একজন মৃত কবিকে কতবার হত্যা করা যায়? সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। কবি মারা যান, তাঁর সমসাময়িকেরা মারা যান, বিদ্বেষীরা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হন, তবু কবিকে ঘিরে বিদ্বেষ শেষ হয় না। নতুন প্রজন্মের হাতে নতুন প্রযুক্তি আসে, রাষ্ট্রভাষা বদলায়, রাজনৈতিক দলের নাম বদলায়, কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য পরিসরে পুরোনো ঘৃণা নতুন চেহারা নিয়ে ফিরে আসে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আমাদের সমাজে যে বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ বারবার মাথা চাড়া দেয়, তাকে এই জায়গা থেকেই বোঝা দরকার। রবীন্দ্রনাথকে আমরা কতটা পড়েছি সমস্যাটা এখানে নয়, তাঁকে না পড়েও তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি হয়েছে, সমস্যাটা ঠিক সেইখানে।
কোনো লেখককে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠানোর অর্থ তাঁকে বোঝার পথ বন্ধ করে দেওয়া। রবীন্দ্রনাথ নিজেও সমস্ত প্রশ্নের সমাধান দিয়ে যাননি, তাঁর চিন্তায় দ্বন্দ্ব আছে, সীমাবদ্ধতা আছে, শ্রেণিগত অবস্থানের প্রভাব আছে। তা নিয়ে সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু সমালোচনা আর বিদ্বেষের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য, সেটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। সমালোচনার উদ্দেশ্য লেখককে তাঁর দ্বন্দ্ব, ঐতিহাসিক অবস্থান ও চিন্তার অসংগতিসহ বুঝতে চাওয়া; কিন্তু বিদ্বেষের উদ্দেশ্য তাঁকে ট্যাগ দিয়ে অপরাধী বানিয়ে খারিজ করে দেয়া। প্রথমটি চিন্তাচর্চার অংশ, দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক এজেন্ডা। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বর্তমান বাঙলাদেশের ঘটনাগুলোতে দ্বিতীয় প্রবণতাই চোখে পড়ছে।
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকাটা মোটামুটি এরকম,
- তিনি জমিদার ছিলেন
- কলকাতার অভিজাত পরিবারের সন্তান ছিলেন
- ঔপনিবেশিক বাঙলার ক্ষমতাবান সাংস্কৃতিক পরিসরে বেড়ে উঠেছেন
- তাঁর সাহিত্য দীর্ঘকাল ধরে বাঙলা ভাষার সাংস্কৃতিক রুচি নির্ধারণে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছে।
এসব তথ্যের কোনোটিই অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক সত্যের অস্তিত্ব আর সেই সত্য থেকে তৈরি করা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এক নয়। জমিদার পরিবারের সন্তান বলেই তাঁর সমগ্র সাহিত্যকে শোষণের দলিল ট্যাগ দিয়ে বাতিল করে দেওয়া যায় না। একইভাবে, সাহিত্যিক প্রভাব ব্যাপক ছিল বলেই তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রতিটি অবস্থানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্তিকামীও ঘোষণা করা যায় না। প্রশ্ন হলো, আমরা রবীন্দ্রনাথকে তাঁর ঐতিহাসিক অবস্থানের মধ্যে রেখে বিচার করছি, নাকি পূর্বনির্ধারিত কোনো মতাদর্শের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এমন সব অভিযোগ সাজাচ্ছি, যার উদ্দেশ্য সমালোচনা নয়, প্রত্যাখ্যান?
পাকিস্তানিরা রাষ্ট্রীয় আইনকানুন করেও যার চিন্তাকে মুছে ফেলতে পারেনি, স্বাধীন বাঙলাদেশে তাকে বুলডোজার আর আলকাতরা দিয়ে মুছে ফেলতে চাওয়া বেকুব— তুমি কোন কাননের ফুল?
