জুনের শেষদিকে যখন বর্ষা নামল, মায়ের গর্ভের ভ্রূণ তখন পুরোপুরি আকার পেয়ে গেছে। হাঁটু আর নাক তো তৈরি হয়েই ছিল; আর ঠিক যতগুলো মাথা গজানোর কথা, সেগুলোও একেবারে ঠিকঠাক জায়গায় বসে গেছে। একেবারে শুরুতে যেটা একটা ফুলস্টপের চেয়ে বিন্দুমাত্র বড়ো ছিল না, সেটাই ধীরে ধীরে বেড়ে একটা কমা, একটা শব্দ, একটা বাক্য, একটা অনুচ্ছেদ, আর তারপর একটা আস্ত অধ্যায়ের আকার নিয়েছিল; এখন সেটা ফেটে পড়ে আরও জটিল সব রূপ নিতে শুরু করেছে, বলা যেতে পারে, রীতিমতো একটা বই—হয়তোবা একটা বিশ্বকোষ—কিংবা আস্ত একটা ভাষা হয়ে ওঠার জোগাড় হয়েছে… সোজা কথায় বলতে গেলে, মায়ের পেটের মাঝখানের ওই মাংসপিণ্ডটা এতটাই বিশাল আর এত বেশি ভারী হয়ে উঠল যে, আমাদের দোতলা-সমান টিলার একেবারে নিচে থাকা ওয়ার্ডেন রোড যখন বৃষ্টির ঘোলাটে হলুদ জলে থইথই করছে, জলে-আটকে-পড়া বাসগুলোতে যখন জং ধরতে শুরু করেছে, বাচ্চারা যখন জলে-ডোবা রাস্তার বুকে সাঁতার কাটছে আর খবরের কাগজগুলো ভিজে জবজবে হয়ে জলের তলায় তলিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়টায়, দোতলার একটা গোলাকার মিনার-ঘরে বসে আমিনা টের পেল যে তার ওই সিসার মতো ভারী বেলুন-পেটের ভারে সে আর একচুলও নড়াচড়া করতে পারছে না।
বিরামহীন বৃষ্টি। সিসা-বাঁধানো শার্শির রঙিন কাচে আঁকা টিউলিপ ফুলগুলো যে জানলায় নেচে উঠত, তার নিচ দিয়ে জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঘরের ভেতর ঢুকছে। জানলার ফ্রেমের ফাঁকে গুঁজে-রাখা তোয়ালেগুলো জল শুষে শুষে শেষমেশ একেবারে ভারী, জবজবে আর পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ল। সমুদ্রটা এখন ধুসর থমথমে, আর দিগন্তের ওই সরু হয়ে-আসা রেখায় বৃষ্টির মেঘেদের সঙ্গে গিয়ে মিশতে সে যেন নিজেকে বহুদূর অবধি বিছিয়ে দিয়েছে। মায়ের কানে বৃষ্টির সেই একটানা ঝমঝম শব্দ, গণৎকারের কথা আর মাতৃসুলভ অন্ধবিশ্বাসের জগাখিচুড়ি, তার সঙ্গে অচেনা মানুষদের ফেলে-যাওয়া জিনিসপত্রের ওই খাপছাড়া উপস্থিতি—সব মিলিয়ে মা যেন কেমন সব অদ্ভুত জিনিসপত্র কল্পনা করতে শুরু করল।
পেটের ভেতর একটু একটু করে বড়ো হতে-থাকা বাচ্চাটার ভারে আটকা পড়ে, আমিনা নিজেকে মোঘল আমলের কোনো এক মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত খুনির মতো ভাবতে লাগল, বড়ো পাথরের নিচে চাপা দিয়ে মেরে ফেলাটা সে-আমলে একটা খুব সাধারণ শাস্তি ছিল... আর এর পরের বছরগুলোতে, মা হওয়ার ঠিক আগের সেই শেষ সময়টার কথা যখনই সে ফিরে ভাবত, সেই সময়টা যখন উলটে-গোনা ক্যালেন্ডারের টিকটক শব্দ সবাইকে ১৫ই আগস্টের দিকে প্রবল বেগে ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, মা বলত: ‘ওসবের আমি কিচ্ছু জানি না। আমার তো মনে হতো সময় যেন একেবারে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। আমার পেটের বাচ্চাটাই ঘড়িগুলোর কাঁটা থামিয়ে দিয়েছিল। এ-ব্যাপারে আমি একেবারে নিশ্চিত। হেসো না: পাহাড়ের নিচে ওই ক্লকটাওয়ারটার কথা মনে আছে? আমি বলছি শোনো, ওই বর্ষার পর সেটা আর কোনোদিনও চলেনি।’
