পারিবারিক ইতিহাসেরও তো আবার খাওয়াদাওয়ার নিজস্ব কিছু বাছবিচার বা নিয়মকানুন থাকে। নিয়মটা হলো, এর ঠিক সেই অংশটুকুই শুধু গেলা বা হজম করা উচিত যেটুকু হজম করার অনুমতি আছে—অর্থাৎ অতীতের একেবারে হালাল অংশটুকু, যার গা থেকে সবটুকু লাল রং আর রক্ত নিংড়ে ধুয়ে ফেলা হয়েছে। মুশকিল হলো, এতে করে গল্পের সেই রসালো ব্যাপারটা আর তেমন থাকে না; আর তাই আমিই এবার আমার বংশের প্রথম আর একমাত্র মানুষ হতে চলেছি, যে কিনা হালাল করার এই নিয়মকানুনকে সটান বুড়ো আঙুল দেখাতে চলেছে। গল্পের শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্তও আমি বেরিয়ে যেতে দিইনি, আর এভাবেই আমি এসে পৌঁছেছি ঠিক সেই অকথ্য অংশটায়, যা নিয়ে সচরাচর কেউ টুঁ-শব্দটিও করে না; এবং তারপর, বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে, জোরকদমে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি।
১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে ঠিক কী ঘটেছিল? কুচ নহীনের রানি মারা গেলেন, কিন্তু আমি সে-কথা বলতে আসিনি; যদিও যাওয়ার আগে তিনি এমন ফ্যাকাশে সাদা হয়ে গিয়েছিলেন যে বিছানার চাদরের সঙ্গে মিশে-থাকা তাঁকে আলাদা করে চেনাই দায় ছিল; আমার এই গল্পের জন্য একটা রুপোর পিকদানি বিলিয়ে দিয়ে নিজের কাজটুকু মিটিয়ে তিনি যে বড্ড তাড়াতাড়ি বিদায় নিলেন, সেটা তাঁর এক ধরনের কৃপাই বলতে হবে… আরও একটা ব্যাপার হলো, ১৯৪৫ সালে বর্ষাও কিন্তু ফাঁকি দেয়নি। বার্মার জঙ্গলে, ওর্ড উইঙ্গেট আর তাঁর চিন্ডিট বাহিনী, আর সেই সঙ্গে জাপানিদের হয়ে লড়াই-করা সুভাষচন্দ্র বসুর সেনাদল—সবাই ফিরে-আসা সেই বর্ষার জলে একেবারে ভিজে জবজবে হয়ে গেছিল। জলন্ধরে রেললাইনের ওপর অহিংসভাবে শুয়ে-থাকা সত্যাগ্রহী বিক্ষোভকারীরাও ভিজে একেবারে একসা হয়ে গেছিল। দীর্ঘদিনের খরায়-ফাটা মাটির ফাটলগুলো একটু একটু করে বুজে আসতে শুরু করল; কর্নওয়ালিস রোডের ওই বাড়িটার দরজা-জানলার ফাঁকে ফাঁকে তোয়ালে গুঁজে রাখা হয়েছিল, আর সেগুলোকে সারাক্ষণ নিংড়ে নিংড়ে আবার জায়গামতো গুঁজে দিতে হচ্ছিল। রাস্তার ধারে ধারে জমে-থাকা জলের ডোবাগুলোতে যেন মশার চাষ হতে শুরু করল। আর সেই পাতালঘর—মুমতাজের তাজমহল—এমন ড্যাম্প ধরে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে উঠল যে শেষমেশ সে বেচারি অসুস্থ হয়ে পড়ল।
ক-দিন তো সে কাউকে কিচ্ছুটি জানাল না, কিন্তু যখন তার চোখের কোল দুটো লাল হয়ে উঠল আর সে জ্বরের ঘোরে কাঁপতে শুরু করল, তখন নিউমোনিয়ার ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে নাদির তাকে বাবার কাছে গিয়ে চিকিৎসা করানোর জন্য রীতিমতো কাকুতিমিনতি শুরু করলেন। পরের বেশ কয়েকটা সপ্তাহ মুমতাজ আবার ফিরে এল তার বাপের বাড়ির পুরনো বিছানায়, আর আদম আজিজ তাঁর মেয়ের বিছানার পাশে বসে, জ্বরে-কাঁপতে-থাকা মেয়ের কপালে ঠান্ডা ফ্লানেলের কাপড় বুলিয়ে দিতে লাগলেন। ৬ই আগস্ট তার রোগটা একটু পিছু হঠল। ৯ তারিখ সকালে মুমতাজ বেশ খানিকটা সুস্থ হয়ে উঠল, সামান্য শক্ত খাবার মুখে তোলার মতো অবস্থা হলো তার।
