ওরা দুজন একে অপরের পাশাপাশি বড় হয়ে উঠেছিল। শহরের একেবারে প্রান্তে মাঠ, জঙ্গল আর ফলের বাগানঘেরা এলাকায় ওদের বাড়ি। কাছেই একটা অন্ধদের জন্য স্কুল। সেখানকার সুন্দর বেল টাওয়ারটা ওদের বাড়ি থেকে দেখা যায়।
এখন ওদের বয়স কুড়ি। প্রায় বছরখানেক ওদের দেখা হয়নি। ওদের সম্পর্কের মধ্যে বরাবরই এক ধরনের প্রাণচ্ছল অন্তরঙ্গতা বিরাজ করত। কিন্তু কেউ কাউকে ভালোবাসার কথা কখনও বলেনি।
ছেলেটির নাম নিউট। মেয়েটি ক্যাথরিন।
সেদিন দুপুরের একটু পর নিউট ক্যাথরিনের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল।
ক্যাথরিন দরজা খুলতে এল। ওর হাতে একটা মোটা, ঝাঁ-চকককে পত্রিকা। এটাই ও বিগত কয়েকদিন ধরে পড়ছে। পত্রিকাটি মূলত কনেদের নিয়ে। নিউটকে দেখে ও অবাক হয়ে গেল,
“নিউট!”
“আমার সঙ্গে একটু হাঁটতে যাবে?” নিউট বলল।
নিউট বরাবরই লাজুক প্রকৃতির। এমনকি ক্যাথারিনের সঙ্গেও তাই। নিজের লজ্জা ঢাকতে সে অন্যমনস্কভাবে কথা বলে, যেন যে বিষয়টা সত্যিই তাকে ব্যস্ত রেখেছে, সেটার অবস্থান বহুদূরে কোথাও। অথবা সে একজন গোপন এজেন্ট যে কোনও এক মিশনে বেরিয়ে সুন্দর, দূরবর্তী এবং অলুক্ষণে কয়েকটি গন্তব্যের মাঝখানে সামান্য সময়ের জন্য থেমেছে। নিউট এভাবেই কথা বলত সবসময়। এমনকি যে বিষয়গুলো তাকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলত, সেগুলোর ক্ষেত্রেও।
“হাঁটতে?” ক্যাথারিন বলল।
“এক পায়ের সামনে আরেক পা ফেলে,” নিউট বলল, “পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে, সেতুর উপর দিয়ে—”
“তুমি যে এখন শহরে আছ, আমি তো জানতামই না।”
“এইমাত্র এলাম।”
“এখনও সেনাবাহিনীতে আছ তার মানে।”
“আর সাত মাস বাকি।”
নিউট ছিল আর্টিলারি বাহিনীর প্রাইভেট ফার্স্ট ক্লাস। কুঁচকানো ইউনিফর্ম। বুট ধুলোমলিন। গালে না-কমানো দাড়ি। ও পত্রিকার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “দেখি তো, সুন্দর বইটা।”
ক্যাথরিন পত্রিকাটা ওর হাতে দিল।
“আমি বিয়ে করছি, নিউট।”
“আমি জানি,” নিউট বলল। “চলো, একটু হাঁটি।”
“আমি ভীষণ ব্যস্ত, নিউট। আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই বিয়ে।”
“আমরা যদি একটু হাঁটি, তাহলে তোমার গাল গোলাপি হয়ে উঠবে, আর তুমি হয়ে উঠবে একেবারে গোলাপি-কনে।” নিউট পত্রিকার পাতা ওল্টাতে লাগল। “একজন গোলাপি কনে—ওর মতো, ওর মতো, ওর মতো,” নিউট পত্রিকার পাতায় গোলাপি আভায় রাঙা কনেদের দেখাতে দেখাতে বলে চলল।
ক্যাথরিনের মুখও রাঙা হয়ে উঠল। ও গোলাপি কনেদের কথা ভাবতে লাগল।
“হেনরি স্টুয়ার্ট চেস্টেনের জন্য এটাই হবে আমার উপহার,” নিউট বলল। “তোমাকে একটু হাঁটতে নিয়ে গিয়ে আমি তাকে একজন গোলাপি-কনে উপহার দেব।”
“তুমি ওর নাম জানো?” ক্যাথরিন জিজ্ঞেস করল।
“মা লিখেছিল।” নিউট বলল। “ও কি পিটসবার্গ থেকে?”
“হ্যাঁ। তোমার ওকে ভালো লাগবে।”
“হয়তো।”
“তুমি কি—তুমি কি বিয়েতে আসতে পারবে, নিউট?”