... আর মুসা—বার সেই পুরোনো খাস চাকর, যে কিনা ওই দম্পতির সঙ্গে বম্বেতে এসেছিল, সে অন্য চাকরবাকরদের কাছে খবরটা রটিয়ে দিতে ছুটে গেল। লাল-টালির ছাদওয়ালা ওই প্রাসাদগুলোর হেঁশেলে, ভার্সাই, এস্কোরিয়াল আর স্যাঁ সুসির পেছনের দিকে থাকা চাকরদের খুপরিগুলোতে গিয়ে সে বুক ঠুকে বলতে শুরু করল: ‘একেবারে খাঁটি দশ টাকার একখানা বাচ্চা হতে চলেছে গো; হ্যাঁ রে ভাই! দশ টাকার সাইজের এক পেল্লায় পমফ্রেট মাছ যেন, দেখিস তোরা!’ খবরটা শুনে চাকরবাকরেরা সবাই ভারী খুশি হলো; কারণ নতুন বাচ্চার জন্ম হওয়াটা তো এমনিতেই একটা চমৎকার ব্যাপার, আর সে-বাচ্চা যদি বেশ হৃষ্টপুষ্ট আর নাদুসনুদুস হয়, তবে তো আর কথাই নেই…
... আর আমিনা, যার ওই পেট—ঘড়ির কাঁটা অবধি থামিয়ে দিয়েছিল, সে মিনারের সেই ঘরটায় নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে একজায়গায় থিতু হয়ে বসে তার স্বামীকে বলল, ‘হাতটা একবার রাখো তো দেখি এখানটায়, একটু টের পাচ্ছ কি... ওই তো, পেলে? ... বেশ তাগড়াই একটা ছেলে হবে আমাদের দেখো; আমাদের ছোট্ট চাঁদের কণা।’
বর্ষা শেষ হওয়ার পর, আমিনা যখন আমিনার শরীরটা এতটাই ভারী হয়ে উঠল যে তাকে একজায়গা থেকে নড়াতে গেলে দুজন চাকরকে হাতে হাত রেখে পালকির মতো দোলা বানিয়ে তাকে তুলতে হতো,—ঠিক সেই সময়টায় উই উইলি উইঙ্কি ওই চারটে বাড়ির মাঝখানের গোল চত্বরটায়—যেন বা এক সার্কাসের রিং—আবার তার গান শোনাতে ফিরে এল; আর কেবল তখনই আমিনা বুঝতে পারল যে, টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র ওই পুরস্কারটা জেতার দৌড়ে সে একা নয়, তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে জাঁদরেল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী (অন্তত এই দুজনের কথা সে জানত)। আর তখন তার মনে হলো, ভবিষ্যদ্বাণী ফলুক কি ছাই না-ই ফলুক, শেষবেলার লড়াইটা এবার একেবারে হাড্ডাহাড্ডি হতে চলেছে।
‘উই উইলি উইঙ্কি আমার নাম; গান শুনিয়ে পেট ভরানোই আমার আসল কাম!’
সাবেক জাদুকর, ভেলকিবাজ, বায়স্কোপ-ওয়ালা আর ওই সব গাইয়ে-বাজিয়ে... আমি জন্মানোর ঢের আগেই যেন আমার জীবনের ছকটা কষা হয়ে গিয়েছিল। আমোদপ্রমোদের এই কারবারিরাই যে আমার গোটা জীবনের সুর বেঁধে দেবে, তা যেন ঠিক হয়েই ছিল।
‘আশা করি আপনারা সব কম-ফোর-টেবল—মানে বেশ আয়েশেই আছেন! ...নাকি আপনারা সব কাম-ফোর-টি? মানে চা খেতে এসেছেন? ওহ্, জোক করলাম, জোক! ও লেডিজ অ্যান্ড ল্যাডাস, কই দেখি এবার একটু হাসুন তো দেখি!’
লম্বাকালোসুদর্শন চেহারার এক সং, হাতে অ্যাকর্ডিয়ান—সে এসে দাঁড়িয়েছিল ওই গোল চত্বরে। ওদিকে বাকিংহ্যাম ভিলার বাগানে, উইলিয়াম মেথওল্ডের ওই মাঝখানে-কাটা সিঁথির ঠিক পাশে আর নিচে আমার বাবার পায়ের বুড়ো আঙুলটা (তার বাকি ন-জন সঙ্গীকে সাথে নিয়ে) পায়চারি করে বেড়াচ্ছিল... চটি-পরা, ফোলা ফোলা সেই আঙুলটা ঘুণাক্ষরেও জানত না যে তার কপালে কী চরম এক সর্বনাশ ঘনিয়ে আসছে। আর উই উইলি উইঙ্কি (যার আসল নামটা আমরা কোনোদিনও জানতে পারিনি) দিব্যি একের পর এক রসিকতা করে যাচ্ছিল ও গান শোনাচ্ছিল। দোতলার একটা বারান্দা থেকে আমিনা সেসব দেখছিল আর শুনছিল; আর ঠিক তখনই সে টের পেল, পাশের বারান্দা থেকে ধেয়ে-আসা নুসি-দ্য-ডাকের সেই হিংসে আর রেষারেষি-মাখানো তীক্ষ্ণ চাহনিটা কেমন কাঁটার মতো তার গায়ে এসে বিঁধছে।