আর এবার আমার দাদু একটা পুরোনো চামড়ার ব্যাগ নিয়ে এলেন, যার একেবারে তলার দিকে চামড়ার ওপর পুড়িয়ে লেখা ছিল হাইডেলবার্গ শব্দটা; কারণ তিনি মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলেন যে, মেয়েটার শরীর যখন এমন ভেঙে পড়েছে, তখন একবার ভালো করে আগাগোড়া পরীক্ষা করে নেওয়াটাই ঠিক হবে। তিনি ব্যাগের মুখটা খুলতেই তাঁর মেয়ে কাঁদতে শুরু করল।
(আর এবার আমরা ঠিক সেই জায়গাটায় এসে পড়েছি। পদ্মা: এই তো, এইবারই।)
মিনিট দশেক পর সেই দীর্ঘ নিস্তব্ধতার পর্ব একেবারে চিরকালের মতো ঘুচে গেল, কারণ আমার দাদু তখন রোগীর ঘর থেকে রীতিমতো গর্জন করতে করতে বেরিয়ে এলেন। তিনি গলা ফাটিয়ে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে আর ছেলেদের ডাকতে লাগলেন। তাঁর ফুসফুসের জোর ছিল সাঙ্ঘাতিক, আর সেই গর্জনের আওয়াজ সোজা গিয়ে পৌঁছোল পাতালঘরে-থাকা নাদির খানের কানে।
এই এত হট্টগোল আর চেঁচামেচি যে ঠিক কী কারণে হচ্ছে, সেটা আঁচ করা তাঁর পক্ষে খুব একটা কঠিন ছিল না।
পরিবারের সবাই ড্রয়িংরুমে রেডিয়োগ্রামের চারপাশে, সেই বয়স-থমকে-থাকা ছবিগুলোর নিচে এসে জড়ো হলো। আজিজ মুমতাজকে পাঁজাকোলা করে ঘরে এনে একটা সোফার ওপর বসিয়ে দিলেন। তাঁর মুখটা তখন একেবারে থমথমে, ভয়ংকর দেখাচ্ছে। একবার ভেবে দেখুন তো, তাঁর নাকের ভেতরটায় তখন ঠিক কেমন সুড়সুড়ি লাগছিল? কারণ তাঁকে এবার এমন একটা বোমা ফাটাতে হতো: বিয়ের পর পুরো দুটো বছর কেটে যাওয়ার পরও তাঁর মেয়ে কিনা এখনও কুমারী।
রেভারেন্ড মাদার এই নিয়ে পুরো তিনটে বছর টুঁ-শব্দটিও করেননি। ‘ওরে মেয়ে, কথাটা কি সত্যি?’ ছেঁড়া মাকড়সার জালের মতো যে নিস্তব্ধতা এতদিন ধরে বাড়ির আনাচেকানাচে ঝুলে ছিল, তা অবশেষে এক ফুঁয়ে উড়ে গেল; কিন্তু মুমতাজ শুধু মাথা নেড়ে জানাল: হ্যাঁ। সত্যি।
তারপর সে মুখ খুলল। সে বলল যে সে তার স্বামীকে ভালোবাসে, আর ওই বাকি ব্যাপারটা ঠিক একদিন না একদিন ঠিক হয়ে যাবে। মানুষটা ভারী ভালো, আর যেদিন তাদের বাচ্চা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি আসবে, সেদিন সে ঠিকই ওই কাজটাও করতে পারবে। সে বলল, একটা বিয়ে তো আর শুধু ওই একটা জিনিসের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না, অন্তত সে এমনটাই ভেবেছিল, আর তাই কথাটা সে কারও কাছে ঘুণাক্ষরেও তুলতে চায়নি, আর তার বাবারও এভাবে সবার সামনে গলা ফাটিয়ে কথাটা বলে দেওয়া মোটেই ঠিক হয়নি। সে হয়তো আরও কিছু বলত; কিন্তু ঠিক তখনই রেভারেন্ড মাদার একেবারে ফেটে পড়লেন।