“সেটা আমি ঠিক জানি না।”
“কেন? তোমার ছুটি কি বেশিদিনের জন্য নয়?”
“ছুটি?” নিউট তখন চ্যাপ্টা রুপোর বাসনপত্রের দু-পাতাজোড়া একটা বিজ্ঞাপন মন দিয়ে দেখতে দেখতে বলল, “আমি তো ছুটিতে আসিনি।”
“হ্যাঁ?”
“ওরা যেটাকে A.W.O.L. বা এবসেন্ট উইদাউট অফিসিয়াল লিভ বলে, আমি এখন সেটাই।”
“ওহ, নিউট! এ হতে পারে না।”
“আরে হ্যাঁ, আমি এখন ওটাই,” নিউট বলল। ওর চোখ তখনও পত্রিকার দিকে।
“কিন্তু, নিউট, কেন?”
“তোমার রুপোর বাসনপত্রের নকশাটা কেমন, সেটা জানতে আমাকে আসতেই হত,” নিউট পত্রিকা থেকে রুপোর বাসনপত্রের নকশাগুলোর নাম পড়তে লাগল। “অ্যালবেমার্ল? হিদার?” ও মুখ তুলে তাকাল, মৃদু হাসল। “আমি ঠিক করেছি, তোমাকে আর তোমার বরকে একটা চামচ উপহার দেব।”
“নিউট, নিউট—সত্যি করে বলো তো,” ক্যাথরিন বলল।
“আমি হাঁটতে যেতে চাই।”
ক্যাথারিন খানিকটা ভগিনীসুলভ রাগে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, “ওহ, নিউট—তুমি তোমার এই A.W.O.L. থাকা নিয়ে আমাকে বোকা বানাচ্ছ, না?”
নিউট হালকা করে পুলিশের মতো স্যালুট ঠুকে চোখ কপালে তোলার ভঙ্গি করল।
“কোথা থেকে আসছ এখন?” ক্যাথরিন জিজ্ঞেস করল।
“ফোর্ট ব্র্যাগ।”
“উত্তর ক্যারোলিনা?”
“ঠিক তাই,” নিউট বলল। “ফায়েটভিলের কাছে, যেখানে স্কারলেট ও’হারা স্কুলে যেত।”
“তুমি এখানে এলে কীভাবে, নিউট?”
ও বুড়ো আঙুল তুলে হিচহাইক করার ভঙ্গি করে বলল, “দুদিন লাগল।”
“তোমার মা জানেন?”
“আমি মাকে দেখতে আসিনি।”
“তাহলে কাকে দেখতে এসেছ?”
“তোমাকে।”
“আমাকে কেন?”
“কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি,” নিউট বলল। “এখন আমরা কি হাঁটতে পারি? এক পায়ের সামনে আরেক পা ফেলে—পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে, সেতুর ওপর দিয়ে—”
……………………………
এখন ওরা হাঁটতে শুরু করেছে একটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, যেখানে মাটি জুড়ে শুকনো বাদামি পাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
ক্যাথরিন রেগে গিয়েছিল। উত্তেজনায় ওর প্রায় কেঁদে ফেলবার মতো অবস্থা। ও বলল, “নিউট, এটা একেবারে পাগলামি।”
“কেন?” নিউট বলল।
“আমাকে ভালোবাসো—এ কথা বলার জন্য এর চেয়ে বিদঘুটে সময় আর কী হতে পারে?” ক্যাথরিন বলল। “তুমি আগে কখনও এভাবে কথা বলোনি।” ও হাঁটা থামিয়ে দিল।
“চলো, হাঁটতে থাকি,” নিউট বলল।
“না। এ পর্যন্তই, আর নয়। তোমার সঙ্গে বেরোনো আমার একেবারেই উচিত হয়নি।”
“কিন্তু তুমি বেরিয়েছ,” নিউট বলল।
“সে তো তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে আনার জন্য। কেউ যদি হঠাৎ এসে পড়ত আর বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগে তোমাকে আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলতে শুনত—”
“তাহলে তারা কী ভাবত?”
“তারা ভাবত তুমি পাগল।”
“কেন?”