... ওদিকে নিজের ডেস্কে বসে আমি পদ্মার সেই অধৈর্য হয়ে ওঠার তীব্র হুলটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। (মাঝেমধ্যেই আমার মনে হয়, ইশ, আমার যদি আরও একটু সমঝদার কোনো শ্রোতা থাকত, এমন কেউ… যে কিনা লেখার তাল, লয় আর ওই মিহি সুরগুলোর সূক্ষ্ম বুননের দরকারটা বুঝত, যে সুরগুলোই পরে একটু একটু করে চড়ে গিয়ে, ফুলেফেঁপে উঠে পুরো গানটার দখল নেবে; এমন কেউ যে অন্তত এটুকু বুঝত যে, যদিও আসন্ন প্রসবের ভারে আর তুমুল বর্ষায় এস্টেটের ক্লক-টাওয়ারের ওই ঘড়িটাকে একেবারে চুপ করিয়ে দিয়েছে, তবুও মাউন্টব্যাটেনের সেই টিকটক কিন্তু এখনও বেজেই চলেছে, খুব ধীর লয়ে হলেও সে-আওয়াজকে থামানোর কোনো উপায় নেই, আর তার সেই একঘেয়ে, একটানা ড্রামের আওয়াজের মতো দ্রিমিদিমি সুরটা দিয়ে আমাদের কানদুটো ভরিয়ে তোলাটা এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।) পদ্মা বলে: ‘এসব উইঙ্কি-ফুঙ্কির গপ্পো ছাড়ো তো বাপু; দিনরাত এক করে অপেক্ষা করে মরেছি, আর তুমি এখনও নিজের জন্মানোর কথাটায় এসে পৌঁছোতেই পারলে না!’ কিন্তু আমি তাকে একটু ধৈর্য ধরতে বলি; সবকিছুরই তো একটা নির্দিষ্ট পরিসর আছে, আমার এই গোবর-পদ্মটিকে আমি একটু বকুনি দিয়েই বলি, ওই যে উইঙ্কি, ওরও একটা ভূমিকা আছে নাকি। বারান্দায় বসে থাকা গর্ভবতী মেমসাহেবদের ও এখন কেমন ক্ষ্যাপাচ্ছে দেখো। গান গাইতে গাইতেই একটু থেমে সে বলে ওঠে, ‘পুরস্কারের কথাটা আপনারা শুনেছেন তো, মেমসাহেবরা? আমিও শুনেছি। আমার বনিতারও সময় একেবারে ঘনিয়ে এসেছে, এই হলো বলে; কে বলতে পারে, খবরের কাগজে হয়তো আপনাদের বদলে ওর ছবিটাই ছাপা হবে!’ … আর আমিনা তখন ভুরু কুঁচকে আছে, এবং ওই মাঝখানে-কাটা সিঁথির নিচে মেথওল্ড মুচকি হাসছেন (হাসিটা কি একটু জোর-করা? কিন্তু কেন?), আর আমার বাবার পায়ের বুড়ো আঙুলটা নাচাতে নাচাতে, তখন বেশ বিচারকের মতো গম্ভীর হয়ে ঠোঁট উলটে বলছেন, ‘বড়ো বেয়াদব লোক তো; ও কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি করছে।’ কিন্তু মেথওল্ড এবার যেন একটু অপ্রস্তুত হয়েই—এমনকী বেশ কিছুটা অপরাধবোধ নিয়েই!—আহমেদ সিনাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কী যে বলেন, মশাই। এদের তো কাজই হলো সঙ্ সাজা, বুঝলেন না। লোককে খেপিয়ে তোলা আর জ্বালাতন করারই তো লাইসেন্স দেওয়া আছে এদের। সমাজের ক্ষোভ উগরে দেওয়ার জন্য এমন একটা ব্যবস্থা থাকাটা তো খুবই জরুরি।’ আর আমার বাবা, কাঁধ ঝাঁকিয়ে শুধু বললেন, ‘হুঁ।’ তবে লোকটা, এই উইঙ্কি—বেশ চালাকচতুর, কারণ সে এখন আসরে জল ঢালার চেষ্টা করছে, বলছে, ‘একটা বাচ্চার জন্ম হওয়া তো দারুণ ব্যাপার; আর দুটো বাচ্চা হলে ব্যাপারটা দুটো-দারুণ! মানে টু ফাইন, বুঝলেন না ম্যাডামেরা, রসিকতা করলাম আর কি?’ আর ঠিক তখনই তার মেজাজটা আচমকা বদলে গেল, যখন সে খুব নাটকীয় একটা কথা পেড়ে বসল, একেবারে অভিভূত করে দেওয়ার মতো একটা জরুরি ভাবনা: ‘লেডিজ আর জেন্টলমেনরা, আপনারা আমাকে বলুন তো, মিস্টার মেথওল্ড সাহেবের এত পুরোনো অতীতের মাঝখানে বসে আপনাদের ভালো লাগে কী করে? আমি বলছি শুনুন: এটা নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে খুব অদ্ভুত লাগে; মনে হয় যেন সত্যি নয়; কিন্তু এখন তো এটা একটা নতুন জায়গা হয়ে উঠেছে, লেডিরা, ল্যাডারা, আর যতক্ষণ না সেখানে একটা বাচ্চার জন্ম হচ্ছে, কোনো নতুন জায়গাই ঠিক সত্যিকারের হয়ে ওঠে না। ওই প্রথম বাচ্চার জন্ম নেওয়াতেই আপনাদের মনে হবে যে এটা আপনাদের নিজের বাড়ি।’ আর তারপরই, একটা গান: ‘ডেইজি, ডেইজি…’ আর মিস্টার মেথওল্ডও সেই গানে গলা মেলালেন, কিন্তু তবুও তাঁর কপালের ওপর কীসের যেন একটা কালো ছায়া লেগেই আছে...
