এর পর এল ভেলকিবাজিতে-ভরা জানুয়ারি মাস। সময়টা ওপর ওপর এমন থমথমে হয়ে ছিল যে মনে হচ্ছিল ১৯৪৭ সালটা বুঝি শুরুই হয়নি। (অথচ, আসলে তো তলে তলে...) এটা সেই সময়, যে মাসে ক্যাবিনেট মিশন—সেই বুড়ো পেথিক-লরেন্স, সেয়ানা ক্রিপস আর ফৌজি এ. ভি. আলেকজান্ডার—তাদের চোখের সামনে ক্ষমতা হস্তান্তরের ছকটা একেবারে মাঠে মারা যেতে দেখল। (কিন্তু আদতে তো আর মাত্র ছ-মাসেরই অপেক্ষা, তার পরেই...) যে মাসে বড়োলাট ওয়াভেল দিব্যি বুঝে গিয়েছিলেন যে তাঁর দিন ফুরিয়েছে, তিনি বাতিল, তিনি একেবারে ফান্টুস হয়ে গেছেন। (আসলে তো ওটাই সব কিছুকে আরও ত্বরান্বিত করল, এর দৌলতেই শেষ ভাইসরয়ের আসার পথটা খোলসা হয়ে গেল, যিনি কিনা...) যে মাসে মিস্টার অ্যাটলিকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন মিস্টার আউং স্যাম-এর সঙ্গে বার্মার ভবিষ্যৎ নিয়ে ফয়সালা করতে বড্ড বেশি ব্যস্ত। (অথচ, সত্যি বলতে কী, তিনি আসলে তখন শেষ বড়োলাটকে তাঁর পদে বসানোর কথা ঘোষণা করার আগে তাঁকে সবটা বুঝিয়ে-পড়িয়ে নিচ্ছিলেন; সেই হবু শেষ বড়োলাট তখন রাজার সঙ্গে দেখা করে তাঁর কাছ থেকে অবাধ আর পূর্ণ ক্ষমতার অধিকার আদায় করে নিচ্ছেন; যাতে খুব শিগগিরই, শিগগিরই...) যে মাসে গণপরিষদ কোনো সংবিধান চূড়ান্ত না করেই নিজেদের অধিবেশন নিজেরাই মুলতুবি করে বসে রইল। (কিন্তু আসলে তো আর্ল মাউন্টব্যাটেন, সেই শেষ ভাইসরয়—তাঁর সেই অমোঘ টিকটক আওয়াজ, তাঁর সেই ফৌজি ছুরি—যা কিনা গোটা একটা উপমহাদেশকে নিমেষে তিন টুকরো করে ফেলতে পারে, আর তাঁর সেই স্ত্রী—যিনি কিনা শৌচাগারের খিল এঁটে চুপিচুপি মুরগির বুকের মাংস চিবোতেন, —এইসব নিয়ে যে-কোনো দিনই আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বেন।) আর এই আয়নার মতো নিস্তরঙ্গ থমথমে ভাবটার মধ্যে দিয়ে যখন ভেতরে ভেতরে চলতে-থাকা ইতিহাসের কলকবজার বিশাল ঘড়ঘড়ানি টের পাওয়া একরকম অসম্ভব ছিল, ঠিক তখনই, একদিন সকালে আমার মা, সেই আনকোরা নব্য আমিনা সিনাই—যাঁকে বাইরে থেকে দেখতে একেবারে শান্ত আর নির্বিকার লাগছিল, যদিও তাঁর চামড়ার নিচে তখন বিশাল সব কাণ্ডকারখানা ঘটে চলেছে—অনিদ্রার কারণে মাথার ভেতরটা ভোঁ-ভোঁ করা আর জিভের ওপর না-ঘুমোনো ঘুমের একটা পুরু আস্তরণ নিয়ে জেগে উঠলেন, আর একেবারে নিজের অজান্তেই মুখ ফসকে বলে উঠলেন, ‘সূর্যটা ওখানে কী করছে? হায় আল্লাহ! ওটা তো একেবারে ভুল জায়গায় উঠেছে।’
