১৯৮২ সালে ফ্রান্স কলেজে জ্যাকুয়াস দেরিদার সাথে কথা বলেন সাংবাদিক পল ব্রেন্নান। দেরিদার ‘দ্যা লা গ্রামাটোলজি’ সম্পর্কিত যেসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি প্রধানত সেসব নিয়ে কথা বলেছেন।
ব্রেন্নান : আপনি এক ধরণের সাহিত্য-বিজ্ঞান তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন- এমন দাবীর বিরুদ্ধে কীভাবে প্রত্যুত্তর করবেন?
দেরিদা : প্রচলিত পদ্ধতির বিজ্ঞান নয়। এটা বিজ্ঞানকে উপস্থাপনের একটা কৌশল, দর্শনেরও-- তাদেরকে বিনির্মাণ করা, একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা (অবশ্য রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও) এবং বিজ্ঞানের অসম্পূর্ণতার সীমানা দেখানো।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ভাষাবিজ্ঞান ফরাসী দৃশ্যপটের বিজ্ঞানজগতে একটি প্রভাববিস্থারী মডেল।
ব্রেন্নান : একজন ব্যাকরণবিদ করতে পারেন কিন্তু অন্য দার্শনিক এবং ভাষাবিজ্ঞানীরা পারেন না, এমন কাজ কোনটি?
দেরিদা : প্রথমে আমি অবশ্যই বলব যে (হাসতে হাসতে) ব্যাকরণতত্ত্ব কখনোই কোনরকমের ধ্বনাত্মক বিজ্ঞান নয়, দর্শনও না; ‘ব্যাকরণতত্ত্ববিদ’ বলতে কিছু নেই। ‘ব্যাকরণবিদ্যা’ বইটি শুধুমাত্র ব্যাকরণতত্ত্বের বই নয়; অবশ্য এটা এমন এক বই, যা ব্যাকরণতত্ত্বের সীমাবদ্ধতার উপর জোর দেয়।
ব্রেন্নান : আপনি জীবিত ভাষার কথা বলেন। এখানে লিখিত ভাষায় কথ্য ভাষার প্রতিফলন ঘটে। আপনি মৃত ভাষার কথাও বলেন, যেখানে লিখিত ভাষার সাথে কথ্য ভাষার কোন সম্পর্ক থাকে না। পৃথিবীতে এই মুহুর্তে টিকে থাকা শত সহস্র ভাষার দিকে যদি তাকান, তাহলে কোন ভাষাগুলোকে প্রবলভাবে জীবিত এবং কোনগুলোকে মরণোন্মুখ বলবেন।
দেরিদা : ক্ষমা করবেন। আমি এরকম কথা কখনো বলিনি। আমি এরকম কখনো বলিনি যে, পূর্ণাঙ্গ জীবিত বা মৃত কোন ভাষা আছে। আমি মনে করি প্রত্যেক ভাষার মধ্যে মৃত্যুর কিছু টুকরো মিশে থাকে। আর ভাষার মধ্যে জীবন এবং মৃত্যুর যে বিরোধ দেখা যায়, তা কৃত্রিম। ভাষা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এই যে, এটা নিজে নিজে জীবন্ত। আর লেখালেখি হল ভাষার মৃত অংশ। আমি ঠিক এই বিষয়টির বিরোধীতা করি। তাই এমন কিছু বলতে যাব না, যে বর্তমানকালে কিছু ভাষা অন্যের চেয়ে বেশি অথবা কম জীবিত। বরং কিছু ভাষা যেমন কারিগরি, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক বা সামরিক স্তরের ভাষাগুলোর মধ্যে শক্তির পার্থক্য থাকে। কিছু ভাষা, যেমন ইংরেজি, রুশ, চিনা -এই ভাষা ক্রমশ আরও বেশি সংখ্যক নতুন মানুষের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে, এবং এইসব মানুষ ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী যারা এসব ব্যবহার করছে তারা সমকালে অন্যদের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। তারপরও আমি এই উপসংহার টানবোনা যে, তারা অন্যভাষার চেয়ে বেশি জীবন্ত।