... আর আসল কথাটা হলো: হ্যাঁ, ব্যাপারটা অপরাধবোধই বটে, কারণ আমাদের উইঙ্কি হয়তো বেশ চালাকচতুর আর মজার মানুষ হতে পারে, কিন্তু সে অতটাও সেয়ানা নয়, আর এবার উইলিয়াম মেথওল্ডের সেই মাঝখানে-কাটা সিঁথির প্রথম রহস্যটা ফাঁস করার সময় এসেছে, কারণ তার ছাপ গড়িয়ে পড়ে মানুষটার মুখটাকে কালিমালিপ্ত করেছিল: এই টিকটক শব্দ আর সবসুদ্ধু বেচে দেওয়ার পাট চুকিয়ে ফেলার অনেক দিন আগের কথা, একদিন মিস্টার মেথওয়াল্ড উইঙ্কি আর তার বনিতাকে একটু নিরিবিলিতে তাঁকে গান শোনানোর জন্য ডেকে পাঠিয়েছিলেন। জায়গাটা হলো এখনকার দিনে আমার বাবা-মায়ের ওই বড়ো বসার ঘরটা; আর কিছুক্ষণ গানবাজনা চলার পর তিনি বলেছিলেন, ‘শোনো উই উইলি, ভাই আমার একটা উপকার করে দাও তো: মাথাটা একেবারে ছিঁড়ে যাচ্ছে, আমার এই প্রেসক্রিপশনের ওষুধগুলো একটু এনে দিতে হবে, এটা সোজা কেম্পস কর্নারে নিয়ে গিয়ে ওষুধের দোকান থেকে বড়িগুলো নিয়ে এসো দিকি, চাকরবাকরগুলোরও সব কটার ঠান্ডা লেগে বসে আছে।’
উইঙ্কি তো গরিব মানুষ, তাই সে এককথায় জি সাহেব, এক্ষুনি আনছি সাহেব বলে বেরিয়ে গেল; আর তারপর বনিতা ওই মাঝখানে-কাটা সিঁথিটার সঙ্গে একা হয়ে গেল, সে টের পাচ্ছিল সিঁথিটা যেন তার আঙুলগুলোকে এমনই এক অমোঘ টানে কাছে টানছে, যা এড়ানো তার পক্ষে একপ্রকার অসম্ভব; আর মেথওল্ড যখন একটা বেতের চেয়ারে মূর্তির মতো চুপচাপ বসে ছিলেন, গায়ে তাঁর হালকা ক্রিম-রঙা স্যুট, যার কলারে গোঁজা একটা মাত্র গোলাপ ফুল, বনিতা খেয়াল করল যে সে নিজেই আঙুল বাড়িয়ে মানুষটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সে টের পেল তার আঙুলগুলো চুল ছুঁয়েছে; মাঝখানের সেই সিঁথিটা খুঁজে পেল; আর তারপর সে সেটা একেবারে ঘেঁটে দিতে শুরু করল।
আর তাই এখন, ঠিক ন-মাস পর, উই উইলি উইঙ্কি যখন তার বউয়ের আসন্ন বাচ্চা হওয়ার কথা নিয়ে রসিকতা করছে, তখন এক ইংরেজ সাহেবের কপালে একটা কালো দাগ ফুটে উঠল।
‘তাতে কী?’ পদ্মা বলে ওঠে। ‘এই উইঙ্কি আর তার বউ—যাদের কথা তুমি আমাকে ভালো করে বলোইনি—তাদের নিয়ে আমার কীসের এত মাথাব্যথা শুনি?’
