হিন্দু মধ্যবিত্তের জাতপাত
ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, বাঙালি, কলকাতার বাঙলিরা, মুলতঃ হিন্দু মধ্যবিত্ত, আর যাই হোক জাতপাতের ব্যাপারটা থেকে অনেক দূরে। অন্তত, সারা ভারতের তুলনায়। আর সাম্প্রদায়িক তো নয়ই। চিরকাল দেখেছি, কাউকে সাম্প্রদায়িক বললে সেটা একটা গালাগালি বলেই ধরা হতো। যেমন ইংল্যান্ডে দেখেছি, কাউকে রেসিস্ট বললে মহা চটে যায়। বুঝতে পারিনি, সেটা ঐ রেসিস্ট শব্দটার দোষ, নাকি সত্য ভাষণ সহ্য হয় না বলে! আমাদের বাঙালির ক্ষেত্রে অবশ্য এমনটা ভাবিনি কখনও। ভীষণ রকম প্রগতিশীল আধুনিক মানুষ বলে একটা দারুণ গর্ব গড়ে উঠেছিল স্বাভাবিক ভাবে। একটা ছোট ঘটনা সেটায় প্রথম সন্দেহ জাগল।
তখন কলেজের পাট চুকিয়ে সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছি। চোখে বিপুল স্বপ্ন। যেমন হয় আর কি! বন্ধুবান্ধব মিলে দামাল জীবন।
আমার এক প্রিয় বন্ধুর বাবাকে একবার হাসপাতালে নিয়ে যাবার দরকার পড়লে আমি তার সঙ্গী হলাম। দক্ষিণ কলকাতার শিশু মঙ্গল। তখন নির্ভরযোগ্য সেবা প্রতিষ্ঠান ব’লে খুবই সুখ্যাতি। বহুবিধ ক্লিনিকাল টেস্ট। কাউন্টার থেকে কাউন্টার-এ দৌড়ঝাঁপ। সবই হয়ে গেলো, একটা বাদে। বুকের এক্স-রে। যখন নির্দিষ্ট কাউন্টারে পৌঁছলাম, সময় পেরিয়ে গেছে। রোগী বয়স্ক মানুষ। হুইল চেয়ারে। বন্ধুর বাড়িও কলকাতা থেকে বেশ দূরে, ভদ্রেশ্বর। শুধু এক্স-রের জন্যে আবার আসা সব দিক থেকেই ব্যয়সাপেক্ষ। আর সে সময়ে মধ্যবিত্ত সমাজ এতো ফুলে ফেঁপে ওঠেনি। মধ্যবিত্ত বলতে একটা নির্দিষ্ট মানসিকতাকে বোঝাত। ব্যাপারটা বেশিটাই অর্থনীতি নিরপেক্ষ। ফলে সবিনয় অনুরোধ ও একটু পেড়াপেড়ি চলল। কিন্তু ফল হোল না। ব্যাজার মুখে ফিরেই আসছিলাম। হঠাৎই পিছন থেকে এক ভদ্রলোকের গলা। ডাকছেন আমাদের, ‘শুনে যান।‘ অগত্যা। বললেন উনিই টেকনিশিয়ান। এক্স-রে টা করে দেবেন। আমরা তো তাঁর সদাশয়তা দেখে আপ্লুত। আছে আছে! এ বাংলায় সৌজন্য এখনও বেঁচে আছে। বন্ধু ও আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এমন কি, হুইলচেয়ারে রোগীর মুখেও যেন ঈষৎ স্বস্তিচিহ্ন দেখা গেলো। মিনিট পনের কুড়ির মধ্যেই সব চুকে গেলো। ভদ্রলোককে অনেকআনেক ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। যাক সবটা হয়ে গেলো। ডাক্তারকে আজই সব রিপোর্ট দেখিয়ে চিকিৎসা শুরু করা যাবে। কিন্তু আবার পিছু ডাক। ঐ ভদ্রলোকেরই গলা। থামলাম। উনি কিছু বলতে চাইছেন আমার বন্ধুকে। ‘ ভাই, কেন এতো ঝামেলা করেও করে দিলাম, বলুন তো?’ সকলেই অপ্রস্তুত! উত্তর দেবো কী! একটু দম নিয়ে তিনি নিজেই ব্যাখ্যা করলেন, ‘ আরে ভাই, তুমিও বদ্যি, আমিও বদ্যি; এটুকু না দেখলে কি চলে?’ বেশ পরিতৃপ্তির হাসি তাঁর মুখে। আমরা তো বাক্যহারা! উনি বোধ হয় এবারে আমার বন্ধুটির জোরাল সমর্থন আশা করছিলেন! তবে তা হোল না। শাশ্বতর দ্রুত উত্তর, ‘আমি হলে কিন্তু করতাম না!’ ওঁর প্রতিক্রিইয়াটা অবশ্য দেখা হয় নি; কারণ, আমরা আর পেছনে তাকাই নি!
