সালটা ১৯৪৭, ১৪ই আগস্ট। গোটা ভারতবর্ষ তখন একটা ঘোরের মধ্যে। প্রায় দু’শো বছরের ব্রিটিশ শাসনের পাট চুকতে চলেছে, সবাই স্বাধীনতার জন্য অধীর অপেক্ষায় রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগোচ্ছে মাঝরাতের দিকে। অন্যদিকে বম্বে শহরের এক প্রান্তে প্রসবযন্ত্রণায় ছটফট করছেন এক নারী।
এল মাহেন্দ্রক্ষণ। মধ্যরাতে, ঘড়ির কাঁটা যখন বারোটা ছুঁল, তখন একসাথে জন্ম নিল একটা ছোট্ট শিশু—সালিম সিনাই। জন্ম নিল দুটো আনকোরা নতুন দেশ।
সালমান রুশদির বিখ্যাত উপন্যাস ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’-এর সূচনা ঠিক এভাবেই।
সালিমের বয়স আর স্বাধীন দুই দেশের বয়স একেবারে কাঁটায় কাঁটায় একই। কাহিনি আবর্তিত হয় সালিমের জীবনের তিরিশটা বছর ঘিরে। সেই গল্প কখনো ফিরে গেছে অতীতে, কখনো বা উঁকি দিয়েছে ভবিষ্যতে; উন্মোচন করেছে পরিবারের নানা গোপন রহস্য।
তবে সবচেয়ে বড় রহস্যটা হলো সালিমের কিছু অদ্ভুত জাদুকরী ক্ষমতা। আর সেই ক্ষমতার সাথে তার জন্মের ওই অদ্ভুত সময়টার এক গভীর যোগ রয়েছে। শুধু সালিম নয়, ওই মধ্যরাতে বা তার আশেপাশে জন্মানো সব ছেলেমেয়ের মধ্যেই ভর করেছে কোনো না কোনো অলৌকিক ক্ষমতা।
নিজের মন-পড়ার ক্ষমতা বা টেলিপ্যাথি দিয়ে সালিম এই ‘মধ্যরাতের সন্তানদের’ এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। তাদের মধ্যে এমন কেউ আছে যে দিব্যি আয়না আর সময়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলে যেতে পারে, এমন শিশু আছে যে জলে ডুব দিলেই নিজের লিঙ্গ বদলে ফেলে, আবার এমন যমজ-বাচ্চাও আছে যারা অনায়াসে অনেকগুলো ভাষায় কথা বলতে পারে। এই সমস্ত জাদুকরী ঘটনা আর ইতিহাসের গোলকধাঁধায় সালিমই আমাদের হাত ধরে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে।
সালিমের জন্মদিনটা একদিকে যেমন আনন্দের, তেমনই ভারতের ইতিহাসের এক চরম অস্থির সময়েরও সাক্ষী। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে দেশভাগ—যার ফলে ব্রিটিশ ভারত ভেঙে তৈরি হলো ভারত আর পাকিস্তান। তারপর ১৯৬৫ আর ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং সবশেষে ইন্দিরা গান্ধীর আমলের সেই জরুরি অবস্থা—সব কিছুই সালিমের গল্পে ছুঁয়ে গেছে।
এজন্যেই ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’-কে উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের এক অনবদ্য দলিল বলে ধরা হয়। যে সাহিত্য--উপনিবেশের প্রভাব, বিপ্লব, দেশত্যাগ আর মানুষের আত্মপরিচয় খোঁজার লড়াইয়ের কথা বলে।
লেখক সালমান রুশদি নিজেও জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালে। ভারত ও ব্রিটেনে পড়াশোনা করা এই লেখক তাঁর লেখায় ইতিহাস, রাজনীতি আর জাদুকরী বাস্তবতাকে এমনভাবে মিশিয়েছেন যা সত্যিই অভাবনীয়। ভারতীয় আর পাকিস্তানি সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ—পারিবারিক রীতিনীতি, খাবারদাবার, ধর্ম থেকে শুরু করে রূপকথার গল্প দিয়ে তিনি এই উপন্যাসকে ভরিয়ে তুলেছেন।