কিছু মানুষ কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারে না; তবে পদ্মা হবে, খুব শিগগিরই হবে।
আর এখন সে হতে চলেছে: আরও বেশি অধৈর্য; কারণ, মেথওল্ডস এস্টেটের ঘটনাবলি থেকে দীর্ঘ এক ঘূর্ণিতে পাক খেতে খেতে ক্রমশ ওপরের দিকে উঠতে উঠতে—গোল্ডফিশ আর কুকুর, বাচ্চাদের প্রতিযোগিতা আর ওই মাঝখানে-কাটা সিঁথি থেকে বহু দূরে, পায়ের বুড়ো আঙুল আর টালি-বসানো ছাদগুলো ছাড়িয়ে বহু উঁচুতে—সদ্য-শেষ-হওয়া বৃষ্টির পর একেবারে তরতাজা আর ঝকঝকে হয়ে-ওঠা এই শহরের বুকের ওপর দিয়ে আমি উড়ে চলেছি; আহমেদ আর আমিনাকে উই উইলি উইঙ্কির গানে মগ্ন থাকতে দিয়ে, আমি ডানা মেলেছি ওল্ড ফোর্ট এলাকার দিকে, ফ্লোরা ফাউন্টেনকে পেছনে ফেলে আমি এসে পৌঁছোচ্ছি পেল্লায় এক ইমারতের সামনে, যার ভেতরটা স্তিমিত এক আলো-আঁধারি আর দুলতে-থাকা ধুনুচির সুগন্ধে ভরপুর... কারণ ঠিক এখানেই, সেন্ট থমাস ক্যাথিড্রালের ভেতর, মিস মেরি পেরেইরা এখন ঈশ্বরের গায়ের রং কেমন হয়, সেই পাঠ নিচ্ছে।
‘নীল,’ তরুণ পাদ্রি বেশ আন্তরিক গলাতেই বললেন। ‘যাবতীয় যা প্রমাণ পাওয়া যায়, বাছা, তা থেকে তো এটাই বোঝা যায় যে আমাদের প্রভু যিশু খ্রিস্টের গায়ের রং ছিল হালকা আকাশের মতো নীল, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ আর অপরূপ সুন্দর এক আভা।’
পাপ স্বীকার করার সেই কনফেশন-বক্সের কাঠের জাল-কাটা জানলাটার ওপাশে বসে-থাকা ছোট্টখাট্টো চেহারার মহিলাটি এক মুহূর্তের জন্য একেবারে চুপ মেরে গেলেন। বেশ একটা ভাবনায়-পড়া, উদ্বিগ্ন নীরবতা। তারপর: ‘কিন্তু তা কী করে সম্ভব, ফাদার? মানুষের রং তো আর নীল হয় না। এই এত বড়ো দুনিয়ায় কোনো মানুষের রংই তো নীল নয়!’
ছোট্টখাট্টো মহিলাটির ওই অবাক হওয়ার পাল্লা দিয়ে তরুণ পাদ্রিও রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেন... কারণ মহিলা তো এমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে বলে কথা ছিল না। বিশপ বলেছিলেন, ‘নতুন ধর্মান্তরিতদের নিয়ে এই এক সমস্যা... ওরা যখন রং নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন তারা প্রায় সবসময়ই ওই দলের... তবে সেতুবন্ধন করাটা খুব জরুরি, বৎস। মনে রেখো,’ বিশপ এমনভাবেই বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর হলেন স্বয়ং প্রেম; আর হিন্দুদের প্রেমের দেবতা কৃষ্ণের গায়ের রং সবসময় নীল হিসেবেই দেখানো হয়। তুমি ওদের নীল বলবে; এটা দুটো বিশ্বাসের মধ্যে এক ধরনের সেতু তৈরি করবে; খুব আলতো করে ব্যাপারটা সামলাবে, বুঝতে পারছ তো; আর তা ছাড়া নীল একটা বেশ নিরপেক্ষ রং, সাধারণ রঙের ঝামেলাগুলো অনায়াসে এড়ানো যায়, সাদাকালোর দ্বন্দ্ব থেকে দূরে থাকা যায়: হ্যাঁ, সব মিলিয়ে আমি নিশ্চিত যে এই রংটাই বেছে নেওয়া ঠিক হবে।’ বিশপরাও যে ভুল করতে পারেন, তরুণ পাদ্রি এখন মনে মনে সেটাই ভাবছেন, তবে আপাতত তিনি বেশ ফাঁপরেই পড়েছেন, কারণ ওই ছোট্টখাট্টো মহিলাটি যে রীতিমতো তেতে উঠছেন তা বেশ বোঝাই যাচ্ছে, আর কাঠের জালিটার ফাঁক দিয়ে তিনি কড়া ভাষায় ধমকাতে শুরু করেছেন: ‘নীল আবার কেমন উত্তর হলো, ফাদার, এমন কথা কি বিশ্বাস করা যায়? রোমে হোলি ফাদার পোপের কাছে আপনার একটা চিঠি লেখা উচিত, তিনি নিশ্চয়ই আপনাকে সঠিক পথ দেখাবেন; তবে মানুষের গায়ের রং যে কোনোদিনও নীল হয় না, এটা বোঝার জন্য তো আর পোপ হওয়ার দরকার পড়ে না!’ তরুণ পাদ্রি চোখ বন্ধ করলেন; একটা লম্বা শ্বাস নিলেন; তারপর পালটা আক্রমণ শানালেন। ‘ত্বকের রং নীল করেও নেওয়া যায়,’ তিনি একটু তোতলাতে তোতলাতেই বললেন। ‘যেমন পিক্টরা; নীল রঙের পোশাক পরা আরবের যাযাবরেরা; তুমি যদি আরেকটু পড়াশোনা করতে বাছা, তাহলে বুঝতে পারতে…’ কিন্তু এবার কনফেশন-বক্সের ভেতর এক খেঁকিয়ে-ওঠা রাগী গলা প্রতিধ্বনিত হলো। ‘কী বলছেন, ফাদার? আপনি আমাদের প্রভুর সাথে ওইসব জংলি বুনো মানুষদের তুলনা করছেন? হে ঈশ্বর, লজ্জায় আমার কান দুটো ধরে বসে থাকা উচিত!’ … আর এরপর আরও অনেক, অনেক কথাই হলো, ওদিকে তরুণ ফাদারের পেটের ভেতর তখন ভয়ে গুড়গুড় করছে, আর হঠাৎই তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল যে, এই নীল রঙের ব্যাপারটা নিয়ে এত হইচইয়ের পেছনে নিশ্চয়ই আরও বড়ো কোনো কারণ ঘাপটি মেরে আছে, আর তিনি প্রশ্নটা করেই বসলেন; আর তাতেই ওই লম্বা চওড়া বকুনির বদলে শুরু হলো কান্নাকাটি, আর তরুণ পাদ্রি ঘাবড়ে গিয়ে বলে উঠলেন, ‘আরে আরে শান্ত হও, আমাদের প্রভুর ওই স্বর্গীয় রূপ কি আর কেবল একটা সাধারণ রঙের ব্যাপার হতে পারে?’ … আর তখন চোখের ওই বাঁধ-ভাঙা নোনা জলের স্রোতের মধ্যে দিয়ে একটা গলা ভেসে এল: ‘তা ঠিক, ফাদার, আপনি আসলে মানুষটা খুব একটা খারাপ নন; আমি তাকে ঠিক এই কথাটাই বলেছিলাম, একেবারে হুবহু এই কথাটাই, কিন্তু সে আমাকে ভীষণ খারাপ খারাপ কথা শোনাল, আর আমার একটা কথাও কানে তুলল না…’ তো, এই হলো গিয়ে ব্যাপার, গল্পের মধ্যে অবশেষে ওই লোকটার প্রবেশ ঘটেছে, আর এবার একে একে সব কথাই বেরিয়ে এল, আর কুমারী, ছোট্টখাট্টো, দিশেহারা মিস মেরি পেরেইরা এমন এক স্বীকারোক্তি করে বসল, যা থেকে আমরা একটা খুব জরুরি ইঙ্গিত পেয়ে যাই যে, ঠিক কী কারণে আমার জন্মের রাতে সে এমন একটা কাজ করে বসেছিল—যে কাজটা কিনা আমার দাদুর সেই নাক-ঠোকার সময় থেকে শুরু করে আমার বড়ো হয়ে ওঠা পর্যন্ত, বিংশ শতাব্দীর ভারতবর্ষের পুরো ইতিহাসে সবচেয়ে শেষের আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হয়ে রয়ে গেল।
মেরি পেরেইরার স্বীকারোক্তি: প্রত্যেক মেরির যেমন একজন জোসেফ থাকে, তারও ঠিক তেমনই একজন জোসেফ ছিল। জোসেফ ডি’কস্টা, পেডার রোডে ডাক্তার নার্লিকারস নার্সিং হোম নামের এক ক্লিনিকের আর্দালি (‘ওহো!’ পদ্মা তাহলে শেষমেশ একটা যোগসূত্র খুঁজে পেল বটে), যেখানটায় সে নিজে ধাইমার কাজ করত। প্রথম দিকটায় সবকিছু বেশ ভালোই চলছিল; লোকটা তাকে কখনো-সখনো চা, কিংবা লস্যি, নয়তো ফালুদা খাওয়াতে নিয়ে যেত আর মিষ্টি মিষ্টি কথা শোনাত। লোকটার চোখদুটো ছিল ঠিক রাস্তা-খোঁড়া ড্রিল মেশিনের মতো—কঠিন আর তীক্ষ্ণ, যেন সারাক্ষণ একটা খটখট আওয়াজ তুলে চলেছে, কিন্তু সে কথা বলত ভারী মোলায়েম আর সুন্দর করে। কুমারী, ছোট্টখাট্টো আর নাদুসনুদুস চেহারার মেরি তার এই আদরযত্ন বেশ তারিয়ে তারিয়েই উপভোগ করত; কিন্তু এখন সবকিছু একেবারে পালটে গেছে।
‘হঠাৎ হঠাৎ করেই সে সারাক্ষণ কেবল বাতাস শুঁকে বেড়াচ্ছে। কেমন একটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে, নাকটা একটু উঁচিয়ে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী গো জো, তোমার কি ঠান্ডা-ফান্ডা লাগল নাকি?’ কিন্তু ও বলল, না; না, ও নাকি উত্তরের বাতাস শুঁকছে। আমি তো শুনে বলি, ‘জো, বম্বেতে তো হাওয়া আসে সমুদ্রের দিক থেকে, পশ্চিম দিক থেকে, জো…’ মেরি পেরেইরা ভারী করুণ আর কাঁপা-কাঁপা গলায় এরপর জোসেফ ডি’কস্টার সেই রেগে-ফেটে-পড়ার কথাটা শোনাল, জোসেফ তাকে বলেছিল, ‘তুমি কিচ্ছুটি জানো না মেরি, বাতাস এখন উত্তর দিক থেকেই আসছে, আর সেই বাতাস একেবারে মৃত্যুর গন্ধে ভারী হয়ে আছে। এই স্বাধীনতা তো কেবল বড়োলোকদের জন্য; গরিবগুলোকে দিয়ে মশা-মাছির মতো একে অপরকে খুন করানো হচ্ছে। পাঞ্জাবে, বাংলায়। দাঙ্গা আর দাঙ্গা, গরিবের বিরুদ্ধে গরিবের লড়াই। ওই বাতাসের মধ্যেই সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে।’
আর মেরি বলেছিল: ‘তুমি পাগলের মতো কীসব বকছ জো, ওইসব জঘন্য জিনিস নিয়ে খামোখা তুমি এত মাথা ঘামাচ্ছ কেন? আমরা তো এখনও দিব্যি শান্তিতেই দিন কাটাতে পারি, তাই না?’
