ওরহান ভেলি কানিক (১৯১৪-১৯৫০) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তুর্কি কবি—এবং সম্ভবত আধুনিক তুর্কি কবিতাকে সবচেয়ে আমূলভাবে বদলে দেওয়া কণ্ঠগুলোর একজন। তাঁর আগে কবিতায় ছিল অলংকার, উচ্চাঙ্গ সুর, ছন্দের আনুষ্ঠানিকতা। অরহান ভেলি সেই দরজা ভেঙে দৈনন্দিন কথাবার্তার ভাষাকে কবিতায় নিয়ে আসেন। ভেলি সবচেয়ে বেশি পরিচিত গ্যারিপ মুভমেন্ট–এর জন্য, ‘ফার্স্ট নিউ মুভমেন্ট’ বা তুর্কি ভাষায় ‘বিরিঞ্চি ইয়েনি’ নামেও পরিচিত। একে ‘স্ট্রেঞ্জ’ বা উদ্ভট (গ্যারিপ) বলা হতো। সেসময়ের বিদগ্ধ সাহিত্যিক সমাজের কাছে এই গ্যারিপ কবিতা মোটেও কবিতা বলে মনে হতো না, এমনকি কবিতাসুলভ কোনো অনুভূতিও না। তাদের চোখে এগুলো ছিল তুচ্ছ ও সাধারণ বিষয় নিয়ে লেখা কিছু এলোমেলো, ভাঙাচোরা বাক্যের সমষ্টি মাত্র। তৎকালীন প্রথাগত সাহিত্য মহল বিষয়টিকে অত্যন্ত ‘খাপছাড়া’, ‘আজব’, এবং স্তম্ভিত করার মতো মনে করে; কিন্তু সাধারণ মানুষ একে সানন্দে গ্রহণ করে, কারণ এই কবিতাগুলো শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের জীবনের কথাই বলে।
ভেলি, মেলিহ জেভদেত আন্দায়, এবং অকতায় রিফাত—এই তিনজন মিলে এই কবিতার ধারা শুরু করেন যেখানে সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহৃত হয়, রাস্তা, চা, দোকান, ফেরিওয়ালা, হাওয়া—এসব বিষয় কবিতার কেন্দ্রে আসে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল কবিতাকে “উচ্চবিত্ত শিল্প” থেকে সরিয়ে জীবনের কাছে নিয়ে আসা। ভেলি দেখিয়েছিলেন কবিতা জটিল শব্দ ছাড়াও গভীর হতে পারে, সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাও শিল্পের বিষয়, এবং সরলতা মানেই সরলীকরণ নয়। আজকের অনেক মিনিমাল, কথোপকথনধর্মী, এভরিডে-লাইফ পোয়েট্রি–র মধ্যে তাঁর প্রভাব দেখা যায়। তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয়, কেউ খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলছেন। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার ভেতরে নির্মাণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এটাই তাঁর বড় কৃতিত্ব। –অনুবাদক
আমি, ওরহান ভেলি
আমি, ওরহান ভেলি।
সেই বিখ্যাত কবিতার লেখক—
“সুলেমান এফেন্দি, ঈশ্বর তাঁর আত্মার মঙ্গল করুন।”
শুনলাম আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে
আপনাদের নাকি ভারী কৌতূহল।
তবে খুলেই বলি শুনুন:
প্রথমত আমি একজন মানুষ, অর্থাৎ,
কোনো সার্কাসের জন্তু-টন্তু নই আর কী।
আমার একটা নাক আছে, একটা কান আছে,
যদিও সেগুলো খুব একটা সুগঠিত নয়।
একটা বাড়িতে থাকি আমি,
একটা চাকরিও আছে।
মাথার ওপর কোনো মেঘ নিয়ে ঘুরি না আমি,
আর পিঠেও কোনো দৈব বাণীর সিলমোহর নেই।
ইংল্যান্ডের রাজা জর্জের মতো আমি অতি-বিনয়ী নই,
আবার জেলাল বায়ারের সেদিনের সেই
আস্তাবল রক্ষকের মতো আভিজাত্যও আমার নেই।
আমি পালং শাক খেতে ভালোবাসি।
আর পনির ভরা মুচমুচে পেস্ট্রির জন্য তো আমি পাগল।
পার্থিব কোনো ধন-সম্পদের প্রতি
আমার কোনো লোভ নেই,
সত্যিই বলছি, বিন্দুমাত্র নেই।
ওকতায় রিফাত আর মেলিহ জেভদেত
আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু,
আর আমার একজন প্রেমিকাও আছে,
ভীষণ মর্যদাসম্পন্ন।
তাঁর নামটা আমি বলতে পারব না,
সাহিত্য সমালোচকরাই নাহয় খুঁজে বের করুক।
তুচ্ছ সব কাজকর্ম নিয়েও আমি ব্যস্ত থাকি,
তবে তা কেবল বড় কোনো কাজের ফাঁকে ফাঁকে।
কীভাবে বলি বলুন তো,
হয়তো এমন হাজারো অভ্যাস আছে আমার,
কিন্তু সে সবের তালিকা বানিয়ে লাভটা কী!