এ প্রসঙ্গে পূর্বতন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান প্রমোদ দাশগুপ্তের স্মরণ সভার ব্যাপারটাও মনে পড়ে গেলো। ব্রিগ্রেডে পিডিজির সর্বদলীয় স্মরণ সভায় এক কালের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের মন্তব্য ছিল একদম সোজাসুজি। বিপরীত মেরুর প্রয়াত রাজনীতিবিদ প্রমোদ দাশগুপ্তের ( তৎকালীন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান) স্মরণে তাঁর অংশগ্রহণের কৈফিয়ৎ ছিল সেরা, ‘প্রমোদ বাবুও বদ্যি ছিলেন, আমিও বদ্যি।‘ এরপরে তো আর কথা চলে না।
এক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রজ সহকর্মীর একটি মন্তব্য দিয়ে এই লেখা শেষ করবো। বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রস্তুতি তো বহুদিনের। আদবানিজীর এয়ারকন্ডিশন্ড রথ বের হওয়ার প্রাক্কালে, রামশিলা বানানোর ধুম পড়ে গেছলো। অনেকেরই মনে আছে এখনও। কিছুই না, ব্যাপারটা ইঁট পুজো। যে মন্ত্রপূত ইঁট দিয়েই নাকি রামলালার মন্দির বানানো হবে অযোধ্যায়। অবশ্য আজ মন্দির বনে গেলেও, সেই ইঁট যে কোন কাজে লেগেছে তেমন কোন সংবাদ কারও কাছে আছে বলে জানা নেই। এই বুজরুকি নিয়ে একদিন আলোচনাকালে উত্তেজিত প্রগতিশীল সহকর্মীদের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সুকুমার নন্দী ফুট কাটলেন, এই যে আপনারা এতো কিছু বলছেন, বলুন তো কারা কারা বাড়ি তৈরি করেছেন ভিত পুজো ছাড়া? কারও উত্তরই স্পষ্ট জানা গেলো না। একটা অস্থির নীরবতার পর সুকুমারদা বললেন, ওরা তাহলে কী আর ভুল করছে! কেউ কেউ, আরে, ওটা আর আমাদের ভিতপুজো এক হোল বলে ক্ষীণ প্রতিবাদ করতে গেলেও আর বেশি এগোতে পারেন নি!
আমাদের প্রগতিশীলতার ব্যাপারটা আমার কাছে তাই এখনও বড়ো গোলমেলে ঠেকে!
কথার কথা
যদিও জীবনের বেশির ভাগটাই বাঙলার বাইরেই কাটাতে হয়েছে, প্রথম ভাগটা কিন্তু কম সময় নয়। নয় নয় করে তিনটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়িয়ে তবেই দেশান্তরী। পড়াশুনো করা লোকদের সঙ্গে মেলামেশা করে যেমন ঋদ্ধ হয়েছি, মজাও পেয়েছি প্রচুর। বেশ কিছু এখনও মনে পড়লে নিজের মনেই হাসি। ভালই লাগে। অবসরের খোরাক আর কী!
এক কলেজের টিচার্স কমন রুমের কিসসা।
আমি তখন বড়ই তরুণ। আলনাগোছান গোঁফ নিয়ে সকল সহকর্মীর স্নেহময় অবজ্ঞায় পালিত হচ্ছি। কলেজ সারভিস কমিশন থেকে চাকরি। চুপচাপ থাকি আর ভিজে বেড়ালের মতো মুখ করে মজা লুটি। কমন রুমে অনেক রথীমহারথীরাও বেশ উদার হয়ে পড়েন। মানে, সিনিওর জুনিওরের আগলটা কিঞ্চিত আলগা হয়ে যায়।
এক সহকর্মী, চল্লিশের একটু উপরেই বয়স হবে, একটু মিষ্টি মুখের আয়োজন করেছেন। উপলক্ষ গড়িয়ার এক প্রান্তে একটি ছোট বাড়ি কিনেছেন। উনিশশো বিরাশি সাল। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মাস্টারমশাইয়ের পক্ষে ছোট হলেও এক চিলতে জমি সহ একটা দু কামরার গোটা বাড়ি কিনে ফেলাটা বেশ ভাল খবরই ছিল। সে সময়ে আমরা সরকার থেকে সস্তায় জমি পেয়ে অনেকে মিলে একটা কোওপারেটিভ হাউসিং-এর স্বপ্নতেই অভ্যস্ত ছিলাম। আর আমার মতো লেকচারারের তো তখন ওটাও প্রায় দিবাস্বপ্ন তূল্য। যে সব সিনিওর সহকর্মীরা ও রকম হাউসিংয়ে থাকতেন, তাঁরা তো আমাদের কাছে সৌভাগ্যবান বিস্ময়পুরুষ। যাই হোক আয়োজন মন্দ ছিল না। কচুরি, মিষ্টি খাওয়া চলছে। অনেকেই ওঁর নতুন বাড়িটা নিয়ে প্রশ্নট্রশ্ন করছে। কয়েকজন তো একদিন নতুন বাড়িতে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে আবদার আবেদন করছেন। কতো পড়লো, রেজিস্ট্রেশনের সমস্যা, পাড়া কেমন, রাস্তাঘাট, কতো টাকা লোন করতে হোল, ইএমআই ইত্যাদি নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন। মোটামুটি বেশ জমাট গুরুতর আড্ডা। এই সময়ে প্রবীণতম সহকর্মী সমরেশদার প্রবেশ। কোন মিটিংটিটিং-এ আটকে পড়েছিলেন। বেশ হৈহৈ করেই এলেন। ধীরে সুস্থে খাওদাওয়া করলেন। সমরেশদা আবার সেই সময়ের শাসক দলের বেশ কেউকেটা। চা খেয়ে বেশ গুছিয়ে নিয়ে দরাজ হুংকার দিলেনঃ তরুময়, তাহলে তুমি এখন বাগানবাড়ির মালিক, কী বলো! সঙ্গে কড়িবর্গা ফাটান হাসি! তরুময় তো এক্কেবারে চুপসে গিয়ে, পারলে মাটিতে মিশে যান লজ্জায়! না না, কী যে বলেন দাদা! ঐ এক ফালি জমিতে দুচারটে ফুলগাছ!