টানা তিন বছরের জমানো কথা যেন একেবারে বাঁধ ভেঙে তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল (কিন্তু ওই কথাগুলো দিনের পর দিন জমিয়ে রাখার দায়ে তাঁর বেলুনের মতো ফুলে-ওঠা শরীরটা কিন্তু এতটুকু কমল না)। আমার দাদু টেলিফাঙ্কেন রেডিয়োটার পাশে একেবারে পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, আর তাঁর ওপর দিয়ে যেন এক সাঙ্ঘাতিক ঝড় বয়ে যেতে লাগল। কার মাথা থেকে বেরিয়েছিল এই বুদ্ধি? কোন আহাম্মকের মতলব ছিল, কী-যেন-বলে, এমন একটা কাপুরুষ যে কিনা আদতে কোনো পুরুষমানুষই নয়, তাকে এ-বাড়িতে ঢোকানোর? দিব্যি রাজার হালে, কী-যেন-বলে, তিন-তিনটে বছর ধরে এখানে থাকা আর খাওয়া জুটছে, তা আপনার আর কী—মাংস-না-মেলার দিনগুলো নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল আপনার? কী-যেন-বলে, চালের দর-দাম যে কোথায় চড়েছে সে বিষয়র কতটুকু মাথা ঘামিয়েছেন? কে সেই অপদার্থটা, কী-যেন-বলে, হ্যাঁ, সেই সাদা-চুলওয়ালা অপদার্থটা কে যে কিনা এমন একটা জঘন্য বিয়েতে মত দিয়েছিল? কে নিজের মেয়েকে ওই বজ্জাতটার, কী-যেন-বলে, বিছানায় তুলে দিয়েছিল? কার মাথাটা দুনিয়ার যাবতীয় ছাইপাঁশ হাবিজাবি চিন্তাভাবনায় ঠাসা ছিল, কী-যেন-বলে, কার মগজটা বিদেশি কায়দাকানুনের পাল্লায় পড়ে এমন গলে জল হয়ে গিয়েছিল যে নিজের মেয়েকে এমন একটা অস্বাভাবিক বিয়েতে সঁপে দিতে পারল? কে সারাজীবন ধরে কেবল খোদার অবাধ্য হয়েছে, কী-যেন-বলে, আর আজ কার মাথার ওপরে তার বিচার হয়ে নেমে এল? কে এই বাড়ির ওপর এমন সাঙ্ঘাতিক সর্বনাশ ডেকে আনল... তিনি আমার দাদুকে শুনিয়ে শুনিয়ে টানা এক ঘণ্টা উনিশ মিনিট ধরে বকে চললেন, আর তাঁর কথা যখন থামল, ততক্ষণে আকাশের মেঘেদেরও জল ফুরিয়ে গেছে এবং গোটা বাড়ির মেঝেতে জলে থইথই করছে। আর, তাঁর কথা থামার আগেই, তাঁর ছোটো মেয়ে এমেরাল্ড ভারী অদ্ভুত একটা কাণ্ড করে বসল।
এমেরাল্ডের হাত দুটো মুখের দু-পাশে উঠে এল, হাত দুটো মুঠো করা, শুধু তর্জনী দুটো সটান খাড়া। ওই খাড়া আঙুল দুটো ঢুকে গেল তার কানের ফুটোয়, আর মনে হলো যেন ওই আঙুলগুলোই তাকে চেয়ার থেকে হ্যাঁচকা টানে তুলে ছোটাল—দৌড়… কানে আঙুল গুঁজে এক্কেবারে পড়ি-মরি দৌড়! গায়ে ওড়না নেই, সোজা রাস্তায় বেরিয়ে জলের গর্তগুলো ভেঙে সে ছুটল তো ছুটলই। রিকশা-স্ট্যান্ড ছাড়িয়ে, পানের দোকান পেরিয়ে, যেখান থেকে বুড়োরা তখন সদ্য বৃষ্টি-থামা ধোয়ামোছা পরিষ্কার হাওয়ায় ভারী সাবধানে সবেমাত্র বাইরে পা বাড়াচ্ছিলেন। তার ওই সাঙ্ঘাতিক ছুট দেখে রাস্তার ওই বখাটে ছোকরারাও একেবারে থ, যারা কিনা পানের পিকের পিচকিরিগুলোর ফাঁক দিয়ে এপাশ-ওপাশ করার খেলা শুরু করার জন্য একেবারে তৈরি হয়ে দাঁড়িয়েছিল; কারণ একজন অল্পবয়সী মেয়ে, তা-ও আবার তিন