...নিজেকেই এবার একটু থামাতে হচ্ছে। আজ অবশ্য এমনটা করব ভাবিনি, কিন্তু পদ্মা আজকাল বড্ড চটছে— যখনই আমি গপ্পো বলতে গিয়ে নিজের চালচলন নিয়ে একটু বেশি আত্মসচেতন হয়ে পড়ি, যখনই ওই আনাড়ি পুতুল-নাচিয়ের মতো আড়ালের সুতো-টানা হাতগুলো দেখিয়ে ফেলি, তখনই সে খেপে যাচ্ছে; নাহ! এর একটা প্রতিবাদ আমার না-করলেই নয়। তাই, নেহাতই সৌভাগ্যক্রমে যে-অধ্যায়টার নাম আমি দিয়ে ফেলেছি ‘সর্বসাধারণের জন্য একটি ঘোষণা’, তার ঠিক মাঝখানেই জোর করে ঢুকে পড়ে আমি (যতটা কড়া ভাষায় সম্ভব) চিকিৎসা-সংক্রান্ত এই সতর্কবার্তাটা সবার উদ্দেশে জারি করছি: ‘ডাক্তার এন. কিউ. বালিগা নামের এক লোক,’ আমি তো পারলে একেবারে ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে ঘোষণা করি! মিনারে-লাগানো চোঙা ফুঁকে সবাইকে জানিয়ে দিই!—‘ব্যাটা আদতে এক্কেবারে হাতুড়ে। লোকটাকে ধরে একেবারে শ্রীঘরে চালান করা উচিত, পেশা থেকে নাম কাটিয়ে দেওয়া উচিত, জানলা দিয়ে সটান বাইরে ছুঁড়ে ফেলা উচিত। কিংবা আরও খারাপ শাস্তি: ওর নিজের ওই হাতুড়ে বিদ্যে ওর ওপরেই ফলানো হোক, ভুলভাল ওষুধের চক্করে ওর গায়ে কুষ্ঠরোগীর মতো ঘা বের হওয়া উচিত। হতচ্ছাড়া আহাম্মক কোথাকার,’ আমি আমার কথায় আরও জোর দিয়ে বলি, ‘নিজের নাকের ডগায় কী হচ্ছে, সেটুকুই ব্যাটার চোখে পড়ে না!’
মনের ঝাল তো মিটল, এবার সূর্যের ওই অদ্ভুত আচরণ নিয়ে দুশ্চিন্তা করার জন্য মাকে আপাতত তার নিজের মতো ছেড়ে দিতেই হচ্ছে, কারণ—আসল কথাটা আপনাদের খুলে বলা দরবার। আমি যে মাঝে মাঝেই এই ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়ার কথা বলি, তাতেই ভয় পেয়ে গিয়ে আমাদের পদ্মা চুপিচুপি ওই বালিগাকে—ওই ওঝাকে! ওই লতাপাতার জড়িবুটিওলাকে!—সব বলে বসেছে। আর তার ফল যা হওয়ার তাই হলো—ওই ভণ্ড লোকটা, যাকে আমি কোনোরকম ব্যাখ্যা দিয়ে অযথাই মাথায় তুলতে চাই না, সে সটান আমার খোঁজ নিতে হাজির। আমি একেবারে সরল মনে আর নেহাতই পদ্মার খাতিরে তাকে আমার শরীরটা একটু পরীক্ষা করে দেখার অনুমতি দিয়েছিলাম। আমার আগে থেকেই সবচেয়ে খারাপ কিছুর আশঙ্কা করা উচিত ছিল; আর ঠিক সেই জঘন্যতম কাজটাই করে বসল সে। ইচ্ছে হলে বিশ্বাস করুন: ওই বাটপাড় লোকটা কিনা আমাকে একেবারে আস্ত একটা মানুষ বলে ঘোষণা করে বসল! ‘আমি তো কোনো ফাটল-টাটল দেখতে পাচ্ছি না,’ সে ভারী করুণ সুরে ঘ্যানঘ্যান করে বলে উঠল। কোপেনহেগেনে নেলসন যেমন ইচ্ছে করে অন্ধ চোখে দূরবীন ধরেছিলেন, এ ব্যাটা তার চেয়ে আলাদা। কারণ এর ভালো চোখ বলে কিচ্ছু নেই; তার এই অন্ধত্ব কোনো একরোখা প্রতিভার স্বেচ্ছায়-বেছে-নেওয়া ব্যাপার নয়, বরং তা তার নিজেরই বোকামির এক অবশ্যম্ভাবী অভিশাপ! একেবারে না-জেনেশুনেই সে আমার মানসিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বসল, সাক্ষী হিসেবে আমার কথার ওপর ভরসা করা যায় কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করল, আর ঈশ্বরই জানেন আরও কী কী সব: ‘আমি তো কোনো ফাটল-টাটল দেখতে পাচ্ছি না।’