‘বাদ দাও, তুমি এসবের বিন্দুবিসর্গও বুঝবে না।’
‘কিন্তু জোসেফ, খুনোখুনির ব্যাপারটা যদি সত্যিও হয়, ওরা তো সব হিন্দু আর মুসলমান; ভালো খ্রিষ্টান মানুষদের খামোখা তুমি ওদের লড়াইয়ের মধ্যে জড়াচ্ছ কেন? ওরা তো অনন্তকাল ধরেই একে অপরকে মেরে আসছে।’
‘তুমি আর তোমার ওই খ্রিস্ট! তোমার মাথায় কি এটুকুও ঢোকে না যে ওটা ওই সাদা চামড়ার লোকেদের ধর্ম? সাহেবদের ঈশ্বরকে সাহেবদের জন্যই ছেড়ে দাও। ঠিক এই মুহূর্তে আমাদের নিজেদের লোকেরা মারা পড়ছে। আমাদের এবার পালটা রুখে দাঁড়াতে হবে; লোকজনকে চোখ খুলে দেখাতে হবে যে নিজেদের মধ্যে মারামারি না করে আসলে কাদের বিরুদ্ধে লড়া উচিত, বুঝতে পারছ?’
আর মেরি বলল, ‘আর ঠিক এই কারণেই রঙের ব্যাপারটা নিয়ে আপনাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ফাদার... আমি জোসেফকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি, বলেছি মারামারি করাটা ভালো নয়, ওইসব পাগলামি-মার্কা চিন্তাভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফ্যালো; কিন্তু তারপর থেকে ও আমার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিল, আর যত সব সাঙ্ঘাতিক লোকেদের সাথে মেলামেশা শুরু করল। ওকে নিয়ে তখন নানা রকম গুজব ছড়াতে শুরু করেছে, ফাদার—ও নাকি বড়ো বড়ো গাড়ি লক্ষ্য করে ইট ছুড়ছে, বোতলে আগুন ধরিয়ে ছুড়ে মারছে; ও একেবারে পাগল হয়ে গেছে ফাদার, লোকে বলছে ও নাকি বাসে আগুন লাগাতে আর ট্রাম উড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে, আর যে কত কী করছে কে জানে! কী আর করব ফাদার, তাই আমি আমার বোনকে সব কথা খুলে বললাম। আমার বোন অ্যালিস, মেয়েটা সত্যিই খুব ভালো, ফাদার। আমি তাকে বলেছিলাম: ‘ওই জো থাকে কসাইখানার কাছে, হয়তো ওই রক্তের গন্ধটাই ওর নাকে ঢুকে ওর মাথাটা একেবারে গুলিয়ে দিয়েছে।’ তাই অ্যালিস ওকে খুঁজতে গেল। যাওয়ার আগে বলল, ‘আমি তোমার হয়ে ওর সাথে কথা বলব; কিন্তু তারপর, হে ঈশ্বর, দুনিয়াটার যে কী হচ্ছে... আপনাকে আমি সত্যি বলছি, ফাদার... ও বাবা…’ আর চোখের জলের তোড়ে তার কথাগুলো যেন তলিয়ে গেল, বুকের ভেতরের গোপন কথাগুলো তার চোখ বেয়ে নোনা জল হয়ে চুঁইয়ে পড়তে লাগল। কারণ অ্যালিস ফিরে এসে জানাল যে, তার মতে আসলে সব দোষ মেরিরই। জোসেফ দেশের মানুষকে জাগিয়ে তোলার যে দেশপ্রেমের কাজে নেমেছে, মেরি তাকে তাতে একটুও সাহস জোগায়নি, উলটে ঘ্যানঘ্যান করে তাকে এমনই বিরক্ত করেছে যে লোকটা আর তাকে দু-চোখে দেখতে পারছে না। অ্যালিস ছিল মেরির চেয়ে বয়সে ছোটো; আর দেখতেও বেশ সুন্দরী; আর এরপর আরও নানা গুজব ডালপালা মেলতে শুরু করল, অ্যালিস আর জোসেফের প্রেমের কেচ্ছা, আর সে-সব শুনে মেরির তো একেবারে পাগল-পাগল দশা।
‘ওই মেয়েটা,’ মেরি বলল, ‘এই রাজনীতি-টাজনীতির ও কী-ই বা বোঝে? স্রেফ আমার জোসেফকে নিজের মুঠোয় করার জন্যই লোকটা যা-সব আবোলতাবোল বকে, ও ঠিক একটা বোকা ময়না পাখির মতো সেগুলোই আউড়ে যায়। আমি দিব্যি কেটে বলছি, ফাদার…’
‘সাবধান, বাছা। তুমি কিন্তু ঈশ্বরনিন্দার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছ…’
‘না ফাদার, আমি ঈশ্বরের নামে দিব্যি করে বলছি, ওই মানুষটাকে নিজের কাছে ফিরে পাওয়ার জন্য আমি হেন কাজ নেই যা করতে পারি না। হ্যাঁ: তা সে... থাক গে বাদ দিন ও যা-ই... আই-ও-আই-ওওও!’