বাত্তির একজন, গায়ে কোনো দোপাট্টা বা ওড়না না জড়িয়ে কানে আঙুল গুঁজে এমন পাগলের মতো একা একা বৃষ্টিতে-ভেজা রাস্তায় ছুটছে, এমন দৃশ্য দেখতে তো আর কেউ অভ্যস্ত ছিল না। আজকালকার দিনে শহরগুলো তো এমন আধুনিক, কেতাদুরস্ত, ওড়না-ছাড়া মেয়েতে গিজগিজ করে; কিন্তু সে-আমলে বুড়োরা এমন দৃশ্য দেখে দুঃখে জিভ চুকচুক করতেন, কারণ ওড়না ছাড়া মেয়েমানুষ মানেই তার কোনো মানসম্মান নেই, আর এমেরাল্ড বিবি কেনই-বা নিজের সম্মানটুকু বাড়িতে ফেলে রাস্তায় বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিল? বুড়োরা একেবারে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু এমেরাল্ড নিজে সবটাই জানত। বৃষ্টি-ভেজা সতেজ হাওয়ায় সে একেবারে জলের মতো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল যে, তাদের পরিবারের এই যাবতীয় ঝুটঝামেলার মূল পান্ডা হলো মাটির তলায় লুকিয়ে-থাকা ওই ভীতু মোটকা লোকটা (হ্যাঁ পদ্মা, ঠিকই ধরেছ)। ওটাকে কোনোভাবে বিদেয় করতে পারলেই বাড়ির সবাই আবার আগের মতো সুখে থাকবে... এমেরাল্ড এক মুহূর্তের জন্য না থেমে সোজা ছুটল ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। সেই ক্যান্টনমেন্ট, যেখানে সেনাবাহিনীর ঘাঁটি; আর যেখানে মেজর জুলফিকারকে ঠিক পাওয়া যাবে! নিজের কসম ভেঙে, আমার মাসি সোজা গিয়ে হাজির হলো তাঁর অফিসে।
মুসলমানদের মধ্যে জুলফিকার নামটা ভারী মশহুর। খোদ পয়গম্বর মহম্মদের ভাইপো, হজরত আলি, তিনি যে দোনালা তলোয়ারখানা বয়ে বেড়াতেন, সেটার নামই ছিল জুলফিকার। সে এমনই এক সাঙ্ঘাতিক হাতিয়ার, যা এই দুনিয়ার মানুষ আগে কখনও চোখেই দেখেনি।
ওহ হ্যাঁ: সেদিন দুনিয়ায় আরও একটা কাণ্ড ঘটছিল বটে। এমন এক সাঙ্ঘাতিক মারণাস্ত্র, যা এর আগে দুনিয়ার মানুষ কখনও চোখেই দেখেনি, তা জাপানের ওই হলদেটে চামড়ার মানুষদের ওপর আছড়ে পড়ছিল। কিন্তু এই আগ্রায় বসে এমেরাল্ড আবার তার নিজের একটা গোপন অস্ত্র প্রয়োগ করছিল। সেটা ছিল ধনুকের মতো বাঁকা-পা-ওয়ালা, বেঁটেখাটো আর চ্যাপ্টা মাথার এক লোক; যার নাকটা প্রায় থুতনি ছুঁয়ে থাকত; আর সে কিনা স্বপ্ন দেখত একখানা পেল্লায় আধুনিক বাড়ির, যেখানে তার বিছানার ঠিক পাশটিতেই বসানো থাকবে একখানা বাথটাব।
হামিংবার্ডের খুনের পেছনে সত্যিই নাদির খানের কোনো হাত ছিল কি না, সে-ব্যাপারে মেজর জুলফিকার কখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি ঠিকই; কিন্তু সত্যিটা পরখ করে দেখার জন্য তাঁর ভেতরটা সারাক্ষণই নিশপিশ করত। আগ্রার মাটির তলার সেই তাজমহলের কথা এমেরাল্ডের মুখে শুনে তিনি এতটাই উত্তেজিত হয়ে পড়লেন যে রাগ করার কথাটাও বেমালুম ভুলে গেলেন, আর পনেরোজন সেপাইয়ের একটা দল নিয়ে সোজা কর্নওয়ালিস রোডের দিকে ছুটলেন। এমেরাল্ডকে সামনে রেখেই তারা ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকল। আমার মাসি: সুন্দর একটা মুখের আড়ালে যেন আস্ত এক বিশ্বাসঘাতক, গায়ে কোনো ওড়না নেই, আর পরনে গোলাপি রঙের ঢলঢলে পাজামা। সেপাইগুলো ড্রয়িংরুমের কার্পেটটা গুটিয়ে সরিয়ে যখন পেল্লায় সেই চোরাদরজাটা খুলল, আজিজ একেবারে বোবাকালা হয়ে সেই দৃশ্য দেখতে লাগলেন। ওদিকে আমার দিদিমা তখন মুমতাজকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘মেয়েমানুষের বিয়ে তো কোনো পুরুষমানুষের সঙ্গেই হওয়া উচিত,’ তিনি বলে উঠলেন। ‘তা বলে কোনো ইঁদুরের সঙ্গে তো আর নয়, কী-যেন-বলে! ওই, কী-যেন-বলে, কেঁচোটাকে ছেড়ে আসার মধ্যে কোনো লজ্জার ব্যাপার নেই।’ কিন্তু তাঁর মেয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলল।
পাতালঘরে নাদিরের সেই অনুপস্থিতি! আজিজের প্রথম গর্জনেই সে সাবধান হয়ে গিয়েছিল; আর বর্ষার জলের চেয়েও দ্রুতগতিতে যে লজ্জা তাকে গ্রাস করেছিল, তাতে সে এক নিমেষেই ভোজবাজির মতো উবে গেল। টয়লেটগুলোর একটাতে একটা চোরাদরজা হাঁ করা অবস্থায় পড়ে আছে—হ্যাঁ, ঠিক সেটাই, কেনই বা হবে না, যেখানে বসে সে একটা পুরোনো কাপড় ধোয়ার বাক্সের নিরাপদ আশ্রয় থেকে ডাক্তার আজিজের সঙ্গে কথা বলেছিল। একপাশে পড়ে আছে একটা কাঠের ‘থান্ডারবক্স’—একটা ‘সিংহাসন’—আর নারকেলের ছোবড়ার মাদুরের ওপর এনামেলের একটা খালি পাত্র এদিক-ওদিক গড়িয়ে বেড়াচ্ছে। টয়লেটটার বাইরের দিকে একটা দরজা আছে, যেটা গিয়ে খুলেছে ভুট্টাখেতের পাশের গলিটাতে; দরজাটা এখন খোলা। বাইরে থেকে তালা লাগানো ছিল ঠিকই, কিন্তু দেশি কোম্পানির তালা, তাই সেটা ভাঙা ছিল জলভাত... আর ওই তাজমহলের নরম আলোয় ভরা নিভৃত অবসরে পড়ে আছে একটা ঝকঝকে পিকদানি, আর মুমতাজের উদ্দেশে লেখা তার স্বামীর সই করা একটা চিরকুট, মাত্র তিনটে শব্দ, ছ-টা সিলেবল, আর শেষে তিনটে বিস্ময়সূচক চিহ্ন:
তালাক! তালাক! তালাক!
উর্দু ভাষায় ওই শব্দটায় যে বজ্রপাতের মতো একটা গমগম আওয়াজ আছে, ইংরেজিতে তার বালাই নেই, আর তাছাড়া এর মানেটা তো আপনারা বিলক্ষণ জানেন। আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম। আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম। আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম।
নাদির খান শেষপর্যন্ত একটা ভদ্রোচিত কাজই করল।
পাখি যে ডানা মেলে উড়ে গেছে, সে-কথা টের পেয়ে মেজর জুলফির সে কী ভয়ংকর রাগ! চোখের সামনে তিনি তখন কেবল লাল রং দেখছেন। ওহ, সে রাগ একেবারে আমার দাদুর রাগের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো, যদিও তার বহিঃপ্রকাশটা ঘটল বড্ড ছোটোখাটো কিছু অঙ্গভঙ্গির মধ্যে দিয়ে! মেজর জুলফি প্রথমটায় রাগের চোটে একেবারে অসহায় হয়ে ব্যাঙের মতো লাফাতে লাগলেন; শেষমেশ নিজেকে কোনোমতে