শেষমেশ পদ্মাই ওকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। ‘থাক গে, কবরেজমশাই,’ পদ্মা বলল, ‘আমরা নিজেরাই ওঁর দেখাশোনা করে নেব খ’ন।’ ওর মুখে আমি ওর নিজেরই এক ধরনের চাপা অপরাধবোধের ছায়া দেখতে পেলাম... তারপরই বালিগার প্রস্থান, এই লেখার পাতাগুলোতে সে আর কখনও ফিরে আসবে না। কিন্তু হে ঈশ্বর! ডাক্তারি পেশা—যা কিনা ছিল খোদ আদম আজিজের ধ্যানজ্ঞান—তা কি আজ এমন রসাতলে গেছে? বালিগাদের মতো এমন নোংরা আঁস্তাকুড়ে গিয়ে ঠেকেছে? যদি এটাই সত্যি হয়, তবে তো শেষমেশ মানুষ ডাক্তার-বদ্যি ছাড়াই দিব্যি নিজেদের চালিয়ে নেবে... আর এই কথাটাই আমাকে আবার সেই পুরোনো প্রসঙ্গে ফিরিয়ে নিয়ে যায় যে, ঠিক কী কারণে আমিনা সিনাই একদিন সকালে ঠোঁটের ডগায় সূর্যের কথা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠেছিলেন।
‘ওটা তো একেবারে ভুল জায়গায় উঠেছে!’ নিজের অজান্তেই সে চেঁচিয়ে উঠল, আর তারপর, রাতের সেই আধাখ্যাঁচড়া ঘুমের রেশ ধরে মাথার ভেতরের ভোঁ-ভোঁ আওয়াজটা একটু থিতিয়ে আসতেই সে টের পেল, এই ভেলকিতে-ভরা মাসটায় কেমন করে সে একটা ধোঁকার শিকার হয়েছে—কারণ আসল ব্যাপারটা হলো, সে ঘুম থেকে উঠেছে দিল্লিতে, তার নতুন স্বামীর বাড়িতে, যে বাড়ির মুখটা পুবদিকে, একেবারে সূর্যের দিকে; তাই সত্যি কথাটা হলো, সূর্য ঠিক তার নিজের জায়গাতেই আছে, বরং তার নিজের জায়গাটাই পালটে গেছে... কিন্তু এই অতি সাধারণ সত্যিটা মাথায় ঢোকার পর, আর এখানে আসার পর থেকে করা এ-রকম আরও হাজারো ভুলের সঙ্গে এটাকেও মনের এক কোণে সরিয়ে রাখার পরও (কারণ সূর্য নিয়ে তার এই ঘুলিয়ে-যাওয়া ব্যাপারটা রীতিমতো রোজকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যেন তার মন এই বদলে-যাওয়া পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে, মাটির ওপরে তার বিছানার এই নতুন জায়গাটাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে চাইছিল না), সেই তালগোল-পাকানো অনুভূতির কিছুটা রেশ তার ভেতর তখনও রয়েই গেল, আর তাকে কিছুতেই পুরোপুরি স্বস্তি পেতে দিল না।