চোখের নোনা জলে কনফেশন-বক্সের মেঝে যেন ধুয়ে যাচ্ছে... আর ঠিক এই সময়, ওই তরুণ পাদ্রির মনে কি নতুন কোনো ধর্মসংকটের উদয় হলো? পেটের ভেতর ওই চরম অস্বস্তি সত্ত্বেও, তিনি কি এক অদৃশ্য দাঁড়িপাল্লায় মেপে দেখছেন—একদিকে পাপ-স্বীকারোক্তির পবিত্রতা, আর অন্যদিকে জোসেফ ডি’কস্টার মতো এক সাঙ্ঘাতিক মানুষের হাত থেকে সভ্য সমাজের ঘোরতর বিপদের দিকটা? তিনি কি সত্যিই মেরির কাছ থেকে তার জোসেফের ঠিকানাটা চেয়ে নেবেন, আর তারপর সবটা ফাঁস করে দেবেন... সোজা কথায় বলতে গেলে, ওপরওয়ালা বিশপের আদেশের ভার আর পেটের গোলমালে নাজেহাল এই তরুণ পাদ্রির কি আই কনফেস ছবিতে মন্টগোমারি ক্লিফটের মতো আচরণ করবেন, নাকি ঠিক তার উলটোটা? (বেশ কয়েক বছর আগে নিউ এম্পায়ার সিনেমায় বসে ছবিটা দেখার সময় আমি নিজেই অবশ্য এর কোনো সুরাহা করতে পারিনি।)—তবে না থাক; আরও একবার আমাকে আমার এই সব ভিত্তিহীন সন্দেহগুলো গলা টিপে মেরে ফেলতে হবে। জোসেফের কপালে যা ঘটার ছিল, শেষমেশ হয়তো তা এমনিতেই ঘটত। আর খুব সম্ভবত আমার এই গল্পের ইতিহাসে ওই তরুণ পাদ্রির একটাই ভূমিকা ছিল, আর তা হলো—তিনিই ছিলেন বাইরের দুনিয়ার সেই প্রথম মানুষ, যিনি বড়োলোকদের প্রতি জোসেফ ডি’কস্টার ওই হাড়-জ্বালানো বিষাক্ত ঘৃণা আর মেরি পেরেইরার বুক-ফাটা হাহাকারের কথা নিজের কানে শুনেছিলেন।
কাল আমি ভালো করে স্নান সেরে দাড়ি কামাব; গায়ে চড়াব একেবারে আনকোরা নতুন একটা কুর্তা, বেশ চকচকে আর কড়কড়ে ইস্ত্রি-করা, আর তার সাথে জুতসই একটা পাজামা। পায়ে গলাব ডগার দিকটা ওপর-পানে-বাঁকানো সেই আয়নার-কাজ-করা চটিজোড়া, চুলটা বেশ পরিপাটি করে আঁচড়ানো থাকবে (তবে মাঝখানে-কাটা সিঁথি মোটেই নয়), দাঁতগুলো একেবারে ঝকঝক করবে... এক কথায় বলতে গেলে, নিজেকে একেবারে খাসা সাজে সাজিয়ে তুলব। (‘যাক বাবা, বাঁচা গেল’—ঠোঁট উলটে বলে উঠল পদ্মা।)
অবশেষে কালকে সেইসব গল্পের পাট চুকবে, যেগুলোর জন্মলগ্নে আমি নিজে হাজির না থাকায়, আমাকে এতদিন মনের ওই পাক-খাওয়া গহীন তলদেশ থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনতে হচ্ছিল; কারণ মাউন্টব্যাটেনের উলটে-গোনা ক্যালেন্ডারের কাঁটায়-কাঁটায়-মাপা সেই দ্রিমিদ্রিমি আওয়াজটাকে তো আর কোনোভাবেই এড়ানো যাচ্ছে না। মেথওয়াল্ডস এস্টেটে, বুড়ো মুসা এখনও একটা টাইমবোমার মতো টিকটিক করে চলেছে ঠিকই; কিন্তু তার সেই আওয়াজ আর কানে আসছে না, কারণ অন্য আরেকটা আওয়াজ এখন চারপাশ থেকে ফুলেফেঁপে উঠছে—কান-ফাটানো, নাছোড়বান্দা এক আওয়াজ; একটা একটা করে সেকেন্ড পেরিয়ে যাওয়ার আওয়াজ, প্রবল বেগে ধেয়ে-আসা এক অবধারিত মধ্যরাত।
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য