সামলে, বাথরুমের ভেতর দিয়ে, সেই সিংহাসনটা পেরিয়ে, ভুট্টাখেতের পাশ দিয়ে সীমানার গেট গলে বাইরে ছুটলেন। কিন্তু কোত্থাও সেই দৌড়তে-থাকা, মোটাসোটা, লম্বা-চুলওয়ালা, ছন্দহীন কবির টিকিও দেখা গেল না। বাঁ-দিকে তাকালেন: কিচ্ছু নেই। আর ডানদিকে: আস্ত একটা শূন্য। রাগে ফুঁসতে থাকা জুলফি এবার নিজের রাস্তা বেছে নিলেন, সাইকেল-রিকশার স্ট্যান্ডটা পেরিয়ে তীরবেগে ছুটলেন। বুড়োরা তখন পিকদানিতে-পিক-ফেলার খেলায় মেতেছে, আর পিকদানিটা রাখা আছে ঠিক রাস্তার মাঝখানে। রাস্তার ওই ছোকরারা পানের পিকের পিচকিরির ফাঁক দিয়ে এপাশ-ওপাশ করে গা বাঁচাচ্ছে। মেজর জুলফি ছুটলেন তো ছুটলেনই। বুড়োরা আর তাদের নিশানার ঠিক মাঝখান দিয়ে তিনি ছুট লাগালেন বটে, কিন্তু ওই ছোকরাদের মতো তো আর তাঁর অত কায়দাকানুন জানা ছিল না।
ঠিক তখনই ঘটল সেই চরম দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা: লাল রঙের এক নিচু অথচ জোরালো পিচকিরি এসে সটান লাগল তাঁর দুই পায়ের ঠিক মাঝখানটায়। তাঁর যুদ্ধের পোশাকের ঠিক ওই বিশেষ জায়গাটাতেই যেন একটা লাল হাতের ছাপ খামচে ধরল; যেন টিপে ধরল; আর তাঁর গতিটাকেও ওখানেই থামিয়ে দিল। চরম আক্রোশে মেজর জুলফি থমকে দাঁড়ালেন। ওহ, ব্যাপারটা আরওই দুর্ভাগ্যজনক হয়ে দাঁড়াল; কারণ, ওই খেলায় মাতোয়ারা দ্বিতীয় একজন বুড়ো, এই পাগল সেনা-অফিসারটা ছুটতেই থাকবে ভেবে, পানের দ্বিতীয় পিচকিরিটা ততক্ষণে ছুড়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় একটা লাল হাত যেন প্রথম হাতটার ওপর চেপে বসল, আর মেজর জুলফির সেই দিনটার একেবারে বারোটা বাজিয়ে ছাড়ল...
ভারী ধীরেসুস্থে, একেবারে ভেবেচিন্তে, তিনি ওই পিকদানিটার কাছে গেলেন আর লাথি মেরে ওটাকে ধুলোর মধ্যে উলটে দিলেন। তারপর ওটার ওপর লাফিয়ে পড়লেন—একবার! দু-বার! আবার!—দাবিয়ে একদম চ্যাপ্টা করে দিলেন ওটাকে, আর লাথির চোটে পায়ে যে সাঙ্ঘাতিক লেগেছে, সেটা প্রাণপণে চেপে গেলেন। তারপর, নিজের মানসম্মানটুকু কোনোমতে বজায় রেখে, তিনি খোঁড়াতে খোঁড়াতে আমার দাদুর বাড়ির বাইরে দাঁড়-করানো গাড়ির দিকে ফিরে গেলেন। বুড়োরা তখন তাদের সেই দুমড়েমুচড়ে-যাওয়া পাত্রটা কুড়িয়ে নিয়ে ঠুকে ঠুকে ওটাকে আবার আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনার কাজে লেগে পড়ল।
এমেরাল্ড মুমতাজকে বলল, ‘আমার বিয়ে হচ্ছে, এখন তুমি যদি একটু আনন্দ করার চেষ্টাও না করো, তবে সেটা কিন্তু খুব খারাপ দেখাবে। আর তাছাড়া, এই সময় তো তোমারই আমাকে নানা পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করার কথা।’ তখন মুমতাজ তার ছোটো বোনকে দেখে মৃদু হাসলেও, মনে মনে ভেবেছিল এমেরাল্ডের এমন কথা বলার ধৃষ্টতা তো কম নয়। আর হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবেই, বোনের পায়ের তলায় মেহেদির নকশা আঁকার সময় সে পেন্সিলের চাপটা একটু বেশিই বাড়িয়ে দিয়েছিল। এমেরাল্ড ছিটকে উঠে কেঁই করে উঠল, ‘উঃ! রাগ করার কী আছে! আমি তো শুধু চেয়েছিলাম আমরা যেন একটু বন্ধুর মতো মিশতে পারি।’
