• আপনি আপনার দেশে কেমন সরকার দেখতে পছন্দ করবেন?•• যেই সরকার গরিব লোকদের খুশি রাখতে পারবে। শুধু ভাবেন একবার কী চমৎকার হবে ব্যাপারটা!
(মার্কেস যেমন কলম্বিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ও উদ্যাপিত লেখক, তেমনি ছিলেন একজন কমিটেড লেফটিস্ট। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার রাজনীতি, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে তাঁর ছিল সক্রিয় অবস্থান।
এই সাক্ষাৎকারটি নিউ লেফট রিভিউ-এর মার্চ–এপ্রিল ১৯৮৩ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এতে মার্কেস কথা বলেছেন নিজের রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ, কিউবান বিপ্লব, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা এবং লাতিন আমেরিকার নিজস্ব বাস্তবতা থেকে সমাজতন্ত্রের পথ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। সমাজতন্ত্রের কোনো একক ছক অনুসরণের বদলে নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বিকল্প খোঁজার যে তাগিদ এখানে উঠে এসেছে, তা আজও গুরুত্বপূর্ণ। বাঙলায় অনুবাদ করেছেন মুসাব্বির আহমেদ হিমেল।)
ইন্টারভিউয়ার: আমরা কি এই বিষয়টা নিয়া আলাপ করতে পারি যে কীভাবে আপনার রাজনৈতিক ধারণা ডেভেলপ হইছে? আপনার বাবা তো কনজার্ভেটিভ ছিলেন। ১৮১৯ সালে স্পেন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর প্রায় এক শতক ধরে কলম্বিয়া লাগাতার গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। দুইরকম পলিটিক্যাল পার্টি ১৮৪০ এর দশকে গইড়া উঠতে পারসে: কনজার্ভেটিভরা যাদের চিন্তায় ছিল ফ্যামিলি, চার্চ, স্টেট, আর ছিল লিবারেলরা যারা মুক্ত চিন্তা টিন্তা করতো, এন্টি ক্লেরিকাল আর অর্থনৈতিকভাবে লিবারেল।
১৮৯৯-১৯০২ পর্যন্ত সবচে বাজে রক্তাক্ত যুদ্ধ, “ওয়ার অফ দা থাউজ্যান্ড ডেইস” এই দুইপার্টির মধ্যে চলায় কলম্বিয়া জাস্ট ব্যাংকরাপ্ট আর বিধ্বস্ত হয়ে গেল। কলম্বিয়াতে আমরা তো এই আলাপই দেই যে তুমি কনজার্ভেটিভ নাকি লিবারেল ডিপেন্ড করে তোমার বাপ কী ছিল তার উপর। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে তো মনে হয়না সেইরকম কিছু ঘটছিল, কারণ আপনি বেশ ইয়াং এইজেই লেফট রাজনীতিতে জড়ায় পড়েন। এই পলিটিক্যাল স্ট্যান্স কি আপনার পরিবারের বিপক্ষে একটা প্রতিক্রিয়া ছিল?
মার্কেস: ব্যাপারটা তো আসলে এমন না, আপনি তো জানেন যে, আমার বাপ কনজার্ভেটিভ হইলেও আমার কর্নেল দাদা ছিলেন লিবারেল। আমার রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনাগুলা সম্ভবত তার থেকেই আসছে, সে আমারে ছোটকালে রাজাবাদশা আর রূপকথার গল্প না শোনায়ে লাস্ট গৃহযুদ্ধের বিভৎস বর্ণনা, সেইখানে কীভাবে মুক্ত চিন্তক আর এন্টি ক্লেরিক্সরা কনজার্ভেটিভ গভমেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেছে সেইসব বলতো। আমি যে বছর জন্মাই, তখন আরাকাতাকায় যে ম্যাসাকারটা হয় বানানা ওয়ার্কারদের সেইটা নিয়াও দাদা আমারে বলেছিলেন। আপনি বুঝতে পারছেন হয়তো যে আমার ফ্যামিলি কেমনে আমারে আগে থেকেই দ্রোহের দিকে ঠেলে দিছে র্যাদার সমাজ প্রতিষ্ঠিত হুকুম তালিমের থেকে।
ইন্টারভিউয়ার: আপনার কি মনে আছে কবে, কীভাবে আপনার পয়লা রাজনৈতিক টেক্সট পড়া হয়?