সেগুলো কম-বেশি ঠিক এই রকমই।
আমার গাছ
আমাদের এই পাড়াটায়
যদি আরও অজস্র গাছ থাকত,
তোমাকে ঠিক এতটা ভালোবাসতাম না।
কিন্তু তুমি যদি জানতে
কীভাবে আমার সঙ্গে এক্কা-দোক্কা খেলতে হয়,
তোমাকে ভালোবাসতাম আরও অনেক অনেক বেশি।
আমার সুন্দর গাছটি।
তোমার যখন মৃত্যু হবে,
আশা করি ততদিনে আমরা বদলে ফেলব
আমাদের এই পাড়া।
পাহাড়
পরজন্মে, কলকারখানার ছুটি হয়ে যাওয়ার পর
সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি ফেরার পথ
যদি আমাদের জন্য
এতটা খাড়া না হয়—
তবে মৃত্যু
আদৌ কোনো
ভয়াবহ বিষয় নয়।
ভ্রমণ
ভ্রমণ করার কোনো ইচ্ছেই নেই;
কিন্তু যদি কখনো মনস্থির করি,
তবে আমি ইস্তাম্বুলেই আসব।
বেবেক-গামী কোনো ট্রামগাড়িতে
হঠাৎ আমায় দেখলে
ঠিক কী করবে তুমি?
যদিও আগেই বলেছি তোমাকে,
ভ্রমণ করার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই।
যাত্রা
ভুর্জ গাছগুলো সত্যিই সুন্দর।
তবুও,
যখন আমরা এসে পৌঁছাব
আমাদের শেষ স্টেশনে—
একটা ভুর্জ গাছ হওয়ার চেয়ে
আমার বরং নদী হওয়াই
বেশি পছন্দ।
পানশালা
আমি তো তাকে আর ভালোবাসি না,
তাহলে
কেনই বা হেঁটে যাব
রাতের পর রাত
সেই পানশালার পাশ দিয়ে—
যেখানে বসে প্রতি রাতে মদ্যপান করতাম
কেবল তারই কথা ভেবে?
রবিবারের সন্ধ্যাগুলো
আজ হয়তো আমায় খুব একটা আহামরি দেখাচ্ছে না;
তবে যেদিন আমার সব ঋণ চুকিয়ে দেব,
সম্ভবত সেদিন একগুচ্ছ নতুন পোশাকের মালিক হব আমি;
আর সম্ভবত তখনও তুমি ভালোবাসবে না।
কিন্তু, রবিবারের ওই পড়ন্ত সন্ধ্যাগুলোতে,
যখন আমি তোমার পাড়ার মোড় দিয়ে হেঁটে যাব—
এক্কেবারে বাবু সেজে, কেতাদুরস্ত পোশাকে,
তোমার কি মনে হয়, তখনও তোমাকে আগলে রাখব
ঠিক ততটাই, যতটা আজ?
আমি কি প্রেমে পড়েছি?
আমার মনেও কি তবে এমন ভাবনারা ভিড় জমাত?
আমিও কি এভাবে রাত জাগা এক অনিদ্রাকাতর মানুষ হতাম?
আমিও কি হয়ে উঠতাম এমন নিথর ও নিস্তব্ধ?
তুচ্ছ ভাবতাম সেই মাখানো সালাদকে, যা আমি এতটা ভালোবাসতাম?
আমি কি সত্যিই এমন একটা মানুষে পরিণত হতে যাচ্ছিলাম?
আত্মহত্যা
কাউকে কিছু না জানিয়েই মরে যাওয়া উচিত।
ঠোঁটের এক কোণে লেগে থাকা চাই এক ফোঁটা রক্ত।
যারা আমায় চেনে না,
তারা বলবে—
"নিশ্চয়ই ও কাউকে ভালোবাসত।"
আর যারা চেনে, তারা বলবে—
"বেচারা বেঁচে গেল। বড্ড ভুগেছে লোকটা।"
কিন্তু আমার মৃত্যুর আসল কারণ— এর কোনোটিই হওয়া চলবে না।
চড়ুই
ওগো রূপসী মেয়ে, ততটা মিষ্টি নও তুমিও
যতটা মিষ্টি ছিল সেই চড়ুইটা—
যে এসে থমকে দাঁড়িয়েছিল
ফাঁসের দড়িতে;
আমার কৈশোরের বাগানে
সেই যে বরই গাছটার
সবচেয়ে উঁচু ডালে
পেতেছিলাম।
রবিনসন
আমার সবচেয়ে প্রিয় হলেন দিদিমা
শৈশবের খেলার সাথি,
সেই তখন থেকে— আমরা দুজনে মিলে যখন
নির্জন দ্বীপ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতাম রবিনসনকে,
আর কাঁদতাম সেইসব দুঃখে একসঙ্গে বসে—
লিলিপুটদের হাতে বন্দি হয়ে
যা কিছু সহ্য করেছিল
গলিভার।
প্রেমের কুচকাওয়াজ
প্রথমজন সেই ছিপছিপে, চঞ্চল মেয়ে, নলখাগড়ার মতো,
ভাবি, এখন সে নির্ঘাত কোনো সওদাগরের ঘরণী।
কে জানে সে এখন কতটা মোটা হয়ে গেছে!