নাদির খানের অন্তর্ধানের পর থেকেই বোনেদের সম্পর্কের মধ্যে একটু যেন টানাপোড়েন চলছিল; আর মুমতাজ ব্যাপারটা একেবারেই মেনে নিতে পারেনি, যখন মেজর জুলফিকার (যিনি একজন ফেরারি আসামিকে লুকিয়ে রাখার অপরাধে আমার দাদুকে অভিযুক্ত না করে বরং ব্রিগেডিয়ার ডডসনের সঙ্গে ব্যাপারটা মিটমাট করে নিয়েছিলেন) এমেরাল্ডকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলেন এবং সম্মতিও পেয়ে গেলেন। ‘এ তো রীতিমতো ব্ল্যাকমেইল,’ সে মনে মনে ভাবল। ‘আর তাছাড়া, আলিয়ার কী হবে? যে সবার বড় তার বিয়ে তো সবার শেষে হওয়া উচিত নয়, আর দেখো না, নিজের সেই সওদাগর লোকটার জন্য ও কতই না ধৈর্য ধরে বসে আছে।’ কিন্তু মুখে সে কিছুই বলল না, বরং স্বভাবসুলভ সহিষ্ণু হাসিটি হেসে বিয়ের আয়োজনে নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমের সহজাত গুণটুকু পুরোপুরি সঁপে দিল, আর রাজি হলো একটু আনন্দে মেতে ওঠার চেষ্টা করতে; এদিকে আলিয়া আহমেদ সিনাইয়ের জন্য নিজের অপেক্ষার প্রহর গুনতেই থাকল। (‘ও তো চিরকালই অপেক্ষা করে যাবে,’ পদ্মার অনুমান: একেবারেই নির্ভুল।)
১৯৪৬ সালের জানুয়ারি মাস। দীর্ঘ শামিয়ানা, মিষ্টিমুখ, লোকজন, গানবাজনা, জ্ঞান-হারানো কনে আর একেবারে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা বর: সব মিলিয়ে এক চমৎকার বিয়ের আসর... আর সেখানেই রেক্সিন-ব্যবসায়ী আহমেদ সিনাই সদ্য-তালাক-পাওয়া মুমতাজের সঙ্গে একেবারে গভীর খোশগল্পে মেতে উঠল। ‘আপনি বাচ্চাদের ভালোবাসেন?—কী আশ্চর্য মিল, আমিও…’ ‘আর আপনার কোনো ছেলেপুলে হলো না, আহা রে বেচারি? আসলে সত্যি বলতে কী, আমার স্ত্রীর পক্ষে সন্তানধারণ সম্ভব ছিল না…’ ‘ওহ না; আপনার জন্য বড্ড খারাপ লাগছে; আর আপনার স্ত্রীর মেজাজটাও নিশ্চয়ই খুব খিটখিটে ছিল!’ ‘... ওহ, সে আর বলতে... কিছু মনে করবেন না। আবেগের বশে একটু বেশিই বলে ফেললাম।’ ‘—ঠিক আছে, কোনো ব্যাপার না; ওসব নিয়ে ভাববেন না। উনি কি থালাবাসনও ছুঁড়ে মারতেন নাকি?’ ‘ছুঁড়ে মারতেন মানে? এক মাস তো আমাদের খবরের কাগজে রেখে খাবার খেতে হয়েছিল!’ ‘না না, ওমা, আপনি কী সুন্দর বাড়িয়ে বাড়িয়ে গল্প বলতে পারেন!’ ‘ওহ, কিছু লুকোবার জো নেই, আপনি আমার চেয়ে অনেক বেশি চতুর। তবে হ্যাঁ, সে কিন্তু সত্যিই থালাবাসন ছুঁড়ে মারত।’ ‘আহা রে, বেচারা আপনি।’ ‘না—আপনি। বেচারি আপনি।’ আর মনে মনে ভাবছে: ‘কী চমৎকার মানুষটা, আলিয়ার সঙ্গে থাকলে লোকটাকে সবসময় কেমন যেন বোরিং লাগত…’ আর, ‘... এই মেয়েটা, আমি তো এর দিকে আগে কখনও ফিরেও তাকাইনি, কিন্তু ইয়া খোদা…’ আর, ‘... বোঝাই যাচ্ছে উনি বাচ্চাদের কত ভালোবাসেন; আর ঠিক সেই কারণেই আমি হয়তো…’ আর, ‘... যাক গে, গায়ের রং নিয়ে আর ভেবে কাজ নেই…’ এটা বেশ চোখেই পড়ার মতো ব্যাপার ছিল যে, গান গাওয়ার সময় হলে মুমতাজ দিব্যি উৎসাহের সঙ্গে সব ক-টা গানে গলা মেলাচ্ছিল; কিন্তু আলিয়া একেবারে চুপটি করে ছিল। জালিয়ানওয়ালাবাগে ওর বাবা যতটা চোট পেয়েছিলেন, ও যেন ভেতর ভেতর তার চেয়েও অনেক বেশি জখম হয়েছিল; অথচ ওর গায়ে আপনি একখানা আঁচড়ের দাগও দেখতে পাবেন না।
‘তা, ওগো আমার গোমড়ামুখো দিদি, শেষমেশ বেশ ফুর্তি-টুর্তি করলে দেখছি।’
সে-বছর জুন মাসে মুমতাজ আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসল। মায়ের দেখাদেখি ওর দিদিও ওর সঙ্গে একেবারে কথাবার্তা বন্ধ করে দিল, আর সেই কথা বন্ধ রইল একেবারে তাদের দুজনের মৃত্যুর ঠিক আগে পর্যন্ত, যখন সে প্রতিশোধ নেওয়ার একটা মোক্ষম সুযোগ খুঁজে পেল। আদম আজিজ আর রেভারেন্ড মাদার দুজনে মিলে আলিয়াকে বিস্তর বোঝানোর চেষ্টা করলেন, যদিও তাতে কোনো লাভ হলো না। তাঁরা বোঝাতে চাইলেন যে, জীবনে এমন ঘটনা তো ঘটেই থাকে, আর পরে ধোঁকা খাওয়ার চেয়ে আগেভাগেই সবটা জানাজানি হয়ে যাওয়া অনেক ভালো। আর তাছাড়া মুমতাজ মনে সাঙ্ঘাতিক আঘাত পেয়েছে, এই ধাক্কা সামলে ওঠার জন্য ওর পাশে একজন পুরুষের খুব দরকার... আর আলিয়ার তো যথেষ্ট বুদ্ধিশুদ্ধি আছে, সে ঠিকই সব সামলে নিতে পারবে।
‘কিন্তু, কিন্তু,’ আলিয়া বলল, ‘কেউ তো আর কোনোদিন কোনো বইকে বিয়ে করে না।’
‘নিজের নামটা এবার পালটে ফেলো,’ আহমেদ সিনাই বললেন। ‘নতুন করে সব শুরু করার সময় হয়েছে। ওই মুমতাজ আর তার নাদির খানকে একেবারে জানলা দিয়ে গলিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দাও, আমি তোমার নতুন একটা নাম রাখব। আমিনা। আমিনা সিনাই: নামটা তোমার পছন্দ হবে?’
‘তুমি যা বলবে, স্বামী,’ আমার মা বললেন।
‘যাই হোক,’ সেই বুদ্ধিমতী মেয়ে আলিয়া নিজের ডায়েরিতে লিখল, ‘বিয়ে-শাদির এই ঝকমারিতে কে আর সাধ করে জড়াতে চায়? আমি অন্তত নই; কক্ষনো না; একেবারেই না।’
অনেক আশাবাদী মানুষের কাছেই মিঞা আবদুল্লা ছিলেন একটা ভুল সূচনা; আর তাঁর সেই সহকারী (আমার বাবার বাড়িতে যার নামটুকু পর্যন্ত মুখে আনা বারণ ছিল), সে ছিল আমার মায়ের জীবনের এক ভুল বাঁক। কিন্তু সেগুলো ছিল খরার বছর; সে সময় বোনা বহু ফসলই শেষমেশ কোনো কাজেই আসেনি।
‘তা ওই মোটকাটার শেষমেশ হলোটা কী?’ পদ্মা বেশ চটে গিয়েই জানতে চায়। ‘তুমি নিশ্চয়ই এমনটা বোঝাতে চাইছ না যে তুমি ওর কথা আমাদের আর বলবে না?’
পূর্ববর্তী পর্ব পড়ুন এখানে: [মধ্যরাতের সন্তানেরা]
মধ্যরাতের সন্তানেরা
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল
সালমান রুশদি
▋অনুবাদ: দীপ মন্ডল




মন্তব্য