গল্প বলার ধরনেও আছে এক অদ্ভুত জাদু। প্রেমিকা পদ্মার কড়া নজরের সামনে বসে রাতের পর রাত গল্প লিখে চলে সালিম। ঠিক যেন ‘আরব্য রজনী’-র সেই শাহরজাদ, যে নিজের প্রাণ বাঁচাতে রাজাকে একের পর এক গল্প শুনিয়ে যেত। সেলিমের চোখে এই ‘হাজার এক’ সংখ্যাটাই হলো রাত, জাদু আর নানা রকমের বাস্তবের প্রতীক।
এই উপন্যাসটি পড়া অনেকটা রোলারকোস্টারে চড়ার মতো। সেলিম নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে, “আমি কে? কী আমি? উত্তর হলো—আমি সবাই। এই পৃথিবীতে যা কিছু আমাকে ছুঁয়েছে, আমি তাদের সবাইকে ছুঁয়েছি। আমি না থাকলে যা হয়তো ঘটতই না—আমি সেই সবকিছু। আমাকে বুঝতে হলে গোটা পৃথিবীটাকেই তোমার গিলে খেতে হবে!” সেলিমের এই রুদ্ধশ্বাস গল্পের মধ্যে দিয়ে রুশদি আসলে আমাদের বোঝাতে চান যে, ইতিহাসকে কখনো একটা মাত্র ছাঁচে ফেলে বা একটা গল্পে বেঁধে ফেলা যায় না।
এক ঘরোয়া আড্ডার আমেজে রুশদি বলছেন, ‘এই উপন্যাস লেখার ব্যাপারটাকে আমাদের পরিবারের মধ্যে প্রচলিত একটা ছোটখাটো কৌতুক থেকেই শুরু বলা যায়। ব্রিটিশরা দেশ ছাড়ার ঠিক মাস আড়াই আগে আমার জন্ম হয়েছিল তো, তাই বাড়িতে একটা রসিকতা চলত যে—আমার জন্ম আর দেশের স্বাধীনতার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো গূঢ় সম্পর্ক আছে। পরে যখন বইটা লিখতে বসলাম, তখন মনে হলো সময়টাকে যদি একদম কাঁটায় কাঁটায় মিলিয়ে দেওয়া যায়, তবে ব্যাপারটা জম্পেশ হবে। জন্মক্ষণ আর ইতিহাসের ঠিক সেই আশ্চর্য অদ্ভুত সমাপতন থেকেই আসলে বইটার সূত্রপাত; যেন এর পেছনে কোনো অলৌকিক যাদু কাজ করছে। ওই শিশু আর তার দেশটা যেন তখন হয়ে উঠল একে অপরের যমজ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, স্বাধীন ভারতের ওই প্রথম তিরিশ বছর যেন ইতিহাসের পাতায় একটা আস্ত যুগ। সেই সময়ের একটা নির্দিষ্ট চলন ছিল, একটা অবয়ব ছিল। আর আমার বইয়ের শরীরের কাঠামোটাও ঠিক সেই সময়ের আদলেই তৈরি হয়েছে।’
এই উপন্যাস নিয়ে সালমান রুশদির নিজের মুখেই বরং কিছু কথা শুনে নেওয়া যাক। বিবিসি-কে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত কিছু অংশ তুলে ধরা হল, এতে করে লেখক-পাঠকেরও এক যোগসূত্র গড়ে উঠবে আশা করি।
‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ বই হাতে তরুণ লেখক সালমান রুশদি বিবিসি: স্বাধীনতা, দেশভাগ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, ইন্দিরা গান্ধীর সেই জরুরি অবস্থা, দুর্ভিক্ষ, এমনকি গণ-স্টেরিলাইজেশনের সেইসব অধ্যায়—ওষুধ বিষুধ, জাদু আর সংস্কার—কী নেই এই বইতে! সবকিছুই যেন সালিমের এক অদ্ভুত কল্পনা, যে কিনা নিজের মগজের ভেতরে আধুনিক ভারতের একটা আদল কেমন, তার স্বপ্ন দেখে চলেছে। তার সেই অলীক দর্শনে যেমন আছে খুশি, তেমনি আছে এক বিষণ্ণ হাহাকার। একটা আচারের কারখানায় কাজ করে সালিম সিনাই। তার ছায়াসঙ্গী পদ্মাকে বলে চলেন নিজের পারিবারিক কিসসা, সঙ্গী হয় পাঠকরাও।রুশদি: আসলে ব্যক্তিগত জীবন আর বাইরের জগতের যে রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি—তাদের মধ্যে সম্পর্কটা ঠিক কোথায়, সেটা খতিয়ে দেখার জন্যেই আমি সালিমের চরিত্রটাকে একটা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছি। সালিম ভারি মজার এক বিশ্বাস নিয়ে চলে; তার মনে হয় ইতিহাসের সমস্ত গোলমালের পেছনে বুঝি তারই কোনো হাত আছে। আর সেটা প্রমাণ করতেই সে আড়াই লাখ শব্দের এক বিশাল আখ্যান ফেঁদে বসেছে।সত্যি বলতে কী, আমার জন্ম এই বম্বে (মুম্বাই) শহরে, ঠিক যে বাড়িটার বর্ণনা আমি বইতে লিখেছি। বইয়ের মধ্যে আমার নিজের জীবনের ছোঁয়া যদি কোথাও থেকে থাকে, তবে তা হলো এই জায়গাগুলো। সালিমের ঘরবাড়ি, তার স্কুল, যে পাড়াটার খুঁটিনাটি সে চেনে—সবই আসলে আমার ছোটবেলার খুব চেনা বাস্তব। বম্বে শহরটাকে নিয়ে কিছু করার একটা প্রবল তাগিদ ছিল আমার ভেতর, কারণ শহরটা ভারি রহস্যময়। একটা বাচ্চার বড় হওয়ার জন্য এর চেয়ে রোমাঞ্চকর জায়গা আর হয় না। ভারতের অন্য সব শহর থেকে বম্বে বরাবরই একটু আলাদা। এখানকার মানুষও নিজেদের অন্য সকলের চেয়ে ভিন্ন বলে ভাবে। রাজধানী না হয়েও এটাই হলো ভারতের প্রধান শহর। ভারতবর্ষের অন্য যে কোনো জায়গার তুলনায় এখানে অভারতীয়দের সংখ্যা অনেক বেশি। হরেক কিসিমের ভারতীয় মানুষেরা এখানে এসে জড়ো হয়, শহরটা ঠিক যেন একটা চুম্বক। উপমহাদেশের সব কোনা থেকে মানুষ এখানে এসে ভিড় জমায়। এমন কোনো ধর্ম নেই যার ছোঁয়া এখানে পাবেন না। আর তার একটা ভারি চমৎকার ফলও আছে—শহরটা আসলে ভীষণ রকম ধর্মনিরপেক্ষ। সবাই যখন নিজের নিজের বিশ্বাস নিয়ে এক জায়গায় মেশে, তখন কোনো একটা নির্দিষ্ট গোঁড়ামির ভেতরে নিজেকে শক্ত করে আটকে রাখাটা বড় কঠিন হয়ে পড়ে। সেখানে আপনি চাইলেও খুব একটা কট্টর হয়ে বড় হতে পারবেন না।বিবিসি: আপনার এই উপন্যাসটা পড়তে বসলে মনে হয় কেউ যেন সামনে বসে একখানা কিসসা শোনাচ্ছে। আজকালকার ইংরেজি উপন্যাসের যে ধাঁচ আমরা সচরাচর দেখি, তার সঙ্গে এর কিন্তু বিশেষ মিল নেই।রুশদি: হ্যাঁ, শুরুতেই একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, এই ‘উপন্যাস’ বস্তুটা কিন্তু ভারতের মাটিতে জন্মানো জিনিস নয়। মানে, গদ্য-আখ্যানের কোনো দীর্ঘ ইতিহাস এদেশে আগে ছিল না। ওটা বলতে গেলে ব্রিটিশদের সঙ্গেই এদেশে এসেছে। এখন ভারতে ইংরেজি, হিন্দি বা অন্যান্য ভাষায় প্রচুর উপন্যাস লেখা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে তো আর এদেশের