তা বললে চলবে, ‘বাগানবাড়ি বলে কথা!’
দেখলাম পরিবেশটা একটু অন্যরকম হয়ে গেলো। কোথাও যেন তার কেটে যাওয়ার মতো লাগছে। সভা ভঙ্গ হতেও আর দেরি হোল না।
তবে আসল ঘটনাটা ঘটলো পরের দিন। তখন কলেজের টিচার্স রুম গুলজার। রিসেস টাইম। ছড়িয়ে ছিটিয়ে গল্প গুজব চলছে। হঠাৎই তরুময়দার গলা পাওয়া গেলো। বেশ একটু জোরেই। সমরেশদাকেই কিছু বলছেন। ‘ তা’ দাদা, আপনার ছেলেমেয়ে কেমন আছে?’ সমরেশদা ঢাউস মান্ধাতা আমলের আরামকেদারায় ডুবে ছিলেন। মাথাটা একটু ভাসিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘ ভাল; তা হঠাৎ এ’ প্রশ্ন?’ একটুখানি গলা খাঁকারি দিয়ে তরুময়ের উত্তর, ‘তা হলে দাদার মেয়েছেলেরা ভাল আছে!” অ্যাঁ! বলে কী? এ আবার কেমন প্রশ্ন! সকলেই থ’ মেরে চুপ! সমরেশদারও সামলাতে কিঞ্চিৎ সময় লাগলো। উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত গলায় প্রায় চিৎকার করে ঊঠলেন,‘ মানে? কী যা’ তা’ বলছো? তোমার মাথা ঠিক আছে তো?’ সারা শরীর রাগে, উত্তেজনায় কাঁপছে! উপস্থিত সকলেই রুদ্ধশ্বাস, বাকরহিত। অদ্ভুত নৈশব্দ। যাকে বলে পিনড্রপ সাইলেন্স! সমরেশ সবারই বয়ঃজ্যেষ্ঠ। পলিটিকালিও ওজনদার। তরুময় এবারে প্রায় অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে মুখ খুললেন, আরে স্যার, রাগ করেন কেন? আপনার সঙ্গে একটু মজা করলাম।‘ ‘মানে?’ সমরেশদা বিভ্রান্ত; আমরাও।
‘না, কাল আমায় বললেন না, একটা বাগান বাড়ি কিনেছি। আড়াই কাঠা জমির দুকামরা ঘর। সামনে এক চিলতে জায়গা। তা যদি বাগানবাড়ি হয়? কথার কারিকুরি আর কী! আপনার সঙ্গে তাইই একটু করে দেখালাম!’
এবার সকলে ধীরে ধীরে ধাতস্থ হয়ে সতর্ক ভাবে হেসে উঠলো। অগত্যা সমরেশ বাবুও!
ব্যাপারটাকে লঘুতর করার অভিপ্রায়ে, টিচার্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি শ্যামল হাঁক পাড়ল, হেমন্তদা সব্বাইকে চা দাও; আর শোন, ওটা আমার অ্যাকান্ট থেকে।
চা খেয়ে যে যার ক্লাস নিতে চলে গেলাম।
তবে ব্যাপারটা কিন্তু স্বাভাবিক ছিল না। কদিন পর শুনলাম, তরুময় দা অন্য কলেজে ট্রান্সফারের জন্যে কলেজ সারভিস কমিশনে আবেদন করেছেন।
যাপন-নামা (পর্ব ৭)
▮ মণিপদ্ম দত্ত
▮ মণিপদ্ম দত্ত




মন্তব্য