‘দিনশেষে বাবাদের ছাড়াই সবার দিব্যি চলে যায়,’ বিদায়বেলায় ডাক্তার আজিজ তাঁর মেয়েকে বললেন; আর রেভারেন্ড মাদার তাতে যোগ করলেন, ‘পরিবারে জুটল আরও এক এতিম, কী-যেন-বলে, তবে যাক গে, স্বয়ং মহম্মদও তো এতিম ছিলেন; আর তোমার ওই আহমেদ সিনাইয়ের ব্যাপারে এই কথাটা তো অন্তত বলা যায়, কী যেন বলে, সে অন্তত অর্ধেক কাশ্মীরি বটে।’ তারপর ডাক্তার আজিজ নিজের হাতেই ট্রেনের কামরায় একটা সবুজ রঙের টিনের তোরঙ্গ তুলে দিলেন, যেখানে আহমেদ সিনাই তার কনের অপেক্ষায় বসেছিল। ‘যৌতুক হিসেবে এটা এমন কিছু বিশালও নয়, আবার খুব সামান্যও নয়,’ আমার দাদু বললেন। ‘আমরা তো আর ক্রোড়পতি নই, বুঝতেই পারছ। তবে আমরা তোমাকে যথেষ্টই দিয়েছি; আমিনা তোমাকে আরও দেবে।’ সেই সবুজ টিনের তোরঙ্গটার ভেতর ছিল: রুপোর সামোভার, ব্রোকেডের শাড়ি, আর কৃতজ্ঞ রোগীদের কাছ থেকে ডাক্তার আজিজের পাওয়া সোনার মোহর—যেন আস্ত একটা জাদুঘর, যার প্রদর্শনীগুলো সারিয়ে-তোলা রোগ আর বাঁচিয়ে-তোলা প্রাণের জলজ্যান্ত প্রমাণ। আর এবার যৌতুকটা তুলে দেওয়ার পর আদম আজিজ তাঁর মেয়েকে (নিজের দু-হাতে) পাঁজাকোলা করে তুলে দিলেন সেই লোকটার জিম্মায়, যে কিনা ওর নতুন নাম রেখে ওকে একেবারে নতুন করে গড়েপিটে নিয়েছে, আর সেই হিসেবে সে তার নতুন স্বামীর পাশাপাশি একরকমভাবে তার পিতাও হয়ে দাঁড়িয়েছে... ট্রেনটা চলতে শুরু করতেই তিনি প্ল্যাটফর্ম বরাবর (নিজের পায়ে) হাঁটতে লাগলেন। নিজের দৌড় শেষ করা এক রিলে-রানার যেন, তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন ট্রেনের ধোঁয়া, কমিক-বইয়ের ফেরিওয়ালা, ময়ূরপঙ্খী হাতপাখা, গরম জলখাবারের ভিড়ভাট্টা, উবু-হয়ে-বসা কুলি আর ট্রলিতে-রাখা প্লাস্টারের স্থির জীবজন্তু—সব মিলিয়ে এক আলস্যভরা হট্টগোলের মধ্যে; আর ট্রেনটা ততক্ষণে গতি বাড়িয়ে রাজধানী শহরের দিকে ছুটল, যেন রেসের পরবর্তী ল্যাপ শুরু হলো।
কামরার ভেতর আনকোরা নতুন আমিনা সিনাই (একেবারে ঝকঝকে অবস্থায়) ওই সবুজ টিনের তোরঙ্গের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে রইল, যেটা কিনা সিটের নিচে ঢোকানোর পক্ষে ঠিক এক ইঞ্চি বেশিই উঁচু ছিল। নিজের বাবার সারাজীবনের অর্জনের সেই তালাবন্ধ জাদুঘরের ওপর স্যান্ডেল-পরা পা দুটো চেপে রেখে সে তার নতুন জীবনের দিকে ছুটে চলল। পেছনে পড়ে রইলেন আদম আজিজ, যিনি কিনা এবার বিলিতি আর হাকিমি চিকিৎসার বিদ্যাকে মেলানোর এক অসাধ্য সাধনে নিজেকে সঁপে দেবেন। এমন এক চেষ্টা যা তাঁকে একটু একটু করে ভেতর থেকে নিংড়ে নেবে, আর তাঁকে এই মর্মে বিশ্বাস করতে বাধ্য করবে যে এই ভারতবর্ষে কুসংস্কার, ভেলকিবাজি আর