মার্কেস: আমার সেকেন্ডারি স্কুল ছিল জিপাকিরায়। তো সেইখানের ম্যাক্সিমাম টিচাররাই আবার ত্রিশের দশকের লেফটিস্ট প্রেসিডেন্ট লোপেজের আন্ডারে যে টিচার্স ট্রেইনিং কলেজ ছিল ঐ জায়গার মার্ক্সিস্টদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। আলজেব্রা টিচার দেখা যেত ব্রেকের মাঝে আমাদের সাথে হিস্টোরিকাল ম্যাটেরিয়ালিজম নিয়া আলাপ করতে বসে গেছেন, কেমিস্ট্রি টিচার আমাদের লেনিনের বইপুস্তক ধার দিতেন আর হিস্ট্রির টিচার শ্রেণি সংগ্রামের আলাপ করতো। এই জায়গা ছাড়ার পর আমি উত্তর দক্ষিণ বুঝতাম না, কিন্তু দুইটা জিনিস বিশ্বাস করতাম। প্রথমত- ভালো উপন্যাস হইতেসে বাস্তবের পয়েটিক রূপ, দ্বিতীয়ত- এই যে মানবজাতির ভবিষ্যৎ সেইটা আসলে সমাজতন্ত্রে।
ইন্টারভিউয়ার: আপনি কি কোনোকালে কম্যুনিস্ট পার্টিতে ছিলেন?
মার্কেস: আমি আমার টুয়েন্টিজে কিছু কম্যুনিস্টদের সাথে ছিলাম, কিন্তু আমি আসলে সংগ্রামী না বরং সিম্পেথাইজার ছিলাম। তখন থেকেই কম্যুনিস্ট পার্টির আর আমার মাঝে অনেক কিছুই ঘটেছে। তাদের সাথে প্রায়ই আমার ঝগড়া বিবাদ লাগতো। দেখা যেতো আমি কিছু একটা বললাম সেইটা তাদের পছন্দসই হলো না। তাদের নিউজপেপার গুলা আমার পিছে লেগেই থাকতো। কিন্তু আমি কখনো, কোনো দুর্দিনেও তাদের নিন্দা করিনাই।
ইন্টারভিউয়ার: আপনি আর আমি ১৯৫৭ এর দিকে ইস্ট জার্মানিতে ঘুরেছিলাম। আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও সেইখানে যা দেখেছিলাম তা আমাদের পছন্দ হয়নাই। এই ট্রিপটার পর কি আপনার রাজনৈতিক বিশ্বাসে কোনো পরিবর্তন আসছে?
মার্কেস: ট্রিপটার পর আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসে কিছু স্পষ্টতা আসছে অবশ্য। তখন এই ট্রিপটা নিয়া আমার ইম্প্রেশন রেকর্ড করে সেইটার একটা আর্টিকেল সিরিজ বোগোতার একটা ম্যাগাজিনের জন্যে করছিলাম। সেই আর্টিকেলগুলা পাইরেটেড করে কিছু কিছু ছাপা হলো বিশ বছর পর- কিন্তু এইসব মনে হয় না কোনো সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য ছিল। বরং আমার নিজের রাজনৈতিক ডেভেলপমেন্টের মধ্যে যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান তা দেখানোই এর উদ্দেশ্য ছিল।
ইন্টারভিউয়ার: সেইখানে কেমন কন্ট্রাডিকশন দেখা গেছে?