তবুও তাকে আরেকবার খুব দেখতে ইচ্ছে করে।
এত সহজ তো নয়, প্রথম প্রেম।
........................... উঠে যায় উপরে
......................... আমরা দাঁড়িয়েছিলাম রাস্তায়
......................... যদিও
........... দেওয়াল জুড়ে নাম লেখা ছিল পাশাপাশি আমাদের
........................... আগুনে।
তৃতীয়জন মিস মুভেদ্দেত, আমার চেয়ে বয়সে কিছু বড়,
যখন চিরকুট লিখে লিখে তার বাগানে ছুঁড়ে দিতাম,
সেগুলো পড়ে হেসেই খুন হতো।
আজও সেইসব চিঠির কথা মনে পড়লে,
এমন লজ্জিত হই, যেন সেদিনেরই কথা।
চতুর্থজন উগ্র এবং বুনো।
আমাকে শোনাতো সব নোংরা নোংরা গল্প।
একদিন তো আমার সামনেই জামাকাপড় খুলে।
কত বছর কেটে গেল, ভুলতে পারলাম না আজও।
কতবার যে মেয়েটা আমার স্বপ্নে এসেছে!
পঞ্চমকে বাদ দিয়ে আসি ষষ্ঠজনের কথায়।
তার নাম ছিল নুরুন্নিসা।
ওহ, আমার রূপসী,
ওহ, আমার শ্যামল বরণী,
ওহ, আমার আদরের, আমার আদরের
নুরুন্নিসা!
সপ্তমজন আলিয়ে, উচ্চবিত্ত সমাজের,
কিন্তু তাকে পাত্তা দিতে পারিনি;
অভিজাত আর সব মেয়েদের মতোই
তার দুনিয়া আটকে ছিল কানের দুল আর পশমি কোটে।
অষ্টমজন একই আপদ, কম-বেশি;
অন্যের স্ত্রীর কাছে সে খুঁজত মর্যাদা,
কিন্তু নিজের বেলায় সামান্যতেই মুখভার আর তুলকালাম—
শুধু ছলচাতুরি, অবুঝ বায়না
মিথ্যে বলাটা যেন তার মজ্জাগত স্বভাব।
নবমজনের নাম ছিল আয়তেন।
একটা সস্তা বারে বেলি ড্যান্সার সে;
কাজের সময় সে ছিল যে কোনো লোকের দাসী,
কিন্তু ছুটির পরে,
রাত কাটাতো মনের মানুষ সাথে।
একটু বেশিই চালাক দশমজন,
তাই চলে গেল আমায় ছেড়ে।
সে অবশ্য ভুল কিছু করেনি;
প্রেম-পিরিত তো বড়লোক আর অলসদের কারবার,
নয়তো বেকারদের;
দুটি মন এক হলে
দুনিয়াটা সুন্দর, এই কথা সত্যি,
কিন্তু দুটি নগ্ন শরীর—
মানায় কেবল বাথটাবেরই ভেতরে।
একাদশজন মেহনতি মেয়ে, খাটিয়ে।
তা ছাড়া আর কী-ই বা করার ছিল?
সে ছিল এক বাড়ির ঝি, মালিক স্যাডিস্ট অত্যাচারী;
তার নাম ছিল লুক্সান্দ্রা;
রাতের বেলা চলে আসত আমার ঘরে
আর থাকত ভোর পর্যন্ত।
কনিয়াক গিলত, মাতাল হতো,
আর আলো ফোটার আগেই আবার ফিরে যেত কাজে।
আসা যাক এবার একদম শেষজনের কথায়।
তার মায়ায় আমি জড়িয়েছিলাম এমনভাবে,
যেমন আর কখনো কাউকে বাসিনি ভালো।
সে শুধু এক নারীই ছিল না, ছিল আস্ত মানুষ।
ছুটত না সে বোকার মতো উঁচু বংশ দেখনদারির,
কিংবা কোনো লোভ ছিল না গয়নাগাটির ওপর।
"যদি মুক্তি থাকে আমাদের—" সে বলত;
"যদি থাকে সমঅধিকার—" সে বলত।
সে মানুষকেও ভালো বাসতে জানত তেমন ঠিক,
যেমন সে ভালোবাসত নিজের জীবনকে।
(কবির মৃত্যুর পর তাঁর টুথব্রাশের সাথে জড়ানো অবস্থায় পাওয়া এই কবিতাটি অসমাপ্ত।)
নির্বাচিত কবিতা
▮ ওরহান ভেলি
▮ অনুবাদ: সব্যসাচী রায়
▮ ওরহান ভেলি
▮ অনুবাদ: সব্যসাচী রায়




মন্তব্য