জাদুটোনার আধিপত্য কোনোদিনই ভাঙার নয়, কারণ হাকিমরা তো আর কিছুতেই হাত মেলাতে রাজি নয়; আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই দুনিয়াটা যখন তাঁর কাছে ক্রমশ ফিকে হয়ে আসতে লাগল, তখন তিনি নিজের বিশ্বাসের ওপরই সন্দেহ করতে শুরু করলেন, আর তাই; যে-ঈশ্বরকে তিনি সারাজীবন বিশ্বাস বা অবিশ্বাস—কোনোটাই করে উঠতে পারেননি, শেষমেশ যখন তাঁর সঙ্গে দেখা হলো, তখন সম্ভবত তিনি মনে মনে এমনই কোনো একটা কিছুর অপেক্ষাতেই ছিলেন।
ট্রেনটা স্টেশন ছেড়ে বেরোতেই আহমেদ সিনাই আচমকা লাফিয়ে উঠে কামরার দরজার ছিটকিনিটা তুলে দিল, আর জানলার খড়খড়িগুলোও টেনে নামিয়ে দিল, যা দেখে আমিনা তো একেবারে থ। কিন্তু ঠিক তখনই হঠাৎ বাইরে থেকে দরজায় ধুপধাপ আওয়াজ হতে শুরু করল, হাতল ঘোরানোর শব্দ পাওয়া গেল, আর সেই সঙ্গে কয়েকটা গলা শোনা গেল, ‘আমাদের একটু ভেতরে ঢুকতে দিন না, মহারাজ! মহারানি, আছেন নাকি, আপনার স্বামীকে বলুন না একটু দরজাটা খুলে দিতে।’ আর চিরকাল, এই গল্পের সমস্ত ট্রেনে, ওই গলাগুলোর আর দরজায় এমন কিল-চড় মারার আর কাকুতিমিনতি লেগেই থাকত; বম্বের দিকে ছুটে-চলা ফ্রন্টিয়ার মেলে, আর বছরের পর বছর ধরে চলা যাবতীয় এক্সপ্রেস ট্রেনে; আর ব্যাপারটা সবসময়ই বেশ গা-ছমছমে হতো, অন্তত যতদিন না শেষমেশ আমি নিজেই ওই বাইরের লোকটা হয়ে দাঁড়ালাম, যে কিনা প্রাণের দায়ে কোনোমতে বাইরে ঝুলে থেকে কাকুতিমিনতি করছে, ‘ও মহারাজ! আমাকে একটু ভেতরে ঢুকতে দিন না, হুজুর।’
‘বিনা টিকিটের যাত্রী,’ আহমেদ সিনাই বলল, তবে তারা কেবল তা-ই ছিল না। তারা ছিল আসলে এক একটা জীবন্ত ভবিষ্যদ্বাণী। খুব শিগগিরই এমন আরও অনেকেরই আবির্ভাব হতে চলেছে।
...আর এখন, সূর্যটা একেবারে ভুল জায়গায় উঠেছে। সে, মানে আমার মা, বিছানায় শুয়ে শুয়ে কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ করছিল; কিন্তু সেই অস্বস্তির মধ্যেই আবার একটা চাপা উত্তেজনা—শরীরের ভেতর কী একটা যেন ঘটে গেছে, যা আপাতত তাঁর একান্ত গোপন কথা। ওদিকে পাশেই আহমেদ সিনাই নিশ্চিন্তে নাক ডাকাচ্ছেন। অনিদ্রা-টনিদ্রা ওঁর ধাতে নেই; অথচ ঝুটঝামেলার কি অন্ত আছে? যে ঝামেলার চোটে তাকে টাকা-ঠাসা একটা ছাইরঙা ব্যাগ নিয়ে আসতে হয়েছিল আর আমিনা দেখতে পাচ্ছে না ভেবে… সেটাকে নিজের বিছানার তলায় লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল। আমার বাবা তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছিল, মায়ের দেওয়া সেরা উপহারটার এক আরামদায়ক ওমে নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে, যে উপহারটা কিনা শেষমেশ ওই সবুজ টিনের তোরঙ্গের ভেতরের মালপত্তরের চেয়েও ঢের বেশি দামি বলে প্রমাণিত হয়েছিল: আমিনা সিনাই আহমেদকে উপহার দিয়েছিল তার সেই অফুরন্ত ক্লান্তিহীন নিষ্ঠা।