মার্কেস: না, তেমন কিছু না। আমি বইটা লিগ্যালই রাখছি, আর আমার কম্পলিট কাজগুলা নিয়া যেই বইটা বের হইছে সেইটা তো কলাম্বিয়ার প্রতি রাস্তার মোড়ে বিক্রি হয়। আমি একটা অক্ষরও বদলাই নাই। আমার মনে হয় বর্তমান পোলিশ ক্রাইসিসের সূত্রপাতের ব্যাখ্যা সেই আর্টিকেলগুলায় আছে যেইটারে তখনকার গোঁড়া লোকেরা বলছিল আমেরিকার টাকা খাওয়া কাজ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই গোঁড়ামির ধারণা গুলা আজ ২৪ টা বছর পর, বুর্জোয়া রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টের কমফোর্টেবল আর্মচেয়ারে চেপে বসছে আর ইতিহাস এইখানেই আমারে সঠিক প্রমাণ করে।
ইন্টারভিউয়ার: আপনি তাহলে জনগণের জন্য সো কল্ড গণতন্ত্ররে কীভাবে দেখেন?
মার্কেস: ঐ আর্টিকেলগুলার মেইন আলাপই ছিল জনগণের গণতন্ত্র ব্যাপারটা তো আসলে সোশ্যালিস্ট না আর যেভাবে চলছে সেইটা কোনোভাবেই সোশ্যালিস্ট হতেও পারবেনা, কারণ সিস্টেমটা কখনো বুঝতেই পারেনাই যে একেক দেশে পরিবেশের ভিন্নতার বিচারে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা দেখা যায়। লোকাল কম্যুনিস্ট পার্টিগুলা সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো হতে চাইছিল, এইটা না বুঝেই যে সোভিয়েত মডেল তো আর সবখানে স্যুট করবেনা।
ইন্টারভিউয়ার: আমরা একসাথে যে কিউবান নয়া এজেন্সি, প্রেনসা লাতিনা তে ছিলাম পরে তো দুইজনই রিজাইন করলাম যখন কিউবান কম্যুনিস্ট পার্টি বিপ্লবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গুলা নিজেদের দখলে নেয়া শুরু করলো। আপনার কী লাগে, আমাদের ডিসিশন ঠিক ছিল? নাকি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার একটা সাময়িক ধাক্কা ছিল যেইটা আমরা বুঝে উঠতে পারিনি?
মার্কেস: প্রেনসা লাতিনা ছাড়ার ডিসিশনটা আমাদের ঠিকই ছিল। আমাদের ভাবনাচিন্তা নিয়া ঐখানে থেকে গেলে পরে দেখা যেতো প্রতিবিপ্লবী, সাম্রাজ্যবাদী দালাল এইসব ট্যাগ আমাদের দেয়া হতো আর ডগমাটিস্টরা আমাদের পিছে পড়েই থাকতো। আপনি সেই সময়টা খেয়াল করলেই বুঝবেন, নিজেরে সাইডলাইন থেকে সরানোর চেষ্টাই করছি আমি। কিউবান বিপ্লবটা খুব কাছ থেকে কেয়ারফুলিই দেখার চেষ্টা করেছি যখন আমার বই আর ফিল্মস্ট্রিপ রেডি করতেছিলাম মেক্সিকোতে।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো যে রেভ্যুলশন কখনো কঠোর, কখনো বা এতে কন্ট্রাডিক্টও থাকে একেক ঘাত প্রতিঘাতে, তবুও এইটা এমন এক সোশ্যাল অর্ডার যেইটা আরো গণতান্ত্রিক উপায়ে আর একই সাথে আমাদের নিডগুলারে ঠিকমতো ডিল করতে সক্ষম।
ইন্টারভিউয়ার: আপনি এই ব্যাপারে ঠিক কতটুকু সিউর? সেম কজ গুলাই কী একই প্রভাব তৈয়ার করে না? কিউবা যদি সোভিয়েত সিস্টেমটারে একটা নমুনা হিসাবে এডপ্ট করে ( ওয়ান পার্টি স্টেইট, ডেমোক্রেটিক সেন্ট্রালিজম, সরকার নিয়ন্ত্রিত ইউনিয়ন, নিরাপত্তা অর্গানাইজেশন গুলার সিভিলিয়ানদের উপর এক ধরণের কর্তৃত্ব চর্চা) এইখানে তো জাস্ট ডেমোক্রেসির অর্ডারগুলা অর্জন করাও সোভিয়েতের মতোই কঠিন হবে। আপনি এইসব নিয়া চিন্তিত না?
