এক
কিছুটা খেচর আর কিছুটা মানুষ।
তার চোখ তুলে গিলে খেয়েছে রাক্ষসী;
আগুনে পুড়েছে দৃঢ় মেরুদণ্ড, ডানা!
নিখাত গভীর জুড়ে বিপুল যন্ত্রণা!
সে এখনো পায়ে হাঁটে, খাদ্য খায় বাসি,
বুকের চামড়া ফুঁড়ে চালায় সাঁড়াশি,
স্বপ্ন দেখে সঙ্গমের, ভাবে, সে আসলে
কিছুটা পুরুষ আর কিছুটা রমণী।
দুই
আজকে আমার কোনো ভয় নেই, পিছুটান নেই।
আজকে আমার সব বিপন্নতা শেষ হয়ে যাবে।
আজকে অন্ধকারে ডেকে উঠবে অভিলাষী পেঁচা;
গহীন বাগানে আর একটিও জোনাকি জ্বলবে না!
বাবার ছবির কাছে মুখ রেখে, গন্ধ শুঁকে নিয়ে;
মায়ের স্মৃতির লেপে নীরবে জড়িয়ে ঠাণ্ডা দেহ,
শান্ত নদী, অন্ধকার, প্রার্থনার দু'চোখ ভাসানো
শিলালিপি আওড়াতে আওড়াতে আমি চলে যাবো!
আজকে বৃক্ষে বসে কাঁদবে না শাকচুন্নী, প্রেত!
আজকে ডাকলে মাটি ডাক শুনবে, বলবে, এসো, এসো!
আজকে পেয়েছি ফিরে পরিত্রাণ, মায়ের জঠরে
যেমন ছিলাম, ঠিক তেমনি অনাবৃত, চুপচাপ!
হে পাখি, পাখির মতো ডাকো, যদি শান্তি দিতে চাও;
হে অন্ধকার, আরো গাঢ় হও, দীর্ঘ হও, দ্বিগুণ প্রাকৃত!
আজকে ছাদের ‘পরে দাঁড়িয়ে দেখেছি স্বর্গলোক,
আমার কঠিন প্রাণে সমূলে ছিঁড়েছে দড়িদড়া!
একদিন আমিও চেয়েছি হতে নক্ষত্র-বিজয়ী!
আমারও স্বপ্ন ছিলো বীর্য, ফুল, বীরভোগ্যা নারী!
আজ আমি ক্ষমাপ্রার্থী অনাগত সন্তানের কাছে,
হে শিশু, হে মৃত মাংস, পিতাকে আক্ষেপহীন করো!
আজকে আমার মুখে ভয় নেই, শোকতাপ নেই;
আজকে বিরামহীন গলার ব্যায়ামে অবশেষে
আমি চলে যাবো, আমি মুক্ত হবো, অসম্ভব আলো
কাল থেকে জ্বলে উঠবে মানুষের জীবনে জীবনে!
তিন
Piano Quartet in A Minor- Gustav Mahler
রক্তে যে এতো ধূলো মিশে ছিলো, জানতো না;
মাথার খুলিতে শিক গাঁথা আছে, জানতো না:
কেবল জন্ম আর আবার জন্মের লোভে
কতো পথে গেছে, কতো স্রোতে ভেসে, জানতো না!
পাপ তার পিতা, তার আশরীর অব্যর্থ হতাশা,
তিন মুলুকের ভয়; সে যে ভীত, মানতো না!
পাপ তার আশ্রয়, রক্তের সান্ত্বনা;
যেমন ময়লা ধুয়ে সাফ হয় বৃষ্টিতে,
ভাবতো সে, শুদ্ধ হবে হৃদয় তেমনই
যন্ত্রণায়; ভালোবেসেছিলো ঘুম, ধর্ম, আর ধুলো;
শিশুর বিশ্বাসে গিলে খেয়েছিলো তিক্ত, শাদা পুরী!
এদিকে যে শেষ স্রোত বয়ে গেছে, জানতো না!
ঘ্রাণ পেয়ে শকুনেরা এসে গেছে, জানতো না!
পাপ তার অন্দরে, পাপ তার মাথার খুলিতে
বর্শার মতো গাঁথা, সে যে মৃত, মানতো না!
কেবল হৃদয় আর আরো হৃদয়ের লোভ
রক্তে যে ধূলো ঝেড়ে গিয়েছিলো, জানতো না!
যেমন ময়লা ধুয়ে সাফ হয় বৃষ্টিতে,
ভেবেছিলো, তার পাপও মুছে যাবে কান্নায় কান্নায়!
চার
ঘর চেনো, পর চেনো, রুক্ষ মাটি চেনো,
এতো যে শক্তের ভিত, এখনো তো নিজের অচেনা
নিজে। আকাশে স্বপ্নের ভিড়, পাতালে কামনা;
তুমি কোনোখানে নেই; কাছে, দূরে, ঘৃণায়, মমতায়
সর্বোচ্চ আভাস আছে, সত্যিকারে নেই!
ঘরে ফুল, পরে ফুল, রুক্ষ মাটি ফুলে ফুলে ভরা,
এতো যে নিজের কাছে বাস করো, চাষ করো
নিজের মাটিতে নিজে, ফুল কই? শস্য কই? চারা?
কোথাও যে চলে যাবে, কেনো যাবে, তুমি কি পারো না
ঘরে, পরে, নির্বাসনে দুই মুঠো সংসার কুড়াতে?
কতো মেঘ, কতো বৃষ্টি, শূন্যে এতোটা রং,
আর কিছুদিন গেলে আর কেউ একলা রইবে না!
তোমার ভেতরে তবু ঘানি-টানা, রুক্ষ ঢেলামাটি!
উপশমহীন রোগ; নিরুত্তর, নিষ্ঠুর ভ্রুকুটি!
পাঁচ
দাও, মুছে দাও শরীরচিহ্ন, হে নীল জল,
হে পাখি, আমি পালিয়ে যাচ্ছি গোপনে,
নিজেকে উড়িয়ে দিচ্ছি বিষণ্ন আকাশে
উড়ুক্কু মাছের মতো! সমুদ্র-বাষ্পের মতো!
আমাকে ধারণ কোরো না, রক্ষা কোরো না,
অক্ষমকে আদর দিও না, দাও, মুছে দাও কলঙ্গদাগ,
হে পাখি, হে নীল জল, হে ঘুম, যেতে দাও!
আমি পালিয়ে যাচ্ছি নীরবে, নিজেকে খুন করছি
বিনা উত্তরে, মিলনের অঙ্গুরী খুলে ফেলছি, ফেলবো!
দাও, ভাসিয়ে দাও নীল জামা, জলের ওপরে হাত,
আমার পর্দা ছিঁড়ে গেছে, শূন্যতা স্পষ্ট,
একটা বিরাট আকাশ, চারপাশের আকাশ,
চারপাশের জল আমাকে মন্থন করে মারছে!
দাও, মুছে দাও শরীরচিহ্ন, হে বানভাসি, হে পাখি,
আর মিছেমিছি বাঁচবো না, মরবো না ক্ষণে ক্ষণে,
দাও, উত্তরে দাও ধ্বংস, দক্ষিণে চির শাস্তি,
দাও, জীবনে-মরণে যন্ত্রণা দাও, জননচিহ্ন মুছে দাও!
ঘর পর নির্বাসন
▮ অরিত্র আহমেদ
▮ অরিত্র আহমেদ




মন্তব্য