ক্যাথরিন একটা গভীর শ্বাস নিল এবং ওর বক্তব্য শুরু করল, “তবে এই পাগলামিটা করে তুমি আমাকে যে সম্মান দিয়েছ, তাতে আমি সত্যিই ভীষণই আপ্লুত। আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে তুমি A.W.O.L. হয়ে এসেছ। তবে এটাই হয়ত সত্যি। আমি এও বিশ্বাস করতে পারছি না যে তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, কিন্তু হয়তো তুমি বাসো। তবু—”
“আমি ভালোবাসি,” নিউট বলল।
“বেশ, আমি সত্যিই ভীষণ আপ্লুত,” ক্যাথারিন বলল, “আর বন্ধু হিসেবে তোমাকে আমি খুবই পছন্দ করি, নিউট, সত্যিই খুব আপন মনে করি। কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে যে।” ও নিউটের কাছ থেকে এক পা সরে এসে বলল, “তুমি আমাকে কখনও চুমুও খাওনি।” তারপর নিজের হাত দুটো দিয়ে নিজেকে আড়াল করল। “আমি বলছি না যে এখনই তোমার তা করা উচিত। আমি শুধু বলতে চাইছি, ব্যাপারটা আমার কাছে এতটাই অপ্রত্যাশিত যে কীভাবে এর উত্তর দেব, সে বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।”
“আরও একটু হাঁটো,” নিউট বলল। “এই সময়টাকে উপভোগ করো।”
তারা আবার হাঁটতে শুরু করল।
“তুমি কী আশা করেছিলে, আমার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?” ক্যাথরিন জিজ্ঞেস করল।
“আমি কী করে জানব আমি কী আশা করতে পারি?” নিউট বলল। “এর আগে তো আমি কখনও এমন কিছু করিনি।”
“তুমি কি ভেবেছিলে আমি তোমার বাহুতে ঝাঁপিয়ে পড়ব?”
“হয়তো,” নিউট বলল।
“তোমাকে হতাশ করার জন্য দুঃখিত।”
“আমি হতাশ হইনি,” নিউট বলল। “এটা নিয়ে আমার খুব একটা আশা ছিলও না। তবু এটা আমার ভালোই লাগছে, এই হেঁটে চলা।”
ক্যাথরিন আবার থেমে গেল। বলল, “তুমি জানো এরপর কী হয়?”
“না।”
“আমরা হাত মেলাই,” ক্যাথরিন বলল। “তারপর আলাদা হয়ে যাই। এরপর এটাই হওয়ার কথা।”
নিউট মাথা নাড়ল। বলল, “বেশ। মাঝেসাঝে আমার কথা মনে কোরো। মনে রেখো, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসতাম।”
ক্যাথরিনের চোখে অযথাই জল এসে গেল। সে নিউটের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং জঙ্গলের অসীম বৃক্ষসারির দিকে তাকিয়ে রইল।
“এর মানে কী?” নিউট বলল।
“রাগ!” হাত মুঠো করে ক্যাথরিন বলল, “তোমার কোনও অধিকার নেই—”
“আমাকে জানতে হত।”
“আমি যদি তোমাকে ভালোবাসতাম, তাহলে আমি তোমাকে আগেই তা জানিয়ে দিতাম।”
“তুমি জানিয়ে দিতে?”
“হ্যাঁ,” ক্যাথরিন বলল। সে নিউটের দিকে মুখ ফিরিয়ে ওর চোখের দিকে তাকাল। ওর মুখ অনেকটাই লাল হয়ে উঠেছিল। “তুমি নিজেই বুঝতে পারতে।”
“কীভাবে?” নিউট বলল।
“তুমি তা দেখতে পেতে। মেয়েরা তাদের ভালোবাসা লুকিয়ে রাখতে খুব একটা পটু হয় না।”
নিউট এবার খুব মন দিয়ে ক্যাথরিনের মুখের দিকে তাকাল। ক্যাথারিন খানিকটা বিস্ময়ের সাথেই উপলব্ধি করল, সে যা বলেছে তা সত্যি। একজন নারী তার ভালোবাসা লুকিয়ে রাখতে পারে না।
নিউট এখন সেই ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছে।
আর সেই মুহূর্তে ওর যা করার ছিল, নিউট সেটাই করল। ও ক্যাথরিনকে চুমু খেল।
…………………………
“তোমার সঙ্গে মানিয়ে চলা সত্যিই কঠিন!” নিউট ছেড়ে দিতেই ক্যাথরিন বলল।
“তাই?” নিউট বলল।
“ওটা করা তোমার উচিত হয়নি।”
“তোমার ভালো লাগেনি?”
“তুমি কী আশা করেছিলে,” ক্যাথরিন বলল—“বন্য, বেপরোয়া আবেগ?”