মার্কেস: এই ব্যাখ্যার ত্রুটি হচ্ছে শুরুর পয়েন্টেই। আপনি আলাপটা শুরুই করছেন কিউবা হচ্ছে সোভিয়েত স্যাটেলাইট এই প্রেক্ষাপটে আর আমি সেইটা বিশ্বাস করিনা। আমার মনে হয় কিউবান বিপ্লব বিশটা বছর যাবৎ স্টেট অফ ইমার্জেন্সিতে ছিল আর এইজন্য আমেরিকার বৈরীভাব আর বুঝার অদক্ষতার একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য, আমেরিকা তো এম্নেও ফ্লোরিডার থেকে মাত্র নব্বই মাইল দূরে বিকল্প কোনো সরকারি সিস্টেম মেনে নিতো না।
এইখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের কোনো দোষ আসলে নাই, (মূলত যেটা মোটিভ বা উদ্দেশ্যগত দিক দিয়ে) সোভিয়েতের আনুকূল্য ছাড়া কিউবান বিপ্লবের দেখা পাওয়া আজকের দিনে কঠিনই ছিল। যখন বৈরিতা চলতে থাকে তখন কিউবার অবস্থা কেবল রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা হিসাবেই দেখা যেতে পারে যেখানে আত্মরক্ষাই মুখ্য ছিল। এর বাইরে ইতিহাস, ভৌগোলিক কিংবা সাংস্কৃতিক ইন্টারেস্ট থাকতে পারে। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হলে তখন এইসব নিয়া আবার কথা বলা সম্ভব।
ইন্টারভিউয়ার: ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৬৮ সালে চেকস্লোভাকিয়াতে সোভিয়েত হস্তক্ষেপে সমর্থন দিয়েছিলেন। (কিছু রিজার্ভেশন ছাড়া এইটা সত্য) আপনি এতে কোন পক্ষে ছিলেন?
মার্কেস: আমি তখন পাবলিক প্রোটেস্ট তৈরি করেছিলাম আর আবারো যদি এমন পরিস্থিতি দেখা যায় আমি এইটাই করবো। আমার এবং কাস্ত্রোর পজিশনে পার্থক্য ছিল এই যে সে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ সমর্থন করেছিলেন আর আমি সমর্থন করিনাই। যাইহোক, প্রজাতন্ত্রের জনগণের পরিস্থিতি ব্যাখায় সে যেই বক্তব্য দিয়েছিলেন সেইটা আমাদের এই বিষয়ে আলাপ নিয়া আমার যে আর্টিকেল তার তুলনায় বেশ ক্রিটিকাল আর জোরপূর্বক ছিল। কোনোভাবেই লাতিন আমেরিকার ভবিষ্যৎ হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড কিংবা চেকোস্লোভাকিয়াতে গড়ে উঠবে না, বরঙ এইটা লাতিন আমেরিকাতেই নির্ধারিত হবে। এর বাইরে বাকি চিন্তা ভাবনা আসলে ইউরোপীয় অবসেশন, আর আপনার কিছু রাজনৈতিক প্রশ্নও এই অবসেশনে আটকা পড়ে গেছে।