খাঁটি আঙ্গিক নয়। ওটা অনেকটা বাইরে থেকে এনে লাগানো এক ধরণের ‘কলম করা’ চারাগাছ। ভারতের নিজস্ব সম্পদ হলো মুখে মুখে গল্প বলা—রূপকথা, উপকথা আর কিসসার ঐতিহ্য, যা সেই অনাদিকাল থেকে চলে আসছে। প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণ-মহাভারত থেকে শুরু করে ভারতের নিজস্ব ঈশপের গল্প, মানে ওই পঞ্চতন্ত্রের আখ্যান—সবই তো সেই আদি ঐতিহ্যের অংশ। এখনও ভারতের গ্রামগঞ্জে এই মৌখিক কিসসা বলার এক মস্ত চল আছে। সব মানুষ গোল হয়ে বসে থাকে আর সাদা দাড়িওয়ালা প্রবীণ মানুষেরা তাঁদের গল্প শোনান।বিবিসি: আপনার ছোটবেলায় কি এমন সাদা দাড়িওয়ালা বুড়ো মানুষদের কাছে গল্প শোনার সুযোগ হয়েছিল?রুশদি: (হেসে) না, সাদা দাড়িওয়ালা বুড়ো মানুষ ঠিক নয়, তবে আমার বাবার কাছে আমি প্রচুর গল্প শুনেছি। রাতে শোয়ার আগে বাবা আমায় রোজ গল্প শোনাতেন। এখন অবশ্য ঠিক মনে নেই তার মধ্যে কোনগুলো তিনি নিজের মন থেকে বানিয়ে বলতেন আর কতগুলো প্রচলিত গল্পই নতুন করে শোনাতেন। তবে সেই গল্পগুলোই আমার মনে গল্প বলার একখানা বীজ পুঁতে দিয়েছিল। কারণ দেখুন, এই যে উপন্যাসের মধ্যে একেবারে হুবহু বাস্তবকে ফুটিয়ে তোলা বা ‘রিয়েলিজম’-এর চল, তা খোদ ইংল্যান্ডেও খুব একটা পুরনো নয়। আর ভারতীয় কিসসায় তো ওই বাস্তবতার বালাই কোনোদিনই ছিল না। সেখানে একটা বিশ্বাসই ছিল যে—গল্প হবে একরাশ ডাহা মিথ্যে কথা, যা হবে ঘোরতর অসত্য। সে হবে এক মায়াবী অলীক আখ্যান, যার সঙ্গে এই চেনা চাক্ষুষ জগতের হুবহু মিল থাকার কোনো দায় নেই।বিবিসি: ছোটবেলায় আপনি কি খুব ট্রেনে চড়তেন?রুশদি: হ্যাঁ, বেশ চড়েছি। আমার বাবার আদি বাড়ি ছিল দিল্লি, তাই মাঝে মাঝেই তিনি আমাকে নিয়ে দিল্লি যেতেন। ভারতের সেই রেলভ্রমণ ছিল বড় উত্তেজনার। ইউরোপের যে কোনো ট্রেনের চেয়ে আমাদের ট্রেনগুলো অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।আমার উপন্যাসে ‘টিকিট ফাঁকি দেওয়া’ যাত্রীদের একটা অনুষঙ্গ আছে। এই মানুষগুলো প্ল্যাটফর্মের একটু দূরে ওঁত পেতে থাকে, তারপর ট্রেনটা গতি নেওয়ার আগেই বাইরে থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতল ধরে ঝুলে পড়ে। তারপর দরজায় মরণ-কামড় দিয়ে ধাক্কাতে থাকে আর খুব করুণ স্বরে ভেতরে ঢুকতে চায়। যারা ভেতরে আছে আর যারা বাইরে—পুরো দৃশ্যটাই যেন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব। আপনি যদি আহাম্মকের মতো দয়া করে দরজা খুলে দেন, তবে দেখবেন পিলপিল করে আঠারো-উনিশ জন লোক ঢুকে পড়েছে, যাদের কোমরে হয়তো বন্দুকের বেল্ট বা হাতে ছুরি—বড় সাঙ্ঘাতিক অবস্থা। তাই আপনি দরজা খোলেন না, আর বাইরের সেই দরজায় অবিরাম ধাক্কানোর শব্দ শুনতে শুনতে আপনি এগিয়ে চলেন। জানলার বাইরে কেউ একজন ঝুলে আছে জেনেও আপনি তাকে ভেতরে নেবেন না। আমার উপন্যাসে যখনই কেউ ট্রেনে চড়ে, জানলার বাইরে ওই টিকিট ফাঁকি দেওয়া মানুষগুলোর করাঘাত চলতেই থাকে। আসলে ভারতে এই রেলগাড়িই তো গোটা দেশটাকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে। সড়কপথের চেয়ে রেলপথের গুরুত্ব সেখানে অনেক বেশি। আমাদের ওখানকার ট্রেনগুলো যেমন চমৎকার, তার চেয়েও দারুণ হলো রেল স্টেশনগুলো। ভারতে রেল স্টেশন মানে কেবল যাতায়াতের জায়গা নয়, ওটা হলো জীবনের এক মস্ত আড্ডাখানা। মানুষ সেখানে শুধু চড়তে যায় না, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যায়, সময় কাটাতে যায়। একটা রেল স্টেশন যেন গোটা ভারতবর্ষেরই একটা ছোট সংস্করণ। আসলে ভারত হলো অগুনতি মানুষের দেশ, আর সেই দেশটাকে যদি আপনি একটা বইয়ের পাতায় ধরতে চান, তবে সেই বইটাকেও ওইরকম জনঅরণ্য হয়ে উঠতে হবে।এই বিশাল জীবনটাকে বোঝার জন্য আমি একটা রূপক ব্যবহার করেছি—যা বইটা লেখার আগে থেকেই আমার মাথায় ছিল। একটা চাদরের ফুটো দিয়ে ডাক্তার এক পর্দানশিন মহিলাকে পরীক্ষা করছেন—যাকে কি না পরপুরুষের দেখার হুকুম নেই, এমনকি তিনি ডাক্তার হলেও। গল্পটা আসলে আমার দাদুর জীবনের। তিনি ডাক্তার ছিলেন। একবার তাঁর এক বন্ধুর বাড়ি গিয়েছেন বন্ধুর সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে পরীক্ষা করতে। কিন্তু সেই বন্ধু তো স্ত্রীকে পরপুরুষের সামনে আনবেন না। তাই একটা ফুটো করা চাদর টাঙিয়ে দেওয়া হলো, আর সেই ফুটোর ওপাশ থেকে শরীরের যে অংশটুকু রুগ্ন, সেটুকুই শুধু ডাক্তারের সামনে ধরা হলো। দাদুকে সেই ফুটোর ওপরেই স্টেথোস্কোপ বসিয়ে রুগিনীকে পরীক্ষা করতে হয়েছিল। আমি এই ঘটনাটাকেই একটু অতিরঞ্জিত করে বইতে ব্যবহার করেছি। আমার উপন্যাসের সেই ডাক্তারটি অর্থাৎ সালিমের দাদু ওই চাদরের ফুটো দিয়ে দিনের পর দিন শরীরের এক একটা খণ্ড অংশ দেখতে দেখতেই শেষ পর্যন্ত মেয়েটির প্রেমে পড়ে যান। যেন একটা টুকরো টুকরো মানুষকে জোড়া লাগিয়ে মনের ভেতরে একটা আস্ত মানবীকে গড়ে তোলা। বইটা শুরু করার জন্য এটা যেমন একটা মজার ঘটনা, তেমনি এটা একটা মস্ত রূপকও বটে। আমরা তো আসলে গোটা দেশ বা সমাজকে একবারে সবটা দেখতে পাই না। ওই চাদরের ফুটোর মতোই আমরা জগতের এক একটা টুকরো অংশ দেখি। তারপর স্মৃতির আঠা দিয়ে সেই টুকরোগুলোকে জুড়ে নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি বানানোর চেষ্টা করি। কখনো সেই ছবিটা ঠিক হয়, কখনো আবার ভুল।বিবিসি: ‘মধ্যরাতের সন্তানেরা’ উপন্যাসে আপনি কিন্তু জেনারেল ডায়ারকে এক ম্যাজিকাল কায়দায় জব্দ করেছেন। সালিমের দাদু সেই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মাঝখানে পড়েও কেবল একখানা জম্পেশ হাঁচির চোটে প্রাণে বেঁচে যান।