“আমি তো তোমাকে বলেই চলেছি,” নিউট বলল, “এরপর কী ঘটতে চলেছে, আমার সেই নিয়ে কোনও ধারণাই নেই।”
“চলো আমরা একে অপরকে বিদায় জানাই,” ক্যাথরিন বলল।
নিউট সামান্য ভ্রু কুঁচকাল। বলল, “বেশ।”
ক্যাথরিন আবার যেন একটা বক্তৃতা শুরু করল। “আমরা চুমু খেয়েছি বলে আমার একটুও দুঃখ নেই। ব্যাপারটা খুব মিষ্টি ছিল। আমাদের চুমু খাওয়া উচিতই ছিল। আমরা তো বরাবরই এত ঘনিষ্ঠ ছিলাম। আমি তোমাকে সবসময় মনে রাখব, নিউট। আর তোমার জন্য শুভকামনা।”
“তোমার জন্যও।”
“ধন্যবাদ, নিউট।”
“ত্রিশ দিন।”
“কী?”
“তিরিশ দিনের কারাবাস,” নিউট বলল—“একটা চুমুর জন্য আমাকে এই মূল্য দিতে হবে।”
“আমি—আমি দুঃখিত,” ক্যাথরিন বলল, “কিন্তু আমি তো তোমাকে A.W.O.L. হয়ে আসতে বলিনি।”
“আমি জানি।”
“তুমি নিশ্চয়ই এমন একটা বোকামির জন্য নায়কের পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য নও।”
“নায়ক হতে কার না ভালো লাগে,” নিউট বলল। “হেনরি স্টুয়ার্ট চ্যানস কি নায়ক?”
“সুযোগ দিলে হয়তো হতে পারে।” কথা বলতে বলতে ক্যাথরিন খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে খেয়াল করল, ওরা আবার হাঁটতে শুরু করেছে। বিদায় জানানোর কথাটা যেন ভুলেই গেছে দুজনে।
“তুমি সত্যিই তাকে ভালোবাসো?” নিউট জিজ্ঞেস করল।
“অবশ্যই আমি তাকে ভালোবাসি!” ক্যাথরিন গলা চড়িয়ে বলল। “আমি যদি তাকে ভালো না বাসতাম, তাকে বিয়েই করতাম না!”
“তার মধ্যে ভালো কী আছে?”
“সত্যি বলছি!” ক্যাথারিন আবার থেমে গেল। “তুমি কি একটুও বুঝতে পারছ না তোমার এই আচরণ আমার জন্য কতটা অপমানজনক? হেনরির অনেক, অনেক, অনেক ভালো দিক আছে।” ও বলল, “সম্ভবত তার খারাপ দিকও অনেক, অনেক, অনেক আছে। কিন্তু সেটা তোমার জানার বিষয় নয়। আমি হেনরিকে ভালোবাসি, আর তার গুণাগুণ নিয়ে আমি তোমার সঙ্গে কোনও তর্কে যাব না!”
“দুঃখিত,” নিউট বলল।
“সত্যি বলছি!” ক্যাথরিন বলল।
নিউট আবার ওকে চুমু খেল। ও এই চুমুটা খেল কারণ ক্যাথারিন সেটাই চেয়েছিল।
………………………….
এখন ওরা এসে পড়েছে একটা বিশাল ফলের বাগানে।
“বাড়ি থেকে আমরা এত দূরে চলে এলাম কী করে, নিউট?” ক্যাথরিন বলল।
“এক পায়ের সামনে আরেক পা ফেলে—পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে, সেতুর ওপর দিয়ে।”
“হ্যাঁ এভাবে পা ফেলে ফেলেই এতটা রাস্তা,” ক্যাথরিন বলল।
দূরের অন্ধদের স্কুলের বেল টাওয়ারে ঘণ্টা বেজে উঠল।
“অন্ধদের স্কুল,” নিউট বলল।
“অন্ধদের স্কুল,” ক্যাথারিন বলল। তারপর তন্দ্রালু বিস্ময়ে মাথা নেড়ে জানাল, “আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে।”
“বলো গুড-বাই।”
“যতবারই বলি, মনে হয়, তুমি আমাকে একটা চুমু খাবে।”
নিউট একটা আপেলগাছের নীচে ফুলে-ঢাকা ঘাসের ওপর বসে পড়ল।
“বসো,” নিউট বলল।
“না।”
“আমি তোমাকে ছোঁব না।”
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না।”
ক্যাথরিন নিউটের থেকে প্রায় কুড়ি ফুট দূরে অন্য একটি গাছের নীচে গিয়ে বসল। বসে, ও চোখ বন্ধ করল।
“হেনরি স্টুয়ার্ট চ্যানসের স্বপ্ন দেখো,” নিউট বলল।
“কী?”