আমিনার মতো অমন করে নিজেকে উজাড় করে দিতে আর কাউকে দেখিনি। গায়ের রংটা চাপা বটে, কিন্তু চোখ দুটোয় যেন জৌলুস উপচে পড়ছে; আমার মা ছিল স্বভাবের দিক থেকে এই দুনিয়ার সবচেয়ে নিখুঁত, সবচেয়ে খুঁতখুঁতে মানুষ। কী অমানুষিক নিষ্ঠা তার! পুরনো দিল্লির সেই বাড়ির বারান্দায় আর ঘরে ঘরে সে ফুল দিয়ে সাজাত; কার্পেট বাছার সময়ও সে কী অনন্ত সতর্কতা। স্রেফ একটা চেয়ার ঠিক কোনখানটায় বসবে, তাই নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে করতেই সে পঁচিশটা মিনিট কাবার করে দিত। এখানে একটুখানি নিজের আলতো ছোঁয়া দিয়ে, ওখানে সামান্য একটু রদবদল ঘটিয়ে সে যখন তার সংসার গোছানোর কাজ শেষ করল, তখন আহমেদ সিনাই অবাক হয়ে দেখল যে তার ওই এতিমের মতো ডেরাটা যেন ভারী স্নিগ্ধ আর মায়ায়-ভরা একটা ঠিকানায় পালটে গেছে। স্বামীর ঘুম ভাঙার আগেই আমিনা বিছানা ছেড়ে উঠত, আর তার ওই নিখুঁত কাজের স্বভাবের তাড়নায় সে বাড়ির সবকিছু, এমনকী জানলার বেতের চিক-পর্দাগুলো পর্যন্ত নিজের হাতে ঝেড়েপুঁছে তকতকে করে রাখত (যতদিন না তার স্বামী শেষমেশ এই কাজের জন্য একজন হামাল বা কাজের লোক রাখতে রাজি হলো); কিন্তু আহমেদ কোনো দিন ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে, তার স্ত্রীর এই অসামান্য প্রতিভার সবটুকু কিন্তু বাইরের ফিটফাট ভাব বজায় রাখতেই খরচ হয়ে যেত না। আমিনা তার সমস্ত জেদ আর নিষ্ঠা দিয়ে আসলে যাকে গড়েপিটে নিতে চাইছিল, সে আর কেউ নয়—স্বয়ং আহমেদ সিনাই।
সে তাকে বিয়ে করেছিল কেন?—একটু স্বস্তির আশায়, ছেলেপুলের আশায়। কিন্তু গোড়ার দিকে তার মগজে ওই অনিদ্রার ঘোর এমনভাবে জেঁকে বসল যে, তার ওই পয়লা নম্বর উদ্দেশ্যটাই মাঠে মারা যাওয়ার জোগাড়; আর ছেলেপুলে তো বাপু চাইলেই হুট করে হয় না। তাই আমিনা টের পেল, সে ঘুমের ঘোরে এমন এক কবির মুখ দেখছে যাকে স্বপ্ন দেখা মানা, আর ঘুম ভাঙছে এমন একটা নাম ঠোঁটে নিয়ে যা মুখে আনা বারণ। আপনারা জিগ্যেস করবেন: তা সে তখন কী করল? আমি বলব: সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শুধরাতে লেগে পড়ল। সে নিজেকে ঠিক এই কথাটাই শোনাল: ‘ওরে অকৃতজ্ঞ গাধা, তুই কি দেখতে পাচ্ছিস না এখন কে তোর স্বামী? একজন স্বামীর কী পাওনাগণ্ডা তা কি জানিস না?’
এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর কী হতে পারে, তা নিয়ে অকারণ তর্কবিতর্ক এড়াতে আমি শুধু এটুকু বলে রাখি যে, আমার মায়ের মতে, একজন স্বামীর প্রাপ্য হলো বিনা প্রশ্নে আনুগত্য, আর কোনো রকম শর্ত ছাড়া মন-উজাড়-করা ভালোবাসা। তবে একটা মুশকিল ছিল: আমিনার মন তো তখন নাদির খান আর তার অনিদ্রায় একেবারে বোঝাই হয়ে আছে, তাই সে টের পেল, আহমেদ সিনাইকে সে স্বাভাবিকভাবে এই জিনিসগুলো কিছুতেই দিতে পারছে না। আর সেজন্য, নিজের একনিষ্ঠতার গুণটাকে কাজে লাগিয়ে সে তার স্বামীকে ভালোবাসার জন্য নিজেকে রীতিমতো তালিম দিতে শুরু করল। এই কাজটা করতে গিয়ে সে মনে মনে তাকে, মানে তার শরীর আর স্বভাব—দুটোকেই এক-একটা খুচরো অংশে ভাগ করে ফেলল। তাকে আলাদা আলাদা খোপে ভাগ করল তার ঠোঁট, তার কথা বলার বাতিক, তার নানা সংস্কার আর পছন্দ-অপছন্দ দিয়ে... এককথায় বলতে গেলে, সে তার নিজেরই বাবা-মায়ের সেই ফুটো-করা চাদরের জাদুতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল, কারণ সে মনে মনে ঠিক করে ফেলল যে, সে তার স্বামীকে একলপ্তে নয়, বরং একটু একটু করে, টুকরো টুকরো করে ভালোবাসবে।
প্রতিদিন সে আহমেদ সিনাইয়ের একটা করে টুকরো বেছে নিত, আর নিজের গোটা মনপ্রাণ সেটার ওপর এমনভাবে ঢেলে দিত যতক্ষণ না সেটা তার কাছে পুরোপুরি চেনা হয়ে ওঠে; যতক্ষণ না পর্যন্ত সে অনুভব করত যে তার ভেতরে একটা ভালোলাগা দানা বাঁধছে, আর সেটাই পরিণত হচ্ছে স্নেহে, আর সবশেষে একেবারে নিখাদ ভালোবাসায়। এইভাবেই সে ভালোবাসতে শুরু করল তার বড্ড বেশি চড়া গলাটাকে, আর সেই গলা যেভাবে তার কানের পর্দায় ধাক্কা দিয়ে তাকে কাঁপিয়ে তুলত, সেটাকেও; দাড়ি কামানোর আগে পর্যন্ত সারাক্ষণ ফুরফুরে মেজাজে থাকা, আর ঠিক তারপরই, রোজ সকালে একেবারে কড়া, রুক্ষ, হিসেবি আর দূরের হয়ে পড়ার যে অদ্ভুত স্বভাব—সেটাকেও; শকুনির মতো ভারী পাতায় ঢাকা তার চোখদুটো, যা দিয়ে সে একটা নিরস আর দুর্বোধ্য দৃষ্টির আড়ালে নিজের ভেতরের ভালোমানুষিটুকু লুকিয়ে রাখত বলে আমিনা নিশ্চিত ছিল; ওপরের ঠোঁট ছাড়িয়ে তার নিচের ঠোঁটটার ওই বেরিয়ে থাকার ভঙ্গিটা; আর তার ওই বেঁটেখাটো চেহারা, যার দরুন সে আমিনাকে কোনোদিন উঁচু হিলের জুতো পরতে পর্যন্ত বারণ করে দিয়েছিল… ‘হে খোদা,’ সে নিজেকেই নিজে শোনাত, ‘মনে হচ্ছে এক-একজন মানুষের ভেতরে ভালোবাসার মতো লাখ লাখ আলাদা জিনিস লুকিয়ে থাকে!’ কিন্তু তাতেও সে দমে গেল না। ‘সত্যি বলতে কী,’ সে মনে মনে যুক্তি সাজাত, ‘কেউ কি আর কোনোদিন অন্য একজন মানুষকে পুরোপুরি চিনে উঠতে পারে?’ আর এইভাবেই সে ভাজাভুজি খাওয়ার প্রতি তার স্বামীর টান, তার ফারসি কবিতা আওড়ানোর ক্ষমতা, রেগে গেলে তার দুই ভুরুর মাঝখানে ফুটে-ওঠা ভাঁজ—এই সবকিছুকেই একটু একটু করে ভালোবাসতে আর কদর করতে শিখতে লাগল...