ইন্টারভিউয়ার: সত্তরের দশকে কিউবান কবি হেবের্তো পাদিল্লার বিখ্যাত আত্ম সমালোচনার পর, তাকে সিকিউরিটি পুলিশ বন্দী করেছিল তার লেখার রাজনৈতিক ধারণার সন্দেহে, একমাস বাদে পাবলিকলি প্রতি বিপ্লবী প্রবণতা স্বীকার করার পর তাকে ছাড়া হয়েছিল। ইউরোপীয় আর লাতিন আমেরিকার বুদ্ধিজীবীরা এইটা নিয়ে প্রচুর সমালোচনাও করেছিল সেই সময়ে। এই পুরা ব্যাপারটাকে তখন লেখকদের আর বিপ্লবের মধ্যেকার কীরূপ অবস্থা তখন ছিল সেই হিসাবে দেখা হয়- একইসাথে একে গোপন স্টালিনিজমের উত্থান ভাবা হয় নয়তো বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীগণ বিপ্লব থেকে নিজেকে দূরে রেখে নিজ কর্তব্যের সাথে যেই প্রতারণা করেছিলেন তার প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। আপনার কিছু বন্ধু, এমনকি আমিও নিজেকে কিউবান রেজিম থেকে দূরে রেখেছিলাম।
আপনি সেইটা করেন নাই। আপনি আমাদের প্রতিবাদের যেই টেলিগ্রাম পাঠানো হয়েছিল আপনাকে সেখানে সই করেন নাই। আপনি কিউবাতে যেয়ে ফিদেলের বন্ধু হয়েছিলেন সেই সময়ে, ঠিক কী কারণে আপনি সেই কিউবান রেজিমের অনূকূল অবস্থান নিয়েছিলেন?
মার্কেস: আমার কাছে বেটার তথ্য ছিল আসলে কী ঘটছিল সেই সময়টায়। আর পরিপক্ব রাজনৈতিক বোঝাপড়ার কারণে আমার পক্ষে তখন ধীর স্থির, মানবিক বোঝাপড়া থেকে পরিস্থিতি দেখার সু্যোগ ছিল।
ইন্টারভিউয়ার: আপনি বাদেও লাতিন আমেরিকার অনেক সেরা সেরা রাইটাররা সোশ্যালিজমের (মার্কিস্ট- লেনিনিস্ট) কথা বলে ডিজায়ারেবল বিকল্প হিসাবে। আপনার কী মনে হয় না যে এইটা সামহাউ “ওল্ড ফ্যাশনড” সমাজতন্ত্র? সমাজতন্ত্রকে তো এখন আর কোনো উদার আদর্শ হিসাবে ভাবা হয়না, বরঙ এইটা একটা আকর্ষণহীন বাস্তবতা হয়ে গেছে। পোল্যান্ডে যা ঘটলো এরপর কী আপনি বলতে পারবেন, বা কেউই কী বিশ্বাস করবে যে শ্রমিক শ্রেণিরা এইসব দেশে ক্ষমতায় আছে?
আপনি কী কোনো তৃতীয় অপশন দেখেন আমাদের মহাদেশের পতনশীল পুঁজিবাদ আর পতনশীল সমাজতন্ত্রের বাইরে?
মার্কেস: আমি কোনো তৃতীয় অপশনে ভরসা রাখি না। আমি মনে করি অনেক রকমেরই বিকল্প আছে- আমাদের আমেরিকাতে যতগুলা দেশ আছে ততগুলাই বিকল্প আছে। আমি এইটা মানি যে আমাদের সল্যুশন আমাদের নিজেদেরকেই বের করা লাগবে। আমাদের যেইখান থেকেই পারি নিজেদের সুবিধাটা বের করতে হবে সেটা যেভাবেই হোক, এইটা অন্য মহাদেশের লোকেরা তাদের দীর্ঘ অশান্ত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে অর্জন করছে, কিন্তু আমাদের উচিত হবেনা তাদের অনুসরণ করা যেইটা আমরা এখন অব্ধি করছি। এইভাবেই আমরা নিজেরা নিজেদের জন্য যেই সমাজতন্ত্রের ধারা দরকার সেইটার দিকে পৌঁছাতে পারবো।
ইন্টারভিউয়ার: অন্য অপশন প্রসঙ্গে, মিট্টেরেন্ডের সরকার লাতিন আমেরিকায় কেমন ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন?