এই প্রত্যাখ্যানের রাজনীতিতে রবীন্দ্রনাথ আর লেখক থাকেন না, হয়ে ওঠেন একটি শ্রেণির প্রতীক, কখনো একটি ধর্মের প্রতীক, আবার কখনোবা একটি ভূখণ্ডের প্রতীক। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিচয়কে তাঁর সমগ্র সাহিত্যিক অস্তিত্বের উপরেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাঁকে কলকাতার বাবু সংস্কৃতির প্রতিনিধি বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়। ভাবখানা এমন যেন বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে পূর্ববঙ্গের মানুষের অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার না করে উপায় নেই। এই যুক্তি পুরোটাই ভুল। সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য উত্তরাধিকার ধ্বংস করতে হয় না। পূর্ববঙ্গের নিজস্ব সাহিত্যিক ইতিহাস আছে, লোকসংস্কৃতি আছে, ভাষার স্বতন্ত্র উচ্চারণ আছে, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের অভিজ্ঞতায় নির্মিত বিপুল সৃষ্টিসম্ভার আছে। রবীন্দ্রনাথকে সরিয়ে দিলেই সেই ইতিহাসের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন ভাবনার মধ্যে আত্মবিশ্বাস না থাকলেও হীনম্মন্যতা আছে ভরপুর।
সমস্যাটা আরও জটিল হয় যখন ধর্মীয় পরিচয় সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্র নির্মাণ, সামাজিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক আনুগত্যের কার্যকর উপাদান। এই অঞ্চলে এমন বহু রাজনৈতিক প্রকল্প দেখা গেছে, যেগুলো মানুষের বহুমাত্রিক পরিচয়কে সংকুচিত করে একটি প্রধান পরিচয়ের অধীনস্ত করতে চেয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পেছনে দ্বিজাতিতত্ত্বের যে রাজনৈতিক যুক্তি কাজ করেছিল, তার পরিণতি অল্প দিনের মধ্যেই পূর্ববঙ্গের মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল। ধর্মীয় পরিচয়ের মিল ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা রাজনৈতিক অধিকারের পার্থক্য মুছে দিতে পারেনি। রাষ্ট্র যখন বাঙালির ভাষাকে পদদলিত করতে শুরু করল, তখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে এক ধর্মের অনুসারী হলেই মানুষ এক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অধিকারী হয় না।
রবীন্দ্রনাথের গান ও সাহিত্যকে ঘিরে পাকিস্তান আমলের বিরোধিতা এই ইতিহাসেরই অংশ। তাঁর রচনাকে ভারতীয় কিংবা হিন্দু সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে পূর্ববঙ্গের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে চেষ্টা হয়েছিল, তার পেছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক চক্রান্ত। বাঙালি মুসলমানের পরিচয়কে এমনভাবে নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল, যাতে ভাষা ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নে সে পরিচয়ের প্রথমাংশকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকে। অথচ বাস্তবতা এর বিপরীত। বাঙলা ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছেন মুসলমান লেখক, শিক্ষক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ। তাঁদের কাছে মাতৃভাষা কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সম্পত্তি ছিল না। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীত সেই ভাষারই গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার। তাঁর রচনা গ্রহণ করার জন্য কাউকে নিজের ধর্মীয় পরিচয় ত্যাগ করতে হয় না, যেমন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে কারও ধর্মীয় পরিচয় অধিকতর বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে না।
পাকিস্তানি শাসনের সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজন করা, তাঁর গান গাওয়া, তাঁর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করা তখন বাঙালির সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে বাঙলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের যে সম্পর্ক ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে, তার পেছনে এইসকল কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাস বহুস্বরের ইতিহাস। আর রবীন্দ্রনাথ তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্বাধীনতার পরেও বাঙলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান এই বহুত্বের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। আমাদের জাতীয় সংগীত তাঁর লেখা, তাঁর গান আমাদের ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। অথচ তাঁর উপস্থিতি যত স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে ততটা হয়নি। কখনো রাজনৈতিক কারণে, আবার কখনো ধর্মীয় সংকীর্ণতার কারণে তাঁকে বারবার বিদ্ধ করা হয়েছে। এই বিরোধিতার সবটাই হয়েছে ‘ভিন্ন ভিন্ন রূপে, ভিন্ন ভিন্ন দিনে’। কেউ হয়তো রবীন্দ্রনাথের ধর্মের প্রসঙ্গ তুলে বিরোধীতা করছেন, কেউবা তাঁর শ্রেণিগত অবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে বিরোধীতা করছেন। কিন্তু এসব বিরোধীতার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্রনাথের চিন্তাকে মুছে ফেলা। আরো গভীরভাবে দেখলে বলতে হয়, এসব প্রচেষ্টার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বাঙলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে ইতিহাসের ধারাবাহিক ধ্বংশযজ্ঞকে এগিয়ে নেয়া।
রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে আমরা ঠিক কী প্রতিষ্ঠা করতে চাই? এমন একটি সাহিত্যিক পরিসর, যেখানে তাঁর বদলে আরও বহু লেখক পড়া হবে? সে দাবি যুক্তিসংগত। এমন একটি পাঠ্যক্রম, যেখানে রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি পূর্ববঙ্গের কৃষক, শ্রমজীবী, নারী, নিম্নবর্গ ও প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা আরও গভীরভাবে আলোচিত হবে? এই দাবি আরও বেশি জরুরি। এমন একটি সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা, যেখানে কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যিক কর্তৃত্বের বাইরে বাঙলাদেশের নিজস্ব চিন্তা ও সৃষ্টির বিকাশ ঘটবে? সেটিও প্রয়োজনীয়। কিন্তু এসবের কোনটি প্রতিষ্ঠা করতে রবীন্দ্রনাথকে শত্রু বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং তাঁকে বুঝতে পারলে আমরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব, সাহিত্যিক উত্তরাধিকার কীভাবে গড়ে ওঠে, কীভাবে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়, কীভাবে তার বিরুদ্ধেও নতুন সাহিত্য তৈরি হয়। কিন্তু যারা রবীন্দ্রবিদ্বেষী তারা কিন্তু এসবের কোনোটাই চান না, তারা চান এই জাতি স্রেফ কূপমণ্ডুক হয়ে থাকুক।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দ্বিমত করার জন্য রবীন্দ্রবিরোধী হয়ে ওঠার দরকার নেই। যেমন, তাঁর জাতীয়তাবাদবিষয়ক চিন্তাধারা কিংবা সাহিত্যিক আধিপত্যের ইতিহাস ইত্যাদি প্রসঙ্গ ধরে আলোচনা-সমালোচনা করা যেতেই পারে। এমনকি তাঁর সাহিত্যে নারী, গ্রাম, জাতপাত, ধর্ম ও শ্রেণির প্রশ্ন কীভাবে উপস্থিত হয়েছে, কোথায় তাঁর চিন্তা নিজের সময়কে অতিক্রম করেছে, কোথায় পারেনি, সেসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতেই পারে। তাকে দেবতার আসনে বসিয়ে রাখলে এই কাজ সম্ভব নয়। আবার তাঁকে শত্রুর আসনে বসিয়েও সম্ভব নয়।
বর্তমানের এক মহা সমস্যা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিহাসের জটিলতা ক্রমাগত ছোট ছোট উত্তেজক বাক্যে বর্ষিত হচ্ছে। আধখানা উদ্ধৃতি, একটি বিকৃত তথ্য, একটি ছবি কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার সরলীকৃত ব্যাখ্যা মুহূর্তের মধ্যে বহু মানুষের কাছে পৌঁছে তৈরি করছে মব।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে সব বিরোধিতাকে একটি মাত্র রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও বাস্তবতা আড়াল হয়। কোনো লেখক যখন একটি ভাষার সাংস্কৃতিক পরিসরে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেন, তখন তাঁকে ঘিরে বিরোধ, প্রতিক্রিয়া ও নতুন ভাষা নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বাঙলা সাহিত্যে রবীন্দ্র পরবর্তী প্রজন্মের কবি ও লেখকেরা তাঁর প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁর ভাষা ও নন্দনতত্ত্বের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁদের কাছে এই বিরোধিতা ছিল শিল্পের নিজস্ব প্রয়োজন। তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলতে চাননি, তাঁর উপস্থিতির মধ্যেই নিজেদের নতুন পরিসর নির্মাণ করতে চেয়েছেন। এই সৃজনশীল দ্বন্দ্বের সঙ্গে বহুকাল ধরে চলে আসা ধর্মীয় বিদ্বেষ বা রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিনিয়ন্ত্রণকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
তাহলে রবীন্দ্রনাথ কেন টার্গেট? সম্ভবত এই কারণেই যে, তিনি আমাদের কাছে একই সঙ্গে সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অর্থ বহন করেন। তাঁকে নিয়ে বিতর্কের মধ্য দিয়ে মানুষ এমন সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজে, যেগুলো বর্তমান সমাজেও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা কেমন বাঙলাদেশ চাই, আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি কী হবে, ধর্ম ও সংস্কৃতির সম্পর্ক কোথায় গিয়ে মিলবে, ইতিহাসের কোন অংশকে গ্রহণ করব, কোন অংশকে বর্জন করব, এসব প্রশ্নের সংঘাত তাঁর নামের ওপর এসে পড়ে। যে রাজনীতি মানুষকে পরিচয়ের রাজনীতিতে বন্দি করতে চায়, তার কাছে বহুস্বরের সাহিত্য আতঙ্কের।
রবীন্দ্রনাথকে আমাদের দেবতা কিংবা শত্রু কোনোটিই বানানোরও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন তাঁকে তাঁর সময়, শ্রেণি, চিন্তা, সীমাবদ্ধতা ও সৃষ্টির পূর্ণতা নিয়ে পাঠ করা। আপনি তাঁর সমালোচনা করতে পারেন, দ্বিমত করতে পারেন, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে শক্তিশালী যুক্তিও দাঁড় করাতে পারেন। কিন্তু তাঁকে না পড়ে না জেনে শত্রু ঘোষণা করার মধ্যে আছে শুধু সেই পুরোনো ভয়, যা মানুষের বহুত্বকে সহ্য করতে পারে না এবং নিজের সংকীর্ণতা, কূপমন্ডূকতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য পাঠ্যবই থেকে কবিতা সরিয়ে ফেলে, গান বন্ধ করে, ভাস্কর্য ভাঙে কিংবা দেয়ালচিত্রে কালি মেখে দেয়।
পাকিস্তানিরা রাষ্ট্রীয় আইনকানুন করেও যার চিন্তাকে মুছে ফেলতে পারেনি, স্বাধীন বাঙলাদেশে তাকে বুলডোজার আর আলকাতরা দিয়ে মুছে ফেলতে চাওয়া বেকুব— তুমি কোন কাননের ফুল?




বিশ্লেষনধর্মী এই লেখাটি পড়ে আমার মনে হলো এই ধরনের লেখাগুলি সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া দরকার। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়া দরকার। যাতে রবীন্দ্রনাথের মতো একজন মানুষ যিনি সকলের জন্য দূর্দিনের আশ্রয় তাকে নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রনোদিত ঘৃন্য কাজগুলি বন্ধ হয়।
উত্তরমুছুন