“তোমার সেই চমৎকার হবু-বরের স্বপ্ন দেখো।”
“বেশ, তাই দেখি।”
ক্যাথরিন আরও শক্ত করে চোখ বন্ধ করল। তার হবু-বর যেন চোখের সামনে এক ঝলক ভেসে উঠল।
নিউট হাই তুলল।
গাছে গাছে মৌমাছিরা গুনগুন করছিল। এদিকে ক্যাথরিনের প্রায় ঘুমিয়ে পড়ার মতো অবস্থা। যখন ও চোখ খুলল, দেখল নিউট সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে।
নিউট মৃদু নাক ডাকতে শুরু করল।
ক্যাথরিন নিউটকে এক ঘণ্টা ঘুমোতে দিল। আর এই ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় ক্যাথরিন ওকে সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালোবাসল।
আপেলগাছগুলোর ছায়া ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে লম্বা হয়ে বাড়তে লাগল। অন্ধদের স্কুলের বেল টাওয়ারে আবার ঘণ্টা বেজে উঠল।
“চিক-আ-ডি-ডি-ডি,” একটি ছোট পাখি ডেকে উঠল।
কোথাও অনেক দূরে একটি মোটরগাড়ি স্টার্ট নেওয়ার চেষ্টা করল। তার ইঞ্জিন একবার গর্জে উঠে থেমে গেল। আবার গর্জে উঠল, আবার থেমে গেল। তারপর একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল।
ক্যাথরিন গাছের নীচ থেকে বেরিয়ে এসে নিউটের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।
“নিউট?”
“হুম?” নিউট চোখ খুলল।
“দেরি হয়ে গেছে।”
“হ্যালো, ক্যাথারিন।”
“হ্যালো, নিউট।”
“আমি তোমাকে ভালোবাসি,” নিউট বলল।
“আমি জানি।” ক্যাথরিন উত্তর করল।
“অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
“হ্যাঁ, অনেক দেরি।”
নিউট উঠে দাঁড়াল। তারপর গোঙানির মতো করে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলল “বেশ ভালোই হাঁটা হল।”
“আমারও তাই মনে হয়,” ক্যাথরিন বলল।
“এখানেই তাহলে আলাদা হয়ে যাই?”
“তুমি কোথায় যাবে?”
“হিচহাইক করে শহরে ফিরব, তারপর নিজেকে কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেব,” নিউট বলল।
“শুভকামনা।”
“তোমাকেও। আমাকে বিয়ে করবে, ক্যাথরিন?”
“না,” ক্যাথরিন জবাব দিল।
নিউট হাসল, এক মুহূর্ত নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর দ্রুত হেঁটে চলে গেল।
ক্যাথরিন ওকে দেখতে লাগল। ছায়া আর গাছের দীর্ঘ পরিসরে নিউটের অবয়ব ক্রমশ ছোট হয়ে যেতে লাগল। ক্যাথরিন জানত, এই মুহূর্তে নিউট যদি থেমে পিছন ফিরে তাকায়, যদি একবার ওকে ডাকে, তাহলেই ও নিউটের কাছে ছুটে যাবে। ওর আর কোনো উপায় থাকবে না।
নিউট থামল। পিছন ফিরল। ডাকল।
“ক্যাথরিন…”
ক্যাথরিন ওর কাছে ছুটে গেল। দুহাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। ওর মুখ থেকে কোনও কথা বেরোলো না।
রচনাকাল – ১৯৬০
লেখক পরিচিতি: কার্ট ভনেগাট (১৯২২–২০০৭) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী মার্কিন ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। তাঁর রচনায় ব্যঙ্গ, কল্পবিজ্ঞান এবং মানবজীবনের অসংগতি এক অন্য আঙ্গিকে ধরা দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস Slaughterhouse-Five যুদ্ধ, সময় ও মানুষের অস্তিত্বের জটিলতা নিয়ে রচিত। Cat’s Cradle এবং Breakfast of Champions তাঁর উল্লেখযোগ্য অন্যান্য রচনা। এই গল্পটি লেখকের ছোটগল্প সংকলন Welcome to the Monkey House থেকে নেওয়া হয়েছে।
অনন্তের পথে দীর্ঘ যাত্রা
▮ মূল: কার্ট ভনেগাট
▮ অনুবাদ: সোমরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়
▮ মূল: কার্ট ভনেগাট
▮ অনুবাদ: সোমরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়




মন্তব্য