মার্কেস: রিসেন্টলি মেক্সিকোতে এক লাঞ্চে, প্রেসিডেন্ট মিট্টেরেন্ড কিছু লেখকদের জিজ্ঞেস করছিল যে, আপনারা ফ্রান্স থেকে কী আশা করেন? সবার আলোচনা এমন আলাপের সূত্রপাত করলো যে কার অন্যতম শত্রু আসলে কে। টেবিলে থাকা ইউরোপীয়রা আমেরিকাকে তাদের প্রধান শত্রু হিসাবে বললো যে তারা স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করে আমেরিকানরা নতুন ইয়াল্টা স্টাইলে বিশ্বকে ভাগ করতে চাচ্ছে। আমি প্রেসিডেন্টের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম ( আপনি এখন যেই প্রশ্নটা করছেন সেইটাই) আমাদের প্রত্যেকেরই যেহেতু নিজেদের শত্রু রয়েছে, লাতিন আমেরিকাতে আমাদের প্রয়োজন মিত্র। সমাজতান্ত্রিক ফ্রান্স আমাদের সেই মিত্র হতে পারে।
ইন্টারভিউয়ার: আপনার কী মনে হয় উন্নত ক্যাপিটালিস্ট দেশে গণতন্ত্র যেম্নে কাজ করে সেইভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলায় কাজ করবে?
মার্কেস: গণতন্ত্র উন্নত দেশগুলাতে তাদের নিজেদের উন্নয়নের একটা পণ্য কিন্তু অন্য কোথাও ব্যাপারটা সেরকম না। লাতিন আমেরিকার কোনো দেশে এই অবস্থা চালু করার চেষ্টা বেশ হাস্যকর আর অবাস্তবই হবে যেমনটা সোভিয়েত সিস্টেম চালু করার সময় ঘটেছিল।
ইন্টারভিউয়ার: তার অর্থ এই যে আপনি গণতন্ত্রকে একটা বিলাসিতা হিসাবে চিন্তা করেন ধনী দেশগুলার জন্যে? এইটা নিশ্চয় আপনার মনে আছে গণতন্ত্র মানবাধিকারের ঢাল হিসাবে কাজ করে যার জন্য আপনি লড়াই করছেন…
মার্কেস: আমি গণতন্ত্রের আদর্শ না, গণতন্ত্রের ধরন নিয়া আলাপ করছি।
ইন্টারভিউয়ার: প্রসঙ্গক্রমে জিজ্ঞেস করি, আপনার মানবাধিকার নিয়ে লম্বা সময়ের লড়াইয়ের পরিণতি সফলতা বা ব্যর্থতা হিসাবে কেমন?
মার্কেস: এইটা মাপা তো কঠিন। মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করায় কোনো প্রিসাইজ তৎক্ষনাৎ ফলাফল বলে তো কিছু নাই। এইসব তখনই ঘটে যখন আপনি আশা করছেন না, আর বহুবিধ কারণেই কোনো নির্দিষ্ট কাজের কী অবস্থা সেইটা মাপা অসম্ভব প্রায়। আমার মতো বিখ্যাত লেখকের জন্য এইটা নম্রতার একটা শিক্ষা।
ইন্টারভিউয়ার: আপনার কোন সিদ্ধান্ত নেয়াটা আপনারে তৃপ্ত করে?