‘এমনি করে চললে,’ সে ভাবত, ‘তার ভেতরে ভালোবাসার মতো নতুন কিছু না কিছু রোজই পাওয়া যাবে; তাই আমাদের এই বিয়েটা কোনোদিনই পুরোনো হয়ে একঘেয়ে লাগবে না।’ এইভাবেই, পরম একনিষ্ঠতায়, আমার মা পুরোনো শহরের এই জীবনে থিতু হয়ে বসল। আর ওই টিনের তোরঙ্গটা একটা পুরোনো আলমারির ভেতর খোলা না-হওয়া অবস্থাতেই পড়ে রইল।
আর আহমেদ, ঘুণাক্ষরেও কিছু টের না পেয়ে বা বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে, অবাক হয়ে দেখল যে তার বউ, তার আর তার জীবনের ওপর এমনভাবে নিজের ছোঁয়া বুলিয়ে চলেছে যে, একটু একটু করে সে এমন এক মানুষের মতো হয়ে উঠতে লাগল—আর এমন এক জায়গায় থাকতে শুরু করল যা দেখতে অবিকল এমন এক জায়গার মতো—যাকে সে কোনোদিন চেনেওনি, আর যে পাতালঘর সে কোনোদিন চোখেই দেখেনি। এমন এক নিবিড় আর অদ্ভুত জাদুটোনার প্রভাবে, যা আমিনা হয়তো নিজের অজান্তেই তার ওপর চালিয়ে যাচ্ছিল, আহমেদ সিনাই দেখল তার মাথার চুল ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে, আর যেটুকু-বা পড়ে আছে তা নেতিয়ে গিয়ে কেমন তেলতেলে হয়ে যাচ্ছে; সে অবাক হয়ে দেখল, চুলগুলো বেড়ে কানের ডগার ওপর দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে না যাওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে বাড়তে দিতে তার নিজেরও কোনো আপত্তি নেই। তা ছাড়া, তার পেটটাও ক্রমশ বাড়তে শুরু করল, আর শেষমেশ তা এমন এক নরম, থলথলে ভুড়িতে গিয়ে দাঁড়াল, যার ভেতর আমি কতবার যে মুখ গুঁজে দম আটকে ফেলেছি, আর যেটাকে আমরা অন্তত সজ্ঞানে কেউই কোনোদিন নাদির খানের সেই নাদুসনুদুস চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে দেখিনি। তার দূরসম্পর্কের বোন জোহরা ভারী আদিখ্যেতা করে তাকে বলল, ‘আপনাকে কিন্তু এবার একটু খাওয়া কমাতে হবে, ভাইজান, নইলে চুমু খাওয়ার জন্য তো আমরা আপনার নাগালই পাব না!’ কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো না... আর একটু একটু করে পুরোনো দিল্লিতে আমিনা নরম কুশন আর জানলার ওপর ভারী পর্দার এমন এক জগৎ সাজিয়ে তুলল, যা ভেদ করে যতটা সম্ভব কম আলো ভেতরে আসতে পারে... সে বেতের চিকগুলোর গায়ে কালো কাপড়ের আস্তরণ লাগিয়ে দিল; আর এই সমস্ত ছোটোখাটো রদবদলগুলো তাকে তার এক অসাধ্য সাধনে সাহায্য করেছিল, একটু একটু করে এই সত্যিটা মেনে নেওয়ার সাধনায় যে, তাকে একজন নতুন মানুষকে ভালোবাসতেই হবে। (তবে ওই... নিষিদ্ধ স্বপ্নের দৃশ্যগুলোর প্রতি সে তখনও বেশ দুর্বলই রয়ে গিয়েছিল... আর ওই নরম পেট আর লম্বাটে, নেতিয়ে-পড়া চুলের পুরুষদের প্রতি সে চিরকালই একটা অদ্ভুত টান অনুভব করত।)
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য