রুশদি: ইতিহাসের মোড় বদলে দেওয়ার মতো যদি কোনো একটি ঘটনার কথা বলতে হয়, তবে সেটা বোধহয় এই জালিয়ানওয়ালা বাগ। এই ঘটনাটাই ভারতের স্বাধীনতাকে অবধারিত করে তুলেছিল। কারণ এর ফলে মানুষের ভেতরে ব্রিটিশদের সম্পর্কে এমন এক প্রবল ঘৃণা আর ক্ষোভের জন্ম নেয় যে, আগেকার সেই আনুগত্যের আর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট ছিল না। আমার বইয়ের পরতে পরতে রাজনীতির একটা প্রবল ছোঁয়া আছে। খুব সহজ করে বললে—স্বাধীনতা মানেই ছিল এক বুকভরা আশা। রক্তপাত, দাঙ্গা, দেশভাগ আর অমার্জনীয় সব ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও মানুষের মনে একটা বিশ্বাস ছিল যে, এবার বুঝি নিজেদের একটা দেশ হলো। আমার বাবার প্রজন্মের মানুষরা আজও বলেন, ওই সময়টা ছিল এক আশ্চর্য সম্ভাবনার সময়। কিন্তু আমার বইয়ের আখ্যানটা বলছে, ঠিক তার পরের তিরিশ বছরে সেই আশাগুলো কেমন যেন হারিয়ে গেল। ঠিক যেন বড় যত্নে লালন করা একটা স্বপ্ন ধীরে ধীরে ভেঙে খানখান হয়ে গেল। তাই এই বইতে ‘আশাবাদ’ বা ‘অপটিমিজম’-কে আমি একটা ‘ব্যাধি’ হিসেবেই দেখিয়েছি। মানুষের মধ্যে এই আশাবাদ সংক্রামক রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ে, মাঝে মাঝে মানুষ সেরে ওঠে ঠিকই, কিন্তু আবার সে তাতে আক্রান্ত হয়। এই যে মধ্যরাত্রির সন্তানরা, তারা আসলে ওই স্বপ্নেরই একেকটি প্রতিচ্ছবি। অথচ যখন দেশে জরুরি অবস্থা জারি হলো, তখন সেই শিশুদের বিনাশ যেন আসলে স্বাধীনতার সমস্ত ভালো দিকগুলোরই ধ্বংসের প্রতীক হয়ে দাঁড়াল। কারণ ভারতবর্ষের মতো একটা দরিদ্র দেশে গণতন্ত্রের পরীক্ষা চালানো ছিল এক মস্ত বড় আশার কথা। বড়লোক দেশের জন্য গণতন্ত্র যতটা সহজ, গরিব দেশের জন্য তা তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি কঠিন। যেখানে মানুষের পেটে খিদে থাকে, সেখানে গণতন্ত্রের পিঠ ঠেকে যায় দেওয়ালের সাথে।বিবিসি: এই উপন্যাসে ইন্দিরা গান্ধী হলেন সেই ‘বিধবা’, যাকে নিয়ে সালিমের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। গল্পের পাতায় তিনি ক্রমশ এক ভয়ঙ্কর ডাইনি বা রাক্ষসী হয়ে ওঠেন, ঠিক যেমনটা শিশুদের রূপকথায় থাকে।রুশদি: উপন্যাসে তাঁর প্রথম আবির্ভাব ঘটে কোনো নাম ছাড়া, সালিমের এক দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে। সেই দুঃস্বপ্নটা আসলে আমার নিজেরও দেখা। ইন্দিরা গান্ধীর চুলের সেই সাজটার কথা ভাবুন—মাথার একদিকে ধবধবে সাদা চুলের রেখা, আর বাকিটা কুচকুচে কালো। দেখে মনে হতো যেন চুলটার মধ্যেও কোনো পাগলামি বা ‘সিজোফ্রেনিয়া’ মিশে আছে। আমি আসলে সেই চুলের রঙের আড়ালে তাঁর শাসনের ধরনটাকেই বোঝাতে চেয়েছি। একদিকটা সাদা আর খোলাখুলি, অন্যদিকটা ঘোর কৃষ্ণবর্ণ আর রহস্যে ঘেরা। এমনকি সে সময় ভারতের কালো অর্থনীতির বহর নাকি প্রকাশ্য অর্থনীতির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই আমি ওই চুলের বাহারটাকেই রাজনীতির এক মস্ত বড় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছি।বিবিসি: তার মানে আপনার এই লেখায় যেমন গভীর রাজনীতি আছে, তেমনি আছে শব্দের মারপ্যাঁচ আর এক ধরণের দুষ্টুমি। ওই যে চুলের সিঁথির সঙ্গে ‘সেন্টার পার্টি’র তুলনা...রুশদি: ওটা আসলে একটা কৌতুক। সত্যি বলতে কী, আমার বইতে ইন্দিরা গান্ধী কোনো মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা নিয়ে আসেননি; তিনি এসেছেন এক ভুতুড়ে ভয় বা আতঙ্কের ছায়া হয়ে। জরুরি অবস্থার সময় তিনি অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছিলেন এক ভয়াল ‘রণচণ্ডী’ দেবী। আসলে একজন ঝানু রাজনীতিক আর একজন লেখক—দুজনেই কিন্তু একভাবে সমাজটাকে নিজের মনের মতো করে গড়তে চান। তবে লেখক করেন খাতা-কলম নিয়ে একা একটা ঘরে বসে, তাতে কারো ক্ষতি হয় না। কিন্তু রাজনীতিবিদ যখন সেটা করেন, তখন বাস্তবের জমিতে তার প্রভাব পড়ে বড় মারাত্মক। তাই উপন্যাসে ওই আতিপাতি লিখে চলা সালিম আর সর্বময় ক্ষমতাধর ইন্দিরার মধ্যে একটা রেষারেষি তৈরি হয়; লড়াইটা আসলে ওই একই ভূখণ্ড দখল করার।আমার বইটা মূলত একটা ট্র্যাজেডি, তবে লেখা হয়েছে কমেডির ঢঙে। এর শেষটা বড় বিষণ্ণ। ছোটবেলাকার সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর জন্য এ এক করুণ বিলাপ। স্বাধীনতার সেই পবিত্র মধ্যলগ্নে যে জাদুকরী শিশুরা জন্ম নিয়েছিল, তারা যেন এসেছিল কেবল ধ্বংস হওয়ার জন্যেই। এটাই বোধহয় বইটার মূল সুর। আচার বানানোর সময় যেমন জিনিসগুলো আগেকার মতো থাকে না, বদলে যায়; ঠিক তেমনি কোনো কিছু নিয়ে লিখতে বসলেও তার রূপটা আগের মতো থাকে না। লেখার প্রক্রিয়ায় সেই ইতিহাস বা স্মৃতির স্বাদটাও আমূল বদলে যায়।
১৯৮১ সালে মিডনাইটস চিলড্রেন উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ পায়। আর সেই বছরেই বইটি ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার লাভ করে। পরবর্তী সময়ে, ২০০৮ সালে সমস্ত বুকারজয়ীদের মধ্যে এক প্রতিযোগিতায় এটি সেরাদের সেরা বা বুকার অফ বুকার্স হিসেবেও নির্বাচিত হয়।
মহাকাব্যিক বিশালতার এই উপন্যাসে রুশদি আমাদের দেখিয়েছেন যে, পৃথিবীতে ‘একটাই সত্যি’ বলে কিছু হয় না। বরং একসাথে অনেকগুলো বাস্তবকে মেনে নেওয়া, আর ঘড়ির কাঁটার একটা মাত্র শব্দে অনেকগুলো মুহূর্তকে বাঁচার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের আসল ম্যাজিক।
‘মধ্যরাতের সন্তানেরা’ উপন্যাসটি গঠনগত ভাবে তিনটি পর্বে বিভক্ত। পুস্তক: এক (Book I), পুস্তক: দুই (Book II), পুস্তক: তিন (Book III)। আবার প্রতিটি পর্বে রয়েছে কয়েকটি করে অধ্যায়। পুস্তক: এক-এ আছে আটটি অধ্যায়। পুস্তক: দুই-এ আছে চৌদ্দটি অধ্যায়। পুস্তক: তিন অংশে আছে সাতটি অধ্যায়।
আসুন, আর কথা না বাড়িয়ে, এখন মূল উপন্যাসে প্রবেশ করা যাক।





মন্তব্য