মার্কেস: নিকারাগুয়াতে সান্দিনিস্তাদের উত্থানের আগে যেই সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছিলাম তখন সেইটা আমারে তৃপ্ত করে। থমাস বোর্হে, যে এখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে সমোজার উপর প্রেসার দেয়ার একটা উপায় বের করতে বলছিলেন যাতে তার স্ত্রী আর সাত বছরের কন্যাসন্তান কলাম্বিয়ান এম্বাসি ছেড়ে মানাগুয়াতে যেতে পারে যেখানে তারা এসাইলেম চেয়েছিলেন। তখন যেই স্বৈরাচার ছিল সে এই ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। কারণ থমাস বোর্হে সান্দানিস্তা ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের শেষ বেঁচে থাকা পরিবার।
বোর্হে আর আমি এই সমস্যাটা নিয়া অনেকক্ষণ চিন্তা করে একটা বিষয় বের করলাম যে: ছোট মেয়েটার একসময় কিডনিতে ইনফেকশন ছিল। আমরা একজন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম যে বর্তমান অবস্থা কীভাবে তার স্বাস্থ্যর উপর প্রভাব রাখবে। এই প্রশ্নে তার জবাব সেইসব যুক্তি খুঁজে দিয়েছিল, যা আমাদের দরকার ছিল। ৪৮ ঘন্টারও কম সময়ে মা আর কন্যাসন্তান মেক্সিকোতে চলে যেতে পারছিলেন। যেই মানবিক কারণে বিষয়টা মঞ্জুর করা হয়েছিল সেটার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
একইসাথে, যেই ব্যাপারটা আমারে বেশ বিরক্ত করে এল সালভাদরের গেরিলাদের ১৯৭৯ সালে অপহরণ করা দুইজন ইংরেজ ব্যাংকারকে ছাড়াতে আমি সহায়তা করেছিলাম। তারা ছিল আয়ান মাসি আর মাইকেল শাটার্টন, দুই পার্টির মধ্যে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা ছিল।
জেনারেল টরিজো আমারে ফোন করেছিলেন অপহরণ করা লোকেদের পরিবারের পক্ষ থেকে আর বলছিলেন যে আমি এই ব্যাপারে কিছু করতে পারি কিনা। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে গেরিলাদের যে তথ্য আসতো আমি সেইটার উপর ভরসা করেছিলাম। আমি মুক্তিপণ নিয়া আলোচনার ব্যবস্থা করবো তখনি সেই প্রমিজ করেছিলাম, আর তারাও এই প্রস্তাবে রাজি ছিল। তারপর আমি এন্টিবিতে থাকা গ্রাহাম গ্রিনকে ইংরেজদের পক্ষে আলোচনার জন্য বললাম।
ব্যাংক আর গেরিলাদের মধ্যে এই আলোচনা চার মাস যাবৎ চলে। এইটা আমাদের জানা ছিল যে আমি কিংবা গ্রাহাম গ্রিন এই আলোচনায় অংশ নিবোনা কিন্তু, যখনই কোনো সমস্যা তারা মনে করতো কোনো না কোনো পক্ষ আমার সাথে কথা বলে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতো।
ব্যাংকাররা মুক্ত হয়েছিল কিন্তু গ্রাহাম গ্রিন কিংবা আমি কারো প্রতিই কেউ কৃতজ্ঞতা দেখায় নাই। এইটা যে খুব জরুরি ছিল তা না, কিন্তু আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম। অনেক ভাবনা চিন্তা করে আমি যে ব্যাখায় পৌঁছাইতে পারলাম যে আমি আর গ্রিন এত ঠিকঠাক মতো সবকিছু এরেঞ্জ করেছি যে ইংরেজরা বোধ হয় ভেবে নিয়েছে আমরাও এখানে গেরিলাদের সাথে জড়িত।
ইন্টারভিউয়ার: অনেকেই আপনারে চলমান ক্যারিবীয় দূত হিসাবে মনে করে, অবশ্যই সেটা ভালো দূত হিসাবে। আপনি কাস্ত্রোর ভালো বন্ধু, আবার পানামায় টরিজোর কিংবা ভেনেজুয়েলার কার্লোস আন্দ্রেস পেরেজের, কলম্বিয়ার আলফনসো লোপেজ মাইকেলসনের ভালো বন্ধু। আবার নিকারাগুয়ায় সান্দিনিস্তাদের বন্ধু। সবার কাছেই আপনি পছন্দের একজন।
কোন ব্যাপারটা আপনাকে এমন একটা অবস্থান নেয়ার জন্য আগ্রহী করেছিল?