ব্রেন্নান : আপনি তো কথ্যভাষা, লিখিত ভাষা এবং এদের মধ্যে সম্পর্কগুলোকে বিসদৃশ করে তুললেন।
দেরিদা : আহ… এটা বিরোধীতা না। গত কয়েক বছরে আমি, আমি একটি সহজ ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছি যে ‘লেখালেখি করার ধারণা’ এমন যে, কথ্য ভাষাকে বিভিন্নভাবে লেখা যায়। মানে, আমি একে বলি ‘আর্চি-লিখন’, এটা কথ্যভাষায় ব্যবহার হয়। এটা লেখার ধারণাকে একেবারে বদলে দেয়াকে বোঝায়। অর্থাৎ এদের মধ্যে কোন পরস্পরবিরোধীতা নেই। উদাহরণস্বরূপ ক্যাসেটের টেপে রেকর্ড করাও এক ধরনের ‘লিখন’।
ব্রেন্নান : আপনি আমাদেরকে যে পরামর্শ দিয়েছেন, আমরা যেন নীতিগতভাবে বিভিন্ন মাধ্যম, বলা এবং লেখা সম্পর্কে চিন্তা করা বন্ধ করি। আর ভাষার এই দুই মাধ্যম শুভ ও অশুভত্বের অনেক উর্দ্ধে। এই ভাবনা কেউ কেউ যেমন মার্শাল ম্যাকলুহান যিনি মাধ্যমকে খুবই নৈতিক ভঙ্গিতে ‘মাইক্রোফোন হিটলার তৈরি করে’ এবং আরও অনেক কিছু বলেন- এমন মানুষের সাথে আপনার পার্থক্য তৈরি করে।
দেরিদা : মমম… আমার ধারণা ম্যাকলুহানের আলোচনার যে মতাদর্শ, আমি তার সাথে একমত নই। কারণ তিনি এমন এক ব্যপারে আশাবাদী- যে ধারণায় মনে করা হয় লিখনযন্ত্র এবং এ জাতীয় কিছু থেকে মুক্তি চায় এমন কথ্য ভাষার সম্প্রদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
আমার ধারণা এটা অনেক পুরনো, যেমন প্লেটো, রুশোর কালের গল্প। আর লিখন কার্যের সমাপ্তিকালে আমরা বসবাস করছি- এটা ভাবার চাইতে বরং এটাই মনে হয় যে, আমরা লেখালেখির বিস্তৃত প্রসারিত সময়কালে, লেখালেখির এক আদিগন্ত ব্যপ্ত প্রশস্ত সময়কালে বাস করছি। অন্ততঃ নতুন অর্থে। আমি বর্ণভিত্তিক লেখালেখির কথা বলিনি। বরং যা ব্যবহার করছি (যেমন টেপ রেকর্ডার) এমন নতুন ধরণের মেশিনের কথা বোঝাচ্ছি। এসবকেও আমরা লিখন বলব।
ব্রেন্নান : আপনি রুশোর একটি উক্তি বইয়ের শেষে ব্যবহার করেছেন। উনি লিখনকে এক ধরণের স্বপ্ন বলে লিখেছিলেন। তিনি বলেছেন,
দুঃস্বপ্নের রাতকে আমাদের কাছে দর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়। তুমি বলবে আমিও একজন স্বপ্নবাজ। আমি স্বীকার করি। কিন্তু আমি এমন কাজ করি, যা অন্যরা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমি আমার স্বপ্নগুলোকে স্বপ্ন হিসেবে তুলে ধরি আর পাঠককে ছেড়ে দেই। সে নিজেই খুঁজে বের করুক যে, এইসব স্বপ্নগুলোর নিজের মধ্যে যারা জেগে আছে তাদের উপকারে লাগে এমন কিছু আছে কী না?
আপনার কাছে আমার প্রশ্ন হল, আমাকে এই সাক্ষাৎকারটিকে, একই মানসিকতার মতো করে– শ্রোতা বা পাঠকের ইচ্ছাধীন এক স্বপ্ন হিসেবে গ্রহণ করতে দেবেন কী?
দেরিদা : হ্যাঁ, কিন্তু একথা যদি বলতে দেয়া হয়, তাহলে এমন বোঝাবে যে স্বপ্ন দেখার সময়েও আমি সম্পূর্ণ জাগ্রত থাকি। আর এ সম্পর্কে আমার মধ্যে কোন ভ্রান্তি নেই।
জ্যাক দেরিদার সাক্ষাৎকার
পল ব্রেননান
রূপান্তর: সুশান্ত বর্মণ
পল ব্রেননান
রূপান্তর: সুশান্ত বর্মণ




মন্তব্য