভীর অনুরাগী পাঠক ছিলেন। শিশুদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেন এবং সুযোগ পেলেই তাদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শাস্ত্রে উচ্চ শিক্ষার পাঠ সমাপ্ত করে পরে দর্শন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। মানবতাবাদী সাংবাদিক, দার্শনিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চারপাশের সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশা এবং তার বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াই মার্কসকে ব্যাকুল করে তোলে। তাই তিনি মেহনতী মানুষের দারিদ্র্য-দুর্দশা-বঞ্চনার মূল কারণ ও তার প্রতিকারে গভীর চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। অর্ধ শতাব্দী ধরে নিয়োজিত হন ন্যায় ভিত্তিক উন্নত মানবিক সমাজ নির্মাণের পথ খোঁজার কঠিন সাধনায়। এভাবে তিনি আবিস্কার করেন সমাজ বিকাশের নিয়ম যা এতদিন নানা ভুল ধ্যান-ধারণার তলে চাপা পড়েছিল। তার এই যুগান্তকারী অবদান আজ বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত। উল্লেখ্য যে মার্কসের এই তত্ত্ব জ্ঞান কেবল আপ্ত বাক্য নয়, বরং তা হল কর্মের দিক দর্শন। আর এর সার কথা হচ্ছে: এ যাবৎ দার্শনিকরা জগৎকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, এখন দরকার একে বদলানো। মেহনতী মানুষের কোনো দেশ নেই। কেবল শৃঙ্খল ছাড়া সর্বহারার হারাবার কিছু নেই, জয় করবার আছে গোটা বিশ্ব।
তবে এ কাজটি মোটেই সহজ সরল ছিল না। কেননা মার্কসের তত্ত্ব-জ্ঞান ও কর্মতৎপরতা পক্ষ নেয় মেহনতী মানুষের। তাই তিনি তাদের আপন জন, তাদের মুক্তির দিশারী। কিন্তু শোষক-শাসক-ধনী-মালিক শ্রেণিগুলির কাছে তিনি ভয়ংকর শত্রু। ফলে দেশ থেকে দেশান্তরে মার্কসকে বারবার বিতাড়িত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চলেছে। বেশ কয়েকবার তার ভূয়া মৃত্যু সংবাদ প্রচার করেছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা। চরম দারিদ্র্যে তার দিন কেটেছে। অনাহারে ও বিনা চিকিৎসায় তার ৪ সন্তানের মৃত্যু ঘটেছে। তবুও মার্কস মাথানত করেননি। অন্যায়-অবিচারে ভরা অমানবিক পুঁজিবাদী সমাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। অর্ধ শতাব্দী ধরে একটানা কঠোর ও অক্লান্ত পরিশ্রমে নির্মাণ করেছেন সমাজ বদল এবং মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জ্ঞান-বিজ্ঞান। পুঁজিবাদকে পরাজিত করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জ্ঞান-বিজ্ঞান তুলে ধরেছেন মেহনতী মানুষের সামনে। কেবল তত্ত্ব চর্চা নয়, সেই তত্ত্বের ভিত্তিতে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন সংগঠিত করেছেন। দেশে দেশে পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমের লড়াইকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য গড়ে তুলেছেন শ্রমজীবী জনগণের আন্তর্জাতিক সমিতি।
মানবজীবন ও সমাজ সভ্যতার এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে মার্কসের জ্ঞান আলো ফেলেনি। জ্ঞান জগতের সকল ক্ষেত্রে ছিল তাঁর সহজ বিচরণ। ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস, সমাজবিদ্যা, মনস্তত্ত্ব, গণিত, রাজনীতি, অর্থনীতি সর্বত্র মার্কসের প্রভাব আজো লক্ষণীয়। আর এই মানবীয় কর্মযজ্ঞ তিনি সম্পন্ন করেছেন মানুষের এ যাবৎ কাল ধরে অর্জিত তাবৎ জ্ঞানসৌধের উপর দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক বিশ্ব জনমত জরিপে তাই দেখা যায় মার্কস চিহ্নিত হয়েছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ মানুষ রূপে। তাঁর কর্মকাণ্ডের অনেক বিরোধী থাকলেও, ব্যক্তিগত কোনো শত্রু ছিল না।
সারা দুনিয়ার সকল মহৎ ও প্রণতিশীল চিন্তা ও কর্ম মার্কসের কাছে ঋণী। আজো তার প্রদর্শিত পথ ধরে বহুমুখী ধারায় মানবিক সমাজ গড়ার সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।
কার্ল মার্কসের চিন্তা, সংগ্রাম ও উত্তরাধিকার
শাহীন রহমান
শাহীন রহমান




আহারে, কতোদিন পর শাহীন ভাইয়ের নামটা দেখলাম। লেখাটি খুব টুদিপয়েন্ট হয়েছে শাহীন ভাই। আপনি কেমন আছেন? নির্জন।
উত্তরমুছুন