মার্কেস: এখানে যেই তিনজনের কথা আপনি বললেন, প্রত্যেকেই একই সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন- যেইটা ক্যারিবীয়ার জন্য কঠিন একটা সময়। এইটা খুবই ফরচুনেট একটা কাকতালীয় ব্যাপার আবার একই সাথে বেশ দুঃখজনক যে তারা দীর্ঘদিন এই যোগাযোগটা রাখতে পারেন নাই। ঐ সময়টায় তারা তিনজনই কাস্ত্রো আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে কাজ করছিলেন। আর এইখানে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলটা তারা ঠিকঠাক রাখতে পারতেন। তিনজনের মধ্যেই ধারাবাহিক একটা পজিটিভ আলোচনা চলছিল এই বিষয়ে। আমি যে পুরা ব্যাপারটা শুধু দেখেছি তাই না, বরং যট্টুক সম্ভব সহায়তা করেছিলাম।
আমার মনে হয় মধ্য আমেরিকা আর ক্যারিবীয় অঞ্চল (আমার কাছে দুইটা একই, বুঝে আসে না কেনো তারা এই দুইটারে আলাদা ভাবে) উন্নয়ন আর ইতিহাসের এমন একটা অবস্থায় আসতে পেরছে যে নিজেদের মধ্যকার স্থবির অবস্থা তারা দূর করতে প্রস্তুত। কিন্তু এইটাও বিশ্বাস করি যে মার্কিন এমন কোনো প্রচেষ্টা নষ্ট করে দিতে পারে, কারণ এর জন্য তাদের এই জায়গায় পুরানা গুরুত্বপূর্ণ প্রিভিলেজটা হারায়ে যাবে।
এত সীমাবদ্ধতার পরেও, কার্টার লাস্ট কিছু বছরে ক্যারিবীয় অঞ্চল নিয়া আলাপ করা সেরা লোকটাই ছিলেন। তার প্রেসিডেন্সির সময়কাল টরিজো, পেরেজ, লোপেজের সাথে একই সময়ে ছিল যেইটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এইসব ব্যাপারই আমাকে এই ব্যাপারে নিজের নম্রভাবে যুক্ত হওয়াতে আগ্রহী করেছিল। আমি আসলে অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতার কাজ করতাম, যেইটা অনেকটা সময় পর্যন্ত হয়তো করাও যেত যদি না আমেরিকার বিপর্যস্ত একটা নির্বাচনের মাধ্যমে এমন কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হত যে এর বিপরীত স্বার্থ নিয়ে চিন্তিত।
টরিজো বলতেন যে, আমার কাজ হচ্ছে ‘গুপ্ত কূটনীতি’ আর সে প্রায়ই লোকেরে বলতো যে আমি খারাপ নিউজগুলাও ভালো নিউজে ঘুরায় দেয়ার মোজেজা জানি। এখন এইটা কী নিন্দা ছিল নাকি প্রশংসা সেইটা কখনো বুঝতে পারিনাই।
ইন্টারভিউয়ার: আপনি আপনার দেশে কেমন সরকার দেখতে পছন্দ করবেন?
মার্কেস: যেই সরকার গরিব লোকদের খুশি রাখতে পারবে। শুধু ভাবেন একবার কী চমৎকার হবে ব্যাপারটা!




মন্তব্য